বুধবার, ডিসেম্বর ১১
TheWall
TheWall

ব্লগ : আমার বিচিত্র কথা-১ ২৫শে জুনের সেই মায়াবী রাত

[আজকাল দু’পয়সা সবাই দিচ্ছে – বাসে, ট্রামে, আড্ডার ঠেকে, সোশ্যাল মিডিয়ায়।  The Wall-এর তরফে যখন আমার কাছে লেখা চাওয়া হয়েছিল, তখন শর্ত করে নিয়েছিলাম দু’পয়সার বদলে না হয় চার আনাই দেবো কিন্তু কোনো তাড়া দেওয়া চলবে না।  অবশ্য প্রথমেই  স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে চার আনার বেশি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ আট আনা দিতে গেলেও পেটে কিঞ্চিত বিদ্যে থাকা দরকার – আমার আবার ঐ জিনিসটার বেশ অভাব আছে। ব্লগ লেখার একটা মজা হচ্ছে নিজের মনের মত বিষয় নিয়ে কিছুমিছু একটা লিখে ফেললেই হলো, সম্পাদকের ছুরি কাঁচির তলে জবাই হওয়ার ভয়টা কম। এদিকে কালে কালে বেলা গড়িয়েছে – আমার জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলিও ভরে উঠছে আস্তে আস্তে। পাঠকদের আশ্বস্ত করে জানাই কোনো বিশেষজ্ঞের টুপি পরে নয় বরং এক পাতি পাবলিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই দেওয়ালে আঁকিবুকি কাটবো।  অতএব, সাধু সাবধান।]

রানা আইচ

সে বছর উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে বেশ লায়েক লায়েক ভাব হয়েছে। বাবা মাকে জানিয়ে দিলাম গ্রীষ্মাবকাশে একাই চলে যাবো বিহারের পুর্নিয়াতে – যেখানে রয়েছে আমাদের দেশের বাড়ি। সেখানে ঠাকুরদার বিশাল ছাতার তলায় রয়েছে আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। আর আছে আমার সমবয়সী অতিপ্রিয় জ্যাঠতুতো দাদা যার সাথে প্রায় প্রতি গ্রীষ্মেই মোলাকাত হয়। পুর্নিয়া তখন এক ছোট্ট ঝিমধরা জেলা শহর – যার ঠিক মাঝখান দিয়ে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর চলে গেছে NH 31। সেই জাতীয় সড়কের ঠিক পাশেই ছিল আমাদের বাড়ি। প্রায় দুবিঘা জমির ওপর ‘L’ শেপের ছোট। ঠাকুরদার ছিল কাঠের ব্যাবসা। সেই বেওসার গদিঘর পেরিয়ে আরও ১০০ ফুট হেঁটে আমাদের বাড়িতে ঢুকতে হতো। সারি সারি টিনের শেডে কাঠ সাজানো থাকতো – আর শেডের শেষ মাথায়, বাড়ি আর গদিঘরের ঠিক মাঝখানে ছিল এক বিশাল বকুল গাছ। সেইখান থেকে শুরু হত আমাদের বাগান। ছিল হরেক রকম গোলাপ ফুলের গাছ – গ্রীষ্মে যদিও সেরকম ফুল হত না। তবে বাড়িতে ঢোকার মুখে বারান্দায় দুটো লতানে সাদা গোলাপ গাছে সেই গরমেও ফুল ফুটে থাকতো। আর ছিল অসংখ্য ফলের গাছ। বারান্দার ডান পাশে ছিল এক মজফ্ফরপুরী লিচু গাছ। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই লিচু গাছ নিয়ে। প্রতি গ্রীষ্মের ছুটিতে শেয়ালদহ থেকে সন্ধ্যা বেলায় দার্জিলিং মেল চেপে – কুমেদপুর শাখা লাইন ধরে পরেরদিন সকালে কাটিহার জংশন থেকে বাস ধরে সকাল দশটা এগারটা নাগাদ সেই গদিঘরের স্টপে নেমে আমার প্রথম কাজই ছিলো বাড়িতে ঢোকার আগে সেই লিচু গাছে উঠে টপাটপ ১৫-২০টা লিচু খেয়ে বারান্দায় বেতের চেয়ারে আসীন ঠাকুরদার পায়ের ধুলো নেওয়া। এছাড়া সারা বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, নারকেল, পেয়ারা, জামরুল, লেবু, বাতাবিলেবু গাছের সমাহার। এছাড়া গদিঘরের সামনে ছিল একটা আতা গাছ – পুর্নিয়া ছাড়া অন্য কোথাও দেখার সুযোগ হয়নি, গরুর গোয়ালের পাশে একটা কাশীর পেয়ারা আর পেছনে পুকুরের ধারে একমবোদ্বিতীয়ম গোলাপজামের গাছ।

আরও পড়ুন:  ব্লগ: ২৫শে জুনের সেই মায়াবী রাত – ২

যে কথা বলার জন্য এই রকম গৌরচন্দ্রিকা করতে হল – তা হল কলকাতার ঘুপচি কুঠুরি থেকে পালিয়ে পুর্নিয়ার এই খোলা মেলা পরিবেশে পা দিয়েই ঘরে আর মন বসত না। অবশ্য ততকালীন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রের পরিষেবার গুঁতোয় ঘরে টেঁকাও দায় ছিলো তখন। পুর্নিয়া শহরে কারেন্ট তখন যেতো না, মাঝে মাঝে আসতো। দাদা সাইকেলের কেরিয়ারে চাপিয়ে আমাকে নিয়ে যেতো বাড়ি থেকে মাইল চারেক দূরে আমাদের পারিবারিক ক্ষেতে। জায়গাটার নাম ছিলো কামাত। ধান ক্ষেতের অদুরে ছিল রেলওয়ে লাইন। পথের পাঁচালীর মত সাদা কালো ধোয়া ছেড়ে সেই লাইনে চলে বেড়াত কয়লার ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি। অনেক সময়ে সকালের জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম কামাতের উদ্দেশ্যে। ওখানে পৌঁছে আম গাছের ছায়ায় খাটিয়া পেতে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতাম অক্ষয় কুমার বড়ালের কায়দায়। তো একদিন ঠাকুরমা আমাদের বললেন কামাত থেকে আম পেড়ে নিয়ে আসার জন্য – সামনেই ষষ্ঠী আসছে। ধান ক্ষেতের মাঝে মাঝে আম গাছ – কোনওটা ল্যাংড়া, কোনওটা হিমসাগর, এছাড়া ছিল বিজু আর চৌসা। তো সেবার দাদা ঠিক করলো – ক্ষেতের দুটো কালাপাহাড় আম গাছ থেকে আম পাড়া হবে। কালাপাহাড়? শুনে থমকে যাই। সে আবার কেমনতর নাম? দাদা খবর দিলো কালচে সবুজ আমটা নাকি কাঁচাপাকা অবস্থাতেই চিনির মত মিষ্টি। মহা উৎসাহে শুরু হল আঁকশি দিয়ে আম পাড়া। কালচে সবুজ আমগুলো ঝুপ ঝুপ করে মাটিতে নেমে এলো। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই ভরে উঠ্ল বস্তা। একটা দুটো কাঁচা আম খেয়ে দেখলাম। সত্যি লা জবাব। সেদিন দু’বস্তা আম নিয়ে দিগ্বিজয়ীর হাসি নিয়ে রিক্সা চেপে বাড়ি ফিরলাম। ধরাধরি করে আমের বস্তা দুটো বসার ঘরে নিয়ে আসা হলো। আমগুলো সব ছড়িয়ে দেওয়া হলো খাটিয়ার তলায় – ওখানে থাকলে গরমের ভাপে আমগুলো তাড়াতাড়ি পেকে যাবে।

এই ভাবেই কেটে গেলো জুনের প্রথম সপ্তাহ। গরমের দাবদাহে কখনও কামাতের আমগাছের ছায়ার তলায় খাটিয়াতে আয়েস করে শুয়ে বসে দাদার সাথে জীবনের নিষিদ্ধ ও গুঢ় বিষয় নিয়ে আলোচনা, কখনও দুপুরবেলা রান্না ঘরের পাশের শশা ক্ষেতে থেকে পটাপট দু চারটে শশা তুলে নুন মাখিয়ে চটপট মুখে পুরে পাশের লিচু গাছের ডালে ডালে সময় কাটানো, আর কখনও বা নিতান্তই কিছু করার না থাকলে গদিঘরে বসে কাকা, জ্যাঠা, ভাই-বোনেদের সাথে নির্ভেজাল আড্ডা। রাতের বেলা লোডশেডিং এর গুঁতোয় অতিষ্ঠ হয়ে আমি দাদাকে নিয়ে চলে যেতাম ভাট্টা বাজারে। ডিজেল জেনারেটারের ঘ্যানঘ্যানে আওয়াজের মাঝে মুখে চালান করতাম ফুচকা বা ভেলপুরী। ইমারজেন্সী আলোর তলা দিয়ে কখন সখনো হেঁটে যেতো পুর্নিয়া-সুন্দরীরা – গোধুলি লগ্নের অন্যতম আকর্ষণ। একদিন রাতে দোনামনা করতে করতে সিনেমা হলে ঢুঁ মারলাম – বীর ধর্মেন্দ্র, হেমা মালিনী ও জীনাত আমনের ‘আলি বাবা ও চালিস চোর’ দেখতে। ‘হাতুবা হাতুবা’ গানের সাথে বেবী জিনাতের নাচের তালে তালে দেহাতী লোকেদের তালি আর শিষের আওয়াজ এখনো কানে বাজে। কলকাতা থেকে সকালে আসতো আগের দিনের আনন্দবাজার পত্রিকা – মফস্বলের লোকেদের জন্য ব্যস্ত নগর জীবনের খবর নিয়ে। আসু ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাসি খবর পেতাম বাজারি পত্রিকার খেলার পাতায়।

আরও পড়ুন: ব্লগ : আমার বিচিত্র কথা-১ ২৫শে জুনের সেই মায়াবী রাত 3

ক্রিকেট নিয়ে আমার আগ্রহ বরাবরই বেশি যদিও এখন তা প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। ১৯৮২ র গ্রীষ্মে ভারতের ইংল্যান্ড সফর অনেকটাই বিবিসি টেস্ট ম্যাচ স্পেশালে ফলো করেছিলাম। ২টো ওয়ান ডে তে পুরো হোয়াইটওয়াস আর ৩ টেস্ট ম্যাচের সিরিজে ০-১ এ হেরেছিল ভারত। কিন্তু প্রগাঢ় সখ্যতা হয়ে গেছিলো ব্রায়ান জনস্টন, ডন মৌজি, হেনরি ব্লোফেল্ড  আর ক্রিস্টোফার মার্টিন জেঙ্কিন্সের ক্রিকেট ধারাবিবরণীর সাথে।  পুরো পাখা হয়ে গেছিলাম।  কিন্তু সেবার আর বাড়ির পুরনো ফিলিপ্সের ঢাউস রেডিও খোলার সুযোগই  হয়নি – কারণ সেই সর্বগ্রাসী লোডশেডিং। টিভি দেখার তো প্রশ্নই নেই – কারণ তখনো পুর্নিয়াতে বোকা বাক্সের রমরমা দিন শুরু হয়নি। এই তাইরেনাইরেনার মাঝেই বাড়িতে খুঁজে পেলাম একটা ছোট্ট ট্রাঞ্জিস্টার। বেশ ভালো আওয়াজ – শুধু ব্যাটারিটা কমজোর। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাজার থেকে এভারেডি কিনে ট্রাঞ্জিস্টারের পেটে ভরতে না ভরতেই বিবিসিতে খবর পেলাম ভারতের প্রথম গ্রুপ লীগ ম্যাচ দেরিতে শুরু হয়েছে। জনস্টন ও তার টিমের ধারাবিবরণী মারফত জানলাম ভারি আবহাওয়া ও আলোর অভাবে ভারত প্রথম ২২ ওভারে কেঁদে ককিয়ে করেছে ৩ উইকেটে ৭৭। এরপরেই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান যশপাল শর্মা খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন সাহসী ৮৯ রানের এক ইনিংস খেলে। ভারতের ২৬২/৮ এর  জবাবে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেদিন ৬৭/৩ এ খেলা শেষ করল। এই সূত্রে জানিয়ে রাখি ১৯৮৩ তে নিয়ম ছিল বৃষ্টি বা আলোর স্বল্পতার জন্য খেলা একদিনে শেষ করা না গেলে পরের দিনও খেলা চালু থাকবে। অগত্যা খবর নিলাম সেদিনের দ্বিতীয় ম্যাচের – অস্ট্রেলিয়া বনাম জিম্বাবোয়ে।  এবং বিস্ময়ের আরো বাকি ছিল। জিম্বাবোয়েকে সবাই দুধেভাতে মনে করলেও টুর্নামেন্টের প্রথম বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল ওরাঁই। ভারতের হবু কোচ ডানকান ফ্লেচারের শৌর্যে প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী, টুর্নামেন্ট ফেভারিট অস্ট্রেলিয়াকে ১৩ রানে সেদিন হারিয়ে দিয়েছিল। পরের দিন খবর পেলাম ভারতও দুই বারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩৪ রানে হারিয়ে দিয়েছে। খুশিতে মনটা ভরে উঠলেও খুব একটা অবাক হইনি। কারণ সেই ১৯৮৩ তেই  ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলে ভারতের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দ্বিতীয় ওয়ান ডেতে (গায়ানায় হয়েছিল ম্যাচটা) আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২৭ রানে হারিয়েছিলাম। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভারত ৪৭ ওভারে গাভাস্কারের ৯০ ও কপিলদেবের ৩৮ বলে ঝোড়ো ৭২ রানের সুবাদে ২৮২ রান তুলতে সক্ষম হয়। মানে রবার্টস, হোল্ডিং, মার্শালের (জোয়েল গার্নার ছিল না সেই ম্যাচে) বিশ্বত্রাস ফাস্ট বোলিং এর সামনে আমরা সমান তালে যুঝে রানরেট ছয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছিলাম। আজকলকার ২০-২০ র যুগে তা নিতান্ত নগন্য মনে হলেও গায়ানার মাটিতে সেই ৯০ মাইল বেগে ধেয়ে আসা লাল টুকটুকে গোলার বিরুদ্ধে তা ছিল যেন ডেভিড ও গোলিয়াথের যুদ্ধের সমান। পরে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৫৫ রানে গুটিয়ে যায়। কপিলদেব ১০ ওভারে ৩৩ রান দিয়ে ২ টি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরষ্কারও পকেটেস্থ করেন।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ জেতার পর মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠ্লো। পরের ম্যাচে  জিম্বাবয়েকে হারিয়ে হেলায় পাঁচ উইকেটে হারিয়ে গ্রুপ লীগে ভারত বেশ শক্তপোক্ত জায়গায় পৌঁছে গেলো। খুঁত রয়ে গেলো শুধু একটি জায়গায়। সবাই মোটামুটি রান পেলেও ভারতের ওপেনাররা – গাভাস্কার বা শ্রীকান্ত, কেউই বড়ো রানের মুখ দেখতে পারলেন না। টিম ম্যানেজমেন্ট পরের দুটো ম্যাচে  গাভাস্কারকে ‘বিশ্রাম’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। গাভাস্কারের পরিবর্ত রবি শাস্ত্রীও বিশেষ সুবিধে করতে পারলেন না। ভারতীয়রা যেন অনেকদিনের পুরনো চেনা ফর্ম ফিরে পেয়ে হৈহৈ করে প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১৬২ রানে ও চতুর্থ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৬৬ রানে হেরে গ্রুপ লীগটা পুরো জমিয়ে দিলো।

পরের দুটো ম্যাচ জিততেই হবে। ডু অর ডাই।

(রানা আইচ সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত)

Leave A Reply