বুধবার, মার্চ ২০

ব্লগ: দিল্লির চিঠি/ উল্টোপাল্টা কথা

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

কাকে বলে অত্যাচার? রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস? রাষ্ট্র কতদূর হস্তক্ষেপ করতে পারে? এইসব উল্টোপাল্টা  ঝড়ের মধ্যে দার্শনিক মিশেল ফুকোর ছেয়ে কবি এমে সেজেয়ারকে অনেক কাছের মানুষ মনে হয়। যতবার বাড়ি থেকে বেরোই মনে হয় এই দারিদ্র্য বা উল্টোদিকে থাকা বিপুল ধনবৈষম্য এটাই কি আমাদের প্রাপ্য ছিল? সুবৃহৎ বহুজাতিকের অর্থ নির্বাচনের প্রচারে লাগানো যাবে না। এই ছিল মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের আদেশ  বিশ শতকের গোড়ায় থিওডোর রুজেভেল্ট রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন। এখন সে দিন গেছে, এখন যে কোনও কোম্পানি টাকা ঢালতে পারে। ২০১৪ সালে সে নিয়ম এসে গেছে। হয়ত সেই কারণেই ট্রাম্পের মত ধনকুবের সরাসরি রাষ্ট্রপতি হতে চান। কেন আর অন্যের জন্য টাকা ঢালা! মার্কিন দেশে দেখা গেছে রোনাল্ড রেগানের জমানা থেকে লবি করা বেড়েছে, একের পর এক বাজারপ্রেমী আইন এসেছে। সে আইন আসলে দেখা গেছে সিইও-প্রেমী! দেখা যাচ্ছে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পূর্ণ সময়ের চাকরি করেও সংসার চালাতে পারছেন না। অথচ কোম্পানির মুনাফা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আমাদের দেশেও এ চিত্র আলাদা নয়। সংবিধান অনেক জিনিসকে স্বীকৃতি না দিলেও আমরা সকলেই জানি নির্বাচনে টাকার খেলা। ক্ষমতা ধরে রাখার খেলা। ক্ষমতায় আসার খেলা। কেন অলাভজনক সম্পত্তি  বাড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এর? কেন রাষ্ট্র কাউকেই শাস্তি দিতে পারে না? কেন কোনও নেতা তাদের নির্দিষ্ট মাইনে ও সংস্থানের বাইরে হেলিকপ্টারে চড়ে প্রচারে গেলে প্রশ্ন করি না? আমরা এই ছদ্ম-মধ্যবিত্তরা আজও কারুর মাইনে ৮০০০০ টাকা শুনলে চোখ বড় করি, অথচ তার বিনিময়ে সেই মানুষটি কি অসম্ভব পরিশ্রম করছেন, এবং তাঁর একই পোস্টে চাকরি করা কোনও সাহেব তাঁর অর্ধেক পরিশ্রম করে তার দ্বিগুণেরও বেশি রোজগার করছে,তাই নিয়ে প্রশ্ন করি না। কারণ আমাদের দেশে সঠিক শ্রম আইন হলে সাহেবদের জাঙিয়া কাচার কাজটা চলে যাবে। তাই রাষ্ট্র মাথা ঘামাচ্ছে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে। খাবার জুটছে কিনা বা কীভাবে জুটছে তা তাদের হিসাবে নেই কিন্তু গরুর মাংস খাচ্ছি কিনা সেটা তাদের বিবেচ্য। আজও পর্যন্ত কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘোরতর অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড হয়নি। অদ্ভুতভাবে দেখা যাচ্ছে যাঁদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তাঁরা সবাই গরীব। রাষ্ট্র তাদের সহজে “ঝোলাতে” পারে কারণ তাঁদের আইন কেনার ক্ষমতা নেই। কিন্তু প্রভাবশালীদের আছে উকিল কেনার ক্ষমতা। মজা হল আমরা এই সবকিছুই জানি ও বুঝি। কিছু করি না।  আমরা মধ্যবিত্তরা আমাদের সন্তানদের রাজনীতি করতে বারণ করি কারণ ওটা গুণ্ডামির জায়গা। অথচ আমরাই গুন্ডাদের ভোট দিই। আমর কখনই নিজেদের দাবী তুলি না। আমরা রাস্তায় নামি না এই ভয়ঙ্কর সময় যখন একদিকে সাম্প্রদায়িক শক্তি অন্যদিকে গুন্ডারাজ আস্ফালন করছে। আমরা কি সুশাসন বা এক সুস্থ গণতন্ত্র চাইতে পারি না? অবান্তর প্যালেস্তাইনে বোমা বর্ষণ বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেয়ে হয়ত আমাদের নিজেদের রাজ্য বা দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে প্রশ্ন করা বা সুশাসন চাওয়া কি এই মুহূর্তের সবচেয়ে দরকারি কাজ নয়? এই প্রশ্ন করা তো আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।

এখানেই আবার ফিরে আসেন এমে সেজেয়ার। ক্ষমতা বা আস্ফালন নয়, কিছু প্রশ্ন। ক্যারিবিয়ান সাগরের ছোট্ট দ্বীপ মার্তিনিকের কবি সেজেয়ার ফরাসী ভাষায় পুঁতে রেখেছেন তাঁর তথা কালোমানুষের ল্যান্ডমাইন — তাঁর কবিতা। তেমনই ঔপনিবেশিক প্রভুত্বের বিরুদ্ধে তাঁর সন্দর্ভ। ঔপনবেশিকতা বিষয়ক সন্দর্ভ, যা সাহেবদের বাধ্য করেছে নতুন করে ভাবতে। আমি কবিতা পাঠক হিসেবে তাঁর রচনার মধ্যে দিয়ে প্রশ্নগুলো আমাদের প্রশ্নগুলো খঁজে পাই। উত্তর খোঁজার দায় আমাকে খননে পাঠায়।

আমি দেখি সেজেয়ার সারাজীবন কাটিয়েছেন নাগরিক আন্দোলনে। ফরাসীরা যখন তাদের উপনিবেশ ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়, সেজেয়ার তখন এক আশ্চর্য আন্দোলন করেন। তাঁর দাবী ছিল এতদিন যারা শোষণ করেছে তাদের কোনও অধিকার নেই এই দ্বীপকে তার দারিদ্র্যে ঠেলে চলে যাবার। মার্তিনিককে ফ্রান্সের অঙ্গরাজ্যের স্বীকৃতি দিতে হবে। সে আন্দোলন সফল হয়। গরীব মার্তিনিকের অবস্থা পাল্টায়। সেজেয়ার আমৃত্যু মার্তিনিকের নির্বাচিত  সাংসদ ছিলেন। নাগরিক আন্দোলন ও তার মারফত দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

(শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।)

Shares

Leave A Reply