বুধবার, অক্টোবর ১৬

দ্য আউটসাইডার

একরাম আলি

মানুষ যে-মাটিতে জন্মায়, বেড়ে ওঠে, আছাড় খেয়ে-খেয়ে তার স্মৃতির সুতোগুলো ঝড়ঝাপটায় উড়তে উড়তে ক্রমশ দূরে সরে যায়, ফিরেও আসে কোনও-কোনও নাছোড়বান্দা সুতো; সেই সব স্মৃতি জীবনে আর সঞ্চিত হয় না। কারণ সেই সব ক্ষণস্মৃতিকে পূর্ণতা দিতে সঙ্গে থাকে পৃথিবীর প্রথম বিস্মৃতিগুলো। এই সব বিস্মৃতির পরপারে কী থাকে? মায়া?

কলকাতায় এসে তবু সেই অসম্ভব চেষ্টা আমার ছিল। বোকার মতো।

অচেনা একটা শহরকে কোন উপায়ে আবিষ্কার করতে হয়, যাতে শহরটা হয়ে যাবে নিজের, তা জানব কী করে! অথচ, আড্ডার দুনিয়াজোড়া ডায়াগ্রাম ফেলা থাকত সদ্য-বন্ধুদের টেবিলে। ফিল্ম, ভারতীয় এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীত, বিদেশি সাহিত্য, দেশি-বিদেশি রাজনীতি, এমনকী পাতি হিন্দি সিনেমা পর্যন্ত।

মনে আছে, মেসের প্রথম মাসেই বন্ধুহীন-আমি দেখেছিলাম চোদ্দোটি হলিউডি ফিল্ম। বোকার মতোই। গ্লোবের শীতল আহ্বান, লাইট হাউস আর নিউ এম্পায়ারের মুখর উপস্থিতি, মিনার্ভার ছোট্ট আর ঘরোয়া আমন্ত্রণ, মেট্রোর চিরহরিৎ উপস্থিতি অসম্ভব ছিল উপেক্ষা করা। ফ্রাঙ্কো নিরো, সোফিয়া লোরেন, লিজ টেলর, মার্লন ব্র্যান্ডো, পল নিউম্যান, ধর্মেন্দ্র-টাইপ রবার্ট রেডফোর্ড, চার্লস ব্রনসন, জুলিয়া রবার্ট, বারবারা স্ট্রেস্যান্ড, ওমর শেরিফ— কে নয়! জ্যাক নিকলসন একটু পরে, যখন কলকাতায় এল ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কুক্কুস নেস্ট।

এলিটে রোমান হলিডে। হইহই করে ঢুকে পড়লাম। অড্রে হেপবার্ন আর গ্রেগরি পেকের অবিশ্বাস্য খুনসুটির মাঝে জোর খবর— ড্রেস সার্কেলে সস্ত্রীক স্বয়ং জ্যোতি বসু!

টাইগার হলটার কালচে মালিন্যে কোথাও খুঁজতে চাইতাম কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে। ঘুরতাম আশপাশের চৌরঙ্গি লেন, সদর স্ট্রিট, কলিন লেন। আজ আর কল্পনা করা যায় না সে-সব সন্ধ্যা– নির্জন আধো-অন্ধকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে হাঁটলে শ্যেন-দৃষ্টি রিকশার টুং ডাক শুনতেই হত– বিলকুল ফ্রেশ স্যর, মিদনাপুর, ওনলি নাইন্টিন ইয়ারস ওল্ড।

ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাড়িগুলোতে তত দিনে ময়লা জমেছে। তবু চোখ টানত তার গরাদহীন জানলাগুলো। সাদা বাংলায় যাকে বলে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। ভেতরে ছায়া-ছায়া অন্ধকার। হয়তো মলিন ফ্রকের কোনও  বৃদ্ধা ফ্যাকাসে হাতে তার রাতের রান্নাটুকু গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। নীচে বিমর্ষ আলোয় পুরনো বইয়ের আর গ্রামোফোন রেকর্ডের দোকান।

অস্ট্রেলিয়া না কোথায় তারা চলে যাচ্ছে দলে দলে, তবু তখনও কলকাতায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বিস্তর। আর কলকলে চিনা তরুণ-তরুণীর দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো। শীতে বিদেশির দল। বেশ-একটা কসমোপলিটন মেজাজ। শুধুই গুটকা-পানের থুথু তখনও কদাকার করেনি শহরটাকে।

ও দিকে প্রেসিডেন্সির টানা ফুটে উনিশ শতকী পুরনো বই। ঝলমলে গ্র্যান্ডের নীচে তপনের দোকান। এসবই একা-একা। বড়ো বা মেজো রাস্তা, আঁকাবাঁকা গলির পর গলির সুড়ঙ্গ ধরে আচমকা কোনও  আশ্চর্য জগতে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাঁটা।

কখনও-বা সঙ্গী বলতে বর্ধমানের স্বপন দে। ন্যাশনাল মেডিক্যালে ফার্স্ট কি সেকেন্ড ইয়ার। মেসে হবু ডাক্তার আর এক জন ছিল। কলকাতা মেডিক্যালের রবীন্দ্রনাথ দাশ। কাটোয়ার ছেলে। বিকেলে হইহই করে বণিক বা কালিকা থেকে তেলেভাজা এনে খেলে শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো একান্তে বলত— ও সব খাবেন না, দাদা!

তার হাতে গ্লাসভর্তি ভিভা। আত্মবিশ্বাসী চামচ দিয়ে ঘটঘটিয়ে যত গুলছে, গ্লাসের কানায় ফেনা উথলে উঠছে তাগড়াই বডি বিল্ডারের মতো।

তখনও বন্ধুর দল বড় হয়নি। কফি হাউসে নির্দিষ্ট টেবিলের দখলদারি জোটেনি।

সুড়ঙ্গ ধরে ঘুরতে ঘুরতে আচমকা চোখে পড়ল মতিলাল শীলের বাড়ি। বাদুড়বাগানের ঠিক কোন জায়গাটায় গোলপাতার ছাউনির ঘরে থাকতেন শিবনাথ শাস্ত্রী, খোঁজার চেষ্টাও হল। হাঁ করে তাকিয়ে দেখেছিলাম কেশব সেনের বাসভবন। ইডেন হসপিটাল রোডে দাঁড়িয়ে কল্পনা করবার ইচ্ছে হয়েছিল— রাস্তাটা এক দিন ছিল কাঁচা। এখানেই এক টালির ঘরের খুপরি মেসে থাকতেন ছাত্র বিপিনচন্দ্র পাল। অদূরে ছেচল্লিশের দাঙ্গার কুখ্যাত গোপাল পাঁঠার মাংসের দোকান। মেডিক্যাল কলেজের মেন হস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, মনে পড়েছিল মাত্র কয়েক বছর আগের কথা। এক দাদা থাকতেন এই হস্টেলে। চৌষট্টির দাঙ্গায় ছাদের জলট্যাংকে বন্ধুরা তাকে চার দিন লুকিয়ে রেখেছিল। তারাই মাঝরাতে হাওড়া স্টেশনে নিয়ে গিয়ে বাড়ির ট্রেন ধরিয়ে দেয়।

এই ভাবে ঘুরতে ঘুরতে ঠনঠনের এক গলির মুখে এক দিন দাঁড়িয়ে। আরে, মুক্তারামবাবু স্ট্রিট! এখানেই শিবরাম চক্রবর্তীর মেস না? সঙ্গে এক সদ্য-বন্ধু। চলো, ঢুকে পড়ি। ঘর হাট-খোলা। কেউ নেই যে! কী করি? দেওয়াল জোড়া রাজ্যের ঠিকানা। দেখতে দেখতে এক মহিলা। হাতে চাবির গোছা— মামা কোথায়? বেরিয়ে গেছে? উঃ, এত করে বললাম, যেও না। সেই গেল সভায়? জামাকাপড় না-পরেই?

বুঝলাম, মামার আলমারির চাবি ভাগ্নীর কাছেই, যাতে উনি বেরোতে না-পারেন। শরীরটা ভালো নেই তো। তত ক্ষণে তিনি হাজির। আটপৌরে ধুতি। গায়ে ফুলহাতা সোয়েটার। হলুদ। সঙ্গে সঙ্গে ভাগ্নীর, মানে বিখ্যাত ইতি বা বিনির মেয়ের, বকুনি।

তাঁর কৈফিয়ত— কী করব, ওরা ছাড়ল না যে!
–তাই বলে এই পোশাকে?
তাঁর উত্তর— আলমারির চাবি খুঁজে পেলাম না যে। অগত্যা।

এরই ফাঁকে প্রণাম। মাথায় হাত রেখে বললেন— প্রথম এলে। কী খেতে দিই বলো তো? দাঁড়াও, দেখি।

বালিশটা সরালেন। কাগজের ঠোঙা। চাপে চিপসে গেছে। খুললেন—হ্যাঁ। আছে। এটা খাও।

ভেজিটেবল চপ। চেপটে ফিস ফ্রাইয়ের চেহারা নিয়েছে। ঠান্ডা। কবেকার, জানা নেই। সক্রেটিস যে দিন বিষ খেয়েছিলেন, মৃত্যুর জন্যে তিনি প্রস্তুত হয়েই খেয়েছিলেন। আমিও অম্লানবদনে খেয়ে নিলাম। এই ভাবে কলকাতাও আমাকে একটু একটু করে গিলে ফেলল।

এক দিন কফি হাউসে বসে আছি। একা। দুলকি চালে তুষার রায়। এবং ব্যারিটোন কণ্ঠ– আররে, একরাম! অর্ডারমতো এল হাফ বয়েলড এগ আর টোস্ট। পটে দুধ। ফাটিয়ে ডিমের তরলটি খুব তরিবত করে দুধে মেশালেন। নুন-গোলমরিচ। ঝুঁকে চামচে করে মুখে তুলতে গিয়ে তাকালেন একবার। বড়ো বড়ো চোখ— খাবেন একটু?

হাতে ইনফিউশন। শুনে হাসলেন। খেতে খেতে তাঁর বক্তব্য— বুঝলেন, মহিলা-ফহিলা কিছু নয়। পৃথিবী। ধরিত্রী। রমণের জন্যে পুরুষের সামনে যদি কেউ থাকে… থামলেন। দুধ-গোলা ডিমে ডুবে গেল টোস্টের কোণা। ছোট্ট কামড় দিয়ে মুখের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে এল তাঁর উপলব্ধি— সে এই ধরিত্রী। আহ! চলে যান পুরুলিয়া। দেখে আসুন মাটির ফাটল।

এতটাই ঝুঁকে খাচ্ছিলেন, লম্বা চুল কপাল ছাড়িয়ে তরল খাবারকে ছুঁয়ে ফেলছিল।

তার আগেই, সিউড়িতে, সেই ফরাসি চিত্রীর জীবন-উপাখ্যান আমার পড়া। কলকাতায় এসে লোত্রেকের প্রত্নমূর্তিকে দেখি তুষার রায়ে। ছোটোখাটো। লম্বাটে মুখ। খাড়া নাক। ওইটুকু শরীরের সর্বত্র দারিদ্র্যে-ভরা আভিজাত্য। এমনই আভিজাত্য ছিল এই স্বশিক্ষিত মানুষটির যে, পৃথিবীর কাছে কিছুই চাওয়ার ছিল না তাঁর। এমনকী ভাষা। এমনকী ছন্দও। এক পরমনির্ভর ঘোর ঘিরে থাকত তাঁর চার পাশকে। আসলে তুষার তো হাঁটতে শেখেননি! শুধু ভেসে যেতে জানতেন।

এক সন্ধ্যেয় পাতিরামে দাঁড়িয়ে। দেখি, ভাসতে ভাসতে তুষারদা। জিনস। খাদির পাঞ্জাবি গুঁজে। পায়ে কোলাপুরি। সবই ধাক্কা খাওয়া। তবু সেই পঁচাত্তরে এই জামা-জুতো বাছাই একান্তই তাঁর স্বনির্বাচিত।

কোথায়? কাছে টেনে, যেন গোপন খবর— আররে, আমার বন্ধুর একটা ছবি এসেছে। অপেরায়। যাবেন নাকি? বন্ধু? কে? ওহ, রিয়াল মর্দ মশায়। দেখেননি? কবির বেদি।

তার পর আর কী, একটা ট্রামের ওয়াস্তা। টুক করে অপেরা। উল্টো দিকে সাকি বারে টুনি বাল্ব। অপেরার গলিতে ঢোকার মুখে বিশাল আর কদাকার এক পোস্টারে লেখা— ডাকু! একটু ইতস্তত ভাব, যেন ভুল তথ্য পেয়েছেন। তবু কি তুষারদা ভড়কে যাবার বান্দা? টিকিট কাটা হল। দেখাও হল পুরোটা। রাতে লাহোরে জম্পেশ খেয়ে ফের ট্রাম। কিন্তু বরানগর ফিরবেন কী করে? দরকার কি ফেরার! মেস তো আছেই। তাই, না? চলুন তা হলে।

জেলে-নরকে-হাসপাতালের কোণকানাচে যেমন থাকে, তেমনই একটা বেড ফাঁকা ছিল। শোয়ার আগের অবশ্য-কর্তব্যগুলো করতেই হয়– জল খাওয়া, মশারি টাঙানো ইত্যাদি। তুষারদার আলো নেভানোর মুহূর্মুহূ তাগাদা। অবশেষে আলো নিভল। খোলা জানলা দিয়ে রাস্তার আলো আসছে। শুয়ে শুয়েই হিপ পকেট থেকে কী-একটা পুরিয়া বার করলেন বেশ কসরত করে। মাথা তুলে মুখে ফেলে দিলেন পুরিয়ার গুঁড়ো।

–তুষারদা, একটা কবিতা? শোনাবেন?
–আররে, কবিতা? সে তো রং তুলি শব্দ আর হাতুড়ির মারকাটারি আঘাত। আচমকা ভরাট গলায় শুরু হল সেই মাতাল উল্লাস–

‘আমি অঙ্ক কষতে পারি ম্যাজিক
লুকিয়ে চক ও ডাস্টার
কেননা ভারী ধুন্ধুমার ট্র্যাম্পেটবাদক ব্যান্ডমাস্টার…’

একটা নয়। পরপর কয়েকটা। পরের দিন শুনি, দরজার বাইরে কৌতূহলী ছেলেরা কেউ কেউ কান পেতে দাঁড়িয়েছিল। হয়তো তারা শুনছিল অচেনা নরকের গান।

কিন্তু রাত বাড়ছে। জটিল সব নেশা আর দিনের পর দিন ‘বাতাস পিয়ে’ কাটানো জীবনে অন্ধকারও সে দিন বেশি ক্ষণ স্থায়িত্ব পায়নি। রাস্তার চোরা আলোয় ভরাট গলাও নিভে এল এক সময়। এবং তার মাত্র দু’বছর পরে চিরদিনের জন্যে। নড়াইলের রাজপুত্রটির অপেক্ষায় পঙ্খীরাজের ঘনঘন হ্রেষাধ্বনি আমরা অনেকেই শুনতে পেয়েছিলাম।

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

আরও পড়ুন:

একতলা, দোতলা, তিনতলা

Comments are closed.