বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১
TheWall
TheWall

কমলবাবু

একরাম আলি

হয় না, আনকোরা চোখে অচেনা কোনও তারা খুঁজতে গেলে আকাশের অনেকটা অন্ধকার ঘেঁটে তবে পাওয়া যায় রোহিণী বা পূষার টিমটিমে আলো? মেসে স্থায়ী একটা বেড পেতেও আমাকে খানিকটা ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছিল। দোতলা থেকে কয়েক মাসের জন্যে উঠতে হয়েছিল তিনতলার কোণের ঘরটায়। সেটাও ছিল যাকে বলে থ্রি-বেডেড।

ঘর থেকে বাথরুমে যাওয়ার পথে প্রথমে পড়ত প্রৌঢ় কমলবাবুর ঘর। তারপরেরটা ছিল বটকৃষ্ণ মণ্ডলের। আমাদের বটদার। হোমিওপ্যাথি পাশ করে ইন্টার্নশিপ করছে। বীরভূমের বললে অনেকটা চেপে যাওয়া হবে। বটদা ছিল আমাদের বাড়ির তিন কিমি দুরের। তাতেও কমতি থেকে যাচ্ছে বেশ খানিকটা। আসলে তাঁর ঠাকুর্দা ছিলেন আমার ঠাকুর্দার বন্ধু। বুক চিতিয়ে হাঁটতেন।  সমস্যা ছিল, বর্ধিষ্ণু চাষী-পরিবারের ছেলে বটদার একমাত্র স্যুটটি শীতের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে থাকত।

এক রবিবার বাথরুমে যাচ্ছি, ভরদুপুরে বটদার দরজা খোলা, কিন্তু খোলা নয়। আস্তে দরজা ঠেলে ছোট্ট উচ্চারণ— বটদা!

বটদার গলা– আরে, এসো।

বটদা শুয়ে। পায়ের দিকে এক মহিলা খাটের উপর গ্যাঁট হয়ে বসে আছেন। সুশ্রী। পানপাতা মুখের অনেকটা জুড়ে চোখ। থাকথাক চুলের ঢালে পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা নেই ঠিকই, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসিই তো? একমাত্র চেয়ারটা ইশারায় দেখিয়ে বসতে বললেন। সেই শুরু। ক্রমে জানলাম, দু’জনেরই আমাকে বেশ দরকার। ‘কৃষ্ণাদি’ বলায় একদিন আপত্তি উঠল। বটদার সরাসরি নির্দেশ— ওকে তুমি বৌদিই বলবে।

আগরতলার মেয়ে। লেডিস হস্টেলে থাকেন এবং বটদার ক্লাসমেট। মাঝেমধ্যেই প্যারামাউন্টে এসে আপাত অর্থহীন কথার কাটকুটে জড়িয়ে পড়তে পছন্দ করেন। আর সেইসব কাটকুটের মাঝে আমি যেন চতুরঙ্গ উপন্যাসের শ্রীবিলাস! বা, তার ডামি। যদিও শ্রীবিলাস জানত, জানতাম আমিও— অর্থহীন তো নয়ই, বরং এসব কথা একটা একটা করে বাদাম ভেঙে এগিয়ে যাওয়া।

আসলে সে-ঘরে কোনও দামিনী ছিল না। শচীশ তো নয়ই। তবু শ্রীবিলাসদের কেন যে দরকার হয়!

একদিন দুপুরে বটদা খাচ্ছেন। কৃষ্ণা বৌদি বসে। কথা হচ্ছেই। খাওয়া শেষে বটদা হাত ধুতে বারান্দায়, বৌদি জানতে চান— আচ্ছা একরাম, মানুষ মিথ্যে বলে কোন আনন্দ পায়?

হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বটদার গম্ভীর উত্তর— কেউ যদি আনন্দ পায়ই, কারও ক্ষতি তো নেই? আছে কি?

জোরালো নির্ভরতা-সহ শেষের প্রশ্নটি আমার দিকে তাক করে। এর উত্তর হয় না। তবে তাঁরা পারিবারিকভাবে পাশ করেছিলেন। সফল হয়েছিলেন কিনা জানি না।

এ-হেন বটদার পাশের ঘরে প্রৌঢ় কমলবাবু। কমল মজুমদার। ফ্যাকাসে ফর্সা। রোগা। ছোটোখাটো, প্রায়-বিচ্ছিন্ন, মানুষটির ঘর তুলনায় বড়। শুধু দরজা নয়, ফাউ একটা জানলাও ছিল পাশে। ঘরে যতক্ষণ থাকতেন, দুটোই থাকত পুরো খোলা। তাঁর সব কিছু ছিল সাদা। লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা, মায় প্যান্ট-শার্ট। একটা ছোট্ট ট্র্যানজিস্টার। সেটি মাঝেমাঝে খবর শুনিয়ে চুপ করে যেত। আর আসত স্টেটসম্যান। সারাদিন আর কোনও  শব্দ নেই। একজোড়া হাওয়াই চটির হালকা চলাফেরা, কখনও খুটখাট শব্দ, জানান দিত কোনও মানুষের অস্তিত্বের।

ওই ঘরে প্রতি সন্ধেয় নিয়ম করে আসতেন আরেক প্রৌঢ়। তিনি এলে ঘর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যেত। ঘরটার, মানে মানুষটার, প্রতি বেশ কৌতূহলই ছিল বলা যায়। সামনের বারান্দা দিয়ে যাই-আসি, তবু ঢুকে পড়াটা হয়ে ওঠেনি।

যেদিন জরুরি অবস্থা জারি হল, আবছা হলেও খানিকটা জানা গেল তাঁকে। ২৫ জুন, ১৯৭৫। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাচ্ছি, ম্যানেজারবাবুর ঊর্ধ্বমুখী গলা। নীচে, দোতলায়, বারান্দার রেলিঙের উপর টাটকা আনন্দবাজারের অর্ধেক ছড়িয়ে অর্ধেক দু-হাতে ধরে— যেন প্রিয়গোপাল বিষয়ীর বেনারসী– তিনতলার দিকে তাকিয়ে তিনি হাসি-হাসি মুখে বলছেন, ‘এই যে, কমলবাবু! দিল তো? এবার আপনার জ্যোতিবাবুকে বলুন, নিজের —-দুটো খুলে সুন্দর করে প্লেটে সাজিয়ে ইন্দিরাকে উপহার দিয়ে আসবে!’

কোনও কারণে বারান্দায় বেরিয়েছিলেন। ম্যানেজারবাবুর পরামর্শসূচক বাক্যটিকে হয়তো মনে মনে দেখতেও পেয়েছিলেন। নইলে বিড়বিড় করে কিছু বলতে চাইবেন কেন? যদিও শোনা যায়নি কিছু। ঘরে ফের ঢুকে যাওয়ার ভঙ্গিতে বোঝা গিয়েছিল, কমলবাবু বেশ বিরক্ত।

ম্যানেজারবাবু দেগে দেওয়ায় সেদিন জানলাম– ভদ্রলোক হয়তো সিপিএম-সমর্থক নন, কিন্তু বামপন্থী।

খোলস ছাড়তে লাগল আরও মাস দেড়েক। তবে পুরোটা নয়।

১৫ অগস্ট। তাঁর ছোট্ট ট্র্যানজিস্টারটি সেদিন সকালেই জানিয়ে দেয় বিরাট একটা খবর— শেখ মুজিব আর নেই! ট্র্যানজিস্টারের সাউন্ড বাড়িয়ে দেওয়ায় আমরাও শুনে ফেলি। তবে খবর ভাসা-ভাসা। বাংলাদেশি সেনাবাহিনীর একটা দল ধানমণ্ডির বাড়িতে ভোর-ভোর তাঁকে সপরিবার হত্যা করেছে। খবর শুনে কমলবাবু চঞ্চল। অস্থির। উত্তেজিত। সেদিন কোথাও বেরোলেন না। তবে মাঝেমাঝেই ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে এর-ওর সঙ্গে সেই গলায় কথা বললেন, যে-গলায় মানুষের রাগ-ক্ষোভ-হাহাকার দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসে।

কোনও  বাড়িতে কেউ মারা গেলে প্রতিবেশীরা যেমন জড়ো হয় খোঁজখবর নিতে বা সমবেদনা জানাতে, সেদিন তাঁর ঘরে আমার ঢুকে পড়াটা ছিল তেমনই। সাদা লুঙ্গি-গেঞ্জি। সাদা, পাতলা ব্যাকব্রাশ চুলে রাতের অযত্ন। তিনি জোরে জোরে কথা বলছিলেন। কখনও বসছিলেন। আচমকা উঠে টেবিলের কাছে গিয়ে দেখছিলেন ট্র্যানজিস্টারটাকে। যেন ধানমণ্ডির বাড়ি। নীচের তলায় শেখ মুজিবের রক্তাক্ত লাশ ট্র্যানজিস্টারের ভেতর থেকে হড়কে বেরিয়ে আসবে। গামছায় মুখ মুছছিলেন কখনও। আর আমি দেখছিলাম তাঁর ঘরটাকে। ছোট্ট একটা বুকশেলফ। কিছু বই। পাশে টেবিল। তাতে কিছু বই-খাতা। ফ্যানের হাওয়ায় একটা খাতার পাতা উড়ছে।

একপাশে ডেস্ক। তাতে ছোট্ট জনতা স্টোভ। সসপ্যান। কয়েকটা বয়ামে, কৌটোয় চা-পাতা, বিস্কুট, ডালমুট, মুড়ি। দেওয়ালে বাঁধানো একটাই ছবি। বড়ো মাপের শেখ মুজিব। যেমন স্কুলে-লাইব্রেরিতে থাকেন বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী বা নেতাজি।

বাইরে হইচই। নানা পরস্পর বিরোধী মন্তব্য। আলোচনা। কিন্তু আমি তো তাঁর ঘরে, মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি এসে পড়েছি! কিছু বলতেই হয়। কী বলব? মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল— আপনার ঘরে একটাই ছবি? শেখ মুজিবের?

ঘুরে তাকালেন। উত্তর দেওয়ার জন্যে নয়, প্রতিবাদ করবার জন্যে— আর কার? একটাই তো মানুষ। হাজার বছর পর বাঙালিকে তার রাষ্ট্র-পরিচয় ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন। আর কাউকে চেনেন আপনি? পেরেছেন কেউ? সময়টা মনে রাখবেন, হাজার বছর। সেই তাঁকেই আজ শেষ করে দিল।

ঠিক এই বাক্যগুলো নয়। তবে তাঁর বক্তব্য ছিল এমনই।

সেই তাঁর ঘরে যাওয়া-আসার শুরু। জানা গেল, ফরিদপুরের মানুষ। বিয়ে করার কথা কোনও দিন ভাবেননি। জানা যায়নি, কলকাতায় বা এ-দেশে তাঁর আত্মীয়স্বজন কেউ আছেন কিনা। ষাটোত্তীর্ণ কমলবাবুর কর্মক্ষেত্রটিও জানা হয়নি, যদিও উনি প্রতিদিন অফিসের সময় বেরোতেন। ফিরতে-ফিরতে সন্ধে।

বুকশেলফে একদিন চোখে পড়ল ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব)’। সে-কথা তুলতেই তাঁর বক্তব্য— এই বইটাই তো বাঙালির বেদ। পড়েছেন? ‘হ্যাঁ’ বলায় তিল-পরিমাণ বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছিল বলেই মনে হয়। ক্রমে জানতে পারি, তাঁদের একটা রাজনৈতিক দল আছে। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি। শুনিনি তো এমন কোনও  দলের নাম? শুনবেন কী করে, চারপাশে সব ঔপনিবেশিক ভাবধারার ছড়াছড়ি। কী দক্ষিণপন্থী, কী বামপন্থী। ভারত যে একটা যুক্তরাষ্ট্র, অনেক রাষ্ট্রের সমষ্টি, এই কথাটা এরা ভুলে গেছে। তাহলে সেই রাষ্ট্রগুলোর কী হবে? তারা কি নিজেদের জাতিসত্তা মুছে ফেলবে?

তাঁর চোখ আমার দিকে। ছোটো-ছোটো। পুরো খোলা। তীক্ষ্ণ। তারা দু’টো স্বচ্ছ বাদামি। সেখানে, চশমার তলায়, তাঁর স্বপ্ন বহু দূরের তারার মতো মিটিমিটি জ্বলছে।

‘ঠিক। কিন্তু…’ তিনি মৃদু রাগী গলায় ‘কিন্তু’ শব্দটাকে আক্রমণ করলেন– দেখুন, ওই শব্দটা জগতের বহু পরিকল্পনা আর বিপ্লবকে থামিয়ে দিয়েছে। ওটা আর উচ্চারণ করবেন না।

তাঁর আত্মবিশ্বাস প্রবল। যেদিন জানলাম, প্রতি সন্ধেয় তাঁর যে-বন্ধু আসেন, তিনি বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি আর কমলবাবু চেয়ারম্যান, তৃতীয় সদস্যের তাঁরা অপেক্ষায় আছেন, সেদিন সন্ধেয় কমলবাবুর তৈরি চা আর ডালমুট বিস্বাদ লেগেছিল। তৃতীয় সদস্য পেতে এত অপেক্ষা? শুনে ওঁরা তাকালেন। একটু নীরবতার পর কমলবাবুর উত্তর—  অপেক্ষা তো করতেই হবে!

সে-অপেক্ষা কি চা-ডালমুট চিরতরে নিঃশেষ হওয়া পর্যন্ত? বলতে পারিনি। দেখছিলাম দুই বৃদ্ধকে। দেশভাগের পর সর্বস্বান্ত হয়ে চলে আসা এই মানুষদু’টো সারাদিন পেট চালানোর জন্যে খাটাখাটনি করেন। তারপর জীর্ণ এক মেসবাড়িতে জড়ো হন তাঁদের চেয়ে অনেক বড়ো এক স্বপ্নকে ঘিরে। একদিন মৃত্যু আসবে। তার আগেই তাঁরা জেনে যাবেন– তাঁদেরই সামনে স্বপ্নটি শুকিয়ে এইটুকু হয়ে মরে গেছে। লোকে ভাববে, যে-লোকদুটো মরল, তারা সিপিএম। প্রতিবাদ করবে কেউ—না, না! ওঁরা ছিলেন বামপন্থী।

মানুষ কত কিছুই তো জানতে পারে না। কত কত কমিউনিস্ট দল আছে কত দেশে। বামপন্থী, সমাজবাদী, সমাজবাদী বিপ্লবী, সমাজবাদী গণতন্ত্রী—শত শত নাম। একই দেশে, বহু রূপে। সবাই শোষিত মানুষের জন্যে লড়তে চাইছে। কত দল স্ফীত হচ্ছে, শুকিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে কত স্বপ্ন। যেমন কেউ জানবেই না, ওঁরা—কমলবাবুরা– ছিলেন মাত্র দুই সদস্যের এক রাজনৈতিক দলের দুই প্রধান। কেউ জানবে না দলটার নাম— বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি!

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

দ্য আউটসাইডার

Comments are closed.