মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৬

ব্লগ: খাবো কী খাবো না

রানা আইচ

সত্তর দশকের আশা ভোঁসলের গাওয়া বিখ্যাত বাংলা আধুনিক গানের প্রথম কলি অবলম্বনে ‘য’ এর বদলে ‘খ’ বসিয়ে প্রবন্ধের নামকরণ করে একটু চাপে পড়ে গেলাম। গানের ঠিক পরের কথাগুলোয় ‘য’ এর বদলে ‘খ’ বসালে তো নিজের অবস্থাই তো খুব টাইট হয়ে যাবে! খেতে আমি বড়ই ভালোবাসি – নিজেই নিজেকে ‘খাদ্যরসিকচূড়ামণি’ বলে উপাধি দিয়েছি। এরপরে যদি ‘ভেবে তো হায়রে খাওয়া তো হলো না’ মতো অবস্থা হয় – তাহলে তো বড়ই মনোকষ্টের ব্যাপার! এদিকে চোখের সামনে দেখতে পারছি আশেপাশের চেনা পরিচিত লোকজন বিভিন্ন নিত্যনতুন ডায়েটের কল্যাণে খাওয়া দাওয়ার পাট প্রায় চুকিয়েই দিতে চলেছেন। এককালে কব্জি ডুবিয়ে ঝালঝাল পাঁঠার মাংস খাওয়া বাঙালি এখন বেকড চিকেন আর রাইস দিয়ে ডিনার করে। কেউ কেউ তো ভাতের পরিবর্তে কিনুয়া খাওয়া শুরু করেছেন। এই নয় যে ব্যাপারটা হালে শুরু হয়েছে। ডায়েটের গুঁতো প্রথম টের পাই এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে এক বন্ধুকে বাড়িতে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে।

তখন সবে এদেশে এসে রান্নাবান্নায় হাত পাকাতে শুরু করেছি। মাঝে মাঝে বন্ধুবান্ধবদের ‘আয় বাবা দেখে যা – দু’মুঠো চেখে যা’ গোছের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেছি। তা সেরকম এক ডিনারে এক বন্ধু এসে বললে  – সে শুধুই মাংস ও তরিতরকারি খাবে আলু বাদ দিয়ে – ভাত তো নৈব নৈব চ! শুনে বেশ অবাক হলাম – বাঙালীর ছেলে ভাত খাবে না, আলু খাবে না এ আবার কী অলক্ষুণে কথা! মাথাফাতা ঠিক আছে তো? মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলাম একটু রুটি করে দেবো কিনা। রুটির কথা শুনে বন্ধু এক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সগর্বে জানালো সে রবার্ট অ্যাটকিন্স নামক এক সাহেবের ‘লো কার্ব’ ডায়েট অনুসরণ করছে প্রায় মাসখানেক হলো – ভাত, রুটি, আলু ইত্যাদি শর্করা জাতীয় খাদ্য খাবারের লিস্টি থেকে নির্মম ভাবে ছেঁটে ফেলেছে, বেশি করে খাচ্ছে মাংস ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং সে দিব্বি আছে। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের কথা শুনে বেশ ভিরমী খাওয়াতে সে জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দিলো “burning fat takes more calories so you expend more calories”। এই ডায়েটের ফলে আমাদের শরীর কী কী বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাবে জিজ্ঞেস করায় সে বললে এতে নাকি বেশ তাড়াতাড়ি ওজন কমানো যায়। এদিকে সে ছেলের চেহারা বেশ ছিপছিপে – বাঙালী সুলভ ভুঁড়ি একেবারেই নেই। বেশ চিন্তাই হলো বন্ধুকে নিয়ে – নির্ঘাত বিপথে গেছে! এই বিদেশ বিভুঁইয়ে বন্ধু বন্ধুকে না দেখলে কে দেখবে সেই ভরসায় আমি তাকে কলকাতার বিরিয়ানীর কথা স্মরণ করালাম। কিন্তু ভবী ভোলবার নয়। জানালো বিরিয়ানী হাতের কাছে পেলে সে মাংসটাই শুধু তুলে খাবে! নাহ কেস তো পুরো জন্ডিস!

বন্ধু চলে গেলে রাতে একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম অ্যাটকিন্স সাহেবের এই নতুন ডায়েট মার্কিন দেশে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে। টাইম ম্যাগাজিন তো রবার্ট অ্যাটকিন্সকে ২০০২ সালের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে ঘোষণাও করে ফেললো। আর সেই বছরেই সাহেবের হার্ট অ্যাটাক হলো। বাজারে ঢি ঢি পড়ে গেলো। অনেকে যারা নিজের গাঁটের কড়িটি খসিয়ে এই ডায়েটে নাম লিখিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আবার গাঁক গাঁক করে ভাত রুটি খাওয়া শুরু করলেন। রাতারাতি অ্যাটকিন্স ডায়েটের গ্রাহকের সংখ্যা হু হু করে পড়তে লাগলো। সাহেব একটু সুস্থ হয়েই জনগণকে আস্বস্ত করলেন এই বলে যে ডায়েটের জন্য মোটেই নয় – তাঁর হার্টে আসলে দুরারোগ্য ব্যামো (chronic condition) আছে। কিন্তু এর কয়েকদিনের মধ্যে ২০০৩ এর এপ্রিল মাসে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে তিনি দুম করে পড়ে যান – এবং টানা নয় দিন ধরে হাসপাতালে যমে মানুষে টানাটানির পর দেহ রাখেন। এরপরে বলাই বাহুল্য যে এদেশের স্বাস্থ্য সচেতন লোকেদের কাছে অ্যাটকিন্স ডায়েটের জনপ্রিয়তা হু হু করে কমতে শুরু করে। তা বলে কি আর তারা ডায়েটিং ছেড়ে দিলেন? কভী নেহি। কারণ বাজারে ততদিনে চলে এসেছে আরো আরো কত শত ডায়েট – কত গালভরা নাম তাদের, শুনলেই উপোস করতে ইচ্ছে হয়!

তবে এদেশে গত দু দশকে লোকেদের খাদ্যাভ্যাস বেশ পরিবর্তন হয়েছে সে কথা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো। এব্যাপারটা আরো বুঝতে পারি অফিসে মধ্যাহ্নভোজনের সময়ে। কুড়ি বছর আগে কেউই প্রায় বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যেতো না – আমরা নিয়ম করে প্রতিদিন দলবেঁধে দুপুর বেলা বিভিন্ন রেঁস্তোরাতে খেতে যেতাম। আমার এক ঘনিষ্ঠ তাইওয়ানি বন্ধু থাকায় তার সাথে সুদুর প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের খাবার চাখতে যেতাম বেশ ঘনঘন। তাইওয়ানি, জাপানি, চিনে, ভিয়েৎনামি, থাই, কোরিয়ান, মঙ্গোলিয়ান, মালয়, বার্মিজ খাবার খেয়ে তৃপ্ত হতো রসনা। ইদানিং খেয়াল করছি অফিসের লোকেরা আর দুপুরে বাইরে বিশেষ খেতে যান না। অনেকেই বাড়ী থেকে খাবার নিয়ে আসেন। আর অধিকাংশ সময়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে দুপুরবেলা স্যালাড খেতে পছন্দ করেন। সদ্য কলেজ পাশ করা মেয়েরা তো দেখি লাঞ্চে কচকচ করে কাঁচা সুইট বেবি বেল পেপার (ছোট ক্যাপসিকাম) চিবিয়ে খাচ্ছে। আরেকদিন তো একজনকে দেখলাম কড়াইশুঁটিতে মাখন লেপে মাইক্রোওয়েভে গরম করে দিব্বি গপগপিয়ে খেয়ে নিলো। এসব দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। মনে মনে বলি – ভগবান এদের ক্ষমা করে দাও। আবার পরমুহুর্তে সতর্ক হয়ে যাই – নিজেই নিজেকে বলি – তোমার তাতে কি যায় আসে হে? কথাতেই তো আছে – আপ রুচি খানা অউর পর রুচি পরনা। তুমিও যে মাঝে মাঝে স্যালাড খাও – সেটা ভুলে গেলে চলবে?

তা অফিসে যখন থাকি – কুড়িয়ে বাড়িয়ে দু তিন জনকে পেয়েই যাই বাইরে খেতে যাওয়ার জন্য। অতি সম্প্রতি এর মধ্যে একজন আবার দল বদল করে ফিটনেস সচেতন হয়ে উঠেছে। সেও ছিলো আরেক খাদ্যরসিক কিন্তু তাকে আর বাইরে বার করা যাচ্ছে না। তাকে চেপে ধরতেই জানা গেলো সে এখন এক নতুন ডায়েটে নাম লিখিয়েছে – যা নাকি লেকটিন (Lectin) ফ্রি। আরো জানা গেলো এই লেকটিন হচ্ছে এক ধরণের প্রোটিন। উফ জীবনে কত কিছু যে জানা বাকী! আমার দৌড় আবার সেই গ্লুটন পর্যন্ত। লস অ্যাঞ্জেলেসের এক হার্ট সার্জন, স্টিভেন গান্ড্রি, চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে এক নতুন ডায়েট কোম্পানী খুলেছেন যার নাম গান্ড্রি এমডি। তিনি দাবি করছেন – এই লেকটিনই নাকি সব সর্বনাশের মূলে। আমাদের শরীরের যত জ্বালা-যন্ত্রণা, ব্যাথা-বেদনা এই সবের জন্য দায়ী এই বদতমীজ প্রোটিন। খাবার রান্না করার পদ্ধতিও তিনি বিস্তারে জানিয়েছেন। কাঁচা শাকসব্জি মোটেও নয় – খেতে হলে সেদ্ধ করতে হবে বা গেঁজিয়ে নিতে হবে। এছাড়া প্রেসারে কুকারেও রান্না করা চলবে। এরপর আমার সহকর্মী যা বর্ণনা দিলো তাতে আমার মনে হলো এর চেয়ে খাবার না খেয়ে থাকাটাই শ্রেয় কারণ দুনিয়ার ৮০ শতাংশ খাবারেই তিনি ঢ্যাঁড়া মেরে দিয়েছেন। পানীয়ের মধ্যে কোনোমতে জায়গা পেয়েছে রেড ওয়াইন, শ্যাম্পেন ও হুইস্কি। নেট ঘেঁটে জানা গেলো এই লেকটিন-ফ্রি ডায়েটের আবার অনেক সমালোচকও আছেন – তাদের বক্তব্য এত কম ধরণের খাদ্যবস্তু এই তালিকায় স্থান পেয়েছে যে খাবারটা আদৌ সুষম হবে কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাছাড়া এই ডায়েটে এত বেশি বাধানিষেধ আছে যে লোকেরা অচিরেই আগ্রহ হারাবেন।

আমার মা হোম সায়েন্সের শিক্ষিকা ছিলেন – ছোট বেলায় মার কাছে শুনেছি সুষম খাবার খেতে হবে। কিন্তু সেই সুষম খাবারের নাম করে মা যখন এক গেলাস বিটসিদ্ধ জল নুন আর গোলমরীচ দিয়ে জোর করে খাওয়াতে আসতেন তখন হাত পা ছুঁড়ে খুব প্রতিবাদ করতাম। এর মধ্যে কয়েকদিন আগে চোখে পড়লো কোন এক বলিউডি অভিনেত্রির সেই বিটের চা নাকি ভীষণ পচ্ছন্দ! বুঝতেই পারছেন এহেন সংবাদের শিরোনাম দেখে আর তা বিশদে পড়ার ইচ্ছে হয়নি। মা বেশ হালকা ধরনের অথচ সুস্বাদু রান্নাবান্না পছন্দ করতেন। আমাদের বাড়িতে পালা পার্বণ ছাড়া তেল, ঘি চপ্চপে মশলাদার খাবার খুব কমই হতো। ইদানিং আবার শুনি যে ঘি নাকি খাওয়া ভালো। হায় হায় – কেন খেলাম না তাহলে এতদিন? কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করে। বছর পনের আগে প্রথম শুনেছিলাম রেড ওয়াইন নাকি হার্টের জন্য খুব ভালো। এই নিয়ে খুব লেখালেখি শুরু হলো এবং তার গুঁতোতে সবাই ঢকঢকিয়ে এমন ওয়াইন খাওয়া শুরু করলো যে বিয়ার কোম্পানীগুলোর মাথায় হাত। তো বছর দুয়েক বাদে খবর পেলাম বিয়ার খাওয়াও নাকি শরীরের জন্য ভালো। এরপর কি চিজ কোম্পানীগুলোর মাথার ঠিক থাকে? যথারীতি একদিন খবর পেলাম আমাদের শরীরের জন্য চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত। এসব দেখেশুনে মনে আর কোনো ভয় নেই। ডায়েট ফায়েটের গুলি মারো। তবে এও নয় যে তিনবেলাই চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় সাঁটাচ্ছি। হ্যাঁ – আলুসেদ্ধ ভাত পুরোপুরি বর্জন করেছি, মিষ্টিও প্রায় না থাকার দলে (কোনোদিনই ক্যাটক্যাটে মিষ্টি খুব একটা পছন্দের ছিলো না), আর মা’র উপদেশ মতো কখনো পেট ঠেসে খাই না। একটু ফাঁকা রেখে দিই।

আমার জীবনের মন্ত্র এখন – ‘খান ভালোবেসে খান’।

লেখক সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত 

Shares

Comments are closed.