বকখালিতে চারজন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    দুপুরের নির্জনতা কেমন? যখন বাতাস ছিল পরিষ্কার, ছিল না ধোঁয়াধার দূষণ, চোত-বোশেখে বীরভূম-বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় খাঁ-খাঁ মাঠে দেখা যেত মরুভূমির ঝিলিমিলি। আর, মানুষের নির্জনতা? তার রূপ যেমনই হোক, মেসে এই দুই-ই দুর্লভ।

    হয়েছে কী, তিনতলায় থাকতে একবার জ্বর। রুমমেটরা যে-যার কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে। দুপুরে ফাঁকা ঘরে একা। বিছানায় পড়ে আছি। নাকি ঘোরে? হইহট্টগোলে চাপা পড়ে থাকা অনাত্মীয় ঘরটিই কখন যেন চারপাশ থেকে কাছে এসেছে। একলা পেয়ে ফিসফিসিয়ে বলতে চাইছে কিছু।

    দেওয়ালগুলো পেরেকের অগুন্তি গর্তে ফুটো-ফুটো। ওদিকে কোণের পেরেকে একটা ডানা আটকে থাকায় তপনের আধময়লা মশারি বিছানায় লুটিয়ে। রাস্তার দিকের দরজায় ওপারের চিলেকোঠার আভাস। তার উপরে একটুখানি… আকাশ? হ্যাঁ, আকাশই তো! তত নীল নয়। কেমন ঘোলাটে। হোক, তবু আকাশ তো। আহ! চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কপালের বাঁদিকে যে-ছোট্ট জড়ুল, মায়ের, চোখ সেখানেই ঘুরঘুর করে। খুঁটিয়ে দেখি। ওই জড়ুলটিই কি মা? না-হলে বাদামি দাগটাতেই তার না-বলা কথাগুলোর ছাপ লেগে থাকবে কেন? ভুরুর উপরে কেন ওইটুকুই তার নিজস্বতা?

    দরজায় কেউ যেন দাঁড়িয়ে। ভেতরে ঢুকছে কি? কানে এল– ঘুমোচ্ছিস ?

    অচেনা গলা। বহু দূর থেকে চোখদুটো খুলে গেল। হাওয়াই শার্ট, প্যান্ট, পায়ে চটি। চশমা। ঝাঁকড়া চুলের ছিপছিপে একটা ছেলে। ঘরের একেবারে মাঝখানে। উত্তরের অপেক্ষা না-করেই ফের প্রশ্ন— তুই একরাম তো?

    হ্যাঁ। বললাম বটে, মনে মনে বিরক্ত— অচেনা কেউ ঘরে ঢুকে হুট করে তুই-তোকারি? এ কে?

    যেন আমার শরীরের বিরক্তিটা বুঝতে পেরেছে— আমি ঘনশ্যাম। সোমক দাস। তোর শরীর খারাপ? জ্বর শুনে সঙ্গে সঙ্গে কপালে হাত— ধুর! ও কিছু না। টেবিলে জলের গ্লাস দেখেছিল হয়তো। কাছে এসে তার গলা নরম— জল খাবি একটু?

    অফিস ডুব মেরেছে। কফি হাউসে পায়নি তেমন কাউকে। কিন্তু, মেসের খবর পেল কোত্থেকে?

    তখনও সোমক, মানে ঘনশ্যাম, মানে ঘঞ্চুর (ডাকনামটা পার্থর, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের, দেওয়া।) বিপদজনক বাউন্ডারি লাইনের ওপারে কী, জানা নেই। একটু পরই টেবিলের বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি। দু-তিনটে বই আলাদা করে রাখল। কিন্তু, ওই যে শুরু করেছিল ‘তুই’ বলে, ওই সম্বোধনই তখন একমাত্র অস্ত্র। বইগুলো যে নিয়ে যাওয়া যাবে না, ওগুলো যে ক্লাসের পড়ায় লাগবে, বলাটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। শেষে নাছোড়-সে হাতে তুলে নেয় সঞ্চয়িতা। ওটা! কেউ পড়বার জন্যে নিতে পারে! বিস্ময় দেখে তার নিস্পাপ উত্তর— আরেকবার পড়ে দেখি না? ধ্যাত, লোকে হাসবে। শুনে ঘঞ্চুও হেসে ফেলে। বইটা রাখে। যেন ফিরিয়ে দিল। হাসির মাঝে ভেঙে-ভেঙে তিন দফায় তার ছোট্ট বাক্যটি শেষ হয়– তুই শালা সেয়ানা।

    এরপর তো হুগলির হায়েনার সঙ্গে বীরভূমের বিড়ালের বন্ধুত্ব হতে আটকানোর কথা নয়। আটকায়ওনি। ক্রমে সোমকের সঙ্গে– বলা উচিত, ঘঞ্চুর সঙ্গে— কলকাতার ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে ঘোরাঘুরি। কখনও হেঁটে, কখনও নৌকোয়।

    কথা বলে ফিসফিসিয়ে। যে-কোনও কথা। যে-কোনও পরিস্থিতিতে। এবং ভঙ্গিটি নির্লিপ্ত। ‘র’ হুইস্কি একঢোকে অনেকটা গলা বেয়ে নামতে নামতে মুখভঙ্গি যেমন পালটে যায়, তার চরমতম বিরক্তিপ্রকাশও ততটুকুই।

    ঘঞ্চুর সামনে কোনও উচ্চাবচ ক্ষেত্র ছিল না। তার পা তাই সিঁড়ির ধাপ পারতপক্ষে ছুঁতে চাইত না। বরং সে সমতলে স্বচ্ছন্দ। উঠতে তাকে দেখা না-গেলেও গড়িয়ে পড়ে যেতে অনেকেই দেখেছে।

    প্রথম আলাপের কিছুদিন পরই আমি তিনতলা থেকে দোতলায়। স্থায়ী বেডে। একদিন শেষ দুপুরে ক্লাস থেকে ফিরে দেখি, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। এসময় ঘরে কারো থাকার কথা নয়। তাহলে কে? কড়া নাড়তে দরজা খুলল আমারই একটা হাওয়াই শার্ট। শাড়ির উপরে অধিকন্তু হিসেবে। অচেনা এক মেয়ে। ছিটকে সরে গেল। পিছনে ঘঞ্চু— ঘাবড়াস না। চিত্রা। ভেতরে আয়।

    চিত্রা ততক্ষণে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করেছে। ঘঞ্চু বোঝায়— বেশ মানিয়েছে, না?

    এইভাবে একে-অন্যকে মানিয়ে নিতে-নিতে বেড়ে গেল বন্ধুর সংখ্যা। কলকাতা ছাড়িয়ে হাওড়া, হুগলি, নদীয়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া থেকে দূরের জলপাইগুড়ির সমর রায়চৌধুরী পর্যন্ত। কেননা, ততদিনে বাংলা কবিতা উঠে আসতে শুরু করেছে গাঁ-গঞ্জ থেকে। সবাই সবার বন্ধু। হয়তো প্রত্যেকেই নয়। তবু, ওই আর কী।

    একবার বকখালি যাওয়া হল। সেটা ছিয়াত্তরে। পার্থ (প্রতিম কাঞ্জিলাল), ঘঞ্চু, প্রসূন (বন্দ্যোপাধ্যায়), আমি। যাত্রা শুরু প্যারামাউন্ট মেস থেকে। সেটা দ্বিতীয় বার। তার আগের অভিযানের বৃত্তান্ত পরে।

    কী গরিব আর নির্জন ছিল বকখালি! সরকারের একটি মাত্র ছোট্ট ট্যুরিস্ট লজ। কাঠের। দু’টো মাত্র ঘর। পেতে গেলে বুক করতে হত কলকাতায়। এছাড়া থাকার নিরাপদ হোটেল বা অন্য ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। পাশের ফ্রেজারগঞ্জে জেটি। সমুদ্রে মাছ ধরতে যেত স্টিমারগুলো। দূরে জম্বুদ্বীপের আভাস। পিছনে বিস্তীর্ণ লঙ্কাখেত। সেবারই প্রথম গুরজালি মাছের মুখোমুখি হই। শুকনো লঙ্কার বিচ্ছিরি ঝোল। কিন্তু টাটকা গুরজালিকে কে নষ্ট করবে? অপূর্ব তার স্বাদ।

    আর, জনহীন বালিয়াড়ি। ভোরে লাল কাঁকড়ার রঙে বালি একেবারে লালে লাল। পা ফেললেই লালগুলো সুড়ুৎ করে ঢুকে যাচ্ছে অসংখ্য গর্তে। যেন-বা তরল।

    টানা তিন দিন পুরো সামুদ্রিক জীবন। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে বেপরোয়া ভেসে যাওয়া। একদিন ঘঞ্চুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোত্থাও না। শুধু জানা ছিল, গায়ে লাল শার্ট। অনেক ঘুরে পাওয়া গেল। ওই লাল শার্টটার জন্যেই। লতায়-পাতায় সবুজে-ঢাকা টানা বাঁধ। তাতে গিজগিজ করছে বুনো ফুল। লাল। সেই বাঁধের হুই মাথায় লাল একটু বেশি না? বালিয়াড়ি থেকে তড়িঘড়ি বাঁধে উঠে তিনজন হাঁপাচ্ছি। আর, লতাগুল্মের ভেতর ডুবে পরম নিশ্চিন্তে ঘঞ্চু ঘুমোচ্ছে। তরঙ্গায়িত সমুদ্রের দিকে মুখ। চোখে চশমা।

    সেবারই একদিন ঘুরতে বেরোনোর আগে পার্থর পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। উড়ে-উড়ে যাচ্ছে। সামলাতে বলায় মুচকি হেসে পার্থর উক্তি ছিল— আজ বুঝলাম, হৃদয়ে হাওয়া লাগে ধুতি পরে। হৃদয় শব্দটি অবশ্য কেউ-কেউ বাতিল করেছিল। পার্থরও তাতে অসম্মতি ছিল না।

    সেবারই তো? হ্যাঁ, সেবারই। এক রাতে, প্রায় দুটো-টুটো, মায়ের মতো পরম মমতায় ‘একরাম, এই একরাম’ ডেকে ঘুম নাকি অন্য কিছু থেকে তোলার চেষ্টা করছে ঘঞ্চু। এক হাতে কী-একটা ট্যাবলেট, অন্য হাতে জলের গ্লাস— সোনেরিল। খেয়ে নে। খা!

    তিরতিরে একটা হোটেল। সস্তার। পাশাপাশি দুটো সিঙ্গল বেড। একটাতে পার্থ-প্রসূন, অন্যটাতে বাকি দু-জন। মাঝে ছোট্ট টেবিলের মতো কিছু-একটা। ঘর প্রায়ান্ধকার। ওরা ঘুমোচ্ছে। বাধ্য ছেলের মতো ট্যাবলেট খেয়ে ফের ঘুমিয়ে পড়ি। ঘঞ্চু তারপরও কী-সব করছিল যেন।

    কলকাতা হোক বা বকখালি, বা শান্তিনিকেতন, কোথাও তাকে স্বচাল থেকে টলতে দেখিনি।

    অফিস এজি বেঙ্গল। কিন্তু ঘঞ্চুকে পাওয়া যেত টাউন হলের বটতলায়। খাটিয়ায়। মাসপয়লা মাইনের টাকা পকেটে ঠেসে অফিস থেকে সোজা চলে যেতে পারত বন্ধুর বাড়ি। তারপর সারা রাত কলকাতা ঘাঁটাঘাঁটি। ভোরবেলা ফেরার সময় হয়তো একটা মাত্র দোকান জুলজুল করছে। ঠিক দেখতে পেত। অলৌকিক সেই দোকানে শেষ পয়সাটুকু গচ্ছিত রেখে মুখে পুরে নিত মাজুম। টাল খেয়ে ফার্স্ট বাসে ওঠার সময় পকেট বিলকুল সাফ। তবু দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুর জন্যে চলন্ত বাসের দরজায় তাকে সাবলীল হাত নাড়তে দেখা গেছে।

    সোমক দাসের ওই হাত নাড়াটাই আসল। ফেরাটা নয়। কোথাও ফিরতে সে চায়নি। সমুদ্রে নয়, জঙ্গলে নয়, পাহাড়েও নয়; সে যেতে চেয়েছে ‘দরজা থেকে, জানলা থেকে, উনুন থেকে বাইরে’।

    পেরেছে কি না, সে-ই বলতে পারবে।

    সবার বন্ধুর সংখ্যা তত দিনে অনেক বেড়ে গেছে। বাঁক খেতে খেতে অন্যদিকে গেছে কেউ কেউ। আমিও কি যাইনি? ঘঞ্চু? গেলেও, জমি কিনে বাড়ি তোলার আগে মাটি ফেলে জায়গাটা ভরাট করতে হয়। তৈরি হয়ে গেলে বাড়িটা চোখে পড়ে। যেখান থেকে মাটি আসে, সেখানকার খাবলা-খাবলা গর্তগুলো? কেউ মনে রাখে কি?

    লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

    আরও পড়ুন:

    কমলবাবু

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More