ব্লগ: গোমড়াথেরিয়াম/ যুগল শ্যাম

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সন্দীপ বিশ্বাস

    প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। দ্বাপর যুগ শেষ হতে আর দেরি নেই বেশি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আয়োজন চলছে জোরকদমে। সারা দেশের সব রাজারা হয় পাণ্ডব অথবা কৌরবদের পক্ষে নাম লিখিয়ে ফেলেছে। সবাই মহাব্যস্ত, তবে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ধর্মের জয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারাক্ষণ আকাশ-পাতাল চিন্তা মাথায় ঘুরছে তাঁর। যুযুধান দুই পক্ষের সব মহারথীদের সাথে আলাদা আলাদা করে কথা বলেছেন তিনি। ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, অর্জুন – একটাই প্রশ্ন করেছেন সকলকে… একলা লড়াই করে কে কতদিনে এই যুদ্ধ শেষ করতে পারবে বলে মনে হয়? আর কিছু না… আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাস, এবং বিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে ধারণা। কেউ বললেন কুড়ি দিন, কেউ বা পঁচিশ অথবা আঠাশ। খুব একটা ফারাক নেই এই সব মহাযোদ্ধাদের এস্টিমেটে। এখন একজনকেই জিজ্ঞেস করা বাকি রয়ে গেছে শুধু। ঘটোৎকচের ছেলে, দ্বিতীয় পান্ডবের পৌত্র – নাম তার বর্বরিক। এই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কোনোরকম ইচ্ছাই সে প্রকাশ করেনি এখনো পর্যন্ত।

    তবু তার কথা মাথায় আসার কারণ? শুনেছেন যে এই বয়সেই সে মহাবীর … কর্ণার্জুনের থেকে কম নয় কোনো অংশে। তাছাড়া তার কাছে আছে একটি বিশেষ ধনুক, আর মহাশক্তিশালী তিনটি বাণ – স্বয়ং শিবঠাকুরের সুপারিশে অগ্নিদেবের দেওয়া। ‘তিন বাণধারী’ নামেই সুপরিচিত সে। বাচ্চা ছেলেটার ক্ষমতা একটু যাচাই করে নেওয়া দরকার – ভাবলেন শ্রীকৃষ্ণ ।

    বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে দেখা করলেন বর্বরিকের সাথে। একথা সেকথার পর কায়দা করে প্রশ্নটা করলেন তাঁকে।

    ‘এক মুহূর্তেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ করতে পারি আমি’ – উত্তর শুনে স্তম্ভিত শ্রীকৃষ্ণ। কী করে তা সম্ভব, জানতে চান তিনি। তার সেই বিশেষ ধনুর্বাণ দেখিয়ে বর্বরিক বোঝায় সেগুলোর ক্ষমতার কথা। প্রথম তীরটি নিক্ষেপ করলে তা গিয়ে যাদের নিধন করতে চাই তাদের চিহ্নিত করে ফিরে আসবে। দ্বিতীয়টি এর ঠিক উল্টো – যাদের মারতে চাই না তাদের চিহ্নিত করবে সেটা। আর তৃতীয়টাই আসল কাজ করবে – প্রথমটির দ্বারা মার্কা মারা সবাইকে, অথবা দ্বিতীয়টির দ্বারা মার্কা দেওয়াদের বাদ দিয়ে বাকি সব্বাইকে মেরে আবার তূণীরে ফিরে আসবে। বিশুদ্ধ সেট থিওরির হিসেব! সুতরাং শুধুমাত্র দুবার তীরনিক্ষেপ করলেই শত্রুপক্ষ নিঃশেষ হবে এক নিমেষে! কেবল কথায় ভোলার লোক নন শ্রীকৃষ্ণ। উদ্ভিন্নযৌবন বালকের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়তো পুরোটাই? পরীক্ষা দিতে বলেন বর্বরিককে … যে অশ্বথ গাছের তলায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি তার সবগুলো পাতাকে একটিমাত্র তীরে গেঁথে দেখাও। রাজি হয় বালক। প্রথম তীরটি নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সে… মনে মনে মন্ত্র পড়ে ঠিকানা বলে দিচ্ছে তীরটিকে, এই ফাঁকে গাছ থেকে একটি পাতা ছিঁড়ে নিজের পায়ের তলায় লুকিয়ে ফেলেন শ্রীকৃষ্ণ – ছেলেটির অলক্ষ্যে। ছোঁড়ার পর তীরটি গিয়ে চোখের নিমেষে গাছের সবকটি পাতাকে চিহ্নিত করে শ্রীকৃষ্ণের পায়ের ঠিক ওপরে দাঁড়িয়ে পরে, যেখানে লুকোনো পাতাটি আছে। বর্বরিক ব্রাহ্মণকে অনুরোধ করে পা সরাতে, কারণ অন্যথা বাণটি পা ভেদ করে নিচের পাতায় মার্কা দিয়ে দেবে। শ্রীকৃষ্ণ সেইমতো করতেই শেষ পাতাটিতে নিজের চিহ্ন এঁকে প্রথম বাণ ফিরে যায় বালকের তূণীরে। এরপর তৃতীয় তীর গিয়ে সবকটি পাতাকে একসাথে ফুঁড়ে ফেলে অতি সহজেই। গর্বিত মুখে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বালক ।

    বিস্ময়ে হতচকিত শ্রীকৃষ্ণের মাথায় বিচিত্র চিন্তা খেলে যায় মুহূর্তের মধ্যে।এই একটি অস্ত্রেই তো বাজিমাত করতে পারে বর্বরিক অতি সহজেই! কৌরব বা পান্ডব পক্ষের তাবড় তাবড় সবাইকে বধ করতে পারে চক্ষের নিমেষে! আর, সবচেয়ে যা ভয়ানক তা হলো যে লুকিয়েও কোনো নিষ্কৃতি নেই – তীরগুলি  নিয়তির মতো অমোঘ নিয়মে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে বার করে হত্যা করবে, তা সে যেখানেই আত্মগোপন করুক না কেন! অনায়াসে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হতে পারে এই বর্বরিক! একে তো আরো ভালোভাবে বাজিয়ে দেখতে হবে! স্বয়ং ভীমসেন যার পিতামহ সে পান্ডবপক্ষেরই লোক বলে ধরে নেওয়া যায়, তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য বালকের কাছে জানতে চান তিনি – যুদ্ধে কোন পক্ষকে সমর্থন করবে সে। ‘যে পক্ষ দুর্বল তাদের’ – উত্তর শুনে আবার হোঁচট খান শ্রীকৃষ্ণ। এ ছোকরার কোনো কিছুই কি স্বাভাবিক নয়? বিশদ ব্যাখ্যা করে বর্বরিক – তার মায়ের কাছে এই ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সে। মা অর্থাৎ নাগকন্যা আহিলাবতী – তাঁর কাছেই যাবতীয় অস্ত্রশিক্ষা বালকের। কোনও এক সময় তাকে দিয়ে মা এই প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন। সেইমতো -যেহেতু কৌরবদের এগারো অক্ষৌহিণী সৈন্যের বিপরীতে পান্ডবদের মাত্র সাত – শুধু  সমর্থন নয়, পান্ডবপক্ষের হয়ে যুদ্ধই করবে সে। বলিহারি যুক্তি বটে! বাপ-ঠাকুরদার চেয়েও বড় হলো মায়ের কাছে করা প্রতিজ্ঞা ? সাময়িকভাবে নিশ্চিন্ত হন শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু পরক্ষণেই অন্য এক সমস্যার কথা উদয় হয় মনে। এ যে এক অদ্ভুত ফ্যালাসি ! বোঝান বর্বরিককে – ধরা যাক আজ সে পান্ডবদের হয়ে লড়াই শুরু করলো, কৌরবরা তো অচিরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে… এবং তখন তাঁরাই হবে দুর্বল পক্ষ, সুতরাং প্রতিজ্ঞামতো সে তখন দল পাল্টে তাঁদের হয়ে যুদ্ধ করবে… এবার নির্মূল হওয়ার পালা পান্ডবদের। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত বর্বরিক নিজে ছাড়া আর কেউই বেঁচে থাকবে না।এরকম যুদ্ধ হয়ে লাভটা কী ? বিষয়টা বোঝে বর্বরিক, কিন্তু ক্ষত্রিয়ের প্রতিজ্ঞা – উপায় তো কিছু নেই !

    মুহূর্তে  সমাধানের রাস্তা ভেবে ফেলেন মধুসূদন – এ ছেলেকে যুদ্ধ করতে দেওয়া চলবে না। কথা ঘুরিয়ে এবার ভিক্ষার কথা পাড়েন তিনি – ‘ভবতি ভিক্ষাং দেহি’। বালক সঙ্গে সঙ্গে রাজি – কী ভিক্ষা চাই আপনার? ‘তোমার শির’ – জানান ভিক্ষুক। বিস্মিত বর্বরিক বোঝে যে এই ব্রাহ্মণ সাধারণ কেউ নন – পরিচয় জানতে চান তাঁর। পরিচয় পেয়ে একটাই আর্জি জানায় সে –‘ ভিক্ষা আপনি পাবেন, কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখার খুব সাধ আমার – এমন ব্যবস্থা করুন যাতে সেটা সম্ভব হয়।’ সেইমতো সুদর্শন চক্রে তার শিরচ্ছেদ করে কাটা মাথাটি জীবিত রাখার ব্যবস্থা করেন শ্রীকৃষ্ণ, এবং যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশে একটা উঁচু জায়গায় সেটা স্থাপন করেন তিনি। সেইভাবে সমগ্র যুদ্ধটা নিজের চক্ষে দেখে বর্বরিক। এমনকি যুদ্ধারম্ভে ভগবান-মুখনিঃসৃত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – যা শুধু অর্জুনই শুনেছিলেন বলে সাধারণ ধারণা – তাও শোনে সে নিজের কানে। যুদ্ধাবসানে অর্জুন ও ভীম যখন কে বেশি বীরত্ব দেখিয়েছে এই নিয়ে তর্কে ব্যস্ত তখন শ্রীকৃষ্ণ তাদের নিয়ে যান বর্বরিকের মাথার কাছে – জানতে চান তার মত, যেহেতু পুরো যুদ্ধটা সে দেখেছে। উত্তর আসে … ‘আমি শুধু শ্রীকৃষ্ণকেই দেখেছি। নিহত ও নিধনকারী – সবাই আসলে কৃষ্ণ। সুতরাং তিনিই এই যুদ্ধের শ্রেষ্ঠতম বীর!’ এইভাবে সমগ্র গীতার সারাৎসার অতি সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেয় বর্বরিক।

    কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ, আর কলিযুগের শুরু। বর্বরিকের মৃতদেহ আগেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে, এখন তার মাথা পুঁতে দেওয়া হয় মাটিতে। শ্রীকৃষ্ণ তার এই আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে বর দেন… ‘কলিযুগে আমার জায়গা নিয়ে তুমি দুষ্টের দমন করবে। আমার নামেই লোকে চিনবে তোমায়।’ অধুনা রাজস্থানের একটি ছোট্ট গ্রাম – নাম ‘খাটু’ – সেখানকার মন্দিরে বিগ্রহের আছে শুধুই একটি মাথা। খাটুশ্যামজী নামেই তা পূজিত হয়ে থাকে। আবার শ্যামবাবা নামেও তিনি পরিচিত অনেকের কাছে। কথিত আছে যে এইখানেই বর্বরিকের প্রোথিত শির খুঁজে পাওয়া যায় আনুমানিক এক হাজার খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ, এবং তৎকালীন রাজা রূপ সিং চৌহান স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই জায়গায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শ্যামবাবার ভক্তের সংখ্যা ক্ৰমবৰ্ধমান – দেশের সর্বত্র,  এমনকি কলকাতাতেও। আর হবে নাই বা কেন ? গীতার বাণী স্বকর্ণে শুনেছেন এরকম লোক তো খুঁজে পাওয়া যায় না চট করে !

    (ইন্টারনেটের বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্যাবলী সংগৃহীত। অনেক ঘটনারই একাধিক রকমফের আছে – নিজের পছন্দমতো একটি বেছে নেওয়া হয়েছে ।)

    লেখক ব্যাঙ্গালুরু নিবাসীপেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More