ব্লগ: যাহা নাই ভারতে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সন্দীপ বিশ্বাস 

মনে শান্তি নেই শ্রীকৃষ্ণের। অর্জুনটা লড়ে ভালো নিঃসন্দেহে,তিরটির দিব্যি ছোড়ে পটাপট, কিন্তু তবুও শেষ পর্যন্ত পারবে কী? ভীষ্ম দ্রোণ এদের নাহয় ছেড়েই দেওয়া গেলো – বুড়ো ভাম সব – কিন্তু কর্ণ? সে ব্যাটা কম যায় কী সে? সত্যি বলতে কী, অর্জুনের থেকেও ভালোই হবে হয়তো! আর পার্থকে একবার পটকে দিতে পারলেই তো কেল্লা ফতে! ভীমটার গায়ে শক্তি-টক্তি আছে বটে, কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ একা জেতানোর ক্ষমতা তার নেই। এক্স-ফ্যাক্টর-এর অভাব আছে বড্ড। আর বাকি তিনটে তো অপদার্থের একশেষ যাকে বলে! ওদিকে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে গেছে – ধর্মরাজ্য স্থাপন ইত্যাদি – এখন তৃতীয় পাণ্ডবই ভরসা একমাত্র। কিন্তু সবচেয়ে মুশকিল হলো যে মহা ঘ্যাম হয়ে গেছে তার। সর্বকালের সর্বসেরা ধনুর্বিদ মনে করে নিজেকে। কর্ণের নাম শুনলে তো একদম তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে ইদানিং। এভাবে কতদূর কী করতে পারবে কে জানে! নাঃ, দলটা আর একটু ভারী করতে হবে! চাই অন্ততঃ আর একজন হেভিওয়েট – তা সে যেভাবেই হোক। কাকে নেওয়া যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে আসে একজনের কথা। কোনওক্রমে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাকে যদি সাইন করানো যায় তো একদম নিশ্চিন্ত! তিনি নিজে বললে এক কথায় রাজি হয়ে যাবে সে জানেন তিনি। কিন্তু সেই সঙ্গে অর্জুনের রংবাজিটাও কমানো দরকার একটু। এক ঢিলে দুই পাখি মারতে হবে। বসে বসে মাস্টার প্ল্যান বানান শ্রীকৃষ্ণ। স্মিত হাসি ফুটে ওঠে তাঁর মুখে।

মহাযুদ্ধের আগে সখা কৃষ্ণের নির্দেশে তীর্থ ভ্রমণে বেড়িয়েছেন অর্জুন। রথে চেপে ঘুরছেন দেশের নানান জায়গা – একাই। এক তীর্থস্থান থেকে অন্যটা, এই মন্দির থেকে আর এক। দক্ষিণ দিকে যেতে যেতে পৌঁছেছেন রামেশ্বরমে। ত্রেতা যুগে এইখান থেকেই শ্রীরামচন্দ্র সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় গিয়েছিলেন সীতা উদ্ধারে। স্থাপন করেছিলেন এক শিবলিঙ্গ – যেখানে প্রণাম সেরে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। ধনুষ্কোটিতে পুণ্যস্নান করে মহাদেবের সামনে নতজানু হলেন অর্জুন। তারপর বেরিয়ে পড়লেন আশপাশ দেখার জন্য। রামায়ণের সেই সেতু দেখে মুগ্ধ তিনি। এখনো দিব্যি টিকে আছে তা। মূলত বানরসেনাদের সাহায্যে এই সেতু তৈরি হয়েছিল – পাথর ও গাছপালা দিয়ে। ভাবনা হলো অর্জুনের… রামচন্দ্রের মতো এইরকম ধুরন্ধর ধনুর্বিদ – তিনি তো ইচ্ছা করলেই শুধুমাত্র তীরনিক্ষেপ করে করতে পারতেন সেতুবন্ধন, তাহলে এত ঝামেলা করার কী দরকার ছিল? তিনি নিজেই তো এক্ষুনি এই কাজ করতে পারেন অনায়াসে – তাহলে? তবে কি রামচন্দ্র ধনুর্বিদ্যায় তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না? আত্মপ্রসাদ লাভ করেন একটু। কিন্তু উত্তরটা জানা দরকার। আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন মানুষজন কেউ নেই, শুধু একটা ছোটখাট বাঁদর বসে আছে। তাকেই প্রশ্নটা করেন অর্জুন। অবজ্ঞার হাসি হাসে সেই বানর। ‘তোমার কি মাথা খারাপ? সুগ্রীব, অঙ্গদ, নল, নীল, এবং সর্বোপরি হনুমান – এই মহাবীরদের নিয়ে যে বিশাল বানরসেনা, তার ভার সইতে পারে এরকম সেতু কি শুধু তীরনিক্ষেপে বানানো সম্ভব?’ আরও যোগ করে সে – ‘ওঁদের কথা ছেড়েই দাও না হয়। এইতো দেখছো আমার চেহারা – আমি পেরোতে পারি এরকম সেতুও ওভাবে বানাতে পারবে না কেউ ত্রিভুবনে।’ রাগ হয়ে যায় অর্জুনের – ‘এক্ষুনি করে দেখাচ্ছি আমি।’ বানর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে – ‘বানাও। শুধু আমার ল্যাজটা তার ওপর রাখব, আর তাতেই ভেঙে পড়বে সেটা – দেখো তুমি।’ কিছুক্ষণ বিতর্কের পর শর্ত রাখেন পার্থ… যদি তাঁর তৈরি সেতু ভাঙতে পারে এই বানর তাহলে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে প্রাণ বিসর্জন দেবেন তিনি। হাসি পায়… কার সঙ্গে কথা বলছে জানে না এই অবোধ শাখামৃগটি!

তারপর গাণ্ডীবে ওঠে টংকার। মধ্যাহ্নের সূর্য ঢাকা পড়ে নেমে আসে অন্ধকার। বারে বারে নিযুত পরিমাণ বাণ নিক্ষেপ করেন অর্জুন। সেগুলো আকাশে উত্থিত হয়ে জড়ো হয় এক জায়গায় – ঘন সন্নিবদ্ধভাবে। সমুদ্রের থেকে খানিকটা উপরে তৈরি হয় এক সেতু – একশো যোজন তার দৈর্ঘ্য। দেখে মনে হয় শত সহস্র হাতির ভার অনায়াসে বহন করতে পারবে – এতটাই মজবুত। কাজ শেষ করে সেই তুচ্ছ বানরকে আহ্বান জানান পার্থ… দেখি তুমি কেমন করে ভাঙো এই সেতু। রাম নাম জপ করতে করতে সেই বানর সেতুতে যেই তার ছোট্ট ল্যাজটি মাত্র রেখেছে অমনি তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে অর্জুনের তিরের সেতু। বিস্ময়ে লজ্জায় বাকরোধ হয়ে যায় পার্থের। তারপর স্মরণ হয় নিজের প্রতিজ্ঞার কথা। ক্ষত্রিয়ের দেওয়া কথা তো মিথ্যা হতে পারে না! অগ্নিকুণ্ড জ্বালানোর আয়োজন করেন। তারপর যেই তিনি প্রবেশ করতে যাবেন সেখানে, আবির্ভাব ঘটে এক ব্রাহ্মণ তনয়ের। বয়সে তরুণ, কী তার রূপ! দুজনের কাছেই জানতে চায় সে – ঘটনাটা কী? সব শুনে ছেলেটি বলে যে তোমাদের মধ্যে এই যে শর্ত তা ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কী না দেখার জন্য অতি অবশ্যই প্রয়োজন এক পর্যবেক্ষকের। আর একবার অর্জুন বানাক সেতু, আমি পালন করবো সেই ভূমিকা। রাজি হয় সেই বানর।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে… তৈরি হয় সেতু। বানর প্রথমে তার ল্যাজ দিয়ে পরীক্ষা করে, তারপর ধীরে ধীরে পা রাখে সেতুতে। কিছুই হয় না সেতুর। খানিকক্ষণ যথেচ্ছ দৌড়াদৌড়ি লাফালাফির পর আয়তনে বাড়তে থাকে সে। ধীরে ধীরে পর্বতপ্রমাণ আকৃতি হয় তার। সভয়ে অর্জুন দেখেন… এই বানর আর কেউ নন, মহাবীর হনুমান স্বয়ং! এইরকম চেহারা নিয়েই সমুদ্র লঙ্ঘন করেছিলেন ত্রেতা যুগে। চিরঞ্জীব তিনি, অজর ও অমর। তাই আজ যুগান্তরেও তিনি স্বমহিমায় যথারীতি বিদ্যমান। ঐ ভয়াল আকার নিয়ে অনেক চেষ্টা করেন হনুমান সেতুভঙ্গের। কিন্তু সফল হন না কিছুতেই। এবার বিস্ময়ের পালা তাঁর। হঠাৎ মনে হয় – এ ঐ ব্রাহ্মণের কোনো কারসাজি নয় তো? সাধারণ কেউ নয় বলেই মনে হচ্ছে! কে তিনি? তরুণের দিকে ঘুরে দেখেন… স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র দাঁড়িয়ে সেখানে। আর অর্জুন দেখেন সখা কৃষ্ণকে – মৃদু মৃদু হাসছেন তাঁর দিকে তাকিয়ে। ইতিমধ্যে… যেখানে যখন হনুমান সেতুর ওপর পদক্ষেপ করেছেন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র সবার অলক্ষ্যে ঠিক জায়গামতো সেতুর তলায় উপস্থিত  থেকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে সেটিকে। অবাক চোখে তাকিয়ে  থাকেন দুজনেই, তারপর প্রণাম করেন গড় হয়ে।

অর্জুনকে রীতিমতো বকা দেন কৃষ্ণ – ‘দেখলে তো বেশি মাতব্বরী মারার ফল? এখনো সময় আছে, শুধরে যাও ভাইটি আমার। প্রতিদ্বন্দীকে যথাযথ সম্মান দিতে শেখো, নইলে গো-হারান হারতে হবে যুদ্ধে। আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে আমার দেবত্ব বা অবতারত্ব ক্যানসেল হয়ে যাবে নির্ঘাত!’ লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে থাকেন পার্থ। প্রতিজ্ঞা করেন যে আর কখনও হবে না এরকম। এবার হনুমানকে নিয়ে পড়েন শ্রীকৃষ্ণ। ‘আচ্ছা, কী রকম আক্কেল তোর বল দেখি? একটা জলজ্যান্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারার ধান্দা করেছিলি? এতদিন ধরে এত প্ল্যান ভাঁজছি – আমার মেইন গুটিটাই খেয়ে নিচ্ছিলি আর একটু হলে? রামায়ণের সময় তো এর চেয়ে বেশি বুদ্ধি ছিল তোর? অবশ্য গন্ধমাদনের কেসটা ছাড়া। আসলে হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকলে এইরকমই হয়!’

হনুমান সেই থেকে ডাইভ দিয়ে পড়ে আছে পায়ের তলায়, এখন কেঁদে ওঠে হাঁউমাঁউ ক’রে…

‘ভুল হয়ে গেছে স্যার! কীভাবে প্রায়শ্চিত্ত করবো – আদেশ করুন প্রভু।’

‘শোন তাহলে। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ হবে ভীষণ। আমি এই অর্জুনের সঙ্গেই থাকবো। রথ চালাবো ওর। তুই থাকবি সেই রথের মাথায়। এই ধেড়ে চেহারায় নয়। পতাকার ভিতর লুকিয়ে ঘাপটি দিয়ে থাকবি। লোকে ভাববে অর্জুনের রথের পতাকায় বাঁদরের ছবি আঁকা আছে। আর যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র থেকে বাঁচাবি আমাদের। ঘুমিয়ে পড়িস না আবার!’

‘ওক্কে বস!’

‘শোনো হে অর্জুন। আজ থেকে আরও একটা নাম অ্যাড হলো তোমার – কপিধ্বজ। অনেক ইয়ার্কি হয়েছে – মন দিয়ে যুদ্ধের কথা ভাবো এখন থেকে।’

 

যুদ্ধশেষে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন রথ থেকে নামতে। তারপর হনুমান রথ শীর্ষ থেকে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সকলের চোখের সামনে নিমেষে ভস্মীভূত হয়ে যায় রথটি। অর্জুন বিস্ময় প্রকাশ করাতে কৃষ্ণ বোঝান তাঁকে… অনেকদিন আগেই এটা ঘটতো যদি না হনুমান রথে অবস্থান করে যাবতীয় দিব্যাস্ত্রগুলির থেকে সর্বদা রক্ষা করতেন আমাদের। প্রভুকে প্রণাম করে বিদায় নেন হনুমান। প্রাণভরে তাঁকে আশীর্বাদ করেন মহাভারতের পুরুষশ্রেষ্ঠ।

 

কলিকালের কলকাতায় বোধহয় একাধিক শ্রীকৃষ্ণের প্রয়োজন এখন – সেতুভঙ্গ রোধ করার জন্য। আর চাই অর্জুনের মতো প্রতিজ্ঞা – ভেঙে পড়লে আত্মসমালোচনার অগ্নিকুন্ডে নির্দ্বিধায় প্রবেশ করার মতো মানসিক দৃঢ়তা। মহাভারতের এই কাহিনী আজও তাই প্রাসঙ্গিক সমানভাবে। যাহা নাই ভারতে,তাহা নাই ভারতে!

লেখক ব্যাঙ্গালুরু নিবাসীপেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More