ব্লগ: রোডহেড -৭/ বুড়ো সাহেবের বুড়ো ঘোড়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রুপাঞ্জন গোস্বামী

    অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকের অষ্টম দিন। বেসিশহর থেকে হাটতে হাঁটতে থোরাং ফেদির পথে চলেছি। বাঁদিকে অন্নপূর্ণা ,,৩ এবং, গঙ্গাপূর্ণা শৃঙ্গর সারি। সামনে ভয় দেখানো থোরাং পিক। সকাল তখন প্রায় এগারোটাচারিদিক কুয়াশা, মাউন্টেনিয়ারিং-এর পরিভাষায় যাকে বলে হোয়াইটআউট। সঙ্গে চলছে আবিরাম তুষারপাতগতকাল রাত থেকেই শুরু হয়েছে। এই মুহুর্তে কয়েক ফুট দূরের জিনিস ঠাওর করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুমানের উপর ভর করে চলছিবরফের উপর ইয়াকদের পদচিহ্ন আর মলই আমার পথপ্রদর্শক। এরই মধ্যে আবার এলোমেলো হাওয়া বইছেসব মিলিয়ে আমি চূড়ান্ত বিপর্যস্তঘণ্টা তিনেক হাঁটলেই ইয়াক খড়কা নামে একটা শেপার্ড হাট পড়বেওখানেই পাতবো টেন্ট। আজকের যাত্রা ওখানেই শেষ

    হঠাৎই কুয়াশার মধ্যে মনে হলো ডানদিকে কারও গলার আওয়াজ। রাস্তা থেকে একটু ডানদিকে সরলাম। কুয়াশার চাদর ভেদ করে এগিয়ে দেখলাম এক অবাক করা দৃশ্য।বরফের উপর শুয়ে আছে একটি জীর্ণশীর্ণ ঘোড়া। সামনের বাম পাটা ভাঙা। সারা গায়ে দগদগে ঘা। এক বৃদ্ধ সাহেব , বরফের উপর দুই পা ছড়িয়ে বসে ঘাগুলোতে পরম মমতায় হলদে রঙের ওষুধ লাগিয়ে যাচ্ছেন। চামড়ার ভাঁজ বলে দিচ্ছে সাহেবের বয়স আশির কাছাকাছি , কিংবা তারও বেশি।

    আমাকে দেখে সাহেব পথের রীতি অনুযায়ী ‘বেস্ট অফ লাক ‘ বলে উইশ করে আপন কাজে মন দিলেন। আমি রুকস্যাকটা নামালাম। সাহেব একটু অবাকই হলেন। কুন্ঠিত ভাবে আমাকে বললেন, ঘোড়ার ভাঙা পাটা একটু তুলে ধরতে। উনি একটা ফাইবারের সাপোর্ট লাগাবেন। ঘোড়াটা চুপ চাপ শুয়ে আছে।মাঝে মাঝে ফোঁশ ফোঁশ করে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলছে। ঘোড়াটার চোখের কোনে আমি কি জল দেখলাম ! সাহেব সম্ভবত টেন্টের ফাইবারে পোল কেটে ঘোড়ার পায়ে সাপোর্ট বানিয়েছেন। তারপর ঘোড়াটাকে কয়েকটা ইনজেকশন দিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালেন। অফার করলেন আমাকেও। খাই না তাই নিলাম না।

    আরও পড়ুন: ব্লগ রোডহেড/৫ ওরকম মনে হয় মামু

    সাহেব বললেন তাঁকে এখনও তিন-চার ঘণ্টা ঘোড়াটার পাশে বসে থাকতে হবে। আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে,আমাকে আমার পথে এগিয়ে যেতে বললেন l কেন জানি না আমি পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম “একাই হাঁটছেন ?” ’জানলাম, দল নিয়ে হাঁটছিলেন, দলের বাকি সবাই তরুণ। তাঁরা এগিয়ে গিয়েছেন। “সে কি! এই আবহাওয়ায় আপনি দলছুট হয়ে পড়লেন ? এটা কিন্তু ঠিক করেননি আপনি। ” অবাক হয়ে বলেই ফেললাম।

    সাহেব ঘোড়াটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ”ওরাও এটা বলেছিলো । আমি শুনিনি। কী করে যেতাম বলো , একে এ ভাবে ফেলে ! আমিও বুড়ো এ-ও বুড়ো। এ যতদিন কাজ করেছে, মালিক খাতির করেছে, আজ ও বুড়ো , পঙ্গু তাই পথে। আমারই মতো। সংসারে দুজনেই আজ মূল্যহীন। ছেলেমেয়েরা যে যার মতো সুখে আছে, আমিও তাই পথে নেমেছি। নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছি। আমার তবু দেশে মাথার উপর ছাদ আছে , এর কী আছে বলো? ” অনেকটা বলে একটু দম নিলেন বৃদ্ধ। হেসে বললেন , ঘোড়াটা সুস্থ হলে নিজে্র পায়ে হেঁটে অন্তত ঘাসটুকু জোগাড় করে নিতে পারবে। বৃদ্ধ সাহেবের মুখটা হটাৎ কিসের একটা আশায় সূর্যের মতো উজ্বল হয়ে উঠল।

    আমি স্থাণুর মত বসে আছি। মুখে কথা আসছেনা। চোখের কোণে জল আসছে বুঝতে পারছি। হয়তো কৃতজ্ঞতায়, হয়তো সংসারে দুই অপাংক্তেয় বৃদ্ধের প্রতি সমবেদনায়। কে জানে !

    “নাও, তুমি এ বার এগিয়ে যাও, বেলা বাড়ছে, ওয়েদার আরো খারাপ হয়ে আসছে।”ঘোর কাটল সাহেবের কথায়। বললাম ‘আপনি?

    ’“আমি থাকব, কয়েক ঘণ্টা, হয়তো আজ বা কালও, যতক্ষণ না ও উঠে দাঁড়াচ্ছে।”

    “কিন্তু এই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে…”

    কথা শেষ করতে দিলেন না সাহেব,বললেন, “তোমরা ইয়ং জেনারেশন। তোমাদের প্রচুর তাড়া হাতে সময় নেই। আমার আর এর হাতে প্রচুর সময়। কারণ আমাদের সামনে কোনও লক্ষ্য নেই। তাই আর দেরি না করে এগিয়ে যাও। বেস্ট অফ লাক, আর দুই বুড়োকে সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ। ”

    আমার চোখের সামনের বিষণ্ণ কুয়াশা মনের গভীরে প্রবেশ করতে লাগল। তীব্র একটা অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করতে লাগল পা দুটো চলতে শুরু করল। পালাচ্ছি আমি, কঠিনতম সত্যের মুখোমুখি আরেক মিনিট থাকাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার স্বার্থপরতা আমাকে আমার গন্তব্যের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে। পিছনের কুয়াশার ভিতর থেকে সাহেবের প্রত্যয়ী গলা উদভ্রান্ত বাতাসে ভর দিয়ে ভেসে এলো , “সামনে যদি কেউ আমার খোঁজ করে তো বলে দিয়ো ওদের এগিয়ে যেতে। আমার অপেক্ষায় না থাকতে। আমি আমার মতোই এগোবো।” প্রত্যুত্তর দিতে পারিনি, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয়নি। আমি কুয়াশার চাদর ভেদ করে ফুটে ওঠা, আমার নিজের ভবিষ্যতের দেওয়াল লিখনটা থেকে পালাতে চাইছিলাম।

    লেখক নিজেকে বোহেমিয়ান,বাউন্ডুলে, উড়নচন্ডী  এইসব বিশেষণে অভিহিত করতে ভালোবাসেন।হিমালয়কে হৃদয়ের গভীরতায় মাপেন, উচ্চতায় নয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More