সোমবার, জানুয়ারি ২০
TheWall
TheWall

ব্লগ: শুদ্ধ হতে কতদিন লাগে…

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

অগাস্টের মধুর ব্রিস্টলে পৌঁছনোর একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল রামমোহন রায়ের সমাধি দেখা। তারপর জুড়ে গেল শহর দেখা ও স্বাভাবিক বইয়ের দোকান। আমি সঙ্গী ও প্রদর্শক ইংরেজ কবি নিকি আর্সকট (আমাদের যৌথভাবে লেখা কবিতার বই বায়বীয় মূলের কাজ চলছে তখন)। নিকি পড়েছে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানকার নাড়ি নক্ষত্র ওর জানা। আর সেই জানা থেকেই আমাদের অবশ্য গন্তব্যে দাঁড়ালো ইম্পেরিয়াল টোব্যাকো কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় তথা শহরের এক প্রাক্তন পৃষ্ঠপোষক উইলস সাহেবের টাওয়ার দেখা। এই সেই উইলস যাঁর নামের সিগারেট আজও আমাদের দেশে পাওয়া যায়। এই সেই ইম্পেরিয়াল টোব্যাকো কোম্পানি যার নামের আদ্যক্ষর আজও বদলায়নি (আই টি সি)। সেই টাওয়ারের পাশ থেকে একটা রাস্তা নেমে গেছে আর সেখানেই এক বইয়ের দোকান। সেখানে নানা বইয়ের সঙ্গে পেলাম গটফ্রিড বেন এর নির্বাচিত কবিতা। ফেবার অ্যান্ড ফেবার। সেই গটফ্রিড বেন যার কথা পড়েছিলাম অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের লেখায়। মগ্নচৈতন্যের কবি। রিলকে-উত্তর জার্মান কবিতার এক স্তম্ভ। অথচ তাঁর কোনও অনুবাদ সহজে চোখে পড়ে না। রাতে আমার আস্তানা অ্যাবেরিস্টউইথ শহরে ফেরার পর পড়তে শুরু করলাম ভূমিকাটা। এক আশ্চর্য জীবন কবির। পেশায় চিকিৎসক,   নাৎসিদল ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে হিটলার সংস্কৃতি উপদেষ্টা করেন। মনে রাখতে হবে নাৎসি দলের নামে কিন্তু সোশালিস্ট পার্টি লেখা ছিল। সঙ্গে ছিল জার্মান অস্মিতা যা সে সময়ের বহু বিদ্বজনকেই আকর্ষণ করেছিল। সে তালিকায় গুন্টার গ্রাস ও ছিলেন। কিন্তু তিন বছর পর গটফ্রিড বেন ইস্তফা দেন কারণ তাঁর কাছে তখন নাৎসিদের স্বরূপ উদ্গঘাটিত। আর তার পর থেকেই তাঁর পিছনে গেস্টাপো ইত্যাদি। পালিয়েই বেড়িয়েছেন সারাক্ষণ। কিন্তু আসল বিপর্যয় অপেক্ষা করেছিল পরে। গটফ্রিড বেনের নাৎসি সংসর্গ তাঁকে সারাজীবনের জন্য কবি ও কবিতা পাঠকের জগৎ থেকে নির্বাসিত করে দেয়। তাঁর কোনও বইয়ের অনুবাদ প্রকাশিত হয় নি ২০১৩ সাল অবধি। অনুবাদক ও কবি মাইকেল হফম্যান তাঁর ভূমিকায় জানাচ্ছেন গটফ্রিড বেন নাৎসি সংসর্গ নিয়ে ভীষণ লজ্জিত থাকতেন। বুঝতেন নিজের ভুলের মর্ম। কিন্তু ততদিনে যা হবার তা হয়ে গেছে। একবার পথ চলা ভুল হয়ে গেলে শুদ্ধ হতে কতদিন লাগে! লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। বেন তাঁর জীবন দিয়ে তার প্রমাণ দিয়েছেন। যদিও এখন তাঁকে স্বীকার করা হয় জার্মানির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এক কবি হিসেবে। কিন্তু তাঁর গোটা জীবনই কেটেছে একধরণের নির্বাসনে। যদিও পরবর্তি কালে ৫ বার নোবেল পুরস্কারের জন্য নাম গেছে তাঁর। কিন্তু পাঠক তাঁকে ক্ষমা করেননি।

এখানেই আবার আসে ক্ষমতার প্রসঙ্গ। কবি ও তাঁর ক্ষমতা বিলাস। দেখা গেছে নেরুদা ও নানা কবির স্তালিন প্রীতি। এখনও আমাদের দেশে স্তালিনের স্তাবক আছে। কিন্তু নেরুদার কবিতা ও অন্যান্য কাজ, এমনকি স্তালিনের সমালোচনা, তাঁকে হয়ত বাঁচিয়েছে। কিন্তু গটফ্রিড বেনের কপাল সেরকম ছিল না। কারণ তাঁর কবিতা কখনই জনপ্রিয় ছিল না।

আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি ইউরোপে, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের উন্মুক্ত করতে পারলেও হিটলারের সংস্রবে থাকা লেখক/শিল্পীদের সহজে স্বীকার করতে পারেন না। তবে এখনকার গণতান্ত্রিক পরিবেশে ক্ষমতার কাছে থাকা বিদ্বজনের সংখ্যা কম বলে অন্ততঃ ইউরোপে আর তেমনটা ঘটবে বলে মনে হয় না।

(শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।)

Share.

Leave A Reply