ব্লগ: রোড হেড / হাঁড়কাপানো রাতে বিচার বসায় হিমালয়

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ছোটো বেলায় পড়তাম প্রবোধ সান্যাল , উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, শঙ্কু মহারাজ। কিশোরসুলভ ঈর্ষা  হতো মনে মনে। ভাবতাম লোকগুলো কেমন অবলীলায় হেঁটে হেঁটে মেঘ ছুঁয়ে আসেন। বড় বড় পাহাড়গুলোকে যোহান ক্রুয়েফের মতো ডজ করে পৌঁছে যান  এমন জায়গায়,  যেখান থেকে মনে হয় মহাদেবের  নন্দী ভৃঙ্গিকেও  হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। মহাপ্রস্থানের পথে গিয়েও  পঞ্চপাণ্ডবদের মতো তাঁরা  হারিয়ে যাননা। ফিরে এসে মন-ক্যামেরার রিলকে শব্দের অবয়বে গেঁথে ফেলেন আকর্ষনীয় ভাবে।

    আমার মতো হাজার হাজার  টাল খাওয়া বাউন্ডুলে মাথার টিকি খাড়া করে বই গিলতে থাকতো।  হাতে হাতে ঘোরায়,  পড়ায় পড়ায়, বইগুলো মলাট হারিয়ে ছিলো। আমি হারিয়ে ছিলাম চালচুলো।  বাড়ির ছাদ থেকে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সাদা দশাসই  মেঘগুলো দেখতাম। মেঘের চূড়ায় অন্তিম সূর্য ঝলকাতো। ভাবতাম  সাদা পাহাড় এরকমই বুঝি বিকেলের সূর্যের রং পাফে ঘষে ঠান্ডা গালে রুজ লাগায়।

    স্বর্গীয় পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তীর আত্মীয় ছিলেন সহকর্মী শিশির বসু।  শিশিরদা প্রথমে, পরে প্রাণেশদা নিলেন পাহাড় চেনানোর দায়িত্ব। চিনলাম পাহাড়। রাঢ় বাংলার সুপ্রাচীন পাহাড়গুলোতে আমাকে রগড়ে ধুলো ঝাড়লেন দেখতে সৌম্য, নিরীহ গোছের  আপাদমস্তক ভদ্রলোক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে  বজ্রকঠিন পাহাড়ি সেনগুপ্ত। ব্যাস, ধরে গেলো  মধ্যবিত্তর ঘোড়া রোগ।

    শুরু হলো  পড়তে পড়তে বাবা মা’র শিক্ষকতার পয়সা, পরে আমার চাকরির  সারা বছরের বেশিরভাগ পয়সা  পাহাড়ে ঢেলে আসা। বাবা মা বাধা দেননি। পাহাড়প্রেমী বাবা, গাবদা একটা অ্যালবামও  বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন।  কিন্তু পাড়পড়শীর মাথা ব্যথা। কেউ বলতো ‘দাদা বিয়ে দিয়ে দিন ওকে’। কেউ বলতো কাঠা-দু’য়েক জমি তো কিনে রাখতে পারো, পাহাড়ে পয়সার শ্রাদ্ধ না করে। ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করতো। কি করে বোঝাই এই সব ‘খাই-দাই’ গেরস্তদের। যে জমিতে  হিমালয়, সবটাই যে আমার, আমাদের মতো বাউন্ডুলেদের। দুকাঠায় মন বসেনা যে।

    কী করে বোঝাই হিমালয়ের প্রত্যন্ত বেসিনে  নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে পাতা টেন্টের বাইরে বসে থাকার অভিজ্ঞতা,  পলিনেশিয়ান সুন্দরীর সঙ্গে সবুজ সমুদ্রের সৈকতে বসে থাকার চেয়েও কোটি গুণ আকর্ষনীয়। কারণ হাড়কাঁপানো  রাতে বিভিন্ন জায়গায় বসে হিমালয়ের আমদরবার। দরবারে হাজির থাকে হিমালয়ের নামী-অনামী  আমীর ওমরাহরা। কারো নাম মৃগথুনী, কারো নাম ঋষি, কারো নাম চৌখাম্বা, কারো নাম নন্দাকোট, কামেট, থালাইসাগর, কাবরু থেকে নামজাদা নন্দাদেবী, এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে সহ আরও কতো শত। দরবারে  বিভিন্ন শৃঙ্গ, গিরিখাত, গিরিপথ ছুঁয়ে আসা বাতাস জানায় বিভিন্ন খবর। ভালো মন্দ, অভাব অভিযোগ।

    কারা পাহাড়ে ফেনকমল, ব্রম্ভকমল ছিঁড়েছেন, কারা পাহাড়ের পাথরে অ্যাক্রেলিক রং দিয়ে প্রেমিকা ও নিজের নাম লিখেছেন। কারা গরীব পোর্টারকে ঠকিয়ে কম পয়সা দিয়ে চলে গেছেন। কারা শৃঙ্গে না উঠে শৃঙ্গ জয়ের তকমা নিয়ে ঘুরছে। কারা অভিযানের সমস্ত বর্জ্য পাহাড়েই ফেলে পালিয়েছেন। ওঠে শয়ে শয়ে অভিযোগ। নিঃশব্দে চলে বিচার, বিচার শেষে রায়ের দুটি কপি হয়। একটা চলে যায় দেবলোকে একটা চলে আসে বাউন্ডুলেদের বিবেকে। অনেকের মতো আমারও বিচার হয়। পাহাড়ী গিরিখাত থেকে উঠে আসা বাতাস বলে যায় তুমি একদিন হিমালয়ের অমুক জায়গায় জুনিপার পুড়িয়েছিলে। অমুক জায়গায় ক্যাডবেরির খোলা ফেলেছিলে, অমুক জায়গায় সহযাত্রীদের লুকিয়ে জল খেয়ে নিয়েছিলে।

    বাসা গুলিয়ে ফেলা পাহাড়ী রাতচরা মাথার ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে বলে যায় ‘ভুলে গেলে পাহাড়ী গ্রামের ওপরের পানীয় জলের ঝর্ণায় দলের সদস্যদের প্রাতঃকৃত্যর শেষ ধাপটি করতে দেখেও বাধা দাওনি’। ঝাপটা মারতে থাকে বাতাস।  হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা গুলো হলো আমার গালে দেবতাত্মা হিমালয়ের মারা একেকটা চড়। প্রত্যেকটা চড় আমাকে জীবনের মতো শিক্ষা দিয়ে যায়। সেই ভুলগুলো করিনা। কিন্তু অন্য ভুল করি, পরের আমদরবারে চড় খাই। তবে বয়েস বাড়ে, বাড়ে অভিজ্ঞতা। কমতে থাকে ভুল, কমতে থাকে চড়ের সংখ্যা। হিমালয়ের মনের মতো হবার চেষ্টা করতে থাকি দশকের পর দশক।

    মনে পড়ে যাচ্ছে কুমায়ুনের বাগেশ্বরের সবুজপাহাড় চূড়ার ছোট্ট মন্দিরের গোপাল দাসজীর কথা। দড়িপাকানো শরীরের  জটাজুটধারী সন্যাসী। বয়েস বুঝতে হিমশিম খেতে হবে। গাঁজায় টান দিয়ে দুই হাতে দুটো লোহার বালতি ভর্তি জল অক্লেশে টেনে তুলতেন মন্দিরে। তিনদিন ছিলাম দাসজীর মন্দিরের পেছনে স্লেট পাথরের তৈরি ন্যাড়া ঘরে। ‘ফুলগোবি-টমাটর’-এর  তরকারি আর খসখসে রোটি  খেয়ে  স্লিপিং ব্যাগের ওমে শুয়ে শুনতাম দাসজীর কথা। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারতেন। দাসজী বলেছিলেন একটা কথা সেটা সারা জীবন ভুলিনি।

    সেটা হলো বেটা স্বার্থপর আর অবিশ্বাসীদের জন্য হিমালয় নয়। পাহাড়ে যাত্রাপথে এমন কোনও সঙ্গী নিবিনা যে তোকে বিশ্বাস করেনা বা তুই যাকে ভরসা করতে পারিসনা। কারণ জিগ্গেস করেছিলাম। বলেছিলেন পথেই বুঝবি, বাবা হিমালয় তোকে  তোর ভুলগুলো  ঘেঁটি ধরে দেখিয়ে দেবে। হ্যাঁ, দেখিয়ে দিয়েছে হিমালয়। হিমালয়ে যত ঢুকেছি তত শিক্ষা পেয়েছি।

    সুউচ্চ নির্জন গিরিপথে অসুস্থ হয়ে পড়েছি দেখেও অভিজ্ঞ সঙ্গী এগিয়ে গেলেন আমাকে ছেড়ে। অথচ একটু আগেই আমার বুকে ও পিঠে দুটো স্যাক ঝুলিয়ে ওপরে উঠে আসছিলাম। ওঁর স্পন্ডিলাইটিসের সমস্যা বেড়েছিলো কদিন ধরে। ওঁর আর আমার স্যাক বইছিলাম। তখনকার বিখ্যাত পাহাড়ি মানুষটির ব্যবহারে কষ্ট হয়নি, হাসি পেয়েছিল। মনে হয়েছিলো আমার সব পরিচিতকে একবার হিমালয়ের দরবারে এনে ফেলি। দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যাবে।

    (লেখক নিজেকে বোহেমিয়ান,বাউন্ডুলে, উড়নচন্ডী  এইসব বিশেষণে অভিহিত করতে ভালোবাসেন।হিমালয়কে হৃদয়ের গভীরতায় মাপেন, উচ্চতায় নয়।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More