প্রায় দ্বীপ, প্রায় দ্বীপের কবিতা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

দিল্লি তে ফিরে আসার পর থেকেই আমি উতলা ছিলাম অলমোস্ট আইল্যান্ড ডায়লগ এর জন্য।

সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল এক বিরাট চমক। যে চমক সহজলভ্য নয় শুধু তাই নয় এক বিরাট প্রাপ্তি ও বটে। নিজের লেখা নিয়ে কথা বলার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই ঘটে যায়, ঘটে যায় নানা রকমের কবিদের সঙ্গে আলাপের সুযোগ। কিন্তু এখানে এমন একজন কবির সঙ্গে আমার আলাপ হলো যা আমার কল্পনাতীত। আরি সিতাস।

দক্ষিণ আফ্রিকার কবি মূলত ইংরেজি ভাষায় কিন্তু জুলু এবং আফ্রিকান ভাষাতেও সমান দক্ষতা। তাঁর কবিতা তাঁর অন্যান্য রচনা তাঁর প্রবন্ধ তাঁর তৈরি করা নাটক, কখনও মৌলিক কখনও বা কোনও ধ্রুপদী নাটকের নিজস্ব ধারণা এই সব মিলিয়ে তৈরি তাঁর লেখক জীবন।

তিনি সমাজতত্ত্বের অধ্যাপকও। তাঁর রচিত ব্যবসার ইতিহাস এবং সেই ব্যবস্থার সমাজতত্ত্ব সারা পৃথিবীতেই গ্রহণযোগ্য। আরি সিতাস এর জন্ম সাইপ্রাসে যখন তার বয়স চার বছর বাবা মা চলে আসেন দক্ষিণ আফ্রিকায় তারপর থেকেই শুরু সেই দেশের সঙ্গে শিশু কবির মিলিয়ে নেওয়া। শুরু হয় লড়াই। বয়সন্ধিকালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষ – কালো মানুষের লড়াই। যদিও তিনি সাদা, যদিও তিনি ইউরোপ থেকে এসেছেন তবুও সত্তরের দশকের গোড়ার যুবক কবির পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সংগঠিত করেছেন শ্রমিকদের। সংঘর্ষ করেছেন নানা রকমের আন্দোলন তৈরি করেছেন। নতুন করে প্রতিরোধের নাটক যেখানে কালো মানুষ নিজের হাতে নিজের মতো করে ভেঙে দেব-এর সমস্ত ছক ভেঙে দেবে নাটকের প্রচলিত ধারা।

এইরকম একটা অবস্থান থেকে শুরু হয় তাঁর কবিতা উড়ান।  যদিও সে কবিতার সম্ভাবনা ছিল ভীষণ ভাবে মৌখিক প্রতিবাদের কবিতা হয়ে ওঠার। কিন্তু তিনি তা হতে দেননি। তিনি জড়িয়ে গেছেন কবিতার নাটকীয়তায়। ছড়িয়ে গেছেন কবিতার চিন্তাশীল শাখা-প্রশাখায়। জড়িয়ে পড়েছেন মানুষের নিজস্ব ভূগোলে নিজস্ব ইতিহাসে। এমন একটা লোককে আমি সামনে থেকে দেখছি। দেখছি তার কবিতা পাঠ। দেখছি কীভাবে দীর্ঘ দু’ঘণ্টা ধরে তিনি শ্রোতাকে মুগ্ধ করে রাখেন তাঁর ইতিহাসে তাঁর লেখাদের বেড়ে ওঠার দর্শনে।

কবিতা কখন কীভাবে কার কাজে লাগে তার কোন নির্দিষ্ট মানচিত্র নেই। কিন্তু কবিতার মূল চাহিদাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নাটকীয়তার কোন তুলনা হয় না। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে অনেক সময় দেখা যায় আবৃত্তিকাররা সেই কাজ করে থাকেন। বিদেশে আবৃত্তিকার বলে কিছু হয় না। কবি নিজেই অনেক সময় পারফরম্যান্স কবিতার দ্বারা এই কাজ করে থাকেন। কিন্তু সিরিয়াস কবিতা এইভাবে কতদূর যেতে পারে তাই নিয়ে আমাদের সন্দেহ থেকে যায়।

দেখি, আরি সিতাস সরাসরি নাটকের মারফত পৌঁছে দিতে চান কবিতাকে, যেখানে সিরিয়াস চিত্রকল্পময় জটিল ভাবনা সমৃদ্ধ কবিতা পৌঁছে যায় বৃহত্তর পাঠক গোষ্ঠীর কাছে। শুরু হয় কবিতা পাঠ এবং কবিতার গভীরে পৌঁছানোর এক অবিস্মরণীয় খেলা।

সেই খেলা সেই তোমায় আমায় সারা জীবন সকাল সন্ধ্যা বেলা। দেখি আরি সিতাস সেভাবেই পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর যাবতীয় উত্তর-ঔপনিবেশিক গভীর চিন্তা ও গভীর দর্শন। তিনি সারাজীবন কাজ করেছেন খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে আবার কাজ করেছেন দাস ব্যবসা নিয়ে অ্যাকাডেমিক স্তরে। তাঁর প্রবন্ধের উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তা পৌঁছে গেছে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ভাবুক এর কাছে। সিতাস-এর কবিতা আমাদের শেখায় কীভাবে শুধুমাত্র আবেগ নয়, শুধুমাত্র কলেজ কলিজায় আলোড়ন তোলা অনুভূতিমালা নয় বরং আমাদের সময়ের কবিতা হয়ে উঠবে আরও বেশি করে ভাবনার সঙ্গী। তাঁর কবিতা দর্শন আমাদের সময়ের বিশেষ করে ঔপনিবেশিক ভাবনা দ্বারা আক্রান্ত সমাজে এবং চিন্তায় একটা বিরাট ফুটো করে দেয়। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে আমাদের গোপন এবং চাপিয়ে দেওয়া মূল্যবোধের বাইরের এক বিরাট জগত। বাংলা কবিতা শিখতে পারে কীভাবে ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য উচ্চবর্ণের হিন্দু কবিদের লেখা থেকে বেরিয়ে এক অন্য দিকে যাওয়া যায়। অথচ এই অন্যদিক কিন্তু বাংলা কবিতায় বরাবরই ছিল, তার সূচনা পর্ব থেকেই ছিল। চর্যাপদের অঙ্গীকার তা। অথচ আমরা সেই অঙ্গীকার প্রায় ভুলে গেছি।

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More