বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫

ব্লগ: হ্যারিসন রোড ২/ ম্যানেজারবাবু

একরাম আলি

কলকাতার পুরোনো মেস-অঞ্চলের সীমানা ছিল মোটের ওপর দক্ষিণে ধর্মতলা স্ট্রিট, উত্তরে বিবেকানন্দ রোড, পুবে আপার সার্কুলার রোড, পশ্চিমে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ—এই আয়তক্ষেত্রটিতে। অঞ্চলটায় দু’দুটো মেডিকেল কলেজ, দেশের ডাকসাইটে ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সায়েন্স কলেজ, হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজও যেন দু’টো কী তিনটে, কলেজ অন্তত হাফ-ডজনের বেশি, অধিকন্তু মেসবাসী মফস্বলীদের কাছে ডালহৌসি বা ধর্মতলা বলতে গেলে হাঁটাপথ।

প্রায় প্রতিটি মেসেরই একটা করে নাম ছিল। সে-নাম সাধারণত তুলে আনা হত ব্রিটিশ লব্জ থেকে। রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি ভুবনবিস্তৃত হওয়ার পর বাংলা নামে দুএকটা মেস মাথা তুলে দাঁড়ায়। তারা তখন আর নেটিভ নয়, বরং অপেক্ষাকৃত সম্মানজনক ছিল তাদের উপস্থিতি। যেন রং-চটা অ্যাংলোর পাশে স্বদেশি জমিদার! একটা ছিল শ্রীনিকেতন বোর্ডিং হাউস, যেটা ছিল প্যারামাউন্টের উল্টো ফুটে। ওখানেই একসময় থাকতেন সাহিত্য যশোপ্রার্থী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। অসম্ভব পরিশ্রমী, জেদি, অনবরত চা-পায়ী এই মানুষটির সারা দিনের কাজ বলতে ছিল লেখা, কাটা এবং ফের লেখা। লেখা থেকে যৎসামান্য উপার্জনের উপরই ভরসা। যাকে বলে কায়ক্লেশে দিন গুজরানো। তবু তিনি গল্প আর চিত্রনাট্য লেখার লোভনীয় চাকরি পেয়েও বোম্বের ফিল্ম-দুনিয়ায় পা রাখেননি। এই মেসেই পড়ে থেকেছেন। চালিয়ে গেছেন লেখার লড়াই

মেস যেমনই হোক, তার একটা চরিত্র কী করে যেন তৈরি হয়ে যেত মেসের এলাকা, বাড়ি, নাম, বোর্ডার, সর্বোপরি ম্যানেজার— সব কিছুর বর্ণবিচ্ছুরণে পেয়ে যেত একেকটা স্বতন্ত্র রং। প্রধান চরিত্রটি অবশ্যই ম্যানেজার। কার্যত তিনিই মালিক। কেন যে মালিক থেকে নিজেকে ম্যানেজারে নামিয়ে আনতেন তাঁরা, সে-এক রহস্যই। মেস-ব্যবসার এও হয়তো এক পদ্ধতি।

ম্যানেজারবাবুর কাজ কী? হাজারটা। আমাদেরটি ছিলেন অকৃতদার। ফলে কাজ বেশিই! রান্নার ঠাকুর-সহ তিন-চারজন চাকর সামলানো। এসব মানুষের খাস ভৃত্য একটা লাগতই। ভেতরের কিছু-না-কিছু গন্ধ পেয়ে যেত বলে ভৃত্যটির চালচলন হত একটু বেয়াড়া ধরনের তবু সে খাসই থেকে যেত। কতজনকে আর ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যায়!

রোজ সকালে জনাদুয়েক চাকর নিয়ে বৈঠকখানা রোডে লুট-সস্তায় বাজার করতে যাওয়া ছিল অবশ্য কর্তব্য। খেতে বসে ফেব্রুয়ারির শেষেও বাঁধাকপির ঘ্যাঁট-জাতীয় তরকারি দেখলে হোমিয়োপ্যাথি-ছাত্র পূর্ণ পর্যন্ত বলতে ছাড়ত না– হরি, ষাঁড়ের মুখ থেকে কবস্তা বাঁধাকপি আজ ছাড়িয়ে আনলে?

বাজার থেকে এসে গুছিয়ে কাগজ পড়তে আর কাগজের কোনও-একটা বিষয় নিয়ে উটকো তর্ক করতে অনেকটা সময় চলে যেত। তার ওপর মানেজারবাবুর ছিল বয়সের ভার, যে-ভারে শুয়ে থাকাও পরিশ্রমের। পোষ্য বলতে ছিল গোটাকয়েক বেড়াল, যাদের তিনি দুপুরে-রাতে নিজে খাওয়াতেন। সে-সময় দোতলার সরু বারান্দায় তাঁর নাগাড়ে ‘আয়, আয়, আয়’ ডাকটি চুরুলিয়ার তপন মুখুজ্জে সুযোগ পেলেই বেশ নকল করত। অন্যটি নকল করা অবশ্য তপনের সাধ্য ছিল না। কেননা সেই পোষ্যটি মাঝে মাঝে এসে সিঁড়ির উল্টোদিকের ঘরে উঠতেন আর দরজায় সর্বক্ষণ পর্দা-ঝোলা সে-ঘরে ম্যানেজারবাবু ছাড়া আরেকজনেরই ঢোকার ছাড়পত্র ছিল— সে ওই হরি

ছিলেন বহরমপুরের মানুষ। তরুণ বয়সে কলকাতায় আগমন ফুটবল খেলতে। প্রথমে হাওড়া ইউনিয়ন বা ওই জাতীয় কোনও ক্লাবে। পরে মোহনবাগানে উন্নীত হন। সখের প্রাণ গড়ের মাঠের পর্ব চুকলে এই মেস। মনে হয়, জীবনটা তাঁর খারাপ কাটেনি। সম্পর্কে জমিদার-প্রজা হলেও সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন মেসেরই এক সমবয়সী বোর্ডারকে। তিনি সুধীরবাবু। পদবী আজ আর মনে নেই। ম্যানেজারবাবুর মতো তিনিও অকৃতদার। তিনতলার একটা সিঙ্গল রুমে একা থাকতেন। বহু পুরোনো বোর্ডার। আরও একজন অকৃতদার ছিলেন অবশ্য– কমলবাবু। কমল মজুমদার। তবে মেজাজে চরিত্রে প্রথম দু’জনের সঙ্গে ছিল কড়া রকমের তফা তিনজনই ষাটোর্ধ্ব।

ম্যানেজারবাবুর ভগবদ্গীতা ছিল আনন্দবাজার। আর ছিল একটা রেডিও, যেটা মাঝে মাঝেই চলত। তবে বলতেই হবে, মানুষটি তত কট্টর বিষয়ী ছিলেন না। না-হলে মধ্য-কলকাতায় মেস-যুগের শেষ পর্বে এত সহজে কেন আমাকে নিলেন?

হয়েছে কী, সেদিন ছিল রবিবার। এরই মধ্যে কয়েকদিন কেটে গেছে, অথচ থাকার স্থায়ী ঠিকানা জোগাড় হয়নি এবং প্রায় প্রত্যেক দিন ম্যানেজারবাবু খোঁজ নিচ্ছেন কোথাও কিছু হল কি না। মনে মনে ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে মেজাজে ভারি ধরনের একটা বইয়ের ভেতর নিশ্চিন্তে ঢুকে পড়েছি। কখন বিকেল হয়েছে, ঘরের আলো কমেছে আর আলোর আশায় আমিও একটু একটু করে এগিয়ে গেছি জানালার কাছে, শেষে বইটাকে নিয়ে বসেছি জানালার একেবারে ধার ঘেঁষে— খেয়াল নেই। এমন সময় বারান্দায় ম্যানেজারবাবুর উঁচু গলা। যেন গোটা মেসকেই উদ্দেশ করে তিনি বলছেন— ‘দেখে যাও, পড়া কাকে বলে। মন থাকলে পড়তে আলো লাগে না।’ বা, এরকম কিছু। আমি যে পড়তে কষ্ট হলেও তখনও আলো জ্বালাইনি, অন্যরা দিব্যি লাইট জ্বালিয়ে গুলতানি মারছে— এটাই তাঁর বলবার কথা।

সে-রাতে খাওয়ার সময় হোমিয়োপ্যাথির ছাত্র প্রসেনজিৎ হাসতে হাসতে যা বলেছিল, কথাগুলো সংক্ষেপ করলে অনেকটা এরকম— কী খেল দেখালেন, দাদা! আপনি তো টিকে গেলেন।

কিন্তু নিজের কেনা খাসিকে যেমন কোনও দিন বিশ্বাস করেনি কসাইরা, কসাইকেই-বা কবে বিশ্বাস করেছে আড়কাঠে আটকে-থাকা খাসিটি! তবু সেই হোমিয়োপ্যাথ ছাত্রটির কথা সত্যি হল।  দশদিন পেরিয়ে গেছে, যেমন ছিলাম আমি আছি, বাড়তি বলতে তেলচিটে আলখাল্লার মতো সারা গায়ে একটা সংকোচ। অবশেষে ম্যানেজারের ঘর থেকে একদিন ডাক এল। নানা ভণিতা শোনার পর জানতে পারলাম, আমি থাকছি। সেই সঙ্গে জানলাম থাকার নিয়মাবলি। শেষে একটা কথা মনে রাখতে বলা হল— মেসের ছত্রিশ বছরের ইতিহাসে আমিই প্রথম মুসলমান, যাকে থাকতে দেওয়া হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের মর্যাদা যেন দিই।

বসেছিলেন ঝুঁকে, খাটের ওপর, দু-টো হাত দু-দিকে, খাটের কানাচ ধরে। কথাগুলো বলার জন্যে অতিরিক্ত কিছুর দরকার হচ্ছিল তাঁর। হতে পারে বাড়তি কোনও জোর, হতে পারে এমন এক বিষণ্ণতা– যা এই ঘরে নেই।

প্রসঙ্গটায় সহজ হওয়া কঠিন। দারুণ একটা সুখবরের সঙ্গে মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হল দশ টনের ভার। বলা হল—এই মালটা তোমারই, তোমাকেই বইতে হবে।

উপায় নেই। তাই ঘরের আবহাওয়া সহজ করার জন্যে সেদিন জানতে চেয়েছিলাম– তিনি তো বহরমপুরের মানুষ, মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের কারও সঙ্গে আলাপ বা দেখা হয়েছে কখনও?

খাটের কানাচ ছেড়ে ডান হাত ওপরে উঠল। সেখান থেকে এককভাবে তর্জনী মুখে হাসি-হাসি ভাব। বললেন, ‘একবার। তখন সেভেন কি এইটে পড়ি।’

তারপর যা বলেছিলেন, সেটা অনেকটা এরকম:

পুজোর ছুটি। বিকেলে পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলছিলেন। পাশ দিয়ে নবাব বাহাদুরের গাড়িতে— সবাই চিনত গাড়িটাকে—পাড়ার এক ডাক্তারকাকু, একা। কোথায় যাবেন? লালবাগ। অসময়ে কেন? নবাব বাহাদুরের অসুখ, তলব করেছেন। যাবি? হ্যাঁ–অ্যা-অ্যা। যা, চট করে জামা-প্যান্ট পরে আয়। কোথায় খেলা কোথায় কী, একছুটে জামাপ্যান্ট পরে হাজির। যেতে যেতে শিখিয়ে দিয়েছিলেন– কী করতে হবে, কী নয়।

বুক ঢিপঢিপ করছিল। কখন যে গাড়ি লালবাগে ঢুকেছে, খেয়াল ছিল না। মূল ফটক, তারপর ডাইনে হাজারদুয়ারি পেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরে ওয়াসিফ মঞ্জিল, বা নিউ প্যালেস। গাড়িবারান্দা। দু’জন উর্দিপরা লোক এসে একটা পেল্লায় হলে নিয়ে গেল। ড্রয়িং রুম। সোফায় বসে আছেন, আরেকজন এসে ডাক্তারকাকুকে আদাব করে জানতে চাইল, ছেলেটি কে। হাসিমেশানো উত্তর গেল—ভাইপো। ভেতরে কোনও দিন ঢোকার সুযোগ হয়নি তো, তাই… লোকটা যেমন এসেছিল, তেমনই ভঙ্গিতে ফিরে গেল। এরই মধ্যে ট্রেতে দু’গ্লাস সরবত– রুমালে ঢাকা– দিয়ে গেল একজন। সব কিছুই আলাদা। মাথার ওপর বিরাট ঝাড়লণ্ঠন, চারদিকে সোফা, দেওয়ালে থামে নকসা, কাচের কাটা-কাটা গ্লাস, তার ওপর পাতলা রেশমি রুমাল, সুগন্ধি সরবত— ভয়-ভয় করছিল। আচমকা সেই লোকটা ফিরে এসে বলল—আসুন।

ডাক্তারকাকু বললেন, ভাইপো একা থাকতে পারবে না। ও কি সঙ্গে যেতে পারে? শুনে লোকটা আবার কোথাও গেল এবং ফিরে এল তখনই—আসুন সঙ্গে।

চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে বারান্দা। সেখান থেকে একটা ঘরে। হলঘরই বলা উচিত। সব জানালা খোলা। সামনে গঙ্গা। শরতের সিরসিরে হাওয়া খেলছে প্রকাণ্ড খাটে খালি গায়ে বসে আছেন নবাব বাহাদুর। মানে নবাব স্যার ওয়াসিফ আলি মির্জা। হাঁপাচ্ছেন যেন। পঞ্চাশের ওপর বয়স। বনবন করে ফ্যান ঘুরছে, তবু শরতের সন্ধ্যেয় দরদর করে ঘামছেন।

চিকিৎসা শেষ হলে আবার সিঁড়ি ড্রয়িং রুম। ঝাড়বাতির তলা দিয়ে বাইরে।

গাড়িতে উঠে একটাই প্রশ্ন ছিল— এত ঘাম?

ড্রাইভারকে দেখিয়ে ইশারায় চুপ করতে বললেন। গোরাবাজারে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে বললেন— তোরা বাচ্চা ছেলে। বুঝবি না। বলবর্ধক কোনও ওষুধ উনি বেশি খেয়ে ফেলেছেন। ভয়ের কিছু নেই। তবে বারবার এমন করলে বিপদ।

ম্যানেজারবাবু মুখ ঘুরিয়ে এবার আমার দিকে ঠোঁটে ফিকে রেখা, যেন হাসির, ‘বুঝেছিলাম, তবে আন্দাজে। ভাবো, অক্সফোর্ডে পড়া পণ্ডিত মানুষ। বইও লিখেছেন শুনেছি। মেজাজে পুরো সাহেব। নামী পোলো খেলোয়াড় ছিলেন অথচ…’

অসম্পূর্ণ কথা দুই ঠোঁটে মিলিয়ে গেল যেন তাঁরই নাড়িনক্ষত্রে ঘুরপাক খেতে খেতে হারিয়ে যাচ্ছিল কথাগুলো। মোহনবাগানের একদা-ফুটবলার। আজ মেস-মালিক। বাবরি চুল। লুটিয়ে-পড়া কোঁচা। শেষ দুপুরে রংবেরঙের বেড়াল-পরিবেষ্টিত হয়ে যখন তিনি চুনোমাছের চচ্চড়ি আর মাখা ভাত নিয়ে ঝুঁকে পড়েন বারান্দায়, যখন সিঁড়ির ওপাশে ঘরের পর্দা দুলে ওঠে, তখন তাঁরও পশ্চাৎপটে প্রকাণ্ড একটা খাটের আভাস দেখা যায় না কি, যেখানে বসে তিনি খালি গায়ে হাঁপাচ্ছেন!

(চলবে)

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Comments are closed.