মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

রবিবার

একরাম আলি

পাশেই পূরবী। উনিশশো একষট্টির জানুয়ারিতে কলকাতা বেড়াতে যখন নিয়ে আসা হয়, ওই হলেই দেখানো হয়েছিল ‘মানিক’। শম্ভু মিত্রকে সেই প্রথম দেখি। ফিল্মে। তখন কি জানতাম, যুগান্তর পেরিয়ে ওই সিনেমাহলের পাশে এক মেসজীবী হয়ে আমি আশ্রয় পাব কলকাতার? আর দেখানো হয়েছিল ‘অঙ্গার’। মিনার্ভা থিয়েটারে। চুয়াত্তর সালে দুটো প্রেক্ষাগৃহেই বিস্তর ময়লা জমে গেছে। তবু সামনের অর্ধগোলাকৃতি স্থাপত্যে তখনও বেশ অন্যরকম লাগত পূরবীকে। পিছনে অরুণা, শ্রদ্ধানন্দ পার্কের গায়ে। যেন পূরবী নামের অগ্রজাকে বরপক্ষের সামনে স্বেচ্ছায় অরুণা এগিয়ে দিলেও মনে খিচখিচ— আমারটা? শিয়ালদার দিকে একটু হাঁটলে ছবিঘর। ফ্লাইওভারের নামগন্ধ ছিল না তখন। বেশি রাতে শিয়ালদা স্টেশনের সামনে এক খোলা মাঠের মতো সার্কুলার রোড। ডাইনে ট্রামলাইন ধরে দু-পা হাঁটলে আপাদমস্তক বঙ্গীয় প্রাচী। তবু টানটা ছিল যাকে বলে সাহেবপাড়ার হলগুলোর দিকেই। যেমন ইউনিভার্সিটিতে কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব তেমন পেকে ওঠেনি। যত বন্ধু, সবাইকে কফি হাউসের তর্কোজ্জ্বল ভিড় আর বিবিধ ধোঁয়ার ভেতর থেকে খুঁজে নিতে হয়েছিল।

তেমনই একজন পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। রণজিৎ দাশ। নিশীথ ভড়। সোমক দাস, অর্থাৎ ঘঞ্চু। দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। শ্রীরামপুর থেকে কালেভদ্রে মৃদুল দাশগুপ্ত। ভাস্কর চক্রবর্তী এলে ওই টেবিলেই বসতেন। ক্রমে প্রেসিডেন্সি-স্কটিশ-সেন্ট পলসের আবির্ভাব। অমিতাভ মণ্ডল। প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। অনির্বাণ লাহিড়ী (পরে ধরিত্রীপুত্র)। পূষণ গুপ্ত। শৌনক লাহিড়ী। দেবাঞ্জন চক্রবর্তী। আরও কত নাম! এমনও বিকেল গেছে, আশপাশের টেবিল থেকে চেয়ার টেনে-টেনে পনেরো-ষোলোজনের দল। সাতাত্তরে বিলেত থেকে ফিরে এই দলেই শিং ভেঙে ঢুকে পড়লেন উৎপলদা, মানে উৎপলকুমার বসু। একটু পরে গৌতম বসু। গৌতম সেনগুপ্ত। একেকটা মাথায় কত চিন্তা, কল্পনা আর পরিকল্পনার অভিঘাত! কত রকমের বাকরীতি! কত-না ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিশ্ব জড়ো হত একটা মাত্র টেবিলে!

আড্ডা শেষে একা মেসে ফিরবার পথে মাথা ঝকমক করত যেমন, ঝিমঝিমও। সেটা কি কথার তুবড়িতে, নাকি রকমারি ধোঁয়ার অন্তর্ঘাতে? ভোলানাথ শীলের কাগজের দোকান, নানা নামের মহেন্দ্র দত্ত, কে সি পাল, জালানদের পেল্লায় বাড়ি, ডানহাতি ইউনিভার্সিটির লেডিজ হস্টেল পেরিয়ে চেনা সেলুন। বন্ধ সেলুনের সামনে সুরজের হাসি— ফিরছেন? শুনলেই পাড়াটিকে নিজের মনে হত। ফাঁকা ট্রামের অকারণ যাওয়া-আসা। পুঁটিরাম বন্ধ হব-হব। পরপর আর্য ফ্যাক্টরির ব্যাগ-সুটকেশ। ছোট্ট স্টেশনারি। তারপরই মেসের দরজা।

এক রবিবার নিশীথের বাড়ি। সেটা পঁচাত্তর সাল। পথপ্রদর্শক এবং সঙ্গী পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। কোন বাস, মনে নেই আজ। থ্রি-বি কি? সারকারিনায় নেমে একটু এগিয়ে বাঁ-দিকের গলি। সারকারিনার পেছনের দিকে। আমরা যাব ২এ মাধব দাস লেন। গলি সংকীর্ণ। দু-পাশের সংসার নেমে এসে আরও সতর্ক করছিল পথচারীদের। আগে পার্থ, গায়ে-গায়ে আমি। বাচ্চার কান্না, বাসি থালা-বাটি, বৃদ্ধের বসে-থাকা, ব্যস্ত মহিলাদের প্রভাতকালীন খুচরো ঝগড়া– দেখেশুনে পা ফেলতে হয়।

ডানহাতি ঢোকার দরজা। কোনো-কোনো বাড়ি দিনের পর দিন গেলেও বাড়িটা অপ্রবেশ্যই থেকে গেছে। নিশীথের বাড়িতে এমন অবারিত হাওয়া ঘুরছিল যে, প্রথম দিনেই গোটা বাড়িটা চোখের সামনে হাজির। বাবা ভাই বোনেদের পেরিয়ে, এবং গৃহস্থালি, আমরা দ্বিতীয় ঘরে ঢুকি– যেটির দরজা ভেজানো। কিন্তু বন্ধ নয়। আলতো ঠেলে পার্থই খোলে। ভিতরটা— আন্দাজ হয়– বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়াগন্ধে ডুবন্ত। কিন্তু ধোঁয়া তো শুধু বিড়ি বা সিগারেট থেকে উদ্গীরণ হয় না। দশ মহাবিদ্যার মতো দশ মহাধোঁয়ারও যে উদ্গীরণপ্রতিভা আছে, তখনও জানা ছিল না। ওদিকে নিশীথ ব্যস্ত। তার বৃহদাকার চোখদুটো ছোট্ট ঘরে আমাদের বসার জন্যে জায়গা খুঁজছে। বিশেষত, আমি নতুন। ঘর ততক্ষণে ভর্তি। সোমক, রণজিৎ, অমিতাভ বসু, উমা (পরে, বসু), একটু পরে অঞ্জনা (পরে, কাঞ্জিলাল)— এদের কথা মনে পড়ে। এবং তর্ক। বিষয় কবিতা। বিষয় সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্য। এগিয়ে-পিছিয়ে। শঙ্খ, শক্তি, বিলিতি বরফে হিমায়িত উৎপল। এবং বিষয়, কান টানলে মাথার মতো গোটাতিনেক বিদেশি ভাষার সাহিত্য এবং দর্শন। হাবার মতো এক শ্রোতার ভূমিকা আমার। চা। মাখা-মুড়িও এসেছিল, মনে পড়ে।

বাঙালি সংসারের দিগন্তে ফুটে-ওঠা দ্বীপের রেখার মতো ঘরটা। দারুচিনি? তেমনই মনে হয়েছিল। তাই কি প্রথম দর্শনে সহজ হতে পারিনি? অথচ, আমি তো সেখানেই ছিলাম!

অল্প দিনেই দল বেড়ে গেল। অমিতাভ মণ্ডল, প্রসূন। এক সকালে সুদূর কর্নফিল্ড রোড থেকে লম্বাটে এক তরুণ। পাট্টার পাজামা, একাধিক বোতাম-খোলা হাওয়াই শার্ট, হাওয়াই চটি। হাতে লেখা-ভর্তি খাতা। যেন পাশের বাড়ি থেকে এসেছে। গৌতম সেনগুপ্ত। সেদিন একটা নতুন নিম্নচাপ। সামুদ্রিক হাওয়া। অমিতাভ-প্রসূন আসার সময়ও অনেকটা তেমনই ঘটেছিল।

যদিও পরিসর কম, ঘরটা ছিল বাড়ির মধ্যে একটা খোলা মাঠের মতো। তাতে কিছু অন্ধকার ঝোপও ছিল, যে-সব অন্ধকারে কয়েকটি তরুণের অস্থির জোনাকি উড়তে পারত।

তার বেশ কয়েকমাস পর পার্থপ্রতিমেরই সঙ্গে একদিন দুম করে শঙ্খ ঘোষের বাড়ি। শ্যামবাজার। সেদিনও ছিল রবিবার। বাস থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে সিঁড়ি। দরজায় লেখা— মিঠি/টিয়া। যিনি খুললেন, পরে জেনেছিলাম তাঁর নাম। চারুদি। সে-বাড়ির তিনিই সব। এমনকী গৃহকর্তাকে বকতেও পারেন। ঢুকে বাঁ-দিকে বসার ঘর। বইপত্রে সঙ্কুচিত। কোনও বই খোলা শেলফে মুখিয়ে আছে। কোনো বই কাচের আবরণে।

যাঁর বাড়িতে আসা, তিনি সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে আপাদমস্তক সোজা এক শিরদাঁড়া। অথচ, তাঁরই ‘দুধারে আঁধার জল পাতাল নাড়ায়’।

সে-সময় রবিবারের আড্ডায় তত ভিড় ছিল না। আড্ডা বা আলোচনা ছিল উচ্চগ্রামে বাঁধা। একদিন গিয়ে দেখি– কালো মোটা ফ্রেমের চশমা, এক ভদ্রলোক মোড়ায় বসে। শ্যামল ঘোষ। যত দূর মনে পড়ে, ব্যাক ব্রাশ চুল। শ্যামলা রং। সহজাত গাম্ভীর্যকে নিজের অজানতে ভূষণ করে অন্যের কথা শুনছেন। ইনিই কি ‘নক্ষত্র’ নাট্যদলের শ্যামল ঘোষ? হ্যাঁ। চোখ আটকে গেল অতি সাধারণ দেখতে সেই মানুষটার চোখে-মুখে। জেগে রইল চশমার মোটা কালো ফ্রেম। আড্ডায় যাঁরা ছিলেন, কেউ তো জানতেন না, রেডিয়োতে ‘ক্যাপ্টেন হুররা’ নাটকটি শোনার পর থেকে আমি তাঁর ভক্ত? গাঁয়ে থাকার সময় ভরসা বলতে ছিল এইচএমভি-র ভালব রেডিয়োকে বিদায় দিয়ে বাড়িতে-আসা ফিলিপসের ঢাউস ট্র্যানজিস্টার-এস। যদি বলি, মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের লেখা সেই নাটকটি দেখেছিলাম ট্র্যানজিস্টারের পর্দায়, অত্যুক্তি হবে না। ফের একদিন ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’। রেডিয়োতে। নক্ষত্র গোষ্ঠীরই প্রযোজনায়। জমজমাট একটা নাটক। কিন্তু রেডিয়ো থেকে পাওয়া ‘ক্যাপ্টেন হুররা’ আমার কাছে তখনও ছিল সর্বার্থে একটা নতুন উপহার। এবং সেটি শ্যামল ঘোষেরই দেওয়া।

সবাই কথা বলছেন। তিনি চুপ। কখনো দু-একটা মন্তব্য। আজ লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে, আরে! মানুষটির প্রতি মুগ্ধতার রেশ চাঁদের আলোর মতো এত-এত বছর পরেও চোখের কোণে লেগে ছিল, বোঝা যায়নি তো!

এরকম সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। ভাস্কর চক্রবর্তী। এঁদের অবশ্য যখন-তখন পাওয়া যেত কফি হাউসে বা অন্য নানা অজায়গা-কুজায়গায়। কিন্তু, শঙ্খবাবুর বাড়িতে সব কিছুরই যেমন অন্য রূপ, এঁদেরও। শুধু পার্থপ্রতিমই থাকতেন স্বরূপে। তাঁর সুস্তি বিড়ি-সহ। সেগুলো ছিল কিরিচ। নিরীহ ছড়ির ভেতর পুরে-রাখা তীক্ষ্ণ সব ছুরি।

একদিন বই-জহুরি ইন্দ্রনাথ মজুমদার। সুবর্ণরেখার। হাতে-কাচা ধুতি-পাঞ্জাবি। সোজা কথার মানুষ। চারদিকে তাকিয়ে জানালেন— বইগুলোকে দেখলে মায়া হয়। এগুলো তো নষ্টই হয়ে যাবে।

শঙ্খবাবু সায় দেন—হ্যাঁ। যা ধুলোবালি!

ইন্দ্রনাথ ‘না-না’ করে ওঠেন। বিপদ খোলা সেলফের বইগুলোকে নিয়ে নয়। কাচের ভেতরে থাকা বইগুলোর। ওগুলো তো হাওয়া-টাওয়া পাচ্ছে না! সব নষ্ট হয়ে যাবে।

ছোট্ট একটা ঘর। এবং শঙ্খ ঘোষ। সেই ঘরে এরকম কত-কত মানুষের, কত বিখ্যাত জনের, সমাবেশ যে হয় রবিবারের সকালে! একবার এক পরিচিতজন এসেছেন। বসেই আছেন চুপচাপ। একসময় আড্ডা ভাঙো-ভাঙো। জানতে চাই, কিছু কি বলার ছিল শঙ্খবাবুকে? সেই প্রথম তিনি কথা বললেন– না। একজনের আসবার কথা। মনে হচ্ছে, আর আসবেন না।

সেদিনই বুঝতে পারি— অস্থির আর বিশাল এক হাওড়া স্টেশনের ছোট্ট এক কোণে রবিবারের এই ঘরটি আসলে বড়ো ঘড়ির তলা। চেয়ারে যিনি উপবিষ্ট, সবার কথা শুনছেন, দরকারে বলছেন কিছু কথা, তিনি শঙ্খ ঘোষ নামে পরিচিত হলেও আসলে ওই বড়ো ঘড়িটি, যেটির ডায়ালে তাঁর ধুতি-পাঞ্জাবির শুভ্রতা লেগে আছে।

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

আরও পড়ুন:

এইট-বি

 

Shares

Comments are closed.