ব্লগ রোডহেড/৪ কুমায়ুনি আকাশে  ভোরের  সুবর্ণরেখা

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    কাঠগুদামের আগের স্টেশন হলদোয়ানিতে নেমে পড়েছি। যাব মাইকতোলি বেসিন। হইহুল্লোড় করে বাসের ছাদে উঠে, মাল তুলে, বাসের ভেতর ঢুকলাম।

    বাসে অবাঙালির সংখ্যা অবশ্যই বেশি। সেই ভিড়ে চোখ টানল এক বাঙালি ট্রেকার দল।দলটিতে পুরুষও আছেন, আছেন মহিলারাও। চল্লিশের উপর প্রায়  সবার বয়েস। কিন্তু টিমের একজনকে আমার আদৌ ট্রেকার মনে হচ্ছে না। আমি কেমন যেন ধরতে পারি, কে ট্রেকার, কে ট্রেকার নয়। আবার, কে ট্রেকার, আর কে মাউন্টেনিয়ার। অনেকেই পারেন হয়তো।

    যাক, দলটির মধ্যে ওই লোকটিকেই কেমন যেন জবুথবু মনে হচ্ছে। ভদ্রলোক সব কিছু দেখছেন কেমনে যেন বিস্ময়ের ভঙ্গীতে। দলটিতে  ছিলেন তিনজন মহিলা ও দুজন পুরুষ। ওই ভদ্রলোকটিকে বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে অভ্যস্ত ট্রেকার বলে আমার মনে হয়েছে। ওই ভদ্রলোক ছাড়া সবার  গায়ে এক অদ্ভুত ধরণের সাদা সুতির কলারহীন টি-শার্ট। টি শার্টটিতে কতো কী লেখা, বিভিন্ন ফ্যাব্রিক কালার  দিয়ে। একটা সিট ওদিকে খালি ছিলো। ইচ্ছা করেই কাছে গিয়ে বসলাম। গিয়ে দেখি টি শার্টগুলো  আসলে দলের স্কোরবোর্ড। দলটি  কোথায় কোথায় ট্রেক করেছে তার নাম ও সাল। কোথাও লেখা রূপকুণ্ড-১৯৮৭, তো কোথাও লেখা পঞ্চকেদার-১৯৯০। এই ভাবে টি শার্টগুলির সারা শরীরে গোটা ত্রিশেক ট্রেক রুটের নাম লেখা।

    ভারী মজা লাগলো দেখে। আলমোড়া এসে আলাপ হলো টিমটির সদস্যদের সঙ্গে। দিদিরা খু্ব ভালো, মিশুকে, দলছুট ভদ্রলোকও খু্বই ভালো। কিন্তু আমার চোখ কপালে উঠলো দলনেতা ভদ্রলোককে দেখে । ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা। ফর্সা মুখে সাদা দাড়ি। সুঠাম ব্যয়াম করা চেহারা, দামী বিদেশী কার্গো প্যান্ট পরনে। চওড়া কব্জি দুটোর  একটায় অল্টিমিটার ঘড়ি  ও অন্য কব্জিতে ওয়াটারপ্রুফ ঘড়ি। কোমরে ওয়েস্ট পাউচ। হাতে ভিডিও ক্যামেরা। বয়েস জানলাম আশির কাছাকাছি। শুনলাম সারা বিশ্ব ঘুরেছেন। একটু রাশভারী গোছের ভদ্রলোক ।নাম জানলাম ওঙ্কারনাথ মজুমদার। আমাকে বললেন ,ওঁকে আঙ্কেল বলে ডাকতে। কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের কাছে বাড়ি।

    আরও পড়ুন: ব্লগ রোডহেড/ ৩ – হাল্লা চলেছে যুদ্ধে

    আঙ্কেলের মতো,  পাওয়ার-প্যাকড  লিডার (ট্রেকিং টিমের) আমি আর দুটি দেখিনি। অস্ট্রিয়া থেকে একটা টিম আসতো নব্বইয়ের দশকে, সবার বয়স ষাটের ওপর। হিমাচলে আমার সঙ্গে টিমটার আলাপ হয়, তাঁরাও ভীষণ টেক-স্যাভি ছিলেন।ওঁদের সঙ্গে দুটি ট্রেকও করেছি। কিন্তু ১৯৯৪ সালে আশি বছর বয়েসি আঙ্কেলকে দেখে আমি সত্যি সত্যিই অভিভূত ও তাজ্জব হয়ে গেছিলাম। আঙ্কেলের ট্রেকিং টিমের তিনজন  সদস্যার মধ্যে  দুজন টিচার ও একজন পোস্ট অফিসে কর্মরত ছিলেন তখন ।এখনও নাম মনে আছে আরতিদি, অঞ্জলিদি ও বাচ্চুদি। বয়সের দিক থেকে আঙ্কেলের পরে অঞ্জলিদি, আরতিদি ও বাচ্চুদি। বাচ্চুদি তখন তিরিশের কোঠায়, আমি কুড়ির প্রথম দিকে। আঙ্কেলের আমার স্যাকটা পছন্দ হয়েছে।আমার প্রিয় ক্লাইম্বার বন্ধু স্বর্গীয় সর্বজিৎ সাধুর তৈরি করে দেওয়া লাল টুকটুকে রুকস্যাক (তখন কেউ ব্যাকপ্যাক বলতো না)। আঙ্কেল  সর্বজিৎ-এর টেলিফোন নাম্বার নিলেন, হয়তো পছন্দমতো বানিয়ে নেবেন। এদিকে, আমাদের টিমে ছিলেন  ন্যাশনাল লাইব্রেরীর অজয় সেনগুপ্তদা ও তাঁর স্কুলে পড়া  মেয়ে কোয়েলি ও বার্ন স্টান্ডার্ড-এর  শ্যামসুন্দর চ্যাটার্জি। অজয়দা আর শ্যাম দুজনেই কাঞ্চনজঙ্ঘা ফাউন্ডেশনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আর দলে ছিলাম আমি আর শিশির বসুদা।আমি জীবনে কোনও পাহাড়ি  ক্লাবের লিখিত ভাবে সদস্য হইনি একটি ছাড়া। তা-ও আবার মাত্র  কয়েক বছর আগে কয়েক মাসের জন্য । সে এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা। ছেড়ে দিয়ে বেঁচেছি। যাহোক বাসের মধ্যেই ট্রেকিং টিমদুটি অদ্ভুত ভাবেই মার্জ করে গেলো। সৌজন্যে আঙ্কেল ও আমার দেখা সেরা ফটোগ্রাফার অজয়দা।

    সম্মিলিত টিমের একজন আমার খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলেন। আঙ্কেলের টিমের সেই দলছুট ভদ্রলোক, আজও ভালো নাম জানি না। আমরা ডাকতাম কাকা বলে। অঞ্জলিদিদের স্কুলের ক্লার্ক। জোর করে প্রায় তুলে নিয়ে এসেছেন অঞ্জলিদি, আরতিদিরা।সারাক্ষণ সিঁটিয়ে আছেন। আঙ্কেলের  টিমের কাকাকে আমার দলছুট মনে হয়েছিল প্রথমেই। কাকা অভিজ্ঞ ট্রেকার ও পর্বতারোহীদের সম্মিলিত টিমে ভীষণ ভাবে মিসফিট ভাবছে নিজেকে। সদ্য কেনা ট্র্যাক স্যুট ও পাওয়ার শ্যু ও সান-হ্যাটে মন্দ লাগছিল না মানুষটিকে। অল্প বিস্তর সবাই কাকার পিছনে লাগছে! অল্প হেসে থেমে যাচ্ছেন  মানুষটা। কী যেন ভাবছেন আর আমাকে যেন ক্রমশ জড়িয়ে ধরছেন । ঠিক যেমন করে বাচ্চাকে মায়ের কোল থেকে অচেনা  কেউ নিতে চাইলে বাচ্চা মা’কে যেমন করে আঁকড়ে ধরে । আমার সঙ্গে ওঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া , ঘোরা-ফেরা। কাকা একবার দার্জিলিং গেছিলেন। ব্যাস, কাকার পাহাড় গল্প শেষ। সেই কাকা চলেছে সুন্দরডুঙ্গা হয়ে দেবীকুণ্ড। সেখান থেকে আবার অন্য পথে নিচে নামবেন। সে পথটা সম্পর্কে আঙ্কেল ঝেড়ে কাশছেন না। নতুন রুট ওপেন করবেন নাকি! বিস্তর রিসার্চ করে এসেছেন।

    আরও পড়ুন: ব্লগ: রোড হেড / ২ অদৃশ্য সিগন্যাল ধরতেন নিমা তাসি স্যার

    বিভিন্ন বয়েস ও বিভিন্ন মানসিকতা দিয়ে বানিয়ে ফেলা আমাদের অদ্ভুত টিমটা চলেছে ঢাকুরি পাস (২৯০০মি) পেরিয়ে, পিণ্ডার উপত্যকার বুক চিরে গদাইলস্করি চালে। আঙ্কেলের নিদান, টিমের মহিলাদের কথা ভেবে হাঁটতে হবে। সে ভাবেই এগোনো হচ্ছে। আমাদের এতো আস্তে হাঁটতে একটু অসুবিধা হচ্ছে বটে। কিন্তু  সুবিধা হয়েছে সারভাইকাল স্পন্ডিলাইসিস নিয়েও ট্রেকে আসা অজয়দার এবং ট্রেকে অনভিজ্ঞ কাকার। খাতি গ্রাম পেরিয়ে, পিণ্ডার নদী আর সুন্দরডুঙ্গা নদীর কনফ্লুয়েন্স পেরিয়ে এগোচ্ছে টিমটা। আঙ্কেল তাঁর টিমের মহিলারদের ব্যাপারে একটু পজেসিভ। তাঁর দলের কোনও মহিলা সদস্য আমাদের দলের কোনও পুরুষ সদস্যের সঙ্গে কথা বললেই মহিলা সদস্যাকে ডেকে নিচ্ছেন নিজের কাছে।বেশ মজা লাগছিলো ব্যপারটা। তবে আমরা ওঁদের সদ্য পরিচিত, তাই আঙ্কেল হয়তো এখনও ভরসা করতে পারছেন না ।ঢাকুরির পর এই রুটের শেষ গ্রাম জাতোলিতে রাত কাটিয়ে এসে গেছি কাঁঠালিয়াতে ( ৩২৮১মি) । আগে এসে ক্যাম্প সাইটে টেন্ট পেতে ফেলেছে আমার পূর্ব পরিচিত গাইড বলবন সিং দানু ও তার টিম।

    আসার পথে দেখেছি, যতো পথ এগিয়েছে, ট্রি লাইন যতো কমেছে,ততই ফিউজ হয়ে যাচ্ছেন কাকা। সুন্দরবনের সরু খাঁড়ি থেকে হঠাৎ সাগরে বেরোলে আনকোরা ট্যুরিস্টদের যে হাল হয়, কাকার এখন সেই অবস্থা।
    এ বার এই সময়টায় বেশ বরফ আছে দেখছি সুন্দরডুঙ্গাতে। পরের দিন রাত থাকতে থাকতে বেরিয়ে কাকা ও হীরা সিং-কে নিয়ে উঠে গেলাম বালুনি টপে। হি হি করে কাঁপছেন কাকা। ঢাউস জ্যাকেট চাপিয়েছেন। মাঙ্কি ক্যাপ নাকের ওপরে , চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। কাকার হাত হীরা আর আমি পালা করে  ধরে ধরে বালুনি টপে (৩৯০০মি)উঠে এলাম। বালুনি টপেও অল্প বরফ আছে দেখছি। বেদম কাকা বালুনি টপে এসে বরফের ওপর বসে পড়তে চাইছিলেন। বসতে দিলাম না, ন্যাপস্যাকের ভেতর থেকে ফ্লাস্ক বের করে লিকার চা দিলাম কাকাকে। ফ্লাস্কের ঢাকনিতেই। হীরা খইনি থাবড়াতে বসলো।

    ভোর হয়ে আসছে, সূর্যের আলো এখুনি এসে পড়বে পৃথিবীতে। পৃথিবী আর আকাশের মিলন যেখানে,  সেখানে আবীর  রাঙা রেখাটা ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। কুমায়ুনি আকাশে  ভোরের সুবর্ণরেখা। কাকা হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছেন, আমিও। আস্তে আস্তে এসে পড়লো,  ঘুমভাঙা সূর্যের  পৃথিবীকে দেওয়া উত্তাপের প্রথম ইনস্টলমেন্ট।

    আরও পড়ুন: ব্লগ: রোড হেড / ১ হাঁড়কাপানো রাতে বিচার বসায় হিমালয়

    সূর্যালোকের নিবিড় ছোঁয়ায় জেগে উঠছে  মাইকতলি ( ৬৮০৩ মি ) নন্দাকোট (৬৮৬১মি) পানওয়ালিদোয়ার (৬৬৬৩মি), বালজৌরি(৫৯২২মি), দেবোতলি ( ৬৭৮৮ মি), মৃগথুনী ( ৬৮৫৫ মি), ভানোটি (৫৬৪৫ মিটার), থারকোট (৬০৯৯মিটার), দুর্গাকোট(৫৮৬৯মি) শৃঙ্গের দল।মাইকতলি গ্লেসিয়ার আর সুকরাম নালা এখনও চাদর চাপা দিয়ে আছে।
    অবশেষে একসময়  কুয়াশার অবগুণ্ঠন কাটিয়ে চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকালেন দেবতাত্মা হিমালয়। কাকা একবার আমার মুখ দেখেন, একবার দুগ্ধফেননিভ শৃঙ্গগুলিকে। দার্জিলিং-এর ম্যালে বসে দেখা হিমালয় আর হিমালয়ের কোলে বসে দেখা হিমালয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। তাই বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। এতবার হিমালয়ে গিয়ে আমারই কাটে না, তো কাকা।  অদ্বৈত মল্ল বর্মনের একটি উপন্যাস আমার খুব প্রিয়, তার চেয়েও বেশি প্রিয় উপন্যাসটির নাম, “দ্বীপের নাম টিয়ারং”। হিমালয়ের আগুন রাঙা ভোরে প্রতিজ্ঞা করলাম,আমিও লিখবো এক উপন্যাস, নাম দেবো  ‘শৃঙ্গের  নাম সোনারঙ’। শৃঙ্গরাজির অনির্বচনীয় সৌন্দর্যে বিহ্বল হয়ে কতক্ষণ স্থাণুর মতো  কাটিয়েছিলাম জানি না। চমক ভাঙল কাকার স্বরে ‘কাকা জিজ্ঞেস করলো, দেবীকুন্ডের (৪৪১৯মি) রাস্তাটা কোন দিক দিয়ে? অনেক দূরের বরফে মোড়া পথটা দেখিয়ে দিলাম। পথ অবশ্য এই মুহূর্তে নেই, বলবন সিংরা  আইসঅ্যাক্স দিয়ে  বের করে নেবে। আঙ্কেল রোপ, আইসঅ্যাক্স, ক্যারাবিনার, হার্নেস নিয়েই  এসেছেন। কাকা কী বুঝলো জানি না, পথ দেখাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত ধরে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো বছর পঁয়তাল্লিশের কাকা ।” ভাই আমি পারবো না,আমি তোমাদের টিমের সঙ্গে ফিরে যাবো। তুমি আঙ্কেলকে রাজি করাও। প্লিজ প্লিজ প্লিজ।আমি মরে যাবো, আমি নির্ঘাত পড়ে যাবো।”

    বরফে মোড়া দেবীকুন্ডের পথ কিন্তু খুব একটা সহজ নয়। ফুট খানেক চওড়া পথ দিয়ে ট্র্যাভার্স করতে হয়। বাঁ দিকে পাহাড় আর ডান দিকে প্রায় পঁচাত্তর ডিগ্রি কোণে নেমে যাওয়া খাত। এর মাঝ দিয়ে পথ।
    কাকা কেঁদেই চলছে শিশুর মতো। অবশেষে, আঙ্কেলকে বলবো বলে কাকার কান্না থামাই। রাতের মিটিং-এ কথাটা তুলতেই  আঙ্কেল রাগে ফেটে পড়লেন। তাঁর টিম ছেড়ে যাওয়া যাবে না। আমাকেও গম্ভীর ভাবে  নিজের চরকায় তেল দিতে বললেন।সত্যিই তো ,নিজের দায়িত্বে নিয়ে এসেছেন কাকাকে। আমাদের হাতে কাকাকে ছেড়ে দেওয়াটা আঙ্কেল মানতে পারছেন না, পারার কথাও নয়। শুরুতেই কথা শেষ, কাকা আঙ্কেলের টিমেই থাকবেন। মেসটেণ্টের ব্যাটারির আলোয় স্পষ্ট বুঝতে পারছি, কাকা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি কাকার দিকে না তাকিয়ে,  মাথা নিচু করে নিজের টেণ্টে ফিরে এলাম।

    পরদিন ভোরে আমাদের টিম  বেরিয়ে গেলো দেবীকুন্ডের পথে। আমরা মাইকতলি বেসিনে থাকবো আরও তিনদিন।আঙ্কেলদের টিম আজ দেবীকুণ্ড হয়ে অন্য পথে চলে যাবে। দেবীকুণ্ড দেখে আমাদের ফিরছি , তখন প্রায়  বেলা সাড়ে এগারোটা। দুই দল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সকাল থেকেই। পোর্টাররা ভাগাভাগি হয়ে গেছে।আমরা নামছি, ওদিকে  দেবীকুন্ডের পথে উঠে আসছে আঙ্কেলের টিম। আবহাওয়া হটাৎই কেমন যেন খারাপ হয়ে গেলো। হোয়াইট আউট হয়ে আসছে। এতো দেরি করলো কেন আঙ্কেলের টিমটা? দেরি হলো যখন,  আজ না বেরোলেই তো  ভালো হতো। কাকে বলবো, আবার কী ভাববে। তাই কিছু বললাম না।
    আঙ্কেলের টিমের সবাই একে একে একটু চিন্তিত মুখে টুকটাক কথা বলে  পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো দেবীকুন্ডের পথে। দোর্দণ্ডপ্রতাপ আঙ্কেল কথা বললেন না আমার সঙ্গে। বিরক্তির প্রকাশ মুখে। শেষে আসছে কাকা। বধ্যভূমিতে নিয়ে আসা পরাজিত সৈনিক যেন।আমাকে দেখে ম্লান হাসলো। ধরা গলায় বললো, “আসি “, চোখের কোণে জল চিক চিক করছে। হাল ছেড়ে দিয়েছে ভাগ্যের হাতে।
    কাকাকে বললাম, “ভয়ের কিছু নেই গো কাকা, তোমাদের সঙ্গে দরকারি সব ইকুইপমেন্ট আছে, আমাদের সঙ্গে তো  কিছুই নেই। দেখ তা-ও  কেমন ড্যাংডেঙিয়ে ঘুরে এলাম।” কাকা কিছু বললো না,  ম্লান হেসে এগিয়ে গেলো।
    কাকার পিছনে বলবন সিং আসছিলো, ওকে আগেই বলেছিলাম সব সময়ে কাকার পেছনে থাকতে আর হীরা সিংকে কাকার সামনে রাখতে। বলবন আমাকে দেখে বললো “ফিকর মাত করো সাব, ম্যায় হুঁ না।”

    উপরে উঠে যাচ্ছিলো আঙ্কেলের টিমটা, উঠে যাচ্ছিলো কাকা, পিছনে বলবন। হীরাকে দেখতে পাচ্ছি না, এগিয়ে গেছে বোধ হয়। ঠিক ধরে নেবে কাকাকে। ওদের আমি চিনি, অনেক দিন ধরে চিনি।
    হারিয়ে যাচ্ছে কাকা, আঙ্কেলের টিমের চারদিকে জাল বিছোতে থাকা ঘোলাটে মেঘের ভেতরে।
    ওদের দিকে চেয়ে বসে আছি আমি,আমার অজান্তেই আমার হাত দুটো কপালে উঠে এলো। “বাবা হিমালয় কাকাকে রক্ষা কোরো, ভয় পেয়ে কিছু না ঘটিয়ে বসে।”
    আরও কিছুক্ষণ বসে থাকতাম, কিন্তু নীচে থেকে আওয়াজ আসছে, “ও-ও-য়  রূপাঞ্জন”। শ্যাম হয়তো অজয়দার কথায় খুঁজতে বেরিয়েছে। সাড়া না পেয়ে গলা চড়িয়েছে নিপাট ভালোমানুষ শ্যামসুন্দর।

    ফিরে এলাম ক্যাম্পসাইটে, কাকার জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কেন আনকোরা মানুষটাকে বিপদে ফেলা। আমাদের সঙ্গে ফিরলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো?
    ঘুমাতে পারিনি সারা রাত। ভেবেছি,  কী করছে কাকা এখন। টেণ্টের ভেতরে স্লিপিং ব্যাগে?  নাকি, আর ভাবতে পারছি না।

    ফিরে এসেছি কলকাতায়, হঠাৎ একদিন ফোন বেজে উঠলো।
    -হ্যালো? কে ?
    -আমি কাকা গো , মরিনি বেঁচে আছি।
    -আরে কাকা, উফ্ফ্ফ,সব ঠিক ছিলো তো, ঠিক আছে তো ? (আমার গলায় আনন্দমিশ্রিত উত্তেজনা)
    -হ্যাঁ গো,সব ঠিক ঠাক, শোনো না, পরের ট্রেক পিন-পার্বতী পাস। আমি যাচ্ছি, তোমায় যেতেই হবে গুরু।

    হাঁ হয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম। আলমারির ওপর থেকে রুকস্যাকটা শুনতে পেলাম বলে উঠল  “জয় বাবা হিমালয়”। দেওয়ালের টিকটিকিটা ধুয়ো ধরলো, ‘ঠিক ঠিক ঠিক’।

     (লেখক নিজেকে বোহেমিয়ান,বাউন্ডুলে, উড়নচন্ডী  এইসব বিশেষণে অভিহিত করতে ভালোবাসেন।হিমালয়কে হৃদয়ের গভীরতায় মাপেন, উচ্চতায় নয়।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More