বুধবার, মে ২২

সান সিমোন থেকে / ৩

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আগেই লিখেছি এই দ্বীপ ঐতিহাসিক ভাবে দেখেছে প্রথম গাইয়েগো ভাষার কবিতার উত্থান, দেখেছে জুল ভের্ন -এর ক্যাপ্টেন নেমোকে। দেখেছে সামরিক শাসনের থাবা, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প। এখন এখানেই অনুষ্ঠিত হয় বাৎসরিক কবিতার কর্মশালা। এবারের কর্মশালার শুরু করেছিলাম আগের দুটি পর্বে। এবার শেষ করব বাকি অংশগ্রহণকারী কবিদের দিয়ে। রোসালিস ব্রাঙ্কো ( Rosa Alice Branco) সমসাময়িক পর্তুগেশ ভাষার গুরুত্বপূর্ণতম কবিদের একজন, আমাদের হিসেবে ৭০ দশকের কবি। দেখেছেন সালাজার এর স্বৈরাচারী শাসন। কবিতা লেখার বীজ পুঁতে ছিলেন বাবা। তাঁর নিজস্ব এক সিনেমা দেখার ঘর ছিল বাড়িতে। প্রজেক্টার ও চল্লিশজনের বসার জায়গা। সেই সিনেমার অন্ধকার ঘর থেকেই তাঁর কবিতার উৎপত্তি। পরে পেয়েছেন সর্বকালীন পর্তুগেশ ভাষার এক প্রধান কবি আন্তোনিও রামোস রোসার সান্নিধ্য, তাঁকে নিয়েই রোসালিসের ডক্টোরাল থিসিস। এখন সারা দুনিয়ার কবিতা উৎসবে ঘুরে বেড়ান। বন্দর শহর পোর্তো থেকে কিছু দূরে এক গ্রামে থাকেন। কবিতা লেখা ও কবিতার সংক্রান্ত কাজই তাঁর সময় যাপন। এখন একটি কবিতা উৎসবও চালান।

সান সিমোনের এই কবিতার বসবাস আসলে এক ২৪ ঘন্টা কবিতার সঙ্গে থাকা। সকাল উঠে প্রাতরাশের পর পরস্পরের লেখা অনুবাদ ও বিকেলে দ্বীপের বাইরে লঞ্চে চড়ে কাছাকাছি শহরগুলোয় কবিতা পড়ে আসা। ওয়াইন ও ভূমধ্যসাগরীয় খাবার। এরই মধ্যে মিরেন আগুর মেয়াবের সঙ্গে জমে উঠেছিল আলাপ। তিনি এই কর্মশালার আরেক অংশগ্রহণকারী মহিলা। স্পেনীয়। লেখেন এস্পানিয়ার আরেক ভাষা এউস্কেরায়। উত্তর এস্পানিয়ার পাইস বাস্কো ও নাবাররা অঞ্চলের এক অতি প্রাচীন ভাষা। দুনিয়ার ভাষা পরিবারে এর কোনও আত্মীয় নেই। ফ্রাঙ্কোর সামরিক শাসনকালে এই ভাষা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। গোপনে লেখা ও বলা চালিয়ে যাওয়া এই জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁদের ভাষা এক প্রতি-সংস্কৃতির বাহক। এখন গণতান্ত্রিক এস্পানিয়ায় এ ভাষার পূর্ণ স্বীকৃতি থাকলেও দুনিয়ার দ্বিতীয় ভাষা এস্পানিওলের সঙ্গে এক অসম লড়াই এখনও জারি। যখন আমাদের দেশে দেখি বেশি পাঠকের জন্য  বা  ইংলিশ মিডিয়ামের দোহাই দিয়ে অনেকেই ইংরেজিকে বেছে নিচ্ছেন লেখার মাধ্যম হিসেবে সেখানে মিরেন আগুরদের লড়াই কুর্নিশযোগ্য। আমি সর্বত্র দেখলাম তিনি প্রথমে তাঁর ভাষাতেই কবিতা কবিতা পড়লেন। তারপর পড়লেন অনুবাদ।

আগেই বলেছি শোসে মারিয়া আলবারেস কাক্কামোর কথা। তিনি লেখেন গাইয়েগো ভাষায়। গাইয়েগো যাকে বলা হয় পর্তুগেশ ভাষার মা, সেই ভাষাও ফ্রাঙ্কোর জমানায় নিষিদ্ধ ছিল। মনে রাখতে হবে, ফ্রাঙ্কোর মাতৃভাষা কিন্তু এই গাইয়েগো। কিন্তু তিনি সংখ্যা গরিষ্ঠতার অজুহাতে চাপিয়ে দিয়েছিলেন এস্পানিওল ভাষা। হয়ত মনে পড়বে গুজরাতিভাষী আরেক স্বৈরাচারীর কথা যিনি হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের বোঝা চাপিয়ে দিতে চান আমাদের উপরে। এই সান সিমোন ব্লগের প্রথম কিস্তিতে লিখেছিলাম শোসে মারিয়া সম্ভ্রমে শঙ্খ ঘোষ আর মেজাজে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর এই সম্মান গোটা এস্পানিয়ায় ছড়ানো রয়েছে তাঁর প্রতিরোধী স্পিরিটের জন্য। সারাজীবন এস্পানিওল সাহিত্যের শিক্ষক, কিন্তু নিজের লেখার ভাষা গাইয়েগো। তিনিই প্রথম প্রজন্মের গাইয়েগো কবি যিনি সামরিক শাসনের চোখ রাঙানির মধ্যে লিখেছেন নিজের ভাষায়। তাঁর নিজের কাকা মারা গেছেন ফ্রাঙ্কোর হাতে। বাবা দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন কয়েদখানায়। কিন্তু এসব তাঁকে দমাতে পারেনি।

আমাদের আরেক সহকবি টিমো বেরগের। আমার সমসাময়িক জার্মান কবি। টিমো জার্মান ঐতিহ্যের ভারে বিরিক্ত হয়েই শিখতে শুরু করেন এস্পানিওল ভাষা। পড়তে চলে যান আরহেন্তিনায়। সেখানে গিয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন ইস্পানো আমেরিকার কবিতায়। তাঁর কবিতা সোচ্চারভাবে আঙ্গিক সচেতন। এই অন্য রকম কবিতার সন্ধানে তাঁর আরহেন্তিনা গমন তাঁকে এক বিশেষ দিকে নিয়ে গেছে। তিনি এখন বার্লিনে লাতিনালে নামক এক কবিতা উৎসবের আয়োজন করেন।  সেখানে ইস্পানোভাষী কবিরা আসেন নানা দেশ থেকে।

সব শেষে যাঁর কথা না বললেই নয় তিনি ইয়োলান্দা কাস্তানিও। আমার সমসাময়িক গাইয়েগো ভাষার কবি। যাঁর সঙ্গে আমি আগেও অংশ নিয়েছি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের কবিতা কর্মশালায়। এই দিল্লিতে। সেমিনার করেছি ভাষাদের হেজেমনি নিয়ে। তিনিই আয়োজন করেন এই কবিতা কর্মশালার। নানা ভাষার কবিরা এই দ্বীপের নির্জনতায় ক্যাপ্টেন নেমোর স্নেহে কবিতা লিখুন এটা তাঁরই ভাবনা।

ছবিতে বাঁ দিক থেকে দাঁড়িয়ে ইয়োলান্দা কাস্তানিও, আব্দুল হাদি সাদোউন, টিমো বেরগের, রোসালিস ব্রাঙ্কো ও আমি। বসে বাঁ দিক থেকে মিরেন আগুর মেয়াবে, শোসে মারিয়া কাক্কামো ও গালিসিয়ার লেখক সমন্বয় মঞ্চের মারতা দা কোস্তা

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।

Shares

Comments are closed.