জঙ্গলমহলের জার্নাল/ ২

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মারাংবুরু মাহাত:  মোটা টাকার বিনিময়ে বহিরাগতদের প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি আর কুর্মি সম্প্রদায়ের আন্দোলনের বিরোধিতা করায় জঙ্গলমহলে মাশুল গুনতে হল শাসক দলকে। ‘উন্নয়ন’ দেখিয়েও পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের আদিবাসী ভোট ব্যাঙ্কে ব্যাপক ধস নামল।  শাসক দলকে শবক শিখিয়ে ‘দ্যাখ কেমন লাগে’ মেজাজে জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা। কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে বলছেন,‘আগে নগরে পরিবর্তনের সূচনা হত। এখন উল্টোটা। প্রত্যন্ত  জঙ্গলমহল থেকে পরিবর্তনের সূচনা। জঙ্গলমহল আগে ভাবে, পরে ভাবে কলকাতা!’

    জঙ্গলমহলে এমন করুণ ফলাফল হবে, পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের কাছে। ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়া জেলার বিদায়ী সভাধিপতিরা হেরে  গিয়েছেন। অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী চূড়ামণি মাহাত, পশ্চিমাঞ্চল দফতরের মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতের খাস তালুকে গ্রাম পঞ্চায়েত হাতছাড়া। দুই জেলায় একাধিক পঞ্চায়েত সমিতিতে সবুজ ঝড় থমকে গিয়েছে। উড়েছে গেরুয়া আবির। শালবনির  বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাতের নিজের এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত গিয়েছে বিজেপির হাতে। পুরুলিয়া জেলা পরিষদের বিদায়ী সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতের নিজের ‘ঘর’ বলরামপুরে শাসক দল গোহারা। পঞ্চায়েত সমিতি ছিনিয়ে নিয়েছে বিরোধীরা। ঝাড়গ্রামের জেলা পরিষদের বিদায়ী সভাধিপতি সমায় মাণ্ডির গড়েও ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল। উড়েছে পদ্মফুলের পতাকা।

    তুলনায় বাঁকুড়ার রাইপুর, রানিবাঁধ, খাতড়ায় ভাল রেজাল্ট হয়েছে তৃণমূলের। কিন্তু  এই ‘ভাল’ রেজাল্টের নেপথ্য কাহিনী রয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, বহিরাগত দুষ্কৃতীদের নিয়ে এসে শাসক দল বুথ দখল করে দেদার ছাপ্পা দিয়েছে। বিকেল তিনটে পর্যন্ত আদবাসীদের একজোট হতে সময় লেগেছে। তিনটের পর আদিবাসীরা বহিরাগতদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।  তীর ধনুক উঁচিয়ে এগিয়ে আসে। তখন পালাতে বাধ্য হয় বহিরাগতরা। ততক্ষণে ছাপ্পা দেওয়ার অপারেশন সফল করে ফেলেছে দুষ্কৃতীরা। ফলে বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলে ব্যালট বাক্সে আদিবাসী ক্ষোভের প্রভাব দেখা গেল না।

    তৃণমূলের আদিবাসী ভোট ব্যাঙ্কে ধস নামার কারণ কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের হাতে বেশ কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। প্রথমত, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বহিরাগতদের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ জঙ্গলমহলে। শেষ যে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, তাতে জঙ্গলমহলের যুবকদের চাকরি হয়নি। হলেও সেটা নামমাত্র।  চাকরি পেয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুর, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, হুগলি জেলার যুবকরা। বহিরাগত যে সব যুবকরা  প্রাথমিক শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন, তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কারণ  বেশির ভাগ শিক্ষকদের মাধ্যমিকের নম্বর থার্ড ডিভিশন বা টেনেটুনে পাশ করেছেন। কেউবা উচ্চ মাধ্যমিকে দু’বার ফেল। অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বহিরাগত যুবকরা চাকরি পেয়েছেন। ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

    বহিরাগত যুবকরা প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি করতে এল জঙ্গলমহলে, আর এখানকার শিক্ষিত মেধাসম্পন্ন যুবকরা বঞ্চিত হলেন। চোখের সামনে তাঁরা দেখছেন, উচ্চ মাধ্যমিক টেনেটুনে পাশ যুবক গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষক। শিক্ষিত বেকাররা এই বঞ্চনার ক্ষোভ উগরে দিলেন ব্যালট বাক্সে। শুধু যুবকরা নন, তাঁর পরিবারের ভোটগুলিও গেল বিরোধীদের ছাপে।

    দ্বিতীয়ত, গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে জঙ্গলমহলে কুর্মি আন্দোলন চলছে। ভাষা, সংস্কৃতি, এসটি তালিকায় পুনরায় অর্ন্তভুক্তির দাবিতে কুর্মিরা পথে নেমেছে। ‘ডহর ছেঁকা’, ‘জিগিড় জিটা গবচন’, ‘রেল ছেঁকা’ একাধিক আন্দোলনে সামিল। এই  আন্দোলনকে ভেস্তে দিতে সরাসরি বিরোধিতায় নামে শাসক দল। শ্রীকান্ত মাহাত, চূড়ামণি মাহাত, শান্তিরাম মাহাত, সৃষ্টিধর মাহাত কুর্মি আন্দোলনকে দমাতে সশরীরে পথে নামেন। নিজেদের জাতিস্বত্বার আন্দোলনে কুর্মি সম্প্রদায় জোটবদ্ধ। ফলে শাসক দলের এই নেতারা চক্ষুশূল হয়ে যান। যার প্রভাব পড়ল ব্যালটে। কুর্মি সম্প্রদায়ের অনেকাংশ ভোট চলে গিয়েছে বিরোধীদের কাছে।

    তৃতীয়ত, আদিবাসী সাঁওতাল মেয়েদের উপর যৌন নির্যাতন। ঝাড়গ্রামের রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত একলব্য আবাসিক স্কুলে সাঁওতাল ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ ঘিরে উত্তাল হয়েছিল ঝাড়গ্রাম। অভিযোগ, স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্রীদের দীর্ঘদিন ধরে শ্লীলতাহানি,  যৌন নির্যাতন করছেন। অভিভাবকরা এর প্রতিবাদ করতে গেলে জাত তুলে গালাগালি দেওয়া হত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ছয় মাস আগে আদিবাসীরা আন্দোলনে নামেন ঝাড়গ্রামে।  কোনও সংবাদমাধ্যমই আদিবাসী  এই  আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে ছাপেনি। বরং শিক্ষকদের সাফাই গাইতে থাকে সংবাদমাধ্যম। এবং অভিযুক্ত শিক্ষকরা আজ পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি।  এর জেরে ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। ক্ষোভে ঘৃতাহুতি পড়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘একলব্য  স্কুলে কোনও ঘটনাই ঘটেনি।’ শুধু ঝাড়গ্রাম নয়, পুরুলিয়ার হুড়া থানার লক্ষ্মণপুরেও মিশনারি আবাসিক স্কুলে সাঁওতাল ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। সেখানেও অভিযুক্ত শিক্ষকরা। সম্প্রতি পুরুলিয়ার বোরো থানার শুশুনিয়ায় একলব্য স্কুলে এক আদিবাসী ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির ঘটনায় অভিযুক্ত স্কুলেরই এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। এই ঘটনাতেও বোরো এলাকা উত্তাল হয়।

    আদিবাসী ছাত্রীদের প্রতি যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষায় পঠন পাঠন ব্যবস্থা রূপায়ণে সরকারের ব্যর্থতাও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত করেছে। সাঁওতালি ভাষায় পঠন পাঠনের জন্য শিক্ষক নিয়োগ  বহুদিন ধরে বন্ধ। স্কুলগুলিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এছাড়া জঙ্গলমহল এলাকার আদিবাসী ছাত্র ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল গুলি বন্ধ। ৯০ শতাংশ হোস্টেল বন্ধ রয়েছে। এসবের কারণে আদিবাসীদের ভোট গিয়েছে বিরোধীদের ব্যালটে।

    চতুর্থত, কেষ্টর পচা চাল জঙ্গলমহলে ‘উন্নয়ন’ বিরোধী হয়ে উঠেছে। দুটাকা কেজি দরের চাল গত নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের। সেই চাল ‘পচা’ বলেছেন আদিবাসীরা। এই পচা চাল এসেছিল বীরভূম থেকে। অভিযোগ, খাদ্য সচিবকে ধমকে ওই চাল পাঠানো হয়েছিল জঙ্গলমহলে। ‘উন্নয়ন’ রাস্তায় দাঁড়াতেই জোটবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ালেন আদিবাসীরা।

    পঞ্চমত, আরএসএস নিঃশব্দে মিশে গিয়েছে আদিবাসীদের সঙ্গে। নানান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আদিবাসীদের মগজ ধোলাই করেছেন আরএসএস সংগঠনের কর্মীরা। যার ফলে আদিবাসীরা তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে বিজেপিকেই বেছে নিয়েছেন। এবং ব্যালটে রায় দিয়েছেন।

    এক বছর পরেই লোকসভা নির্বাচন। তার আগে  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদিবাসীদের মন ফিরে পেতে  বহু প্রকল্পের ঘোষণা করবেন হয়তো। কিন্তু আদিবাসীদের মন কি ফিরে পাবেন? এখন সেটাই দেখার!

    (জল জমি জঙ্গল পাহাড় রক্ষায় আদিবাসীদের পক্ষে এই লেখকের কলম গর্জে ওঠে। একাধিক আদিবাসী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বন ভূমি পাহাড়ের জন্য তিনি সদা জাগ্রত। জঙ্গলমহলে জন্মে জঙ্গলমহলেই বিচরণ করেন এই লেখক।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More