শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

ব্লগ: ঐরাবতের মতো উঠে আসে পরাজয়

অংশুমান কর

‘গরীব মানুষ খায় এরকম ২০টা ডিশের নাম করো’, আমাকে বলেছিল কাজলদা, নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ওদের ৩৫ তলার ফ্ল্যাটে ব্যালকনির পাশে একটা ছোট্ট রকিং চেয়ারে বসে। নীচে, অনেক নীচে মায়াবী তরঙ্গ তুলে তখন বয়ে চলেছে কল্লোলিনী নিউইয়র্ক, যে তরঙ্গ দৃশ্যমান কিন্তু শব্দহীন।

#

কাজলদার প্রশ্ন শুনে আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেছিলাম। কাজলদা এই রকমই। ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ অ্যাটলান্টিক সিটিতে হোটেল শেরাটনে গ্যারি দত্তের রুমে। খুব স্মার্টলি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘হাই, আমি কাজোল’। হ্যাঁ, ‘জ’-এ একটু বেশি ও-কার লাগিয়েই কাজলদা ওর নাম উচ্চারণ করেছিল। কাজলদার স্ত্রী মৌসুমীদি আমাদের অনেকদিনের বন্ধু আর ‘মায়ের মতোই ভাল’ অভিভাবিকা।  প্রথম আলাপের পর দ্রুত কাজলদাও হয়ে উঠল আমার অভিভাবক। পরে দেখলাম  শুধু আমার নয়, আমেরিকায়  যেসব বাঙালি কবি-লেখক-শিল্পীরা যান যে কোনও সংকটে তাঁদের অনেকেরই পরিত্রাতা কাজলদা-মৌসুমীদি। এবারই তো যে উৎপাত ওদের ৩৫ তলার ফ্ল্যাটে সুবোধদা, তিলোত্তমাদি, শ্রীজাত, দূর্বা (মাঝে মাঝে যোগ দিচ্ছিল নিউইয়র্কে পিএইচডি করতে যাওয়া কন্ঠে সরস্বতী ধারণ করা সাহানা) আর আমি করেছি—তা হাসিমুখে সহ্য করা কাজলদা-মৌসুমীদির পক্ষেই সম্ভব। ছোট্টখাট্টো চেহারার কাজলদার  চোখে নীল চশমা।  প্রায়ই পরনে থাকে বাহারি কোট। প্রথম দেখায় যে কোনও বিখ্যাত আমেরিকান ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট বলে ভুল হতেই পারে। ছিল অর্থনীতির অধ্যাপক। চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন একটি বড়সড় সংস্থায় উচ্চপদে আসীন। পড়ে নানা দেশের এমন সব কবিদের কবিতার বই যাঁদের অনেকের আমি নামই শুনিনি!

#

কাজলদার প্রশ্ন শুনে প্রথমে খানিকটা ঘাবড়ে গেলেও আমি কড় গুনে গুনে বলতে শুরু করলাম, ‘পান্তাভাত, কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ…’। কাজলদা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তিনটে মিলে একটাই ডিশ হল’।  আমি আবার শুরু করলাম, ‘আলুর চোকলা ভাজা, গেঁড়ি-গুগুলি, কলমি শাক, আর আর…’ ব্যস, আমার দৌড় শেষ। আমি কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম কাজলদা-মৌসুমীদির ফ্ল্যাট জুড়ে ভারতবর্ষের নানা লোকশিল্প মেলা থেকে কেনা গ্রামীণ শিল্পীদের  শিল্পকর্ম। ভারতবর্ষের গ্রামের গরীব শিল্পীদের হাতের জাদু আমার চোখে মায়া-কাজল বুলিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু অসাড় হয়ে আসছিল আমার চৈতন্য, আমাদের দেশের গ্রামের গরীব মানুষ যে ঠিক কী কী খায়—আমি মনেই করতে পারছিলাম না। কাজলদা বলল, ‘দোষ তোমার নয়। আমিও ওই চার-পাঁচটার বেশি খাবারের নাম মনে করতে পারছি না, তাই  রেস্টুরেন্টটাও খোলা হচ্ছে না’। ‘রেস্টুরেন্ট?’ আমি নড়েচড়ে বসলাম। কাজলদা জানাল যে, ওর অনেকদিনের শখ আমেরিকার বড়লোকদের জন্য ও বানাবে একটা রেস্টুরেন্ট যেখানে চড়া দামে বিক্রি করা হবে ভারতের গরীব মানুষের খাবার। শুনে আমি চমৎকৃত হলাম আর আমার মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের বরাবাজার হাইস্কুলের ক্লাস ফাইভের এক ছাত্রের কথা। আমার মনে হচ্ছিল নীল চশমার আড়ালে থাকা কাজলদার দুই চোখ অবিকল আমার সেই আঠেরো বছর আগের ক্লাস ফাইভের ছাত্রটির চোখ; হুবহু এক।

#

তখন আমি সদ্য এমএ পাশ করে শিক্ষকতা করছি পুরুলিয়ার বরাবাজার হাইস্কুলে। বিষয় ইংরেজি কিন্তু ক্লাস নাইন আর ফাইভে পড়াই বিজ্ঞান। ফাইভে আমার ক্লাস ছিল ঠিক টিফিনের পরে। পঞ্চম পিরিয়ড। কিছুদিন ক্লাস নেওয়ার পর দেখলাম একটি ছেলে প্রায়ই আমার ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছে। রোগা ডিগডিগে চেহারা, কিন্তু বড় বড় দুই চোখে যেন সাত সমুদ্র তেরো নদী পারের কোনও দেশের অঞ্জন।  আমি রেজিস্টার ঘেঁটে দেখলাম যে, ফোর্থ পিরিয়ড পর্যন্ত ছেলেটি থাকছে স্কুলে, তারপর আর থাকছে না। মানে, আমার ক্লাস সে করছে না। আমার শিক্ষকের ‘ইগো’তে লাগল—ঘা খেল আমার অহং।  আমি খুঁজে বের করলাম কোন গ্রামে ওর বাড়ি তারপর ওর এক বন্ধুকে জানালাম যে, কাল ওকে অবশ্যই থাকতে বলিস ক্লাসে, নইলে কপালে দুঃখ আছে। পরের দিন এল সেই ছাত্র। আমি যতই তাকে জিজ্ঞেস করি, কেন সে ফিফ্‌থ পিরিয়ড থেকে ক্লাস আর করছে না, ততই সে মুখে আরও জোরে কুলুপ লাগাতে থাকে।  জেদ চেপে যায় আমার। মনে হয়, আচ্ছা ঢ্যাঁটা তো! আমার দুই আঙুল উদ্যত সাঁড়াশির মতো এগিয়ে যেতে থাকে ওর পিঠের সঙ্গে মিশে যাওয়া পেটের দিকে।  এবার ও কেঁদে ফেলে; বলে, ‘খিদা পাঁয়’। তারপর থেমে থেমে যা বলে তা থেকে আমি বুঝি যে, দিনে দু’বেলা অন্নসংস্থানের উপায় নেই ওদের—জলখাবার তো দূরের কথা, এমনকি জোটে না দুটো মিল। তাই রাত আর দিনের মাঝামাঝি তিনটে নাগাদ একবারই খায় ওরা।  ওর গ্রাম স্কুল থেকে বেশ খানিকটা দূরে। হেঁটে যেতে সময় লাগে। তাই টিফিনের পর ও চলে যায়, খিদের সঙ্গে লড়াই করতে পারে না। শুনে আমার উদ্যত সাঁড়াশির মতো আঙুলগুলি হারিয়ে ফেলে ওদের দংশন ক্ষমতা,  স্নেহের চামর হয়ে ওরা তখন ঘুরে বেড়ায় দশ বছরের রুক্ষ বাদামি চুলে। যে সময়ের কথা বলছি, তখনও মিড ডে মিল চালু হয়নি। এখন হয়েছে। অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ তো যে তিমিরে ছিলেন, সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন। ক’দিন আগেই তো ওই পুরুলিয়াতেই অনাহারে মারা গেলেন এক মহিলা!

#

সম্বিত ফিরে এল কাজলদার ডাকে। কাজলদা আমাকে বলল, ‘চার-পাঁচটা ডিশ দিয়ে তো আর একটা রেস্স্টুরেন্ট খোলা যায় না। তুমি যদি পনেরোটা ডিশের নামও বলতে পারো আমি রেস্টুরেন্টটা চালু করে দেব। লাভ করতে আমি চাই না। এমনকি লস হলেও ক্ষতি নেই। দেখো, একদিন না একদিন রেস্টুরেন্টটা  আমি ঠিক খুলব’। কাজলদা কথা বলে চলছিল। আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল,  গরীব মানুষের খাবারের  কুড়িটা ডিশ কি কখনও হতে পারে? কাজলদা কিন্তু কথা বলেই চলেছিল। খুব আন্তরিক সেই কন্ঠ। আমি ওর কন্ঠে শুনতে পাচ্ছিলাম আমার সেই হারিয়ে যাওয়া দশ বছরের ছাত্রটির স্বর। আমার মনে হচ্ছিল কাজলদা নয়, কথা বলছে ওই দশ বছর। মনে হচ্ছিল ওর ভেতরে জেগে রয়েছে সেই শিশু; সে প্রতিশোধ নিতে চাইছে। মনে হচ্ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী আর পশ এলাকার ৩৫ তলার এক ফ্ল্যাটের ভেতরে শুধু গ্রামীণ শিল্পই নেই, রয়েছে একটুকরো সত্যিকারের গ্রাম, আমার দুখী দেশ, আমার নিরন্ন ভারত। যে ভারত মার খেতে খেতে এইবার মার দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। হয়তো সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থাকবে। হয়তো হেরেই যাবে কাজলদা। কিন্তু, তাতে ক্ষতি কী? কখনও কখনও তো ঐরাবতের মতোই উঠে আসে পরাজয়।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।    

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Leave A Reply