প্রেসিডেন্সি থেকে কলাবাগান

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

একরাম আলি

রাস্তা চকচক করছে। পাশাপাশি দুটো ট্রামলাইনের পা ডাইনে গ্লোব নার্শারি আর বাঁয়ে ডাকব্যাক ছাড়িয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকার জন্যে চকচকে-ভাবটি আরও ধারালো। বাস-ট্রাম-ঠেলাগাড়ি-রিকশা-বাইক-অ্যাম্ব্যাসাডরের পিছনে অ্যাম্ব্যাসাডর আর সে সবের বিকট শব্দে কলেজ স্ট্রিট মোড়ে বেলা ফুরিয়ে যাওয়ার ব্যস্ততা। একদিকে হাওড়া, আরেক দিকে শিয়ালদা— দুই ভয়ঙ্কর রাক্ষসপুরী হাঁ করে অপেক্ষায়। সেই রাক্ষসপুরীতে ঢুকে পড়ার চেষ্টায় চলমান আর দাঁড়িয়ে-থাকা মানুষজনের ভিড়ের কেউ দেখতে না-পেলেও সূর্য কোথাও তো ডুবছে! দিঘি, নদী, বিল, পাহাড়, সমুদ্র বা নিদেন কোনো উঁচু বাড়ির ছাদ সূর্যাস্তকে চিরকাল বিশ্বাসযোগ্য করেছে। মানুষ তাই হয়েছে কৌতূহলী। ডুবছে! সত্যিই ডুবছে! ডুববেই যদি, এত রং ছড়ানো কেন! কার জন্যে? সিগারেট-মুখে কোনো মানুষের মুগ্ধতা হয়তো কিছুটা আড়াল হয়েছে ধোঁয়ায়। কিছুটা তো অবশ্যই লুকোতে পারেনি সে! ঘিঞ্জি এই জংশনে এমন মানুষ কিন্তু একজনও অপেক্ষায় নেই। কেননা এখানে সূর্যাস্তই নেই।

তবু সূর্য অস্তে না-গেলেও তো সন্ধ্যে নামে! নামছেও। বাঁয়ে দু-পাশের ফুটপাথে নতুন আর পুরোনো বইয়ের সম্ভারে; ডাইনে পাতিরাম ছাড়িয়ে খুচখাচ দোকানে, ট্রামের তারে, ওপাশে ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউসের সামনের ফুটপাথে ফুলে-ওঠা ফলগুলোর গায়ে দিনের আলো নিভে আসার আগেই কর্পোরেশনের আলো ঠিকরে পড়ছে যে!

না। নতুন পত্রিকা কিছু নেই। বাসিগুলোই সাজানো। তবু একবার গ্রাম, গঞ্জ, জেলা, কলকাতা আর শহরতলির উপর চোখ বুলিয়ে নেওয়া। গোটা বাংলা সামনে রেখে নিরাসক্ত মুখে বসে আছে ঘাগু বুড়ো– পাতিরাম পারিজা। অতএব গুটিগুটি পায়ে কফি হাউস।

গমগম গমগম আওয়াজ। সিঁড়ি বেয়ে লাভাস্রোত নেমে আসছে তো আসছেই। হয়তো উঠতে গিয়ে সিঁড়িতেই চলমান কেউ— ‘কী, এতক্ষণে?’ বা, ‘উপরে কারা?’

শনিবারগুলো বিশেষ। কানা ছাপিয়ে উথলে উঠত। সেই যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন না—‘শনিবারের বিকেল, আমি তখন থেকে দেখে আসছি/ একটি হাত একটি মাত্র  বুকে আমার নানান পাত্র/ তার মাঝেই ছেলেবেলার একটিমাত্র রাঙা বাদামপাতা।…’? এ যেন সেই রাঙা বাদামপাতাটি অজস্র হয়ে টেবিলে টেবিলে কথার হাওয়ায় দুলছে। জায়গার অকুলান। উঠে দরজায় দাঁড়িয়ে একটু চোখ বাজিয়ে নিতেই হয়– কেউ আছে কি, বা, বসবার জায়গা? আর যে-টেবিলে সংখ্যাটা পনেরো-ষোলো জনকেও ছাড়িয়ে যেত? সাড়ে সাতটা-আটটা বাজলেই তারা দখল নিত প্রেসিডেন্সির সিঁড়ির। কেননা সেদিন যে দক্ষিণ থেকে সমরেন্দ্র দাস, তুষার চৌধুরী এবং আরও কেউ-কেউ। এই ভাবে কী করে যেন রেওয়াজ হয়ে গেল– কিছুক্ষণ কফি হাউসে, তারপর প্রেসিডেন্সির সিঁড়িতে। রাত ন-টা, সাড়ে ন-টা পর্যন্ত। গেটের বাঁদিকের ঘরে মৈথিলী দারোয়ান বেশ সহৃদয়। সন্ধ্যের ঝোঁক তার চোখেও নেমে আসত এক-আধ ছিলিম তামাকের ঘূর্ণিতে।

সিঁড়ি প্রশস্ত। বসা হত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। পিছনে, উঁচুতে, এক মর্মরমূর্তি নিত্য-উপস্থিত– প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ পি কে রায়। ওইটুকুই-যা অস্বস্তির।

ততদিনে আমাদের সিগারেট-বিড়িগুলো কেমন যেন মিইয়ে যেতে শুরু করেছে। ভরসা দেওয়ার অপেক্ষায় ছিল কলাবাগান। অর্থাৎ কলাবাগানের ছোটা সাজন। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের মাঝের যে-রাস্তা, বাঁদিকে ঢুকে সেই রাস্তার ডানহাতি টেবিল টেনিস বোর্ডের মতো অতিকায় এক কাঠের বাক্স। কোন কালের, কেউ জানে না। প্রাচীন, পবিত্র এক বেদি যেন। তার উপর একা ধ্যানস্থ সারিপুত্র, মতান্তরে ছোটা সাজন। খালি গা। পরনে লুঙ্গি। ছোটা সাজন কোনো বিক্রেতা ছিল না। নগদ টাকা নিয়ে সে মাল দিত করুণাবশত। কড়কড়ে দশটা টাকা পেলে বাক্সের উপর দু-আঙুলের ডগা দিয়ে– যেন অনিচ্ছায়– ঠেলে দিত চরসের দুর্লভ গুলি। তার নামটাই ছিল এ-লাইনে ব্যবসার ইউএসপি। যেন আজকের ছোটা সাকিলের ভাই! পুরিয়ার ভেতরে চৌকো মালটা সবুজ তো? জিজ্ঞেস করার হিম্মত হবে কার? খুলে দেখে নিতে হত। সবুজ? ব্যস, আলবাত মনিপুরি। সবজে রং হলেই কেন মণিপুরি, সদুত্তর কেউ জানে না। আর গঞ্জিকা। মণিপুরি? নাকি কাশ্মীরি? ওস্তাদরা দেখেই বলে দিতে পারত। শ্রীমানী মার্কেটের এক গুমটি থেকে আসত সুস্তি বিড়ি। সে-ছিল নেহাতই হোমিয়োপ্যাথির পুরিয়া।

বলতে গেলে, সেইসব বিবিধ ধোঁয়া পেয়ে জ্যান্ত হয়ে উঠেছিল উৎপলদার কবিতা। টুকরো-টুকরো পঙক্তি। ভাঙা কাচের মতো। সেসব পঙক্তির কোণকানাচে বহুমুখী ধার। কেউ হয়তো গেছে ছোটা সাজনের কাছে। ফিরে আসছে দেখলে বহুপ্রতীক্ষিত প্রাণের গহ্বর থেকে উচ্চারিত হত— ‘দূর থেকে হাত তোলো। যদি পারো জানাও সম্মতি।’ অর্থাৎ, পেয়েছ তো? আর সিঁড়ির ধাপে-ধাপে উচ্চাবচ হা-হা হাসি। এত রকমারি হাসির ধাক্কা আর কারো কবিতা দিতে পারেনি। সে-সব পঙক্তি একটু ভেঙেচুরে কত-যে কাজে লেগেছে, কত জটিল অর্থে হাসির দিকে গড়িয়ে গেছে সর্বনাশা জীবন, ভাবলে সেইসব কবিতা আর তার পঙক্তিগুলো ফের দেখতে ইচ্ছে করে। যেমন, দু-চার টান দিয়ে কেউ হয়তো ঝিমিয়ে। তার মুখের কাছে গিয়ে হাসির বিশুষ্ক রূপটি বেরিয়ে আসত— ‘বিষণ্ণতা, (আমরা) তোমারই সন্তান, তোমাকেই/ মাতৃজঠর ব’লে মনে হয়েছিল।’

দেশে ফিরে আসার পর উৎপলকুমার বসুও আমাদের হাস্যরোলে যোগ দিলেন। ‘আবার পুরী সিরিজ’ বেরোনোর পর তো হাসির তুফান! ‘লিরিক তুমি সরল বীণার কাঠ, তুমি দু’দিনের আয়ু বৈ নও,…’ বলা মাত্র হ্যা-হ্যা শুরু হত উৎপলদারও। এরকম কিছু পঙক্তি আজও মনে সেঁটে আছে। এক. “তুমি বিবাহিত, না-কি আনুষ্ঠানিক’ এই প্রশ্ন করেছিল প্রেত।” (পেত্নী মাসির গল্প।)। দুই. ‘খৃশ্চানীকে ভালোবেসে অত্যধিক হয়েছি খৃশ্চান’ (বাঙালির উনিশ শতক উঠে আসে!)। তিন. ‘তোমাকে পড়ে না মনে হে ঈশ্বর, হে উদরাময়!/ বাকি সব মনে পড়ে—’ (মহাপ্লাবনের পরের উপলব্ধি।)। চার. ‘তোমাকে কিছুক্ষণ ভালো লেগেছিল। তারপর নিয়নে বিদ্যুৎ/ সহসা জানাল ঐ টুথপেস্ট আরো ভালো, ঐ তেল, হাসির মেশিন,…’ (বাজার-অর্থনীতির গোড়ার কথা।)। পাঁচ. ‘প্রিয়তমা, তোমার দু’খানি চোখ/ হোমিওপ্যাথির মতো করুণানির্ভর’ (পরাধীন জাতির স্বদেশপ্রেম।)।

চারপাশের অবদমন আর নিষ্ঠুরতা আর অন্তর্লীন নল বেয়ে ভিতর-জলের নাগাড়ে চুইয়ে-পড়াকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা নয় এসব। বরং গ্যালারি-ভর্তি পেতে-রাখা ফাঁদে অবরুদ্ধজনের মশকরা। পরিত্রাণহীন ফাঁদকে অস্বীকার করা। হয়তো মূর্খতা। কিন্তু, সে-মূর্খতা তো ক্ষুদ্রতম গ্রহাণুও করে থাকে অতিকায় বৃহস্পতির গা ঘেঁষে যাওয়ার সময়!

সাতাত্তরের শুরু। উৎপলদা দেশে ফেরেননি তখনও। একদিন ভরা টেবিল। এসে দাঁড়াল দাউদ হায়দার। তখন সে যাদবপুরের ছাত্র। থাকে যোধপুর পার্কে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাড়ি। কী? না, বিবিসি-র সৈয়দ সামসুল হক এসেছেন। কবি। ওই যে ওই টেবিলে। সবার সঙ্গে আলাপ করতে চান। যদি তাঁর টেবিলে আমরা যাই। দ্রুত মতবিনিময়। এবং সমবেত সিদ্ধান্ত— এতটা যখন এসেছেন, ওঁকে আর-একটু আসতে হবে।

শুনে দাউদের অপ্রস্তুত হাসি— সে কী! উনি বয়োজ্যেষ্ঠ। এরকম বলা যায়? ফলে বিপুল টানাপড়েন। দর কষাকষি। শেষে রফা— কাউকে কারো টেবিলে যেতে হবে না। বরং সবাই চলুন প্রেসিডেন্সির সিঁড়িতে।

চার-পাঁচটা ধাপে বসা হল। সৈয়দ হকের বিলিতি জিনসে সিঁড়ির ধুলো লাগল। একে-একে সবার নাম জানতে চাওয়ার সময় পরের পর লম্বা সিগারেটও এগিয়ে এল। শেষে কবিতা শোনানোর আহ্বান আসতেই শুরু হল রাতকানা হাসি। এবং তিনিও বুঝলেন, যা বোঝার।

সেদিন গানে আড্ডায় হইহই হাসিতে সিগারেট-গঞ্জিকায় ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছিল অপরূপ এক ঝরনা। কারো মনেই ছিল না চালচুলোহীন স্পর্ধিত একদল তরুণের মাঝে বিবিসি-র ডাকাবুকো কোনো-এক মাঝবয়সীর উপস্থিতি, যিনি আবার বাংলাভাষার কবি ঔপন্যাসিক নাট্যকারও। কেননা, তিনিও একসময় নিজের ব্যাঘ্রচর্মাসনটি ফেলে এগিয়ে এসেছিলেন দেহাতি ঝরনার একেবারে কিনারায়। হয়ে উঠেছিলেন আড্ডারই একজন।

সেদিন ঝাঁকড়া চুলের দাউদও হয়ে উঠেছিল আড্ডার এক সদস্য। কিন্তু ওই যে, নিজেকে ভেবে নিয়েছিল সৈয়দ হকের স্বনিয়োজিত অনুগামী! আড্ডা গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা কখন দশটা ছুঁয়েছে, তবু বোঝার সেই ভুলটি সে মুছে নিতে পারেনি।

যাঁরা সত্যিই বড়ো– সে-তিনি পণ্ডিত হোন বা কবি, অথবা হোন দেশনেতা— নিজের বড়োত্বকে তারা অস্বীকার করেন বলেই বড়ো। কিন্তু অনুগামীরা যে কিছুতেই সে-কথা তাঁদের ভুলতে দেন না!

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা।

আরও পড়ুন:

রবিবার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More