ব্লগ: গোমড়াথেরিয়াম: নামাবলী

0 ১২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সন্দীপ বিশ্বাস

সেদিন একটা বহু পুরনো কাগজ বাড়িতে খুঁজে পেলাম – আমার মেয়ের বোধহয় তৃতীয় জন্মদিনের অতিথি-তালিকা, আমার নিজের হাতে বাংলায় লেখা। নাম ও তারপর একটা ক’রে সংখ্যা, অর্থাৎ কতজনের আসবার সম্ভাবনা। তখন নিউ জার্সিতে থাকি – প্রথম বিশ্ব  বলে কথা, তাছাড়া আমাদের পরিচিতের সংখ্যাও ছিলো প্রচুর – নয় নয় ক’রে প্রায় চল্লিশটি পরিবারের নাম সেখানে লেখা। বহু পুরনো স্মৃতি… কতো লোকের চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠলো, তাদের অনেকের সাথেই দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ নেই, বা থাকলেও অতি যৎসামান্য, হয়তো বা শুধুই বৈদ্যুতিন। দুটো নামে চোখ আটকে গেলো – প্রথমটা  “সিসুটি”। চেহারা এবং নামের কারণটাও সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেলো।এই দম্পতির সাথে কিভাবে যেন আলাপ ও ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো। তাদেরও একটি শিশুকন্যা ছিলো, তো শ-এর দোষওয়ালা সেই মহিলা তার গল্প করতো অনেকটা এইভাবে (একাধিকবার নিজের কানে শোনা) … “অঘোরে ঘুমোচ্ছিলো বুঝলে। দেখে এত মায়া হলো ! আহা, সিসুটি !” এরপরেও নাম না দিলে নেহাতই অভদ্রতা করা হয়… আমাদের একটা দায়িত্ব আছে তো ? দ্বিতীয় নামটা আরও চমকপ্রদ… লেখা আছে “ছোটলোক – ৩”। গভীর গবেষণায় বসলাম দুজনে… কে এই ছোটলোক এবং তৎসত্ত্বেও কেনই বা তারা সপরিবারে নিমন্ত্রিতের তালিকায় জায়গা পেয়েছিলো কিছুতেই আর মনে পড়ে না ! অনেক চেষ্টায় স্মৃতির দরজা খুললো এবং এক দম্পতির চেহারা ভেসে উঠলো যারা ছিলো দৃষ্টিকটু রকমের কিপটে – নিজগুণে ঐ নাম অর্জন করেছিলো।

আমাদের পরিচিতের মধ্যে, বিশেষ করে স্কুল-কলেজ-হস্টেলে আমরা এরকম বহু লোক দেখতে পাই যাদের কোনো-না-কোনো বিশেষ নাম আছে। সেই নামেই তাদের বেশি লোক চেনে, এমনকি অনেক সময় আসল নামটা প্রায় ভুলতে বসে সবাই। ব্যাঙ্গালোরে পড়তে গিয়ে আলাপ, বিশেষ ঘনিষ্ঠ বন্ধু – তাকে “বং” নামেই সবাই চেনে, এমনকি তার স্ত্রীও। একবার আমাদের আর এক বন্ধু অন্য বন্ধুদের নিয়ে একটা পার্টির আয়োজন করেছে, সবাইকে জানালো যে পার্টিতে ঢোকার পাসওয়ার্ড হলো বং-য়ের আসল নাম – সেটা বলে ঢোকার মতো একজনকেও পাওয়া যায় নি সেদিন। অবাঙালীর কাছে আমরা সবাই বং, তবুও দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের এই ছেলেটি এতটাই ভীষণরকমের বাঙালী যে হস্টেলে ঢোকার কিছুদিনের মধ্যেই জাতি ভাষা নির্বিশেষে সর্বজনসম্মতিক্রমে এই নাম অর্জন করেছিলো।

ছোটবেলায় আমাদের ভবানীপুর পাড়ায় এক ভদ্রলোক ছিলেন – তিনি কেন জানি না “পচা আলু” বললে ভীষণ ক্ষেপে যেতেন । পাড়ার বিষ-ক্যাওড়া ছেলেপিলের দল তাকে রাস্তায় দেখামাত্র বিভিন্ন সুরে ঐ শব্দদুটি বলতে বলতে পেছনে লাইন লাগিয়েছে, আর তিনি অবিরাম অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছেন… এই দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভাসে! স্কুলের এক বন্ধু, ছোটখাটো চেহারার জন্য আমরা তাকে “চড়াইপাখি” ব’লে ডাকতাম… পরে শুনেছি আই-আই-টিতে গিয়ে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়ে “বোতল” নামে ভূষিত হয়েছিলো। আর একজন, উচ্চমাধ্যমিকের সময় – ক্লাস টিমের হয়ে ফুটবল খেলতে নেমেছে, তো তার জার্সিতে একটা বড় ফুটো ছিলো – সেই থেকে তার নাম হয়ে গেলো “ছ্যাঁদা”, শেষদিন পর্যন্ত সেই নামেই তাকে ডাকা হতো।

অনেকসময় নাম নিয়ে অসুবিধাতেও পড়তে হয়। বড়বেলায় হস্টেলে এক অনেক সিনিয়র দাদা, তার নাম শুনলাম নাকি “সখী”, আসল নামটা কেউ আমায় বলেনি । দিব্যি বড়সড় মানুষ, তাকে তো আর নাম ধরে ডাকা যায় না – তো আমি তাকে সখীদা ব’লে ডাকায় ভীষণ রেগে গেলো…” হয় তুমি আমায় আমার আসল নামে দাদা ব’লে ডাকবে (র‍্যাগিংয়ের মতো শোনালো কথাটা), নয়তো সখী ডাকবে, সখীদা কক্ষনো বলবে না”। আমার ব্যক্তিগত ধারণা – কোনোরকম লিঙ্গবিকৃতি সে এক্কেবারেই সহ্য করতে পারতো না! স্কুলের বন্ধু, লম্বা ফর্সা চেহারা, তার নাম কোনো অজ্ঞাত কারণে… “নেংটি”। আজও জানি না সেই নাম কিসের ইঙ্গিত বহন করে – গৃহস্থের আতঙ্ক ছোট্টখাট্টো চারপেয়ে সেই প্রাণীটি, না কি পুরুষের লজ্জানিবারণের শেষ সম্বল বস্ত্রখণ্ডখানি! শুনেছি তার ছেলে একটু বড় বয়েসে খুব সরল মনে বাবার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেছিলো… “তোমরা আমার বাবাকে ওই নামে ডাকো কেন” ? শিশুমনের সেই কৌতুহল সেদিন কিভাবে মিটেছিলো আমার জানা নেই।

বিভিন্ন সময়ের এতরকমের নাম মাথায় আসছে যে এই বিষয় সহজে শেষ হওয়ার নয় । কিন্তু স্থানাভাব, তাই আপাততঃ থামি । আমার নিজেরও বেশ কিছু নাম ছিলো – সেই কথা এবং প্রসঙ্গের বাকিটা অন্য কোনো সময় বলা যাবে।

ছোটবেলায় স্কুলের হস্টেলে অনেকগুলো বাঁড়ুজ্যে ছিলো – তাদে র মধ্যে একজন, প্রথমে সংক্ষেপ হয়ে নাম দাঁড়ালো “বাঁড়ু”। তারপর অচিরেই উ-কারটা আ-কারে পরিবর্তিত হয়ে ভদ্রসমাজে উচ্চারণের অযোগ্য একটি নাম হ’লো তার । তখন আমাদের সেই বয়েস যখন তথাকথিত খারাপ শব্দ ব্যবহার করতে পারলে বেশ একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করা যেত। বোধহয় সেইজন্যেই… হস্টেলের লম্বা করিডরে চিৎকার ক’রে কেউ সেই নামে তাকে ডাকছে, এরকম ঘটনা বিরল ছিলো না। আজ এত বছর পরেও এই কথা লিখতে গিয়ে লজ্জায় কান পর্যন্ত বেগুনী হয়ে গেলো আমার। সত্যি সত্যি!

(ব্যাঙ্গালোর নিবাসী, পেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More