ব্লগ গোমড়াথেরিয়াম: মেসি, লাল রিবনটা কি হারিয়ে গিয়েছিল

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সন্দীপ বিশ্বাস

    ফুটবল পাগল মাত্রেই জানেন, সর্বমোট ৩২ থেকে বর্তমানে আটটি দল এখনও বিশ্বকাপ জেতার আশা জিইয়ে রাখতে পেরেছে। অর্থাৎ এখন কোয়ার্টার –ফাইনাল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে প্রতিযোগিতাটি। আর ঠিক আটটি ম্যাচ বাকি – তৃতীয় স্থান নির্ধারণের খেলাটি নিয়ে। রাশিয়াতে হওয়ায় এবারে আমাদের মতো ভারতে থাকা দর্শকদের সময় নিয়ে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। শুধু রাত্রের ম্যাচটাই একটু ভুগিয়েছে… এই তো কালকেই, ইংল্যান্ড বনাম কলম্বিয়ার খেলায় – ইংল্যান্ড এক গোলে জিতছে, শেষ হতে মিনিটখানেক বাকি, ভাবছি এইবার ঘুমনো যাবে… ও মা, কলম্বিয়া গোল শোধ দিয়ে দিল! অর্থাৎ আরও তিরিশ মিনিট, এবং সম্ভবত  টাইব্রেকার! না দেখে শুয়ে পড়ারও প্রশ্নই ওঠে না ! ফলে পরেরদিন সবাইকে রক্তচক্ষু প্রদর্শন! মাঝে দু’একদিনের বিরতি ছাড়া এই চলছে রাতের পর রাত! খেলোয়াড়রা তো দুটো ম্যাচের মধ্যে বেশ কয়েকদিন ছুটি পায়, কিন্তু আমাদের মতো দর্শকদের সে অবকাশ কই? তাই বলে ঘ্যানঘ্যান কি করছে কেউ? মনে তো হয় না। চার বছর পর পর ফুটবলের এই যে মহোৎসব – অন্তত সোফায় বসে টিভিতে চোখ রেখে সামিল তো হতে পারছি খানিকটা! তাই বা ছাড়ব কেন? অফিস সামলাতে হচ্ছে, বসের গোঁসা না হয় আবার! বাড়ির কাজকর্মও তো দেখতে-টেখতে  হবে… বসিনি খচে গেলে আরো খারাপ! তবু আমাদের দাবিয়ে রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই। আশা রাখি যে এইভাবেই তাপ্পি-তুপ্পি দিয়ে চলে যাবে ১৫ তারিখের ফাইনাল পর্যন্ত।

    কী দেখলাম এখনো পর্যন্ত ? একের পর এক মহারথীদের পতন। জার্মানি, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, স্পেন। মেসি, ছোট রোনাল্ডো, ইনিয়েস্তা। উল্টোদিকে এমব্যাপে নামক এক উনিশ বছরের ফরাসীর আগমনবার্তা… ‘ভগবান’  মেসির দলকে ধ্বংস করে গেল তাঁর দুর্দান্ত গতি। মেসি বাঙালি হলে সেদিন নিশ্চয়ই গাইতেন – ‘তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা’ ! রোনাল্ডো শুরু করেছিল দারুণ ভাবে – গ্ৰুপ ম্যাচে প্রায় একার চেষ্টায় স্পেনের কাছ থেকে পয়েন্ট ছিনিয়ে নিয়ে। কিন্তু উরুগুয়ের সঙ্গে কোনো জারিজুরি খাটলো না – ছাগলাদাড়ি অর নট! মেসি তো তাও একবার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল, সোনার বলও পেয়েছিল সেবার কিছু বোদ্ধাদের অখুশি করে … পর্তুগিজ বীরের তার ধারে-কাছেও পৌঁছানো হলো না। এই প্রজন্মের এই দুই মহান শিল্পীর ক্লাব ফুটবল ছাড়া আর গতি রইলো না বোধহয়! আর অজত্ব প্রাপ্তির (GOAT = Greatest Of All Time) আশাও বিলীন হয়ে গেলো এই সঙ্গে! ওদিকে ব্রাজিলের নেইমার এখনও টিকে আছে। ফুটবলটা ভালো খেলে নিঃসন্দেহে, মেক্সিকোর সাথে কিছুটা হলেও জাত চিনিয়েছে… তবে এখন তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বোধহয় – ফুটবল না অভিনয়, কোনটা তাঁর বেশি প্রিয়! দুটো একসঙ্গে আর বেশিদিন চালানো কঠিন – পাবলিক ক্ষেপে যাচ্ছে যে! কয়েকটা অদ্ভুত স্কোরলাইন দেখা গেল – যেমন, দক্ষিণ কোরিয়া ২ জার্মানি ০, অথবা ক্রোয়েশিয়া ৩ আর্জেন্টিনা ০। তবে একদম অপ্রত্যাশিতভাবে এপর্যন্ত দেখা সবচেয়ে উত্তেজক ম্যাচ সম্ভবত বেলজিয়াম আর জাপানের, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধটা। সবাই ভেবেছিল জাপুরা অতি সহজেই দু-চার গোল খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বাড়ি যাবে, কিন্তু তারাই পরপর দুখানা গোল মেরে দেয় চোখের নিমেষে! বেলজিয়াম দলটা যে কত ভালো তা বোঝা গেল তারপর – ওই অবস্থা থেকে তিনটে গোল করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ম্যাচ বার করে নিলো তারা। এরপর ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলবে হ্যাজার্ডের দল, এবং পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের কাঁদিয়ে ছাড়বে বলেই বোদ্ধারা মনে করছেন। দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত !

    এরই মধ্যে একটা খবর পড়লাম কাগজে – একটু অন্যরকম। গ্ৰুপ লিগের প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের সাথে ১-১ শেষ হয় খেলা, মেসি পেনাল্টি মিস করার পর। সাংবাদিক সম্মেলনে কঠিন সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ফাঁকে এক সাংবাদিক মেসিকে দেখায় একটি লাল রঙের রিবন – জানায় যে সেটি তার মা মেসির জন্য পাঠিয়েছেন। নিজের ছেলের থেকেও মা নাকি মেসিকে বেশি ভালোবাসেন, এবং তাঁর বিশ্বাস যে এই রিবনটি পড়ে খেললেই দল জিতবে। মেসি কোনো কথা না বলে নিয়ে নেয় বস্তুটি। দ্বিতীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ০-৩। শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়ার সাথে জিততেই হবে এইরকম চাপ নিয়ে খেলতে নেমে শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে জেতে তারা। প্রথম গোল মেসির – দুর্ধর্ষ গোল – এবারের বিশ্বকাপে প্রথম। পরের রাউন্ডে পৌঁছয় দল। আবার সাংবাদিক সম্মেলন। সেই সাংবাদিকটি এক ফাঁকে একটু কিন্তু কিন্তু করে মেসিকে নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করে, ‘মনে আছে আমি আগের দিন তোমায় একটা লাকি রিবন দিয়েছিলাম ?’ কোনো কথা না বলে মেসি তার বিখ্যাত বাঁ পায়ের মোজাটি একটু নামিয়ে সাংবাদিককে দেখায়… সেই রিবনটি বাঁধা সেখানে! কৃতার্থ সাংবাদিক আনন্দে ক্যামেরার দিকে ঘুরে চিৎকার করে তার মা’র উদ্দেশ্যে বলে – ‘মা দেখো মেসি তোমার দেওয়া রিবন পড়েছে !’ কাগজের খবর শেষ এইখানেই। এরপর মেসি সেই রিবনটা হারিয়ে ফেলেছিল কি না জানি না আমরা। তবে তার জাদুদন্ডটি যে খোয়া গেছে রাশিয়ার এক বিষন্ন সন্ধ্যায় সে বিষয়ে আর দ্বিমত নেই কোনো !

    লেখক ব্যাঙ্গালুরু নিবাসীপেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More