একতলা, দোতলা, তিনতলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    ট্রামরাস্তার উপর দু’দিকে সারিসারি দোকান। মাঝে সরু গলির মতো ঢোকার রাস্তা, যেটাকে বাংলা লব্জে দেউড়ি বলাই উচিত। ঢুকে ডাইনে সিঁড়ি, বাঁহাতে চাতাল। চাতালে বড়োসড়ো চৌবাচ্চা, যাতে বাচ্চারা দিব্যি হাত-পা ছুড়ে সাঁতার কাটতে পারে। কিন্তু মেস তো আর বাচ্চাদের জন্যে নয়, ইউনিভার্সালও নয়। কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। হয় পুরুষ, না-হয় মহিলাদের। মহিলাদের মেসগুলোকে বলা হত— লেডিস হস্টেল। ট্রামরাস্তার ওপরেই ছিল দু’-একটা। সে সব সাইনবোর্ডের আর দরজার পর্দার চৌম্বকশক্তি টের পেত পথচলতি কেউ-কেউ।

    চাতালের পশ্চিমে, সামনেই খাওয়ার ঘর। সেখানে খেতে চাইলে আসনপিঁড়ি হয়ে বসতে হতো। কয়লার ধোঁয়া-ভর্তি রান্নাঘরটি তার পাশে, কোণে। আর ছিল ভাঁড়ার ঘর, এখনকার ভাষায় স্টোর রুম। উনুনের গলগলে ধোঁয়া, ঠাকুর-চাকরদের ওড়িয়া চিৎকার আর থালায়-থালায় খাবার ছাড়া নীচের কিছুই ওপরে উঠত না।

    ওপরে, অর্থাৎ দোতলা-তিনতলায় ওঠার সিঁড়িতে লোহার রেলিং। উঠে ডান হাতে ম্যানেজারবাবুর ঘর। নীচের চাতালকে সামনে রেখে ঘর চার দিকেই। সঙ্গে সরু বারান্দা। একই বারান্দা বাইরে ট্রামরাস্তার দিকেও। অগ্নিকোণে বারোয়ারি বাথরুম–- বিবিধ কলঙ্কে মলিন।

    তিনতলায় তিন দিকে ঘর, দক্ষিণ দিকটায় খোলা ছাদ। কোনও এক কালে শ্রদ্ধানন্দ পার্ক থেকে হয়তো বা হাওয়া আসত। সে দিকটা আড়াল করে মির্জাপুর স্ট্রিটের উপর কবে যেন উঠে গেছে দশাসই চেহারার ইন্ডিয়া হোটেল। শ্রদ্ধানন্দ পার্ক এখন তাদের। অবশ্য সেই পার্কও ইট-সিমেন্টে চাপা পড়তে বেশি দিন লাগেনি। ছোট হতে-হতে এইটুকু হয়ে গেছে। এতই ছোট, বিশ্বাস করতে অসুবিধে হত সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই কবিতা– ‘শ্রদ্ধানন্দ পার্কে সভা; লেনিন দিবস; লাল-পাগড়ি মোতায়েন…’। অবিশ্বাসীর চোখে দেখতাম পার্কটাকে, এখানে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও সভা করে গেছেন!

    কিন্তু, দোতলায় কোণের ওই যে ঘরটা, বাঁ-হাতি, অনেক ক্ষণ ধরে ওখানে কী একটা শোরগোল হচ্ছে না?

    –ভেবেছো কী? মাস গেলে টাকা তো থুতু দিয়ে গুনে নিচ্ছো। ভাত চাইলে বলছো, নেই?

    চণ্ডীর খিঁচিয়ে ওঠা গলা। জর্জ টেলিগ্রাফে টরে-টক্কা শেখে। ফিরতে তিনটে বেজে গেছে। স্নান করে টেবিলে ঢাকা খাবারের সামনে বসতে-বসতে সাড়ে তিনটের ধাক্কা।

    যাকে বলা হচ্ছে, সেই হরির উত্তর বাইরে থেকে শোনার উপায় নেই। তার সব কথাই ফিসফিসিয়ে, নয়তো কিড়মিড়িয়ে। অগত্যা ঢুকতেই হচ্ছে ভেতরে।

    লম্বাটে ঘর। ছাদের কড়ি থেকে প্রকাণ্ড যে পাখা, তার ব্লেড তিনটে কাঠের। সন্দেহ হয়, মহেঞ্জোদারোর খুঁড়ে পাওয়া কোনও অতিথিশালা থেকে তুলে আনা। বাইরের বারান্দার দিকে দরজা হা-হা করছে। ট্রামের ঘড়ঘড়-ঘটাংঘট ছাপিয়ে চণ্ডীর গলা—শুনতে পাচ্ছো না? নেই তো ম্যানেজারবাবুকে বলো, অন্য হোটেল থেকে কিনে আনতে। জলদি। দেখছ তো, বসে আছি।

    ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে চারটে বেড। লাগোয়া একটা করে টেবিল। বইপত্র। দেওয়ালে নিজের নিজের ব্র্যাকেট। তাতে জামাকাপড়। পূর্ণ নিজের বেডে কাত হয়ে শুয়ে। হাতে সিগারেট। চণ্ডী বিছানায় খাড়া বসে, সামনে ছোট্ট খাবার টেবিলে থালা-বাটি। ভাত-তরকারি শেষ হলেও লালচে ঝোলের তলায় মাছটিকে সে পরম যত্নে ডুবিয়ে রেখেছে। হোক-না রেশনের চাল, ভাত এলে মাছ দিয়ে খাওয়ার ইচ্ছেয়।

    দেখছো কী? নিয়ে এসো ভাত-– পূর্ণ খেঁকিয়ে ওঠে।

    হরি দাঁত চেপে বিড়বিড় করে কী যে বলে, বোঝা যায় না। শেষে বালেশ্বর-দাঁতন-কন্টাই পেরিয়ে খড়্গপুরে এসে তার নিদান— শালার ম্যানেজারবাবুকে বলুন না। আমায় বলে কী লাভ?

    এ বার চণ্ডী টেবিল সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। গলা চড়িয়ে বলে— তা হলে আজ রাত থেকে শালার ম্যানেজারবাবুকেই খাবারটা দিতে বোলো।

    হরি চলে গেলে চণ্ডী যখন হাসি-হাসি মুখে মাছটা খেতে শুরু করেছে, পূর্ণ তড়াক মেরে ওঠে। ডান হাতে সিগারেট, বাঁ হাতের মুঠো বিশেষ ভঙ্গিতে এগিয়ে-পিছিয়ে বলে— ওহ্, চণ্ডী! যা দিলি না!

    রাতে ফেরার পরে আসল ঘটনাটা আরও বড় ঘটনার চক্রে পড়ে শোনা। কারণ, ফিরলে ওই ঘরটাতেই ফিরতে হতো। দরজার মুখোমুখি নড়বড়ে যে তক্তাপোষটি তোষক-চাদরে বেডের রূপ পেয়েছে, সেটিরই নয়া অধিকার তখন আমার। আর আমি সে সময়ে আশুতোষ বিল্ডিং-এ, যার গেটের দিকের দেওয়ালে, বেশ উঁচুতে, সেই চুয়াত্তর সালেও কালো ধ্যাবড়া অক্ষরে কী করে যেন থেকে গেছে লেখাটা— কাকা, লাল সেলাম!

    কাকা অর্থে অসীম চট্টোপাধ্যায়। সিউড়ির মানুষ। কাকা অর্থে নকশাল নেতা।

    কিন্তু ভেতরে, মানে আমাদের ফিফথ্ ইয়ারে, পৌনে দু’শো পড়ুয়ার মধ্যে ছেলে মাত্র জনা-চল্লিশ। কী যে সংখ্যালঘু ছিলাম! তার ওপর নামজাদা সব শিক্ষক-শিক্ষিকা। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ মিত্র, শংকরীপ্রসাদ বসু, দীপ্তি ত্রিপাঠী, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার। বয়স তুলনায় কম বলে কি না জানি না, বরং মানস মজুমদারকে মনে হয়েছে কাছের মানুষ। বেশ চাপের মধ্যে যে ঢুকে পড়েছি, শুরুতেই টের পাই। আর তাই শুরু থেকেই টান বাড়তে থাকে কফি হাউসের।

    তখনও সিঁড়ির নীচে প্রস্তরীভূত ইসমাইল, মুখে গভীর বসন্তক্ষত, সিগারেট বেচে যাচ্ছে; যে নাকি তুষার রায়ের গল্পে মটরু মিয়া। সিঁড়ি দিয়ে উঠলে জানলার ধারের টেবিলে দেখা যেত অতীন, সিরাজ, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়কে। ওই টেবিলে কি শীর্ষেন্দুকেও নিয়মিত বসতে দেখেছি? সম্ভবত। তবে আমার শুরুর সেই দিনগুলোয় কফি হাউসটি রতনপুর হয়ে উঠত তুষার রায় বা সে রকম কেউ এলে। সন্দীপন? চট্টোপাধ্যায়? হ্যাঁ। যেন কলরব, সিগারেটের অনর্গল ধোঁয়া, হাসি, তর্কের দৈনন্দিনতাকে হটিয়ে একটা কিছু ঘটবে এ বার। কিছু একটা ঘটবে না?

    এখন মনে হয়, এই শহরে আমি শুধু ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসিনি, আসিনি কফি হাউসের টানে। এমনকী কলকাতা-নামের কোনও আজব শহরেও আসতে চাইনি। এসেছিলাম এক বিরাট নগরীর বিলুপ্ত, বহমান আর ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো পড়তে, যে নগরীর রাস্তায় পৃথিবীর অতীত আর বর্তমান নগরসমষ্টির ধুলো মিলেমিশে আছে। অন্তত থাকার কথা। তাই হয়তো-বা সেই সুদীর্ঘ পথে হাঁটার জন্যে চাইছিলাম সঙ্গী।

    বিশেষ জানতাম না কিছু। ফলে, আশপাশেই খুঁজতাম তাদের। সেই আশপাশ অর্থে কফি হাউসও। কত সঙ্গী জুটেছে, হারিয়েছে কত! সরতে সরতে অনেকের বা আমার টেবিল দূরের বাঁশবনের অন্ধকারে জায়গা পেয়েছে। তবু খোঁজার কাজটা তো বর্ষার বিড়ির মতো, যা বারবার নিভে যায়। বারবার জ্বালিয়ে নিতে হয়।

    রাত ন’টায় কফি হাউস বন্ধ। তার পরেও দু’-পাঁচ মিনিট কেটে যেত কেষ্ট, সেলিম বা রামুদার মতো বেয়ারার তাড়া খেতে-খেতে। এরাই ছিল কফি হাউসের সে-সময়কার যদুকুলপতি বা যুবরাজ বা ভগবান।

    হাঁটতে হাটতে মেস। সব গলিঘুঁজি চিনতে হবে। তাই এক-এক দিন এক-এক পথে। তত ক্ষণে ফুটপাথবাসীরা কেউ-কেউ গুছিয়ে শুয়ে পড়েছে। কেউ নেভা উনুনের পাশে রাতের খাবার নিয়ে সদ্য বসেছে। পরে এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, গভীর রাতে ফুটপাথবাসী দম্পতির ঝগড়ার কথা। স্টেটসম্যান থেকে নাইট ডিউটি সেরে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময়ে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের খোলা ফুটে তিনি দেখেছিলেন বেশ কয়েকটি ঘুমন্ত বাচ্চা-সহ এক পরিবারকে। দলের পুরুষটি বসে। পাশে মহিলাটিও। প্রায় জনমানবহীন রাস্তার দিকে– যেন পৃথিবীর উপর বসে, সসাগরা ধরিত্রীর দিকে– ক্ষয়াটে হাত প্রসারিত করে পুরুষটি সদর্পে তার সঙ্গিনীকে বলছে, বেরিয়ে যা!

    সে দিন মেসে ঢুকেই দেখি, মহা হইচই। দোতলার বারান্দায় ভিড়। নিজেদের দরজার মুখে এসে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। তিনতলায় বটকৃষ্ণদা, কমলবাবুরা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে। সবাই যেন কাউকে শান্ত হতে বলছে। কাউকে বলছে চুপ করতে। নীচে ঠাকুর-চাকররা ওপরের দিকে তাকিয়ে। বেড়ালগুলোর একটাকেও দেখা যাচ্ছে না।

    কী এমন হল!

    দোতলায় উঠে দেখি, উৎসমুখ আমাদেরই ঘরটি। সবার আগে চণ্ডী রয়েছে মুখিয়ে। তাকে টেনে ঘরে ঢোকাতে চাইছে পূর্ণ, প্রসেনজিৎ, তপনরা। পাশে স্বপন দাঁড়িয়ে। এ দিকে ম্যানেজারবাবুকে টানছেন তিনতলা থেকে নেমে আসা সুধীরবাবু এবং আরও কেউ কেউ। চণ্ডী তখন চেঁচাচ্ছে— কী করবেন কী আমার, অ্যাঁ? কী করবেন? মেস থেকে তাড়িয়ে দেবেন? দিন তো দেখি। এক বার বলে দেখুন।

    তাকে কিছুতেই চুপ করানো যাচ্ছে না। এই চিৎকার-চেঁচামেচির ফাঁকে তিনতলা থেকে বটকৃষ্ণদার ঝুঁকে পড়া গলা— না, না, চণ্ডী। ম্যানেজারবাবুকে ওটা তোমার বলা উচিত হয়নি। খাবার দিতে বলাটা অন্যায় হয়েছে। হাজার হোক, বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ।

    চণ্ডীর চোখ সঙ্গে সঙ্গে ওপরের দিকে— বয়োজ্যেষ্ঠ বলেই সম্মান দিতে হবে? ম্যানেজারবাবুকে? বটদা, আপনি এটা বলতে পারলেন?

    ম্যানেজারবাবুর বাঁ-হাতে কোঁচা। ডান-হাত চণ্ডীর দিকে সোজা তুলে ফেলেছেন। গলায় যেন খাপ থেকে নাইন এমএম রিভলভার নাঙ্গা করার দৃঢ়তা— শোনো, চণ্ডী। অনেক ক্ষণ ধরে অনেক কথা বললে। শেষ কথাটা তোমায় বলি। তুমি বাচ্চা ছেলে। আমায় চিনবে কী? তোমার বয়সি আমার ক’টা ছেলে কলকাতায় বেনামে ঘুরছে, তুমি কি জানো?

    বলেই তিনি এক ভিড় স্তব্ধতা পিছনে ফেলে নিজের ঘরের দিকে ঘুরলেন। যে-যার মতো সরে গিয়ে রাস্তা ছেড়ে দিল। পথে আমি মুখোমুখি। গায়ে গা লাগলেও, দেখতে পেলেন না। ভেতর থেকে শুধু তাঁর বেড়ালদের ‘মিয়াও’ শোনা গেল। আর শোনা গেল— আহ্, বিরক্ত করিস না। ছাড়!

    লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

    আরও পড়ুন:

    https://www.thewall.in/2019/01/blog-harrisson-road-the-japanese-student-who-came-to-stay-in-kolkata-mess/

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More