শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

ব্লগ : ছাতিমতলা/৬ বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল

আবীর মুখোপাধ্যায়

ঠিক আজকের মতো সে দিন বৃষ্টি নেমেছে অঝোরে। বৃষ্টির বন্দিশে ভিজছে খোয়াই, কোপাই, ভুবনডাঙা।

জল রঙে আঁকা, শান্তিনিকেতনের পথ ও প্রান্তর। উত্তরায়ণ থেকে বৃষ্টি ভেজা শালবনের ভিতর দিয়ে দৌড়ে আসছেন কবির ভৃত্য মহাদেব। নন্দলালের কলাভবন, কিঙ্করের সাঁওতাল রমণি ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে ঢুকে পড়ল রবিঠাকুরের গানের স্কুলে। সঙ্গীতভবনে। ক্লাসে ঢুকে, তবে সে থামল।

অমনি তার ভিজে তালপাতার ছাতি থেকে জল ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে! সরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সে বলল,

‘‘বাবামশাই বলিয়েছে!’’

‘‘গুরুদেব!’’

সবে একটা নতুন গৎ ধরে ছিলেন, সেতার রেখে উঠে দাঁড়ালেন, সঙ্গীতভবনের নতুন মাষ্টারমশাই সুশীলকুমার ভঞ্জচৌধুরী। মহাদেবের সঙ্গেই চললেন হনহনিয়ে কবির কাছে। যেতে যেতে তাঁর মনে পড়ল, দিন কয়েক আগেই কবি তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, “এবারে বর্ষামঙ্গলে যন্ত্রে আমার গান না বাজিয়ে তোমার গৎ বাজাবে। তুমি বর্ষার কোনো রাগের গৎ তৈরি করো।” সেই মতো গৎ তৈরি করে কবিকে শুনিয়েওছিলেন। শুনেই কবি রিহার্সালের পরে গৎ-টার বোল লিখে নিয়ে গেলেন ওয়েস্ট পেপার বাকেট থেকে তুলে নেওয়া একটা ব্রাউন খামে!

কবির ঘরে ঢুকেও সেটাই ভাবছিলেন সুশীলকুমার। কী জানি গুরুদেবের হয়তো পছন্দ হয়নি!

‘‘বোসো। এই নাও তোমার গান!’’

রবীন্দ্রনাথের কথায়, তাঁর হাতে সেই ব্রাউন খামটা দেখে চমকে উঠলেন সুশীলকুমার। দেখলেন, তাঁর তৈরি সেতারের তান-তোড়-ঝালায় গাঁথা গৎ-এর বোলের নীচে নীচে লেখা বর্ষার নতুন একটা গান। কোন গান?

দেশ-মল্লারে ‘এসো শ্যামল সুন্দর।’

পরের বারও বর্ষামঙ্গলের আগে ডাক পড়ল সুশীলকুমারের। কবি তাঁকে মল্লারে গৎ তৈরি করতে বললেন। তৈরি হল গৌড় মল্লার, মেঘ মল্লার, মিয়া কি মল্লারের নতুন নতুন গৎ। গৌড় মল্লারে, ত্রিতালে কবি গাঁথলেন “মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো” গানটি। এরপরেই বিরতি! একদিন সেতারিকে ডেকে বললেন,

‘‘না হে! ধার করা সুরে গান নিয়ে নানা কথা রটছে!’’

সুশীলকুমার লিখছেন, ‘‘পাছে আমি মনে দুঃখ পাই সেজন্য আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, “পরে সময়মতো তোমার অন্য গৎগুলির গান লিখে দেব!’’

সে গান আর লেখা হয়নি!

এমন করে কতো যে গান লেখা হয়নি! কতো গান যে লেখা হল বাদল দিনের গগনতলে বসে।

মেঘলা দিনের শান্তিনিকেতনে বসে আমার সেই সব গানের কথাই মনে হয়। সকাল থেকে রবিঠাকুরের গানে পেয়েছে। এমন মেঘ দিনে বর্ষার গানে গানেই দিন গড়াচ্ছে। বন্ধুনি হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করছে। তার কথার ফাঁক-ফোঁকরে ঢুকে পড়ছে মেঘ-গর্জন। বৃষ্টির বোল-চাল।

সে হয়তো লিখল, এখানে শুরু হল… তোমার ওখানে?

রিপ্লাই দিলাম, মেঘ ঘনিয়ে এল ময়নাপাড়ার মাঠে।

সে । ইশশশ… ভিজিয়ে দিলে সব। কেন যে অমন গানের কথা বলো! সারাক্ষণ ঘুরবে এখন মনে মনে।

আমি। কালো? তা সে যতোই কালো হোক।…

এখানে এখন ছুটির দিন-রাত্রি। সকালের মেঘ ভিজিয়ে দেয় দুপুরের দালানকোঠা। বিকেল থেকে রাত্রি কোপাইয়ের দিক থেকে আরও আরও নতুন মেঘ এসে ঝমঝমিয়ে ভাসিয়ে দেয় সারা শান্তিনিকেতন।

রাস্তা-ঘাট প্রায় ফাঁকা।

এখানে-ওখানে পথের বাঁকে জল জমেছে। এমন দিনে নিভৃত কোণে বসে, কবির বর্ষার গান লেখার গল্প পড়ি-লিখি। সে দিনও মেঘ। শ্যামল মেঘের ছায়ায় ঢাকছে খোয়াই, শালবন, সাঁওতাল পল্লি। মেঘ দু’কুল ছাপানো কোপাইয়ের জলে। মেঘ দূরে দূরে প্রান্তরের হাওয়ার গানে, পদ্মার আদিগন্ত চরের বৃষ্টি ধোওয়া জুঁই স্মৃতিতে! মেঘ সিংহসদনের মাথায়, শান্তিনিকেতন বাড়ির কার্নিসে।

মেঘ ঢুকছে উদয়ন বাড়ির দরজা-জানলা-চিলেকোঠার ভিতর দিয়ে কবির লেখার ঘরদোরে।

এমন মেঘজর্জর সকালে লিখতে বসে, টেবিলে একটা চিরকুট দেখেই, প্রিয় ভৃত্যকে ডেকে বকছেন রবীন্দ্রনাথ!

‘‘বলি চুপ করে আছিস কেন?’’

‘‘আজ্ঞে!’’

‘‘এই যে বলিস আমি বড়লোক। ‘দ্বারকানাথের লাতি বলে নয়, নেকার জোরে বড়লোক!’’’

কবির বকা খেয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে বনমালী। কবি বলে চললেন।

‘‘তুই যাকে-তাকে এখানে আসতে দিস কেন? আমার বুঝি অন্য কাজ নেই আর! তোর জন্য আমাকে কি শেষে ফরমাশি গান লিখতে হবে…!’’

এইবার বনমালীর একটু একটু হাসি পেয়েছে। তার যেমন স্বভাব! ফিক করে এই বুঝি সে হেসে ফেলল!

সে জানে তার বাবামশাই একটু পরেই আবার তাকে ডাকবে ‘লীলমণি।’ তার কুচকুচে কালো রঙের জন্য কৌতুক করে হয়তো বলবে, ‘‘চল বোম্বাইতে গিয়ে থাকি এবার হতে, তোতে আমাতে। সেখানে রঙ ফর্সা হয় কিনা!’’

কতো গান বর্ষার।

গীতবিতান হাতে নিয়ে আমার প্রথম মন যায় কবির বর্ষার গানেই। এই বইতে কত গান বর্ষার? ‘গীতবিতান’-এ কবির বর্ষার গানের সংখ্যা ১১২। ‘শাঙনগগনে ঘোর ঘনঘটা’ থেকে ‘এসো ওগো শ্যামছায়াঘন দিন’ পর্যন্ত এই ১১২টি গান ৬৭ বছর ধরে কবি লিখেছিলেন। ‘গীতবিতান’-এ প্রকৃতি পর্যায়ের ২৬ সংখ্যক গান থেকে যার শুরু। আর শেষ ১৪০ সংখ্যক গানে। শেষ কি?

না। গীতবিতানে বর্ষা পর্যায়ে নেই, কিন্তু শেষ বাদলের গান লিখলেন তারও পরে। মৃত্যুর এগারো মাস আগে! ২০ ভাদ্র, বাংলা ১৩৪৭। সে গান, ‘শ্রাবণের বারিধারা বহিছে বিরামহারা।’ দীর্ঘ কবি-জীবনে, এমন বহু বাদ‌লের গান রয়েছে, যে গানগুলি গীতিবিতানে বর্ষা পর্যায়ে সংকলিত নয়। সে সব গান কখনও প্রেম, কখনও প্রকৃতি-র গানে সংকলিত। সব মিলিয়ে সংখ্যা দেড়শোরও বেশি! এসব নিয়ে চর্চাও কম হয়নি।

ফের কবির গান লেখার কথায় ফিরি।

রবীন্দ্র জীবনের প্রথম বর্ষার গানটি লিখেছিলেন পনের বছর বয়সে, কলকাতায় বসে! ‘স্মৃতির পটে জীবনের ছবি’ আঁকতে গিয়ে লিখেছেন প্রথম দিনের কথা। সে দিনও খুব মেঘ! মনকেমনের দুপুর পড়ে আসছে।

গঙ্গার উপর থেকে সজল মেঘ সরছে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দিকে।

রবি ‘সেই মেঘলা দিনের ছায়াঘন অবকাশের আনন্দে বাড়ির ভিতরে এক ঘরে খাটের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া’ একটা শ্লেটে লিখলেন ‘গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে!’ লিখে লিখেই অদ্ভূত আনন্দ হচ্ছিল তাঁর মধ্যে! দিন কয়েক পরেই বিদ্যাপতি-গোবিন্দদাসের ব্রজগাথার শব্দ-সংকেতে লিখলেন জীবনের প্রথম বর্ষার গানটি। ‘শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা।’ ‘গীতবিতান’-এর পাতায় পাতায় চিত্রিত এমন অপূর্ব সব বাদল দিনের গানের ছবি। ‘মেঘছায়ে সজলবায়ে’, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’, ‘গোধূলি গগনে মেঘে’, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’…!

এখন শুনছি ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’, লেখার টেবিল থেকে সীমান্তপল্লির পথ ‌দেখা যাচ্ছে। আকাশ কালো হয়ে রয়েছে। বৃষ্টির ধারা কখনও বাড়ছে। কখনও টিপিস টিপিস। রেলিংয়ের বৃষ্টির বন্দিশ।

যে গানটি শুনছি, তার কথাই বলি। বনমালিকে বকতে বকতে একসময় মেঘের ধূসর ডানার দিকে চেয়ে উদাস হলেন রবিঠাকুর। চাঁপার গন্ধে ভুরভুর চারপাশ।

একটু একটু করে যেন শ্যামমল্লার রাগের আলাপ-বিস্তার ছড়িয়ে পড়ছে বকুলবীথি, ছাতিমতলা, শ্যামলীবাড়ির উঠোনে। কাগজের চিরকুটটা তুলে কবি পড়লেন ‘বেহাগ’ কথাটা। হাতের লেখা দেখে চিনতে পারলেন। বুঝলেন, ভোরবেলা বনমালীর সঙ্গে যোগসাজশ করে এ নির্ঘাৎ শৈলজার কীর্তি!

অনতিপর বেহাগেই গাঁথলেন বর্ষামঙ্গলের জন্য নতুন গান, ‘আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে।’

তার ঠিক দু’একদিন আগেই জল ভরা গগনতলে বসে লিখেছেন ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে।’ আরও একটা গান মল্লারে, ‘বাদল দিনে প্রথম কদমফুল।’

নতুন গান পেয়ে খুশি শৈলজারঞ্জন মজুমদার। সে বার শান্তিনিকেতনে বর্ষামঙ্গল পরিচালনার ভার যে ছিল তাঁরই হাতে! এরপরে নিত্য তিনি চিরকুট রেখে আসেন, কবি লিখে দেন নতুন নতুন বর্ষার গান। স্বরলিপি করে নেন শৈলজা।

দু’জনের মধ্যে রাগারাগিও চলছে!

দশটি গান লেখার পরে কবি ছুটি চেয়ে বলছেন, ‘‘একের পরে শূন্য বসে গেল, এবার শেষ।’’

যুক্তি খুঁজে শৈলজা বলছেন, ‘‘শূন্যের কোনও মূল্যই নেই, একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন!’’

ফের আসে চিরকুট।

কোনওদিন লেখা ‘কীর্তন’, তো কোনওদিন ‘বাউল’, ‘বাগেশ্রী’, ‘টপ্পা’-র অনুরোধ।

জীবনের প্রান্তবেলায় কবি গাঁথলেন নানা রাগে বর্ষার গান। ইমন কল্যাণে ‘এস গো, জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি’, মেঘমল্লারে ‘শ্রাবণের গগনের গায়’, কাফি ঠাটে ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে’, হাম্বিরে ‘স্বপ্নে আমার মনে হল’, মূলতানে ‘শেষ গানেরি রেশ নিয়ে যাও চলে’, ভৈরবীতে ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’, খাম্বাজে ‘এসেছিনু দ্বারে তব শ্রাবণরাতে’, মল্লারে ‘নিবিড় মেঘের ছায়ায়’, বাউল সুরে ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’, বাগেশ্রীতে ‘সঘন গহন রাত্রি’, পিলুতে ‘ওগো তুমি পঞ্চদশী!’

তুমুল বাদল দিনে কবি আলাহিয়া বিলাবলে, ‘আজি মেঘ কেটে গেছে সকালবেলায়।’ একসময় কবি কেবলই থামতে বলছেন। বলছেন, ‘‘আমাকে অন্য কাজে মন দিতে হবে, এবারে তুমি থামো। তুমি বুঝতে পারছ না, তোমার ওপর আশ্রমের অনেকেই অসন্তুষ্ট হচ্ছেন! বর্ষামঙ্গলের দেরিও তো হয়ে যাচ্ছে।’’ হাতজোড় করছেন শৈলজারঞ্জন! ফের পাতলেন রেকাব, ‘‘ষোলোকলায় পূর্ণ করে দিন, আর চাইব না!’’

একটি-দুটি নয়, জীবনের প্রান্তবেলায় রবিঠাকুর সে বার লিখলেন সাত দিনে ষোলোটি গান!

(আবীর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৮১ সালে। ছেলেবেলা কেটেছে অজয়ের স্রোত ছোঁয়ানো বীরভূমের বেজড়া গ্রামে। স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতে। সাংবাদিক হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। কাজ করেছেন অন্য সংবাদপত্রেও। পদ্য-গদ্য প্রকাশিত হয়েছে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘প্রতিদিন’, ‘উনিশ কুড়ি’, ‘সুখী গৃহকোণ’, ‘নতুন কৃত্তিবাস’-সহ নানা পত্র-পত্রিকায়। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মুখ ঢাকো করতলে’, ২০১৬-তে গদ্যগ্রন্থ ’১৫ মেমারি লেন’। এ ২০১৬ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’ । ১০১৮-তে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘পৌষমেলা : স্মৃতির সফর’। এখন ‘মাসিক কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য তিনি। শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজস্ব নিখিল বইওয়ালা বুক ক্যাফে।)

Leave A Reply