ব্লগ দিল্লির চিঠি / মহাদেশ, নিঃসঙ্গতার মহাকাব্য

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    ভাবতে শুরু করি বই নিয়ে। কীভাবে গ্রন্থের কাছে পৌঁছব। গ্রন্থ কি রচনা সম্ভব? নাকি সে তৈরি হয়ে আছে লেখক তাকে খুঁজে নেয়? একদল লেখকের মধ্যে এই ধারণা প্রচলিত যে কবিতা তৈরি হয়ে আছে লেখক তাকে লেখে মাত্র। একে মেনে নিলে খানিকটা দৈব করা যায়। যা আমার মতো অনেকের মনে ধরে না।  কলেজপাঠ্য লজিক বইতে থাকে এক বিখ্যাত উদাহরণ মাটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা মৃৎপাত্র। আমার সামনে যে মাটি দেখছি তাতে তো মৃৎপাত্র দেখছি  না। কিন্তু যিনি কুমার তিনি ঠিক বের করে আনবেন তাঁর শৈলী দিয়ে। কবিতা তো আছেই, মাটিতে মৃৎপাত্রের মত। কিন্তু তাকে বের করে আনতে দরকার শৈলীজ্ঞানীকে। গ্রন্থও একই গোত্রের। নইলে আমেরিকা মহাদেশ ছিল, তাতে উপনিবেশের রগড় ছিল, নিগড় ছিল, তার শেষ রাষ্ট্র স্বাধীন হবার ৭০ বছর পরে কেন তবে গার্সিয়া মার্কেস বেরিয়ে এলেন? যে মহাকাব্য তৈরি হয়ে ছিল আগে থেকে তাকে কেন কেউ লিখল না?

    আরও পড়ুন : ব্লগ: দিল্লির চিঠি: আমেরিকা…

    দীর্ঘ কোনও কথা বলার থাকলে তা হয়ত জমে ওঠে আরও দীর্ঘ কোনও সময়ের স্থির আচ্ছাদনে। মনে হচ্ছিল এই কথাটা, কার্লোস ফুয়েন্তেস এর মেখিকো (México) বিষয়ক এক টিভি সিরিজ দেখতে বসে। একটা দেশ তার ইতিহাসের নিরন্তর গলি দিয়ে আমাদের নানা গোলকধাঁধায় আটকে রাখছে, আমরা শুধু দেখছি ভারতবর্ষের মানবেন্দ্রনাথ রায় থেকে তাদের প্রায় ঘরের ছেলে গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে, পরে আরও ইতিহাস চর্চা থেকে দেখছি সেখানেই ঘটে গেছে বলশেভিক বিপ্লবের আগে এক বিপুল বিপ্লব। ওক্তাবিও পাস বলেন তাঁর দেশ বিদেশিদের সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করে না পুরোপুরি। লুকিয়ে রাখে তার গোপন মর্ম। অথচ সেখানেই গোটা ইবেরো আমেরিকার সমস্ত রাজনৈতিক শরণার্থীরা আশ্রয় পেয়েছেন। এবং সেখান থেকেই এসেছে দীর্ঘ রক্তপ্লাবী মার্কিন দেশে পাড়ি দেবার খবর। কিন্তু সে স্বতন্ত্র। আমাদের বিষয় গার্সিয়া মার্কেস ও তাঁর লিখন। আর সেখানে জড়িয়ে আছে পরতে পরতে মেখিকো। সে চাকরি হারানো যুবক গার্সিয়া মার্কেস হোন বা নিঃসঙ্গতার ১০০ বছর নামক মহাকাব্যের রচনাকালীন জ্যোতির্বলয় সমেত গার্সিয়া মার্কেস।

    গার্সিয়া মার্কেস তাঁর নোবেল ভাষণ শুরু করছেন এক ইতালীয় নাবিকের গল্পে যিনি আমেরিকা মহাদেশ সম্পর্কে তাঁর কাল্পনিক অভিভাষকেই সত্য বলে চালিয়েছেন। আমাদের এর পরেই হয়ত মনে পড়ে যাবে এস্পানিয়ার আলবের নুনিয়েস কাবেসা দে লা বাকা লিখিত এমনি এক আখ্যানের কথা যেখানে চিহ্নিত হচ্ছে আরও কিছু কাল্পনিক জীব। আরও পরে চার্লস ডারুইন তাঁর বিখ্যাত এইচ এম এস বিগল এর যাত্রাপথে দক্ষিণ আমেরিকার শেষপ্রান্তে (এখন চিলে নামক দেশের অন্তর্ভুক্ত) এক মানবেতর প্রজাতি দেখতে পাবেন ও খ্রিস্টান মিশনারিদের নির্দেশ দেবেন তাঁদের মানুষ করার, যে ধারণা চলবে দীর্ঘদিন, মেরে শেষ করে দেওয়া হবে সেই উপজাতির মানুষদের বিশ শতকে।[1]

    এরপর যদি তাকানো যায় বিশ শতকে, স্পষ্ট হবে ইবেরো আমেরিকার (ইস্পানো ও পর্তুগেশ ভাষাভাষী আমেরিকা মহাদেশকে এই নামে ডাকা হয়, ফরাসী ও ওলন্দাজদের প্রাক্তন উপনিবেশ বাদ দিয়ে) উপর দিয়ে যাওয়া পরিবর্তনগুলো যা আসলে এক দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিফলন যার সূচনা হয়েছিল ক্রিস্তোবাল কোলন বা কলোম্বাসের হাতে সেই ১২ অক্টোবর ১৪৯২ সালে।

    অর্থাৎ ১৪৯২ তে শুরু হওয়া এক ইতিহাস যা কিনা বেশ কিছু মানুষগোষ্ঠীকে দুনিয়া থেকে লুপ্ত করে দেবে, আজ ইস্পানোদের গর্বের এস্পানিওল ভাষা যা কিনা দুনিয়ার দ্বিতীয় ব্যাবহারিক ভাষা চেপে বসবে সবার উপর। বিশ শতকে আসবেন সেইসব দুনিয়া কাঁপানো লেখক কবিরা যাঁদের মাতৃভাষা হবে এস্পানিওল এবং তাঁরা গ্রাহ্য ভাষা হিসেবে দুনিয়ার মানচিত্রে এস্পানিওলকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। এবং গার্সিয়া মার্কেস সেই লেখকদেরই একজন।

    গার্সিয়া মার্কেসের লেখা তলিয়ে দেখতে চাইলে দুই আমেরিকা মহাদেশ (যাকে বহু ইস্পানো একটাই মহাদেশ বলে জানেন) তার সবরকমের মিথ্যে ও হারিয়ে যাওয়াগুলো সমেত বুঝতে হবে। চলে আসতে হবে বিরাট আমেরিকা ছেড়ে শুধু কলোম্বিয়া, বেনেসুয়েলাসহ ক্যারিবিয়ান সাগরের স্থানীয়তায়। যে স্থানীয়তা গার্সিয়া মার্কেসকে ভাষা দিয়েছে গোটা আমেরিকার।

    [1] http://bibliotecadigital.educ.ar/uploads/contents/CharlesDarwin-Diariodelviajedeunnaturalista0.pdf  ২৭৪ পৃষ্ঠায় ডারুইন বলছেন সেই প্রায় না মানব প্রাণীদের কথা।

    শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More