এইট-বি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    একরাম আলি

    একটা সময় ছিল, যখন বাঙালি পরিবারে ‘যথাকালে, অর্থাৎ যথাকালের অনেক পূর্বেই’ বিয়ের কাজটি সেরে ফেলা যেত। কেমন একটা ফুল ছিল না বিয়ের? সেটা যে কেমন দেখতে, গন্ধই বা কেমন, কেউ-কেউ জানত। বাকিরা থাকত ফোটার অপেক্ষায়। অবশ্য তারপরও পৃথিবী যেমন ঘুরছিল, ঘুরে যেত। ইতরবিশেষ হত না। কালে কালে কী যে গ্রহণ লাগল দেশে, শুভ কাজটাতে পদে পদে বাধা। ছেলেমেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর জন্যে বাবা-মায়েদের, বীরভূমের ভাষায় যাকে বলে, তনছিট অবস্থা। এর শুরু হয়তো বা পাঁচের দশকে। তেতাল্লিশের মন্বন্তর। দাঙ্গা। দেশভাগ। অনটন। জমিদারি-প্রথা উচ্ছেদ। একের পর এক ঘা-খেয়ে মার্কিন থান-কাপড়, মাইলো, পি এল-৪৮০ পর্যন্ত দেখতে হল। বেকার শব্দটির ঘরে-বাইরে ভনভন করার সেই শুরু।

    আমাদের ওইটুকু মেসে তখন তিন-তিনজন অকৃতদার। তিনজনই ষাটোর্ধ্ব। তিনি ছিলেন তৃতীয়জন। ম্যানেজার সুধাময়কৃষ্ণবাবু, বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কমলবাবুর পর তিনি– সুধীরবাবু। পদবী মনে নেই। থাকতেন তিন তলায়। একটেরে, সিঙ্গল রুমে। ভেতরের বারান্দা থেকে দু’টো ঘরের মাঝে কাঠের পার্টিশন দিয়ে তৈরি সরু প্যাসেজ। দু’পা হাঁটলে বাইরের বারান্দা। নীচে ট্রামলাইনের ফিতে। ডানহাতি দু’টো ঘর। তারপর একটা দরজা। খুললেই সুধীরবাবু। সরু একফালি ঘরে সিঙ্গল বেড। ছোট্ট টেবিল। জানলা একটাই। ওপাশে বেঙ্গল বোর্ডিংয়ের দিকে ফুট আড়াইয়েক অন্ধকার। তবু খুলে রাখতেন। হাজার হোক গলি তো!

    তিনিও ফরিদপুরের। হলে কি হবে, তাঁর গায়ে যে একটু রুপোলি জেল্লা! কোন সূত্রে জানা নেই, তবে নিকটই, সুপ্রিয়া চৌধুরীর তিনি আত্মীয়। মাঝে মাঝে আলিপুরের দিকে কোথায় যেন যেতেন। সঙ্গী বলতে একটা ট্র্যানজিস্টার। কখনো ‘সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’ একা-একা মশগুল থাকতেন। অথবা, সরাসরি বিবিধভারতী। মাঝামাঝি কিছুতে ঠোক্কর খেতে বিশেষ দেখিনি। এক ম্যানেজারবাবু ছাড়া। সম্ভবত, ওই একজনকেই তিনি স্বগোত্রীয় ভাবতেন।

    একদিন শুনলাম, খোঁজ করছেন। গিয়ে দেখি, খাটে বসে। লুঙ্গি, হাওয়াই শার্ট। হাতে চিরুনি। সামনে আনন্দবাজার পাতা। তার উপর মাথা ঝুঁকিয়ে চুলগুলো বারবার সামনের দিকে আঁচড়াচ্ছেন। যা ঝরে পড়ার, কাগজে পড়ছে। আর তাঁর গলায় গুনগুনিয়ে উঁকি মারছে– ‘ইউ টেল মি দ্যাট ইউ লাভ মি বেবি’। ক্লিফ রিচার্ড না?

    থমকে দাঁড়িয়ে। ঢুকব কি না ভাবছি, স্যাট করে ঘাড়টা উঠল— আরে! এচো, এচো।

    সুধীরবাবুর মুখে ‘স’ উচ্চারণটা আসত না। নামকরণের সময় জাতকের ভবিষ্যৎ উচ্চারণ-ক্ষমতা গুরুজনদের জানবার উপায় থাকে না। এ দিকে কমবয়সী বোর্ডাররা আড়ালে ওই নামটি বলার সময় নিষ্ঠা-সহ তাঁকেই অনুসরণ করত।

    আহ্বান প্রশস্ত। ঘর একফালি। তারই মধ্যে খাটের কোনায় বসে পড়ি। আজ ওঁর অফিস নেই। বিকেলে কী করছি? না, তেমন কিছু না। একসঙ্গে একটু বেরোতে চাইছেন। কাছেই। কখন? ওই যে, বিকেলে। টেবিল থেকে তাঁর হাতে উঠে এল দু’টো এক্লেয়ারসের রঙিন মোড়ক। একটা বাড়িয়ে দিয়ে মুখে পুরলেন অন্যটা— খাও।

    চিবোতে চিবোতে দু’একটা কথা। ক্লিফ রিচার্ডের প্রসঙ্গ তুলতেই উদ্ভাসিত মুখ— এইজন্যেই তোমাকে ভালো লাগে।

    বিকেলে বেরিয়েছি। কেন, জানা নেই। মির্জাপুর ধরে হাঁটছি, মিনি হোটেল পেরিয়ে সুধীরবাবু ভাঙলেন— গোটা-দু’য়েক গামছা কেনার আছে। কোথায়? চলো না। ডানহাতি কর্পোরেশন অফিস, পুঁটিরাম, গল্পকবিতা, মৌচাক পেরিয়ে দু’টো কাপড়ের দোকান। নীচু-নীচু। ছোট্ট। একবার এ-দোকান, একবার ও-দোকান। নানান গামছা দেখা হচ্ছে। হাতে নিয়ে, দু-আঙুলে ঘষে। খসখস করছে না? গায়ে লাগবে। এটা? নাহ, বড্ড জ্যালজেলে। অনেক ঘাঁটাঘাঁটির পর– চলো, চা খাই। ট্রামলাইনের মোড়ে হাতে চায়ের ভাঁড়। ওদিকে আশুতোষ বিল্ডিং, এদিকে মেডিকেল কলেজ। বাস, ট্রাম, রিকশা, গাড়ির পর গাড়ি আর পথচারী। কলুটোলার দিক থেকে, ওই যেখানে জ্যোতিষীটি বসে আছে আশুতোষের সিঁড়িতে, একটা তিনচাকার ম্যাটাডর বিকট শব্দে রাস্তা পেরোনোর কসরত করছে। এরই মাঝে গামছাগুলোর গুণগত মান নিয়ে একপ্রস্থ লম্বা আলোচনা।

    ফিরে এসে পছন্দ হল দুটো। পরের ধাপ দাম-দর। আড়াই টাকা। না, দেড়। আড়াই টাকার একপয়সা কমে হবে না, বাবু। হাত ধরে টান– একরাম, চলে এসো। একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন— ডাকল না তো! দু’টাকায় দেবে না? চলো, দেখি। ফিরে গিয়ে— দুই? আচ্ছা, সওয়া-দুই। এই শেষ। দিলে দাও। দেবে কি? চলো, একরাম।

    নিন– মুখে বিরক্তি। দু’টো গামছা ভাঁজ করে কাগজে মুড়ে ছুঁড়ে দেওয়ার মতো ভঙ্গি।

    ফেরার সময় হাসি-হাসি মুখে গর্ব। পেরেছেন! পুঁটিরামের কাছে এসে হাত ধরে টান। রাধাবল্লভী, গজা, অমৃতি। লম্বা আর মারকাটারি অভিযানের মধুরেণ সমাপয়েৎ।

    এ হেন সুধীরবাবুর একটি মন্তব্যে (নাকি উপলব্ধির আনকোরা বয়ান শুনে?) বন্ধুরা বেশ আমোদ পেয়েছিল।

    এক সন্ধেয় ম্যানেজারবাবুর ঘরে মাসের টাকা দিতে গেছি, মাথা ঝুঁকিয়ে উনি হিসেবে ব্যস্ত, এমন সময় জানলার ওপারে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। সুধীরবাবুর গলা— পার্ক স্ট্রিট গিয়েছিলাম, বুঝলেন চুধাবাবু। ওঃ, আজকালকার ছুঁড়িগুলো যা হয়েছে না! পাছা তো নয়– পাঁপড়ভাজা!

    বাইরে মিটমিটে বাল্ব। ভেতরে টিউবলাইট। মাঝখানে জানলার নিবিড় গরাদ। সেদিকে সুধাবাবু ভ্রূক্ষেপও করলেন না। সোফায় মূর্তিমান আমি। সুধীরবাবুর চোখে প্রবীণের অস্বস্তি— কী ব্যাপার? চন্ধেবেলা এখানে? বেরোওনি?

    প্রতিদিনই যে কফি হাউস, বন্ধুর দল, আড্ডা– তেমনটা নয়। একেক দিন একলা ঘুরতেও ইচ্ছে করত। উদ্দেশ্যহীন। আসলে ইচ্ছে করত কলকাতার জঙ্গলে হারিয়ে যেতে। কিন্তু কোথায় যাব? দু-একজন মাত্র বন্ধু তখন। হঠাৎ একদিন প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর কথা মনে পড়ল। বছর দেড়েক আগে আলাপ হয়েছিল সিউড়িতে। সস্ত্রীক উঠেছিলেন দেবাশিসদার (বন্দ্যোপাধ্যায়) বাড়ি। কবিতা শোনাও। দিনদুয়েক আড্ডা। কলকাতায় গেলে বাড়িতে যাবে— বলার সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতেও পরিসরটি ছিল প্রশস্ত। সঙ্কোচ ছিলই। তবু একদিন ফোন করে ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গে সামনের রবিবার যাওয়ার আমন্ত্রণ। দুপুরে খেতে হবে কিন্তু!

    শিয়ালদা গিয়ে এইট-বি। সিধে আপার ডেকে। হু-হু হাওয়ায় পার্ক সার্কাস, গড়িয়াহাট পেরিয়ে কোথায় যেন যাদবপুর। চিনতে চিনতে যাওয়া। টার্মিনাস থেকে থ্রি নর্থ রোড। কথা ছিল দোতলায় উঠে কলিং বাজানোর। সিঁড়ি বেয়ে নয়, উঠতে হল দেওয়ালে ঝোলানো পেইটিঙের সারি বেয়ে। ল্যান্ডিঙে ঝুলছে প্রণবেন্দুদার কবিতার মতো বাহুল্যহীন আলো। বেল বেজে উঠতেই খুলে গেল দরজা। যেন কেউ অপেক্ষায় ছিলেন। সামনে মেরিঅ্যান। দাশগুপ্ত। হেসে পরিষ্কার বাংলায় অভ্যর্থনা। কিন্তু অ্যামেরিকান বাংলা যে! আন্দাজে বুঝতে হল।

    প্রশস্ত ড্রয়িং রুমে সোফায় গা এলিয়ে প্রণবেন্দুদা। পাটভাঙা পাজামা-পাঞ্জাবি। ঠোঁটে মৃদু হাসি। যেন আজন্ম ওইভাবেই বসে থাকাটা তাঁর নির্ধারিত কাজ। এবং থাকতেনও। শুধু মাঝে মাঝে দরকার পড়লে— চিত্ত! ধুতি আর ফুলহাতা শার্টের চিত্ত সঙ্গে সঙ্গে হাজির। দেওয়ালে বড়ো, ছোটো শিল্পকর্ম। বিকাশ ভট্টাচার্য। গণেশ পাইন। কফি বা চা। নানা কথা, পরিকল্পনা। মেসে কী খেতে দেয়। নতুন কী লিখেছ, শোনাও। সেইসব কথায় মেরিঅ্যানকে যোগ দিতে বিশেষ দেখিনি। দূরে ডাইনিং টেবিল। ইতিউতি তাঁকে দেখা যেত ওদিকটাতেই। বউদি বা দিদি বলা হয়তো বা সেজন্যেই হয়ে ওঠেনি। একসময় খাওয়ার ডাক আসত। রবিবাসরীয় ভোজের পর ধীরেসুস্থে ফিরে এসে ফের সোফায়। তাঁর ডানদিকে, একটু পিছনে, এসে দাঁড়াত চিত্ত। নীরব উপস্থিতি যেন। উনি ডানহাতটা আন্দাজে বাড়ালে ধরিয়ে দিত কাগজের একটা ঠোঙা। তারপর অপেক্ষা। ঠোঙা খুললে বের হত দশাসই পানের খিলি। মুখে দিতেন। ডানহাতের মুঠোয় আস্তে আস্তে পাকাতেন ঠোঙাটাকে। ফের পিছনে বাড়িয়ে দিতেন, আন্দাজে। কোথায়, কতদূরে, কে অপেক্ষায় আছে– সব মুখস্থ। বাতিল ঠোঙা হস্তগত হলে চিত্ত স্থানত্যাগ করত।

    ঘণ্টা চারেক থাকা হতই। কোনওদিন কোনও কিছুতে বেচাল দেখিনি।

    এত শীতল, আপাত নিরুপদ্রব, এত ত্রুটিহীন সবকিছু— দেখে কখনো অস্বস্তি হত। কিন্তু সেই অস্বস্তি মুছে যেত তাঁর কবিতা মনে পড়লে— ‘আমি লোকটা মৃত্যুযাপন করছি মনে হয়,/ অথচ লেখায় তার ছিটে-ফোঁটা চিহ্ন নেই। কেন?’ বা ওই লেখাটা— ‘দেয়ালঘড়ির মতো/ বসে থাকি, দেয়ালঘড়ির মতো/ সকলই চলেছে দেখে/ ভয় পাই।/ ভয় পাই, সময়, তোমাকে।’

    সেই শুরু। তারপর থেকে প্রত্যেক রবিবার আমন্ত্রণ। আসা-যাওয়া-খাওয়া-আড্ডার ফাঁকে তাঁর উদ্বেগ আমার কান এড়ায়নি– মাস্টার্স তো দু’বছরের কোর্স, তারপর কী করবে? একদিন বললেন— শোনো, সন্তোষদা আমেরিকায়। ফোনে কথা হয়েছে। ফিরলে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে কথা হবে। লজ্জা কোরো না। যা লাজুক তুমি! এখনই কিছু-একটায় ঢুকে পড়া দরকার। সন্তোষকুমার ঘোষ? কী বলছেন আপনি! চেন না, তাই এরকম ভাবছ। খুব ভালো মানুষ। একটু মেজাজি এই যা। তবে চমৎকার। না-না, প্রণবেন্দুদা। এসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।

    আচ্ছা, অলিন্দে তুমি কবিতা দিলে না তো? পরের রোববার অবশ্যই আনবে। কবিতা পড়ে ঠোঁটে হাসি— কাকে নিয়ে লিখেছ? সুনীল? কী যে বলেন! খামোখা তাঁকে নিয়ে লিখতে যাব কেন? তাঁর সঙ্গে তো আলাপই নেই আমার। আচ্ছা, মানছি। দিয়ে যাও। চলো, খেতে বসি।

    এত শান্ত আর স্থির সব কিছু, তার ভেতর নানা শিরা-উপশিরায় এত ঝঞ্ঝা বইছে সব সময়, এও কি হয়! হয় যদি হোক। রোববারের পর রোববার এমন মৃত্যুদৃশ্য দেখে যাওয়ার শক্তি আমার নেই।

    সেই নিস্তরঙ্গতা থেকে রেহাই চেয়েছিলাম আমি। পেয়েওছিলাম। তবে আমার পদ্ধতিটা ছিল চিরকালের জন্যে ক্ষমাহীন। আমার নিজের কাছেই।

    লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

    আরও পড়ুন:

    বকখালিতে চারজন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More