বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৩
TheWall
TheWall

দিল্লির চিঠি /৩

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

ক্ষমতার অলিন্দে

দিল্লিতে বসে থাকব অথচ ক্ষমতার কথা আসবে না?

নভেম্বর ২০১০, এপ্রিলে স্পেনের এক্সপোয়েসিয়া কবিতা উৎসবে আলাপ হওয়া আংখেল গিন্দা (Ángel Guinda, জন্ম ১৯৪৯) এলেন। আংখেল সমসাময়িক স্পেনের সবচেয়ে পরিচিত পাঁচজন কবির একজন।

সঙ্গে এল ওঁর পুত্রপ্রতিম ছাত্র দাবিদ ফ্রান্সিস্কো। দুজনের সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব প্রবল। এতটাই যে ওঁরা আমাকে দেখতে চলে এলেন দিল্লিতে। আংখেল এসেছেন জেনে আমার ইন্সটিটিউট নিজে থেকে বাকি ব্যবস্থা করে দিল, এমন কি এক আগ্রা ভ্রমণও (এমনটা কি আমাদের দেশে ভাবা যায়? ধরা যাক উৎপলকুমার বসু এসেছেন জানল স্পেনের ভারতীয় দূতাবাস, তারা কি কিছু করবে?) আমি আংখেলকে প্রশ্ন করলাম আপনি এই সাহায্য নিলেন কেন? আপনি না অপ্রাতিষ্ঠানিক, চিরকাল পুরস্কারের ছক থেকে দূরে থাকা লিটল ম্যাগাজিনের কবি? আংখেল আমাকে বললেন সরকার খারাপ হলে কি আমি মেট্রো বা বাসে চড়া বন্ধ করে দেব? এটাতো একটা সার্ভিস। পুরস্কারের সঙ্গে এর একটা তফাৎ আছে। আমাকে পুরস্কার দেওয়া হলে কি করব জানি না, কিন্তু পুরস্কার পাবার জন্য আমার নিজের মত পাল্টে ফেলতে পারব না।

আর এই কথা শুনে আমার শুরু হল দ্বিতীয় আংখেল পরিক্রমা। তখনও অব্দি তিনি কোনও সরকারি পুরস্কার পাননি। পেলেন ২০১২ সালে। আরাগোন রাজ্যের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার। আরাগোন তাঁর জন্ম রাজ্য। সে রাজ্যের রাজধানী সারাগোসা তাঁর প্রথম যৌবনের নেশার শহর। কিন্তু তাকে ছেড়েছেন ২৩ বছর বয়সে। এসেছেন মাদ্রিদ, থেকে গেছেন এখনও অব্দি। পুরস্কার ভাষণে বললেন সারাগোসাতে তিনি উন্মাদ হয়ে যেতেন। একটা ছোট সাহিত্য জগৎ তার ক্ষমতার খেলা, এমনকি দেখা যাচ্ছিল কবিরা স্বৈরাচারী শাসক ফ্রাংকোর পক্ষ নিচ্ছেন। এই সেই ফ্রাংকো যার সেনারা হত্যা করেছে গার্সিয়া লোরকাকে।

সেই সময়ের আংখেলের কাছে মাদ্রিদ শুশ্রূষা। যদিও সে সামরিক শাসনকালে কমিউনিস্ট পার্টি করার দায়ে জেলে গেলেন। পরে স্তালিনকাণ্ড স্পষ্ট হওয়ায় ছাড়লেন দল। তারপর থেকে আজীবন থেকে গেছেন বিরোধী দলের ভূমিকায়। আদ্যন্ত মার্ক্সবাদী, কিন্তু কমিউনবাদী নন। যখন যেখানে অবিচার সেখানে তিনি বিদ্রোহী জনতার সঙ্গে।

আংখেল ও দাবিদ, সারাগোসার এক কাফেতেরিয়ায়, ২০১৪।

ভুলে গেলে চলবে না স্পেন পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলোর একটা। সেখানকার সোশালিস্ট পার্টি সামাজিক ন্যায়ের জন্য ইউরোপে বিখ্যাত। কিন্তু অবিচার থাকে। আংখেলের মত মানুষরা বাম বা দক্ষিণ যে দলই ক্ষমতায় আসে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন দরকার মত। দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে তো লড়াই চিরকাল, যেমনটা আমাদের বিজেপির বিরুদ্ধে। ইউরোপের সাম্প্রদায়িকতার চেহারা আলাদা। শরণার্থী, ভেলায় চেপে আফ্রিকা থেকে আসতে গিয়ে মৃত্যু আছে। আংখেল কবি ও নাগরিক হিসেবে বারবার প্রকাশ্যে, হয়ে উঠেছেন কবিতামানুষের বিবেক। ফ্রাংকোর হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকে তাঁকে কোনও রাজনৈতিক পতাকার তলায় দেখা যায়নি। মাদ্রিদের শ্রমিক মহল্লার সরকারি ইশকুলে পড়িয়েছেন সাহিত্য। গণতান্ত্রিক স্পেনের নানা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডাকলেও তিনি কখনওই ইশকুল ছাড়েননি। আস্তে আস্তে তাঁর কবিতা মহীরুহ হয়েছে। তিনি ছাড়েননি তাঁর সাধের ছোট প্রকাশনা ওলিফান্তে। যে কিনা তাঁর হাত ধরে আজ স্পেনের অন্যকবিতার আশ্রয়। আমি নিজে চোখে দেখেছি কীভাবে আংখেলের কবিতাপাঠে হল ভরে যায়, মাটিতে বসে থাকে লোকে। মেলাতে পারিনি। কীকরে একজন কবি এত নির্মোহ হয়ে নিজের কাজ করেন? আমি স্বভাবলোভী বাঙালি কবি। আমার ঘাড় সর্বদা নামানো। ক্ষমতাবান মানুষ দেখলে আমি বাঁ হাত দিয়ে ঘাড় চুলকোই। আমার লেখার কারণ তো আমি সামাজিকভাবে নিজেকে পরিচিতি দেব বলে। আমি তো চাই আমি কী লিখি লোকে না জানুক, আমার নাম যেন লোকে কবি হিসেবে জানে। আর তাই তো আমার পুরস্কার মানপত্র সাদা ফুল অমর বিধবা। আমি কীভাবে বুঝব আংখেলের আচরণ! যদিও মণীন্দ্র গুপ্তকে দেখেছি সামনে থেকে। সেই ২০১০ এর গাঢ় নম্ভেম্বরের রাতে নিজামুদ্দিনের দরগায় আমির খুসরুর কথা শুনে (তিনি ৫ জন সুলতান যাঁরা পরস্পরকে হত্যা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাঁদের সভাকবি ছিলেন) আংখেল তাঁর ৫ফিট ৫ইঞ্চির শরীরে হেঁড়ে হাসি খেলিয়ে বলেছিলেন “মালটার গোটা জীবন হেব্বি চাপের” ।

(শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।)

Share.

Leave A Reply