মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৬

ব্লগ : প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম

অংশুমান কর

একটা সময় ছিল যখন বাড়িতে অতিথি এলে প্রদীপ শিখার মতো কেঁপে উঠত প্রাণ। সে অবশ্য অনেক বছর আগের কথা। এখনকার মতো তখন মানুষের হাতে হাতে ঘুরত না মোবাইল ফোন। টেলিফোনের ছিল একটাই রঙ, কালো। সে টেলিফোনও আমরা সিনেমায় দেখতাম। গ্রামে আমাদের পাড়াতে তখন কারও বাড়িতেই টেলিফোন ছিল না। সম্ভবত, আমাদের গ্রামে তখন টেলিফোন আসেইনি। তাই খবর না দিয়েই তখন বাড়িতে অতিথি আসত। দূরদেশে কখনো ভ্রমণে না-যাওয়া আমরা তাকেই বলতাম ‘বেড়াতে আসা/ যাওয়া’। তো, আমাদের বাড়িতে তখন খবর না দিয়েই মানুষজন বেড়াতে আসত আর খবর না দিয়েই আমরাও বেড়াতে যেতাম কাকু-জেঠুদের বাড়ি। কোনওদিন চাঁদের আলোয় আর কোনওদিন বা টর্চের আলোয় রাস্তার খানাখন্দ সামলে, বসন্তের বাতাসের কাঁধে হাত রেখে, হেমন্তের কুয়াশার আঙুল ধরে মা-বড়মার সঙ্গে আমরা অন্য পাড়ায় চলে যেতাম বেড়াতে। সেই ছোট বয়সে এই রকম বেড়াতে যেতে দিব্যি লাগত। দুটো কারণ ছিল তার। প্রথমত, জেঠুর কড়া নজরে সেইসব সন্ধেগুলোয় পড়তে বসতে হত না। আর দ্বিতীয়ত, বেড়াতে গিয়ে পাওয়া যেত রসগোল্লা আর চপ বা সিঙাড়া। কেউ আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে দ্বিতীয় উপহারটি হয়তো আমাদের ভাগ্যে তেমন জুটত না, কিন্তু প্রথম উপহারটি মিলত; বন্ধ হত পড়া। তবে তার জন্য লাগত জেঠুর অনুমতি। অনুমতি মিলবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা থাকত। তাই অনুমতি মিললেই তিরতির করে প্রদীপ শিখার মতোই কাঁপতে থাকত প্রাণ।

দ্য ওয়াল পুজো ম্যাগাজিন ১৪২৫ পড়তে ক্লিক করুন

সেই সময়ে কেউ কেউ অবশ্য এমন থাকতেন যারা প্রায় প্রতিদিনই নানা কাজের ছুতোয় বা অকাজেও সন্ধেবেলায় আসতেন বাড়িতে। এঁদের ঠিক অতিথি ভাবা হত না। এঁরা এলে পড়া থেকে ছুটি মিলত না। রসগোল্লা আর সিঙাড়া আনতে ছুটতে হত না বাজারে। এঁদের বরাদ্দ ছিল দুধ-চিনি সহ এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট। চিনি ছাড়া লাল চা-এর মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্বাদ পানীয়টি খাওয়ার চল তখনও গ্রামে-গঞ্জে শুরু হয়নি।  চায়ে ডুবিয়ে বিস্কুট খেতে খেতে এঁরা বাজার-হাটের খবরাখবর দিতেন; নিতেন ঘর-সংসারের খোঁজ। এইসব আলোচনা থেকে দূরে বিরস বদনে বসে আমরা লসাগু-গসাগু আর ভয়েস চেঞ্জ করতাম। এঁরা অতিথি ছিলেন না। হয়ে যেতেন পরিবারের সদস্য। এঁদের আগমন কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং ছিল এক অভ্যাস। তাই এঁরা এলে প্রাণ কেঁপে উঠত না প্রদীপ শিখার মতো।

এই যে বারবার প্রদীপ শিখার কথা বলছি এরও একটা কারণ আছে। খবর না দিয়েই সে সময়ে আমাদের বাড়িতে যেসব অতিথিরা আসতেন, তাঁদের একজন ছিলেন বীরেশ কাকু। যে স্কুলে আমি পড়তাম সেই স্কুলেরই ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন আমার জেঠু, আর বীরেশ কাকু ছিলেন সেই স্কুলের করণিক। সেইসূত্রেই আসতেন আমাদের বাড়িতে। দু-এক কথার পর বসে পড়তেন হারমোনিয়াম নিয়ে। গাইতেন, ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে/ প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম/তোমায়, হে  সুন্দর, বন্দিতে’। বীরেশ কাকুকে আমি কোনওদিন এই গানটা ছাড়া অন্য কোনও গান গাইতে শুনেছি বলে মনে পড়ে না। স্কুলের অনুষ্ঠানেও বীরেশ কাকু এই গানটাই গাইতেন।  বারবার শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল গানটা। বীরেশ কাকুর বদলে অন্য কোনও অতিথি এলেও আমি যেন শুনতে পেতাম কোথাও একটা গুনগুন করে বাজছে গানটা আর অমনি তিরতির করে কেঁপে উঠত প্রাণ, প্রদীপ শিখার মতো।  মাঝে মাঝে ওই অল্প বয়সেই আমি ভাবতাম, এই গানের কথাগুলোর অর্থ কী? অঞ্জলি নিবেদন করতে চাইছে যে প্রাণ, তা প্রদীপ শিখার মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে কেন? সে বয়সে ওই প্রশ্নের উত্তর পাইনি। পরে বুঝেছি যে, ওই কথাগুলোর মধ্যে এক আনন্দ লুকিয়ে আছে। সে আনন্দ আসলে সমর্পণের আনন্দ। পাওয়ায় যেমন আনন্দ, দেওয়ারও তো তেমনই।  তবে এখানে কেবল আনন্দের আলো হয়েই স্থির হয়ে যাচ্ছে না প্রাণ। যা দেওয়া হবে, তা গৃহীত হবে কিনা, তা নিয়ে যেন হৃদয়ে রয়েছে মৃদু শঙ্কাও। তাই প্রাণ হয়ে উঠছে আলোর অতিরিক্ত কিছু। রূপ নিচ্ছে শিখার। কেঁপে কেঁপে উঠছে।  খবর না দিয়ে অন্যের বাড়ি গিয়ে ইয়াব্বড় তালা দেখে সত্যিই দু’একবার তো ভগ্ন হৃদয়ে আমাদের ফিরেও আসতে হত গৃহে।

খবর না দিয়ে এই অতিথি আসার চল আমাদের বাড়িতে চালু ছিল বর্ধমানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটার্সেও। বিশেষ করে বইমেলার সময়ে মাঝে মাঝেই পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তের কবি-লেখক বন্ধুরা খবর না দিয়েই চলে আসতেন আমাদের বাড়ি। আবার কখনও মা বা সোমাকে না জানিয়েই বইমেলা থেকে প্রায়ই বেশ কয়েকজন বন্ধু নিয়ে মধ্যরাত্রে বাড়ি ফিরতাম আমি।  মা আর সোমা মাঝরাত্তিরে দু’মুঠো চাল-ডাল ফেলে দিত হাঁড়িতে। সে অমৃত গ্রহণ করে,  মেঝেতে ঢালাও বিছানা পেতে শুয়ে পড়তাম সকলে।। অনেকদিন অবশ্য আমাদের বাড়িতে আর এভাবে বন্ধু-বান্ধবদের জন্য মেঝেতে বিছানা পাতা হয় না। আসলে খবর না দিয়ে এখন তো আর বন্ধুরা আসেই না। এমনকি, নেমন্তন্ন করতে এলেও আজকাল মানুষ জিজ্ঞেস করে নেয়, বাড়িতে থাকব কি না! আমরা এই সৌজন্য আশাও করি বইকি! সময় তো সত্যিই কমে এসেছে হাজারো আর বিচিত্র সব কাজের চাপে। তাই খবর না দিয়ে ক্বচিৎকখনও কেউ কোনও অনুষ্ঠানের নেমন্তন্ন করতে এলেও অজান্তেই বোধহয় কুঁচকে যায় ভুরু!

এর ব্যতিক্রমও আছে বই কি! মনে আছে একবার সাহিত্য অকাদেমির দায়িত্বে থাকার সময় এক সকালবেলা জরুরি ফাইল সই করাতে গেছি সুনীলদার বাড়িতে। ফোন করেই গেছি। দেখলাম, ফোন না করেই এসে পড়লেন বেশ কয়েকজন। তখন সুনীলদার পুজোর লেখার তাড়া রয়েছে, তবু দেখলাম হাসি মুখেই আগন্তুকদের সঙ্গে কথা বললেন উনি। ওঁরা চলে যাওয়ার পর অসম্পূর্ণ কাজটুকু শেষ করতে করতে আমি সুনীলদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই যে আপনার অমূল্য সময় এঁরা নিয়ে নিলেন, ফোনটুকুও না করে চলে এলেন, আপনি বিরক্ত হন না? শিশুর মতো হেসে উঠেছিলেন সুনীলদা। বলেছিলেন, ‘বাহ্‌, মানুষের বাড়িতে মানুষ আসবে না? সবসময় ফোন করে আসতে হবে নাকি?’ সুনীলদার পক্ষেই এমন কথা বলা সম্ভব। সত্যিই তো, শত ব্যস্ততার মধ্যেও সুনীলদা ফোনও তো ধরতেন নিজেই। ফোন করলেই শোনা যেত, একটু টেনে টেনে বলা কন্ঠে, হ্যালোওওও…

ফোন না করে প্রকাশ কর্মকারের বাড়ি চলে গিয়ে অবশ্য একবার বেশ সংকটে পড়েছিলাম আমি আর কবিবন্ধু প্রদীপ হালদার। তখন আমি এমএ পড়ছি। থাকি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্তরঞ্জন হোস্টেলে। একদিন প্রদীপ এসে বলল, প্রকাশ কর্মকারের বাড়ি যেতে হবে বালিতে। ওর নতুন বই বেরোবে। ‘মাংসবিলাসিনী’। প্রদীপের ইচ্ছে ওর বইয়ের প্রচ্ছদ করেন প্রকাশ কর্মকার। যেমন কথা তেমন কাজ। প্রকাশ কর্মকারকে ফোন না করেই দু’জনে উঠে পড়লাম কর্ড লাইন লোকালে। বালিতে নেমে, একে ওকে জিজ্ঞেস করে পৌঁছেও গেলাম প্রকাশ কর্মকারের বাড়ি। কলিংবেল বাজিয়েই চলেছি, দরজা আর কেউ খোলে না। শেষে পৃথিবীর যাবতীয় বিরক্তি মুখের বলিরেখায় ধরে দরজা খুললেন এক প্রৌঢ়া। এসেছি প্রকাশ কর্মকারের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই শুনে দুম করে মুখের ওপর আবার বন্ধও করে দিলেন দরজা। আমরা দু’জনে তবু আশা না ছেড়ে দাঁড়িয়েই রইলাম। বেশ খানিকক্ষণ পরে দরজা খুললেন স্বয়ং প্রকাশ কর্মকার। জানালাম আমাদের প্রয়োজন। উনি ঘরের ভেতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে কতগুলো স্কেচ হাতে ধরিয়ে বললেন, ‘বেছে নাও’। পছন্দ মতো একটিকে বেছে নিয়ে আমরা ফিরে এলাম বর্ধমান। তৈরি হল প্রদীপের বইয়ের কভার। মাঝে মাঝে ভাবি, আজ কি পারতাম ওই দুঃসাহস দেখাতে? ফোন না করে আজ কোথাও যাওয়ার কথা তো ভাবতেই পারি না। অথচ একদিন ফোন ছাড়াই দিব্যি চলেছিল এ জীবন। কুড়ি বছরে আসলে কুড়ি হাজার বছরের পথ হেঁটে ফেলেছি আমরা!

আমাদের সবকিছুই আজ বড় সাজানো গোছানো। প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত। তাই সরষের তেলে নয়, এখন ব্যাটারিতে জ্বলে প্রদীপ। দেখি, নাচের অনুষ্ঠানে। যখন এভাবে মঞ্চে জ্বলে ওঠে ব্যাটারি-চালিত প্রদীপ, তখন অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে এক মায়া তৈরি হয় বটে। কিন্তু সে মায়া আমাকে আবিষ্ট করতে পারে না। আমি দেখি নৃত্যশিল্পীদের করপুটের ভেতর জ্বলছে যে আলো তা স্থির, কাঁপছে না। মনে হয় যে, ওই আলো কেবল আলোই, শিখা নয়; মনে হয় যে, ওই আলোতে কেবল আনন্দই আছে, শঙ্কা নেই। শঙ্কাবিহীন ওই আনন্দকে, মনে হয়, দোকানে সাজানো ম্যানিকুইন, বানানো আলো, মিথ্যে আনন্দ। আসলে, প্রযুক্তি ‘আলো’ বানাতে পারে, ‘শিখা’ না।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।    

Shares

Comments are closed.