বুধবার, ডিসেম্বর ১১
TheWall
TheWall

ব্লগ : সান সিমোন থেকে ২

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

এই ধরনের কবিতার ওয়ার্কশপে দেখা হয় নানা দেশ থেকে আসা কবিদের সঙ্গে। একসঙ্গে থাকা, অনেকদিন ধরে সারাক্ষণ কবিতাযাপন থেকে বেরিয়ে আসে নানা রকমের কবিতা ভাবনা এবং জীবন দেখার নানা রকমের আঙ্গিক।

আমার বহুদিনের বন্ধু আবদুল হাদি সাদুন যেমন।

আবদুল প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর নানা দেশ ঘুরে কোনও রকমে পৌঁছেছিল মাদ্রিদে। আরবি ভাষাতেই স্নাতকোত্তর করেছিল সে। আর তার গবেষণার ক্ষেত্র ছিল স্প্যানিশ ভাষার উপর আরবি ভাষার প্রভাব। ফলে সেই নয়ের দশকের স্পেনে সহজেই পিএইচডি করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল সে।

তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপকের চাকরিও পেয়ে যায় সে।

এতো গেল মানুষ আবদুল হাদি সাদুনের কথা। কবি আবদুল হাদি সাদুন কিন্তু পরিণত হচ্ছিল যুদ্ধের হাত ধরে। যে যুদ্ধ আমরা শুধুমাত্র টেলিভিশনে দেখেছি। আর আবদুল সেই যুদ্ধকে রেখে দিয়েছে তার নিজের বাড়ির মধ্যে।

চোখের সামনে সে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছে তার বাড়িঘর বন্ধু-বান্ধব পাড়া সব কিছুকেই। সব কিছু, যা ছিল তার জীবনের অংশ। আর যুদ্ধের এই ক্ষতচিহ্নগুলো কবিতার শরীরে নিজের থেকেই ফুটে বের হতে লাগল।

আরও পড়ুন : ব্লগ : সান সিমোন থেকে

তার মনোজগতে স্থায়ী হয়ে গেল যুদ্ধের প্রভাব। সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক শরণার্থী হিসেবে। লক্ষ লক্ষ যুদ্ধ শরণার্থীর একজন।

অধ্যাপনার চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে আবদুল। আজ প্রায় ২৫ বছর, সে পূর্ণ সময়ের লেখক অনুবাদক। প্রতিনিয়ত অনুবাদ করে চলেছে স্প্যানিশ ভাষা থেকে আরবি ভাষায় নানা রকমের সাহিত্য, প্রবন্ধ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, সমস্ত কিছু।

কবি হিসেবে মানুষ যা যা চায়, নানা রকম নানা রকমের উৎসবের আমন্ত্রণ, নানা রকমের পুরস্কার  তার কপালে সবকিছুই উঠেছে।

কিন্তু শুধু কবিতা নয়, আসলে সে লিখতে চেয়েছিল একটা উপন্যাস। তার সেই দীর্ঘ পঁচিশ বছরের যুদ্ধ ক্ষত নিয়ে। উপন্যাসটার নাম দেয় সে ইরাকি কুকুরের স্মৃতিকথা।

এতদিন ধরে মাদ্রিদ শহরে থাকা সত্ত্বেও তার লেখার ভাষা আজও আরবি।

উপন্যাসটা প্রথম প্রকাশিত হয় স্পেনে। তারপর প্রকাশিত হয় অন্যান্য দেশে, মিশরে এমনকি ইরাকেও। কিছুদিনের মধ্যেই উপন্যাসটি কে সে অনুবাদ করে ফেলে স্প্যানিশ ভাষায় এবং প্রকাশ মাত্রই উপন্যাসটি বিরাট সারা ফেলে দিয়েছে।

সরাসরি যুদ্ধের প্রভাব এরকমভাবে উপন্যাসে উঠে এসেছে বহুদিন পর এবং এখন সেই উপন্যাস প্রকাশিত হতে চলেছে ইংল্যান্ডে, আমেরিকায়।

আবদুলকে আমি আবার এই ওয়ার্কশপে আবিষ্কার করলাম। আমাদের প্রথম আলাপ হওয়ার পর প্রায় সাত বছর কেটে গিয়েছে। সে কিন্তু এখনও কেমন শরণার্থীর মতোই রয়ে গেছে। এতদিন ধরে স্পেনে থাকায় তার মনোজগতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্ত সে যেন আজও খুঁজে চলেছে যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইরাক।

সাদ্দাম হোসেন তার চোখে একজন স্বৈরাচারী শাসক, যে গোটা দেশকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি সে ক্ষমা করতে পারে না আমেরিকার আগ্রাসনকারীদের। ঠিক কুকুরের মতো সে যেন সবসময় খুঁজে চলেছে যুদ্ধের আগেকার সেই সব গলি রাস্তা বিকেলের চা পান এবং দূর দেশ থেকে কিনে আনা তামাকের সুগন্ধ।

আবদুল আর আমি এক রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম এ সতীর্থ। আমি ২০০৮ সালে আন্তোনিও মাচাদো কবিতা বৃত্তি পাই, আবদুল সেই বৃত্তি পায় তার পরের বছর। আমাদের আলাপ হয় ২০১০ সালে আমাদের দুজনেরই বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে। তারপর থেকে আমাদের বন্ধুত্ব ঘুরে বেরিয়েছে ভারতের সঙ্গে ইরাকের প্রাচীন সম্পর্কের ভিত্তিতে। আবদুল আমাকে শুনিয়ে গেছে কীভাবে ভারত থেকে সত্তর দশকে আসা রেডিও তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ ছিল। এমনকি তাদের ছোটবেলায় শোনা রূপকথার গল্পের ভারত, সেই দেশ যেখান থেকে ব্যবসায়ীরা মসলা নিয়ে আসত। যে মসলার গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে ইরাকের রুটি, পোলাও আর তাদের রোজকার খাওয়ার লবঙ্গ দেওয়া চায়ে।

কবিতার কথা আমি জানতে চেয়েছি। বিদেশী প্রভাব মুক্ত কবিতা কী ভাবে থেকেছে তাদের দেশে। বদলে আমি তাকে শুনিয়েছি বাংলা কবিতায় ইংরেজি ভাষার প্রভাব। অবাক হয়েছে সে। আমাকে বলেছে কেন আমরা প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে কিছু টেনে বের করছি না। তার কথা আমায় ভাবিয়েছে। তাকে বলেছি আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা। যে ভাষার কবিতার জন্ম হয়েছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হাত ধরে, সাধারণ মানুষের কথায়, সেই ভাষার কবিতা কখনোই গজদন্ত মিনারে মিলিয়ে যেতে পারে না।

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।

Comments are closed.