সোমবার, নভেম্বর ১৮

ব্লগ: দিল্লির চিঠি: আমেরিকা…

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

ইংরেজি ভাষাপ্লাবিত দুনিয়ায় আমেরিকা শব্দটির এক পাথুরে চাঙড়প্রতীম অস্তিত্ব আছে। সেখানে শুধু ইগল পাখির ক্রমশ ধারালো হয়ে ওঠা ঠোঁট,  সেই তারকা খচিত পতাকা এবং একমেরু বিশ্বের এক স্বপ্ন। এই মনোলিথ শুধু ইংরেজি ভাষা দুনিয়ার নয়, প্রায় প্রায় সর্বত্র। যা সমস্ত দেশকে ছাড়িয়ে উঠে শুধু এক বিশেষ দেশের দিকে ইশারা করে। সে দেশে সবাইকার সমান সুযোগ। মজা হল ইবেরো আমেরিকার বাসিন্দারা আমেরিকা বলতে শুধু তাঁদের ভূখণ্ডকেই বোঝেন। বাকিরা নোর্তে আমেরিকানো (উত্তর আমেরিকার)। সেই ভূখণ্ড শুরু মেখিকোয় শেষ চিলেতে । মাঝে থাকে ব্রাজিল সহ ২০টি ইবেরো দেশ। যাদের বেশিরভাগের ভাষা এস্পানিওল ১৪৯২ এর পর। ১৪৯২ সালে এস্পানিওল ঔপনিবেশিকরা আসার পর লুপ্ত হয়েছে আস্তেকা, মাইয়া, ইনকা সহ অনেক সভ্যতা। লুপ্ত হয়েছে তাদের ভাষা। আইমারা গুয়ারানি সোকে মাপুচে এইসব ভাষা আজ টিকে থাকলেও ক্রমশ কঠিন তাদের অস্তিত্ব। কারণ তরুণ প্রজন্ম বলতে চায়না (মনে পড়ছে বাংলা সহ অনেক উত্তর ভারতীয় ভাষার কথা যেখানে তরুণ প্রজন্ম আজ ইংরেজিতেই “কাজ” করে)। এই আবহে ২০ শতকের গোড়ায় ইস্পানো আমেরিকায় এক বিপুল পরিবর্তন ঘটে যায়। ১৪৯২ তে ক্রিস্তোবাল কোলোনের (যাঁকে ইংরেজিভাষীরা কলোম্বাস বলে ডাকেন) আগমনের পর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক ভার গোটা মহাদেশের সাহিত্য ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ওয়াল্ট হুইটম্যান প্রথম সে দেশের ভাষায় কবিতা লেখেন। সেই লেখা এখন ইউরোপীয়দের কাছে একেবারে নতুন কবিতা। এখন অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে আমেরিকান কবিতা বলে আলাদা এক জঁর-এর উপস্থিতি। এস্পানিওলভাষী আমেরিকার ক্ষেত্রে একটু দেরি হয়। ১৯১৮ সালে বেরোয় ইস্পানো আমেরিকার আদিকবি সেসার বাইয়েখো (César Vallejo) প্রথম কাব্যগ্রন্থ কালো ঘোষণাসমূহ (Los heraldos negros), এই বইটিকেই চিহ্নিত করা যায় ইস্পানো আমেরিকার আদি গ্রন্থ হিসেবে। এই পর ১৯২২ এ বেরনো ত্রিলসে নামক কাব্যগ্রন্থ সেসার বাইয়েখোকে সে মহাদেশের কবিতার পিতামহপ্রতীম জায়গা দেয়। ১৯২৪ সাল গোটা ইস্পানোয়ামেরিকার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বছর। প্রকাশিত হয় পাবলো নেরুদার ২০টি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান। গোটা এস্পানিওলভাষী আমেরিকা মহাদেশের কাছে নক্ষত্র হয়ে ওঠেন নেরুদা প্রকাশের দু বছরের মধ্যে। আমেরিকা মহাদেশের বাইরে সে খ্যাতি যায়নি। কিন্তু সূচিত হয়েছিল নতুন মহাদেশের কবিতা। ওই একই বছর প্রকাশিত হয় কলোম্বিয়ার লেখক খোসে এউস্তাসিও রিবেরা  (José Eustasio Rivera) রচিত উপন্যাস ঘূর্ণাবর্ত (La vorágine)। এই বইটিকে ধরা যায় ইস্পানোআমেরিকার প্রথম উপন্যাস যেখানে গাঁথা হয় সে অঞ্চলের ভাষার প্রথম চেহারা। যদিও নেরুদার মত রিবেরাও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেননি ইউরোপীয় প্রভাব থেকে। রিবেরা মারা যান মাত্র ৪০ বছরে।  ঘূর্ণাবর্তই একমাত্র উপন্যাস। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় বেনেসুয়েলার (Venezuela) ঔপন্যাসিক রোমুলো গাইয়েগোস (Rómulo Gallegos) রচিত শ্রীমতি  বারবারা (Doña Bárbara)। রোমুলো গাইয়েগোস আমাদের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁর হাতেই মূর্ত হল নতুন দুনিয়া (Nuevo Mundo)। যদিও তখনও সে দুনিয়া ইওরোপের প্রভাবমুক্ত নয়। সে দুনিয়া সামন্ততান্ত্রিক। সে দুনিয়া ইওরোপীয় বাস্তববাদী ছাঁচে তৈরি। ততদিনে কবিতা পাবলো নেরুদার হাত ধরে পেয়ে গেছে নতুন। তাঁকে ইস্পানো আমেরিকার হুইটম্যানও বলা শুরু হয়েছে। আখ্যান সাহিত্যে এই প্রকৃত আমেরিকা আস্তে সময় নিল আরও প্রায় দু দশক। কুবার (Cuba) ঔপন্যাসিক আলেখো কার্পেন্তিয়ের ১৯৪৯ এ প্রকাশ করলেন এই পৃথিবীর রাজত্ব (El reino de este mundo), উন্মুক্ত হল আমেরিকা মহাদেশের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ও উত্তর ঔপনিবেশিক কালের মিশ্র জাতির মানুষের উপন্যাসন। ভুলে গেলে চলবে না ইংরেজিভাষী দুনিয়া ও ইওরোপের চোখের মণি খোর্খে লুইস বোর্খেসও ১৯৩০ এর দশকে তাঁর প্রথম গল্প সংগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বোর্খেসকে আমরা এই আলোচনা থেকে বাইরে রাখব কারণ তিনি নিজেকে একজন ইওরোপীয়ই মনে করতেন।

(শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।)

Leave A Reply