ব্লগ দিল্লির চিঠি / মিশ্রজাতির ঔপন্যাসন, দেশ, জাতীয়তা, ভাষা … 

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়  

    দেবেশ রায় তাঁর তারাশংকর: নিরন্তর দেশ নামক মহাগ্রন্থে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বাংলা ভাষা তৈরি হয়ে ওঠার হাজারখানেক বছর জুড়েই  এ ভাষা রাজানুগ্রহের বাইরের ভাষা। শুধু শ্রমজীবি মানুষের শ্রমের ভাষা হয়ে থেকেছে। তাতে লাভ হয়েছে এ ভাষার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়নি। তাতে ক্ষতি হয়েছে এই যে বাংলা ভাষায় অভিধা-অর্থের চাইতে লক্ষণা-অর্থ অনেক বেশি শুধু এই কারণে যে শ্রমজীবি মানুষের শ্রম থেকে এ ভাষা অর্থ গ্রহণ করে ঋদ্ধ হতে হীনম্মন্যতায় ভুগেছে (আংশিক উদ্ধৃতি) [1]

    এস্পানিওল রাজার চাপানো ভাষা হলেও সে ভাষা কখন যে নতুন দুনিয়ার নিজস্বতায় পূর্ণ  গেছে তা টের পাননি সে ভূখণ্ডের ইওরোপমুখি লেখকেরা।  সেই সন্ধান প্রথম পাওয়া গেল প্রথম প্রজন্মের জাদুবাস্তবদের হাতে। বিশেষত আলেখো কার্পেন্তিয়েরের লেখায়। উঠে এল মিশ্রদুনিয়ার কথা। যেখানে ভাষা এস্পানিওল হলেও বাকি সবই আলাদা। সেখানে এস্পানিয়ার ঘোষ বোস মিত্তির থাকলেও জুড়ে গেছে বহু কোনওদিন না শোনা পদবী। কারুর  ফরাসী কারুর বা ইতালীয়, কারুর আফ্রিকী, তো কারুর বা কেবল স্থাননাম (আমার এক পরিচিত মেয়ের পদবী বিলোরিও দে মাদ্রিদ, মানে মাদ্রিদের বিলোরিও)। এমন এক মিশ্রণের প্রেসার কুকারে যে খাদ্য রান্না হবে তাকে তো শুধু ইওরোপের প্রচলিত ঘেরাটোপে আটকানো যাবে না। সাড়ে চারশো বছরের বেশি সময়ে সে ভাষায় ঢুকে পড়েছে নানা বিদেশী শব্দ। রয়েছে ১৫/১৬ শতকের শব্দ যা আর ২০ শতকের এস্পানিয়ায় বলা হয় না। তৈরি হয়েছে এক সম্পূর্ণ নতুন ভাষাপ্রবাহ যাকে কাস্তেইয়ানো থেকে আন্তর্জাতিক এস্পানিওল করে তুলছে, আর সে ভাষার আদি কবি পাবলো নেরুদা ও সেসার বাইয়েখো, মহাকাব্যিক আখ্যানের প্রথমজন আলেখো কার্পেন্তিয়ের।  সে ভাষায় জোড়া আছে মধ্য আমেরিকার মেখিকো থেকে দক্ষিণতম চিলে। নাতিশীতোষ্ণমণ্ডল থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চল হয়ে যে ভাষা পৌঁছে গেছে প্রায় দক্ষিণ মেরুতে। এস্পানিয়ায় বরফ নিয়ে নানা শব্দ থাকলেও ছিল না বৃষ্টির শব্দমালা যা তৈরি হল নিরক্ষীয় অঞ্চলে। আজকের এস্পানিওল ভাষায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি শব্দ আছে আর তার পিছনে জুড়ে রয়েছে এই বিরাট ইস্পানো আমেরিকা, তার আফ্রো-কুবানো, মাপুচে, ইনকা, মাইয়া, আসতেকা সভ্যতার চিহ্নসমেত, রয়ে গেছে মেস্তিসো (মিশ্র) ও কাস্তিসো (অভিজাত) নামক দাগ যা আজ পরস্পরের পিছনে লাগতে কাজে লাগে।

    মজা হল বাংলা এসবের কোনও কিছুই করেনি। লক্ষণা-অর্থের শব্দদের আরও কিনারায় পাঠিয়ে, অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘতায় দুঃখিত গোছের খটমট বাংলা তৈরি করেছে। একটু মনে করলেই দেখা যাবে দূরদর্শনের সেই যুগে সরি ফর দা ইন্টারাপশান এর হিন্দি ছিল সহজ, রুকাওয়াট কে লিয়ে খেদ হ্যায়। হিন্দিতে রুকাওয়াট বনাওয়াট জাতীয় দেশি শব্দ তৈরি করা সহজ। বাংলায় নয়। আমরা পশ্চিমবঙ্গে বাংলাকে আজও এক ব্রাহ্মণ্যবাদী ভাষায় আটকে রেখেছি তার তৎসম শব্দের ঝংকারে।

     

    [1] তারাশংকরঃ নিরন্তর দেশ; দেবেশ রায়, দেজ, পৃষ্ঠা ১২

    ছবি: মেহিকোর জাতীয় আর্কাইভ থেকে নেওয়া। ঔপনিবেশিক যুগের পেইন্টিং, ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দ

    শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More