সোমবার, এপ্রিল ২২

হাসপাতাল ভ্রমণ

একরাম আলি

টাকা ফুরিয়ে যায়। এর শুরু কবে থেকে? মনে পড়ে না। সেই যখন হাফ প্যান্ট, যখন ক্লাস ফাইভ, তখন থেকেই তো হস্টেলে। নিজের খরচটা নিজেকেই বুঝে নিতে হত। গোল তামার একপয়সা থেকে শুরু। কত-কত পয়সা। টাকা, মানে কাগজের নোট— নীলচে এক টাকা, হলদে দু-টাকা, সবুজ পাঁচ টাকা। আস্ত দশ টাকার নোট? নিজের খরচের জন্যে ক্লাস সেভেন-এইটের আগে বিশেষ পাইনি। কিন্তু যা পেয়েছি, আশ্চর্যের যে, ফুরিয়ে গেছেই!

টাকা কেন ফুরোয়? ‘অমিতব্যয়ী’ নামে একটা কবিতা লিখেছিলেন পার্থপ্রতিম। সম্ভবত উনিশশো আশি-টাসিতে। ‘টাকা মানুষের মনের প্রতিনিধি’—এই রহস্য উদ্ঘাটন করে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল—‘কৃপণ মানুষের মনকে অত্যন্ত বেশি মূল্য/ দেয় তাই উহার ব্যবহার রুদ্ধ করিতে চায়।‘ কিন্তু আমরা যারা মনের বহুবর্ণ আলখাল্লার পিছু-পিছু হাঁটি, কখনো মনের বিষাদমিশ্রিত চাউনিতে আচ্ছন্ন হই, তারা কৃপণের মতো ‘উত্তর-মন মনুষ্যত্ব’-এর আবিষ্কারক হতে পারিনি যে!

আশুতোষ বিল্ডিঙের সিঁড়ি দু-চার মাস ভাঙার পরও মাসের প্রথম সাত-দশ দিন জীবন ছিল বেপরোয়া। তারপর আচমকা একদিন, ওই কুড়ি-বাইশ তারিখ, সন্দেহ বুজকুড়ি কাটত— আর কত, দেখি তো! দেখা যেত, যা আছে, তাতে আরও দশ-বারোটা দিনের পথ যেন পাহাড় জঙ্গল ভেঙে দূর দুমকা পেরিয়ে কোন পালোইজুড়ির দিকে গেছে!

হিসেব করে দেখলে মনে হয়, দরকারটুকূই পেয়েছি। বা, দরকারের চেয়ে হয়তো কম।

আসলে দরকার যতটা বাড়ে, জোগান ততটা নয়। এক্ষেত্রে সরকার আর বাড়ির অভিভাবকদের বেশ মিল পাওয়া যায়! একদল টাকা-পয়সা কুক্ষিগত করে রাখে। আরেক দল টাকার টান ধরে রেখে সন্তানকে সোজা পথে চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কারো-কারো যে সত্যিই পয়সা থাকে না! চেয়েচিন্তে পুরোনো বই, চেয়েচিন্তে পুরোনো জামাপ্যান্ট। টিফিনে খাবার বা পানীয় বলতে স্কুলের ইঁদারার জল— বীরভূমে, পুরন্দরপুর স্কুলে, এমন সহপাঠী কি দেখিনি?

একবার সত্যিই টাকা এল না। তিন, চার, পাঁচ—তারিখগুলো সরে-সরে যাচ্ছে বটে, এম ও আসতেই চাইছে না। দুপুর-রাতের খাবার না-হয় মেসে জুটবে। সকাল-বিকেলের টিফিন? বা, সারা দিনের সিগারেট? পুটিরামের পিছনে শম্ভুর চা-দোকান। মস্ত ড্রামে ভোর থেকে জল ফুটছে তো ফুটছেই। সকালের চা ওখানেই– বেশ কড়া। দু-টো ফ্যাকাসে বিস্কুটের সঙ্গে রাতে-দেখা লম্বা একটা স্বপ্ন। ভগ্নপ্রায় বিশাল প্রাসাদ। উড়ন্ত একখণ্ড সাদা রেশমবস্ত্রের পিছু-পিছু ছুটছি আমি। ওটা কি শুধুই বস্ত্রখণ্ড? নাকি রেশমের আবরণে কেউ? ঘরের-পর-ঘর পেরিয়ে যাচ্ছি। অজস্র দরজা-জানালা। কিন্তু একটারও পাল্লা-কপাট নেই। কতক্ষণ ছুটেছি, জানি না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। একসময় চিৎকার— থামো! কিন্তু চিৎকার করলেও গলায় কোনো আওয়াজ নেই। কী করে বেরোবে? চোখের সামনে পাল্লাহীন একটা মস্ত জানালা, সেটাই ছিল অন্তিম গবাক্ষ, হা-হা খোলা। সেই জানালা দিয়ে রেশমবস্ত্রটি উড়তে উড়তে অনেক নীচে পড়ে যাচ্ছে। ঝুঁকে দেখি, নীচে কালো জলের হ্রদ। পাহাড়ে-ঘেরা হ্রদে টলটলে ঢেউ। একটা ছোট্ট চিৎকার। ঝুপ শব্দ। পা আটকে গেল। না আটকালে? কী-আর হত, আমিও না-হয় পড়তাম অনেক নীচের সেই জলে! আরেকটা ঝুপ শব্দ হত বড়ো জোর। বেশ কয়েকদিন ফিরে-ফিরে এসেছিল স্বপ্নটা। সন্দেহ হয়—ডুইনো-ডুইনো গন্ধ। সেটা ছিল দুর্গ। রিলকের ধনকুবের বান্ধবীর, যেটাতে বেশ কিছুদিন ছিলেন তিনি। লিখেছিলেন দশটি দীর্ঘ এলিজি। কিন্তু কেন বারবার এই স্বপ্ন? সে কি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ পড়ে?

ততক্ষণে চা শেষ। পকেটে দু-তিনটে মাত্র টাকা। দেওয়া যাবে না। এসব ক্ষেত্রে ছোট্ট করে বলতে হয়– পরে। ব্যস্ত শম্ভু একবার কট্টক-চোখে তাকায় কিনা, বোঝা মুশকিল। আমি তখন হাঁটা দিয়ছি সিগারেটের সন্ধানে, যেখানে আরও মাথা খাটাতে হবে। ‘বন্ধু আমার, বাদামপাতার শিখরে লুপ্ত/ সময়, হে মৃত ডুবো বিষণ্ণ ত্রস্ত মুখোশ’– পাঁচটা ভাজির। চাওয়ার ভঙ্গিটি ‘স্ফটিক-জলের মতন বেঁকানো।’ অবলীলায় সিগারেট আসে। খুচরো পয়সা গুণতে গিয়ে আরও অনেকের মতো থমকে যেতে হয়। রাস্তার ওপারে এভারেস্ট কাফের মালিক ছেলেটি দোকান খুলছিল। হাত থেকে ভারী তালা ফসকে পায়ে পড়েছে। দম ধরে বসে পড়েছে। তার হেলপার ঠান্ডা জল এনে পায়ে ঢালছে। এ হেন দৃশ্যে হাতে কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে বলাটা জলভাত– দিয়ে যাচ্ছি। নাকি দিয়েই দেব? দোকানদার দ্বিধাগ্রস্ত। ফলে পকেটের পয়সা ফের পকেটে।

ছয়, সাত, আট তারিখ। এর পর তো মেসেও মিল বন্ধ! তার আগে কিছু-একটা ব্যবস্থা করা দরকার। হয়েও গেল চমৎকার ব্যবস্থা। দরকার মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত রিকশ ভাড়া। সঙ্গে একটা বালিশ আর চাদর। হাসপাতালের ও-দুটো জিনিস রুচবে না। ম্যানেজারবাবুকে যতটা পারা যায় অসুস্থতার ভান করে বলতে হল– শরীরটা ভালো যাচ্ছে না কিছুতেই। করবাবুর ওষুধে কাজ হল না তো। দু-দিন হসপিটালে থেকে চিকিৎসা করে দেখি।

তারপর রিকশ। বিছানা-বালিশের সঙ্গে দু-টো পেপারব্যাক। খাটের তলায়, আড়ালে, কিছু বইপত্র ছিল। কী বেচা যায়, খুঁজতে খুঁজতে গিনসবার্গ আর কেরুয়াক। ধুর, পাতার পর পাতা বিবৃতিতে ভরা! দু-টোকেই বগলদাবা করি। তারপর আর কী! সোজা মেডিকেল কলেজের মেইন বিল্ডিঙে। দোতলায় উঠ্বে, বাঁদিকে, ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েদের জন্যে স্পেশ্যাল বেড এখন আছে কিনা জানি না। তখন ছিল। যাওয়া মাত্র বেড। তাও দেখেশুনে, একটেরে, জানালার পাশে। সঙ্গী বা গাইড হার্ডিং হস্টেলের এক ডাকাবুকো। সিস্টারকে বলে দেওয়া হল– সামনে স্পেশ্যাল পেপারের পরীক্ষা। ক্লাস না করলেই নয়। দুপুরে খেয়েদেয়ে বেরোবে। শুনেই– সে কী! তা কী করে হয়! হসপিটাল থেকে বেরিয়ে ক্লাস?

–দিদি, একটা বছর নষ্ট হবে?

ফলে দুপুরে ভাত এল বড়ো সাইজের মাছ-সহ। খেয়েদেয়ে মনে হল, এতটা অকৃতজ্ঞ হওয়া অনুচিত। ওয়ার্ডটা অন্তত ঘুরে দেখা যাক। সরকারি হাসপাতাল যেমন হয়, তেমন চাপসংকুল নয়। আলগা আলস্য লেগে আছে গোটা ওয়ার্ডে। অল্প কিছু বেড। তারই মধ্যে গোটা দুয়েক ফাঁকা। সিস্টার দুজনের কাজও হালকা। একজনের চশমার নীচে কৌতূহল। ছাদের কড়িতে চড়ুইয়ের কিচিরমিচির। একটা চড়ুই ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে উড়ে যেতে গিয়ে মাথায় খড়ের কুটো ফেলল। কংক্রিটের এই জঙ্গলে কোথায় পেল খড়ের কুটো? কে জানে, পাখিরা হয়তো সব পায়। লুপ্ত পৃথিবীর সঙ্গে ওদের সম্পর্ক হয়তো এখনও রয়ে গেছে!

কোণের বেডে শুয়ে-শুয়ে একজন পা নাচাচ্ছে। হাতে খোলা বই। ইংরেজি পেপারব্যাক। কভারে বরফ-ঢাকা হিমালয়ের ছবি। কুমায়ুনে ট্রেক করতে গিয়ে পায়ের দুটো আঙুল গেছে। স্নোবাইটে। আরে, ওদিকে একটা কেবিন না? গিয়ে দেখি, তাই তো! ওইটুকু ঘরে সিঙ্গল খাট, টেবিল, ছোট্ট মিটসেলফ আর ইজিচেয়ারের চাপে ঘিঞ্জি যদিও, মনটা ভেঙে পড়ল। ইস, কী ভালোই-না হত কেবিনটা পেলে!

বেরোতে-বেরোতে বিকেল। এল দুধ, ডিম সেদ্ধ, পাউরুটি। আলাদা মাখন– সেটা নাকি বরাদ্দের বাইরে। খেয়ে ধীরেসুস্থে বেরোচ্ছি, সিস্টারের গলা— পাঁচটার মধ্যে ফিরতে হবে কিন্তু। ডাক্তারবাবু রাউন্ডে আসবেন। কাছে গিয়ে ফিসফিস করে— দিদি, আটটা। ফিরবই।

বেরিয়ে সোজা রাজুর দোকান। বিস্তর দাম-দর করে বই দু-টোর বদলে পাওয়া গেল কড়কড়ে পাঁচটা টাকা। কম কী! কেউ-কেউ নিশ্চয় আছে এসব রাবিশ কিনে পড়বে, যেমন আমি একদিন কিনেছিলাম। এরপর নিশ্চিন্তে কফি হাউস যাওয়াই যায়।

রাতে নতুন শিফটের নার্স। ঢুকতেই একজনের মুখোমুখি– কী দরকার? পেশেন্ট, বেড নাম্বার নাইন। কোথায় গিয়েছিলেন? এমন মজার দৃশ্য দেখতে দেখতে অন্যরা রাতের খাবার খাচ্ছে যখন, অনেক বাকবিনিময়ের পর শান্তি। অর্থাৎ বেডে বসে টেবিলে অবগুণ্ঠিত খাবারের মুখোমুখি নিজেকে দেখা।

তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন। ডাক্তারবাবু আসবেন—সিস্টারের হুমকি। এবং সত্যিসত্যিই এক ক্লান্ত ভদ্রলোকের প্রবেশ। স-সিস্টার এক রোগীকে ছুঁয়ে সোজা ন-নম্বরে— কী প্রবলেম? সত্যিই তো, সমস্যা কী? হিজিবিজি কথার শেষে কী বুঝলেন কে জানে, সিস্টারকে কিছু নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

মেসে প্রসেনকে বলা ছিল, এম ও এলে সঙ্গে সঙ্গে খবর দেবে। পরদিন বিকেলে সেই লটারি পাওয়ার খবরটি এসেওছিল। আমহার্স্ট স্ট্রিট পোস্ট অফিসে গিয়ে শুধু টাকাটা তোলার অপেক্ষা।

হাসপাতালে ডাক্তারের রাউন্ড কিন্তু এত সোজাসরল নয়। একটা লম্বা ওয়ার্ডে সার দিয়ে রোগী। ওয়ার্ডের বাইরে বাড়ির উদগ্রীব লোকজন। কেমন আছে এ বেলায়? এম আর আই রিপোর্ট বিকেলে আসার কথা। কী আছে তাতে? সকালে ডাক্তারবাবু বলে গেছেন, বিকেলে জেনারেল বেডে। দিল না তো! একেক রোগীকে নিয়ে হাজারো উদ্বেগ। এদের কেউ ডাক্তারের দেখা পায়, কেউ পায় না। পেলেও ধাবমান ঈশ্বরের এক-আধটা অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পাবে কি না, কেউ জানে না। ওদিকে ওয়ার্ডের ভেতরে কোনো গাঁ-গঞ্জ থেকে আসা রোগী হয়তো টানা চেঁচিয়ে যাচ্ছে— ডাক্তারবা-আ-বু-উ-উ! বাঁ-চা-আ-ন!

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

আরও পড়ুন:

প্রেসিডেন্সি থেকে কলাবাগান

Shares

Comments are closed.