বুধবার, নভেম্বর ১৩

ব্লগ: ২৫শে জুনের সেই মায়াবী রাত – ২

রানা আইচ

কোথা থেকে শুরু করবো ভেবে কূল পাই না। পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা, সব কিছু ভালো মনে আছে এমন দাবী করা বেশ মুশকিল। যা পরিষ্কার মনে আছে সেটা প্রথমেই বলে ফেলি। শনিবার, ১৮ই জুন ভারত-জিম্বাবুয়ে ম্যাচের কমেন্টারি শুনেছিলাম – সেটা এখনও ভুলিনি। বিবিসির টিভি কর্মীদের স্ট্রাইক ছিলো সেদিন (যেটা কলকাতা ফিরে জানতে পারি) – কিন্তু রেডিওর ধারাবিবরণী চালু ছিলো রমরম করে। এও বেশ মনে আছে দুপুরবেলা রেডিওটা চালাতে পঁচিশ-ত্রিশ মিনিট দেরী করে ফেলেছিলাম – কেনো দেরি হয়েছিল মনে পড়ে না। তারপর যা বোধগম্য হল তাতে বুক শুকিয়ে গেলো। কেন্ট কাউন্টির টানব্রিজ ওয়েলসের ছোট্ট মাঠে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভারতের ৯ রানের মাথায় ৪ উইকেট পড়ে গেছে। প্যাভিলিয়নে ফিরে গেছে দুটি ম্যাচ পরে প্রথম দলে ফিরে আসা গাভাস্কার (০), শ্রীকান্ত(২), অমরনাথ(৫) আর মারকুটে সন্দীপ পাতিল(১)। অধিনায়াক কপিল দেব যশপাল শর্মার সাথে জুটি বেঁধেছেন। আমাদের বাড়িতে বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো হোলদোল ছিল না। সুদুর মফস্বলে ক্রিকেট তখনো আবালবৃদ্ধবনিতার মনে তেমন দাগ কাটতে পারেনি। শুধু মাঝে মাঝে আমার দাদা এসে একটু আধ্টু খবর নিচ্ছিলো। এর মাঝে আবার বিদ্যুৎ টাটা বাই বাই করে চলেও গেলো। আমি ট্রানজিস্টার বগলে সটান ছাদে চলে গেলাম – চিলেকোঠার ছায়ায় বসতে না বসতেই শর্মাজি প্যাভিলিয়নের পথে হাঁটা লাগালেন। জিম্বাবুয়ের ফাস্ট বোলার রসন আর অলরাউন্ডার কুরান পিচে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এরমধ্যেই  উইকেটকিপার হাউটনের তিনটে ক্যাচ তালুবন্দী করা হয়ে গিয়েছে। ভারত ১৭-৫, আজ আর রক্ষে নেই।

সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলেন ম্যাচের আয়োজকরা। তাঁরা তো ভাবতে শুরু করলেন লাঞ্চের আগে না খেলা শেষ হয়ে যায়! বিবিসি রেডিওর তরফ থেকে মাঠে উপস্থিত জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট সংস্থার প্রেসিডেন্টের কাছে অনুরোধ গিয়েছিলো একটা ইন্টারভিউর জন্য। তিনি নাকি শুধু বলেছিলেন – খেলাটা শেষ হতে আরো বাকি আছে। খুবই সুচিন্তিত মতামত বলতে হবে! এছাড়া প্রখ্যাত ক্রিকেট লিখিয়ে আয়াজ মেমনের কলামে জানতে পেরেছিলাম সেদিন ভারতের ড্রেসিং রুমের সামনে চেয়ারে অধিষ্ঠিত আরেক দিকপাল শুনিয়েছিলেন অভয়বাণী। তার নাম গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ।

আরও পড়ুন: ব্লগ : আমার বিচিত্র কথা-১ ২৫শে জুনের সেই মায়াবী রাত

এর পরের তিন ঘন্টা যা হলো তা ভারতকে শুধু পরজয়ের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে আনতেই সাহায্য করলো না – তা একেবারে বদলে দিলো টুর্নামেন্টের অভিমুখ, এবং ভারতকে প্রতিষ্ঠিত করলো ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে। এই ম্যাচটা নিয়ে পরে জানতে পেরেছি – যে পিচটাতে সেদিন খেলা হয়েছিল সেটা ছিলো মাঠের চারটে পিচের একদম ধারের পিচ। ফলে পিচের একদিকে বাউন্ডারির সীমানা বেশ দূরে তো অন্যদিকে সীমানার দড়িটা বেশ কাছে। কপিলদেব তার প্রতিআক্রমণে সেই সুযোগটাই নিলেন, কাছের বাউন্ডারির দিকে যে শটগুলো নিলেন তা ফিল্ডারকে পার করা মাত্র বিদ্যুৎগতিতে সীমানা অতিক্রম করলো – দূরের বাউন্ডারির দিকে এমনভাবে শটগুলো নিলেন যাতে খুব সহজেই তিন রান উঠে আসে। প্রথমে অলরাউন্ডার রজার বিনির সাথে ষষ্ঠ উইকেটে যোগ করলেন ৬০ রান। অষ্টম ও নবম উইকেটে যথাক্রমে মদনলাল (৩৯ বলে ১৭) ও কিরমানি (৫৬ বলে অপরাজিত ২৪) দাঁতে দাঁত চেপে কপিলকে সঙ্গ দিলেন। চার, ছয়ের ফোয়ারা ছুটিয়ে ইনিংসের ৪৯ তম ওভারে কপিল সেঞ্চুরি করলেন মাত্র ৭২ বলে। হঠাৎ খেয়াল হলো আস্তে আস্তে  ছাদে সন্ধ্যা নেমে আসছে – আমাকে ছেঁকে ধরেছে মশার দল। নীচে নেমে এলাম – লোডশেডিং তখনো জারি আছে। আমি রেডিওটা হাতে ঝুলিয়ে হাঁটা লাগালাম গদিঘরের দিকে।

কপিল পরের ৭৫ করলেন শেষ ১১ ওভারে। তার ১৭৫ এলো মাত্র ১৩৮ বলে ১৬টা চার ও ৬টা ছক্কার সুবাদে। স্ট্রাইকরেট ১২৬। শেষ ১১ ওভারের কমেন্টারি শুনতে শুনতে খালি প্রার্থনা করছিলাম কপিল যেন নিজের কাছে স্ট্রাইক রাখেন। এবং কিম আশ্চর্যম – কপিল যেন সারা ভারতের সমর্থকদের জন্য ঠিক সেই খেলাটাই খেলে দিলেন!  প্রতি ওভারের শেষেই এক বা তিন রান করে স্ট্রাইক নিজের কাছে রেখে দিলেন। ৬০ ওভারের শেষে ভারতকে ১৭-৫ থেকে প্রায় একক প্রচেষ্টায় ২৬৬-৮ তুলে ধরে ক্লান্ত কপিল যখন প্যাভিলিয়নে ফিরছেন – গাভাস্কার তাঁর ২৪ বছর বয়সী অধিনায়কের জন্য মাঠে এক গ্লাস জল নিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: ব্লগ : আমার বিচিত্র কথা-১ ২৫শে জুনের সেই মায়াবী রাত 3

জিম্বাবুয়ের ইনিংসে ওপেনিং জুটি একটু চেষ্টা করেছিল বটে – প্রথমে গ্রান্ট প্যাটারসন বিনির বলে এলবিডব্লু হলেন। টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন অনভিজ্ঞ ব্রাউন। কিন্তু ছোট বাউন্ডারির দিকে বল ঠেলে এক রানের জায়গায় দু রান নিতে গিয়ে রান আউট হয়ে গেলেন। এক লহমায় হয়ে গেলো ১১৩-৬। কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন অলরাউন্ডার কেভিন কুরান। একা লড়েছিলেন ৯৩ বলে ৭৩ রানের একটা ইনিংস খেলে। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। তিন ওভার বাকি থাকতে জিম্বাবুয়ে ২৩৫ রানে গুটিয়ে গেলো।

১৯৮৩ বিশ্ব কাপের রজত জয়ন্তী বর্ষে বিসিসিআই পুরো টিমটাকে সম্বর্ধনা জানিয়েছিলো। সেই অনুষ্ঠানে গাভাস্কার এক গোপন কথা ফাঁস করছিলেন। জানিয়েছিলেন লাঞ্চের সময় কপিলদেব ফিরে এসে দেখেন ড্রেসিংরুম প্রায় ফাঁকা। আউট হয়ে যাওয়া প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যান নাকি লজ্জায় কপিলদেবকে মুখ দেখাতে পারেননি। তারা অন্য কোথাও গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। নীচের ভিডিওটায় এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।

সামনে রইলো শুধু অস্ট্রেলিয়া। সেও তো আরেক মরণবাঁচন লড়াই। রান রেটে আবার তারা এগিয়ে। মানে ভারত হেরে গেলেই ছিটকে যাবে টুর্নামেন্ট থেকে। উত্তেজনায় সে রাতে ভালো করে ঘুমই এলো না।

গ্রেগ চ্যাপেলবিহীন অস্ট্রেলিয়া সেবার অনেকটা যেন কাণ্ডারীহীন জাহাজ। অধিনায়ক কিম হিউজকে টিমের একটা অংশ বিশেষ পাত্তা দিতো না। নিন্দুকেরা বলে বিশাল প্রতিভাবান সেই টিমটা সেবার তিনটে উপদলে ভাগ হয়ে গেছিলো। প্যাকার সিরিজ খেলে আসা বিশ্বত্রাস ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলি, জেফ থমসন আর উইকেটকিপার রডনি মার্শ ছিলো একদিকে আর অন্যদিকে ছিলো কিম হিউজ ও তার পারিষদেরা। তৃতীয় দলটার ভূমিকা ছিলো নিরপেক্ষ দর্শকের মতো। তাছাড়া ব্যাটিং লাইনআপটাও ছিলো বাঁহাতিতে ভর্তি। প্রথম ছটি পজিসনে একমাত্র কিম হিউজ ছিলো ডানহাতি ব্যাটসম্যান। সবচেয়ে বড়ো কথা লিলি ও থমসন জুটি তখন শুধু অতীতের ছায়া মাত্র।

আমাদের মস্তিষ্ক এক আশ্চর্য জায়গা বটে। দুদিন আগের জিম্বাবুয়ের সাথে খেলাটা এখনো বেশ মনে থাকলেও – এই প্রায় কোয়ার্টার ফাইনাল হয়ে যাওয়া ম্যাচটা খুব একটা যে মনে আছে তা নয়। শুধু আবছা মনে পড়ে ডেনিস লিলি খেলছে না শুনে মনে একটা স্বস্তির ভাব এসেছিলো। এছাড়া কিম হিউজের চোট ছিলো – তাই সে ম্যাচে ডেভিড হুকস অস্থায়ী অধিনায়কের ভূমিকা পালন করেন। ভারতের ইনিংসের শুরুতেই  নিয়মমাফিক ব্যর্থ হলেন গাভাস্কার। আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যাটসম্যানের পুরো টুর্নামেন্ট ব্যাপী রানের এই খরা দেখে খুবই হতাশ হয়েছিলাম। ভারত কোনওমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ৬৫ তে পৌঁছে অমরনাথের উইকেট যখন খুইয়ে বসল – তখন মনে হলো আর আশা না করাই ভালো। এরপর যশপাল শর্মা করলেন ৪০ বলে ৪০। অতিরিক্ত বাবু সেদিন নয় নয় করে ৩৭ রান (যার মধ্যে ১৫টা নো বল আর ৯টা ওয়াইড) তুলে ভারতের হয়ে খেলে দিলেন। এর থেকেই বোঝা যায় অস্ট্রেলিয়ার সেদিন মনে হয় না বিশেষ খেলার ইচ্ছে ছিল। সব মিলিয়ে ভারত ২৪৭ এর টার্গেট রেখেছিল অস্ট্রেলিয়ার সামনে। আস্কিং রেট চারের একটু বেশী।

রজার বিনি সম্বন্ধে বাজারে একটা চালু কথা ছিলো হুগলী দিয়ে হাওয়া ছাড়লে তবেই তিনি উইকেট পেয়ে থাকেন। সে ধারণা আরও  দৃঢ় হয় ১৯৮৬-৮৭ র পাকিস্তান সিরিজে ইডেন টেস্টে। তা সে কথা এখন থাক। মোদ্দা কথা হল বিনির মতো সুইং বোলাররা ভারতের শুকনো আবহাওয়ায় বিশেষ সুবিধা করতে পারতেন না বটে কিন্তু আদ্র ও ভারি পরিবেশে তার ছোট ছোট বিষাক্ত সুইং মেশানো আপাত নিরীহ বলগুলো বহু বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানকে সেই সময়ে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল। সেদিন অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে মনে আছে বিনি আর মদনলালের বিদ্ধংসী বোলিং এর কথা। বলবিন্দার সান্ধু ট্রেভর চ্যাপেলকে আউট করার পর বিনি পটাপট তুলে নেন গ্রেম উড, ডেভিড হুকস ও গ্রাহাম ইয়ালপকে। অপর প্রান্ত থেকেও  তিনটি মূল্যবান উইকেট তুলে যোগ্য সঙ্গত করেন মদনলাল। কিছুক্ষনের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া ৭৮-৭ র গাড্ডায় পড়ে এবং অচিরেই ১২৯-এ গুটিয়ে যায়। ১১৮ রানের এক বিশাল ব্যবধানে জেতে ভারত। বিনি ২১ রান আর ২৯ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হন।

গত দুই বিশ্বকাপের ৬টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে জেতা ভারতের জন্য সেমিফাইনালের দরজা যেনো হঠাৎ খুলে গেলো। এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল কপিলের সেই ঐতিহাসিক ‘চিচিংফাক’ ইনিংসের জন্য। এবার মুখোমুখি ইংল্যান্ড। এই মফস্বলে আর বসে থাকা চলে না। কলকাতায় টিভিতে নিশ্চই খেলা দেখাবে। পরেরদিন সকালে ঠাকুর্দাকে বল্লাম সেদিন বিকেলেই চলে যেতে হবে। দাদু তো শুনে তো আকাশ থেকে পড়লেন।

– এহনই যাইবার কী হৈলো? কয়েকদিন থাইক্যা যা! তাসারা ট্রেনের টিকিট কাটোস নাই, রিসার্ভেশন নাই – যাবি কি কইর‍্যা?

-না দাদু এবার তো যেতেই হবে। অত চিন্তা কোরো না। দরকার হলে টিকিট কেটে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে চলে যাবো – নয়তো খেলা দেখতে পারব না যে!

-কার লগে খেলা?

-ইংল্যান্ড।

-জিতুম আমরা?

-সে আর বলতে!

-কি আর কমু তরে। লায়েক হৈছস – যা পারস কর।

বিকেলবেলা দাদু ঠাকুরমা ও অন্যান্য গুরুজনদের প্রণাম করে, ভাইবোনেদের সাথে বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাকীরা গদীঘরে দাঁড়িয়ে রইলেন  – এমনকি দাদু পর্যন্ত। ওঁর সঙ্গে আমার সেই শেষ দেখা। পরের বছর হেমন্তের শেষে দাদু দেহ রাখলেন।

(লেখক সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত)

Leave A Reply