সোমবার, নভেম্বর ১৮

ব্লগ: ক্ষমতা অর্জন ও বর্জনের ইতিহাস

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি চলে আসি লোদি বাগানে। সেই লোদি বাগান, যেখানে মেহিকো তথা পৃথিবীর এক গুরুত্বপূর্ণ কবি ওক্তাবিও পাস (Octavio Paz) উনিশশো ষাটের দশকে নিয়মিত আসতেন হাঁটতে। এই সেই লোদি বাগান যার ভিতরে থাকা গম্বুজের নীল বিষয়ে পাস লিখেছিলেন কবিতায় “গম্বুজের তর্কাতীত নীলে কে যেন পাখি উগরে দেয়”। আর এই লোদি বাগানের পাড়াতেই লেখা হয় বিশ শতকের মেহিকোর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ। ক্ষমতা অর্জন ও বর্জনের ইতিহাস।মনে হয় ১৯৬৮ সালে দিল্লিতে ওক্তাবিও পাসের মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে পদত্যাগ, এক সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাসের সূচনা করে ইস্পানো-আমেরিকার জন্য। হয়ত বা আমাদের সকলের জন্য। কবি বা সাহিত্যিকের জন্য রাজকবি হবার দিন চলে গিয়েছিল কবে। ২০ শতক দেখেছিল সরকারি সাহায্যে লেখা কবিতা। আমেরিকা মহাদেশ দেখেছিল কবিদের কূটনীতিক হতে। কিন্তু ১৯৬৮ তে মেহিকোর সরকারের ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর প্রতিবাদে ওক্তাবিও পাসের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পদত্যাগ একেবারে অন্য এক ইতিহাসের সূচনা করে। কবি ক্ষমতার কাছে যাবেন কিনা বা রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারি হবেন কিনা এই দ্বন্দ্ব অনেক দিনের। অনেকে বলেছেন কবি তো কোন সাধুসন্ত নন। কবিরও দরকার সামাজিক প্রতিপত্তি। অথবা দরকার রাষ্ট্রশাসনের কাব্যিক অধিকার, বা মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যেমনটা বা ঘটে গেছে ফরাসীভাষী আফ্রিকা মহাদেশের সেনেগালে বা আমেরিকার মার্তিনিক দ্বীপে। সেখানে ফরাসীভাষার উত্তরাধুনিক কবিতার স্তম্ভপ্রতীম কাব্য আন্দোলন নেগ্রিতুদের দুই প্রতিভূ কবি লেওপোলদ সঁগর ও এমে সেজেয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা পেয়েছেন। সঁগর সেনেগালের রাষ্ট্রপতি ছিলেন দুই দশক (১৯৬০-১৯৮০)। আর সেজেয়ার আদায় করেছিলেন তাঁর দ্বীপভূমি মার্তিনিকের জন্য ফরাসী রাজ্য-অধিকার। তিনি আমৃত্যু ছিলেন সেই দ্বীপের সাংসদ ফরাসী সংসদে। দুজনেই প্রবল সেরেব্রাল কবি।  দুজনেই উত্তরঔপনিবেশিক তত্ত্বের স্তম্ভ। তাঁদের কাছে ক্ষমতা এসেছিল মানুষের হাত ধরে। দু দেশেই তাঁদের ক্ষমতায় থাকাকালীন  বিকাশ হয়েছে সম্যক। কিন্তু আমাদের মত দেশে? দেখা যাচ্ছে লাতিন আমেরিকায় ড্রাগ যুদ্ধের হাত ধরে ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে প্রবল। আর সেখান থেকেই কবি/লেখক/শিল্পী বা তথাকথিত বিদ্বজনেররা সরে এসেছেন সরাসরি রাজনীতি থেকে। তাঁরা ঢুকে পড়েছেন নাগরিক বিক্ষোভের রাজনীতিতে। আর এই সরে আসার সূচনা হয় পাসের পদত্যাগ দিয়ে।

পাস চিরকালই ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন নিয়ে সরব। সেই ১৯৪০ বা ১৯৫০ এর দশকে প্রায় সমস্ত বিদ্বজন কমিউনবাদী, তখন তিনি স্তালিনের বিরুদ্ধে সরব। এমনকি এই নিয়ে তাঁর সঙ্গে পাবলো নেরুদার মহাকব্যিক-আড়ি  ছিল ২০ বছর।  পরে নেরুদা নিজে স্তালিনের বিরুদ্ধে বলার পরে তাঁদের আড়ি মেটে। কিন্তু আমাদের দেশে কি ঘটছে? বা আমাদের ভাষায়? স্বপ্নের বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর আমাদের বিদ্বজনেরা তাঁদের সঙ্গে এমন এঁটে যান যে পার্টির দুর্বৃত্তায়ন নজরে আসে না, কেশপুর গড়বেতা আমাদের চুপ করিয়ে রাখে। ব্যতিক্রম সুভাষ মুখোপাধ্যায়। নন্দীগ্রামের পর সরকার পাল্টালেও দেখা যায় একই চিত্র। প্রতিবাদ বা ওই জাতীয় কিছু আসলে আমাদের চারিত্র্য নয়। নিরাপদ দূরত্ব, ফেসবুক ইত্যাদিই আমাদের জ্বালাময়ী ভাষণের অংশ। এতে অবশ্য অবাক হবার কিছু নেই। বাঙালির দর্শন নামক গ্রন্থের ভূমিকার মতিউর রহমান লিখছেন “… তত্ত্বকথা শুনতে ভালো লাগলেও তাতে জৈব প্রয়োজন মেটে না। তাই মানুষ প্রবৃত্তি বশেই জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে আত্মকল্যাণ খুঁজেছে। বহুজন-হিতে বহুজন সুখে যেহেতু কখনও সংঘবদ্ধ প্রয়াসের প্রেরণা মেলেনি তাই বাঙালিমাত্রেই ব্যক্তিক লাভ এবং লোভের সন্ধানে ফিরেছে কালো পিঁপড়ের মত”

আমি ওক্তাবিও পাস কে মনে করি। চুপ করে বসে থাকি গম্বুজের তর্কাতীত নীলের তলায়।

(শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।)

Leave A Reply