নাড়ুগোপাল, নাড়ুগোপাল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অংশুমান কর 

রেমন্ড ফ্রন্টেন, আমার অসম-বয়সি আমেরিকান বন্ধু, মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। রেমন্ড আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিখ্যাত “নোটস অ্যান্ড কোয়ারিজ” জার্নালটির সম্পাদক।  পণ্ডিত মানুষ। বহুদিন পরে রেমন্ডের সঙ্গে দেখা হল গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেমিনারে বক্তৃতা করতে গিয়ে। দেখলাম চেহারা ঠিক আগের মতোই আছে। শুধু একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছেন, হাঁটুর সমস্যায়। সকালবেলা ব্রেকফাস্টের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে রেমন্ড-সহ আমরা ক’জন অপেক্ষা করছি উদ্যোক্তা বন্ধুদের জন্য। সেমিনার কক্ষে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁরা নিতে আসবেন আমাদের। মাঝের এই ছোট্ট একটুকরো ঘাস-জমির মতো ফাঁকা সময়টায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে আমাদের কথা হচ্ছে টুকটাক। সকলেই কথা বলতে বলতেই ব্যস্ত আছি মোবাইল ফোনে। আমি একটু বেশিই। রেমন্ডের দেখলাম এই নেশা নেই। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি মোবাইল ফোন ব্যবহার করো না?” রেমন্ড বলল, “না, দরকার হয় না। আসলে আমি তো বিয়ে করিনি। থাকি একেবারে একলা। বউ বা ছেলেমেয়েদের খোঁজ নেওয়ার দরকারই পড়ে না।  অফিসের প্রয়োজন ল্যান্ডফোনেই মিটে যায়। আর ছাত্রছাত্রীদের আমি বলে দিয়েছি যে, যা জিজ্ঞাস্য জিজ্ঞেস করতে হবে আমার অফিসে এসে, সামনাসামনি বসে। কাকে খবর দেব আর কারই বা খবর নেব? পরিবার না থাকলে মোবাইল ফোনের দরকারই পড়ে না।”  শুনে, চুপ করে গেলাম। বাঙালিদেরও অনেকে মোবাইল  ফোন ব্যবহার করেন না, আমি জানি। কিন্তু কেউ কোনওদিন আমাকে এই কথা বলেননি যে, পরিবার না থাকলে, মোবাইল ফোনের দরকারই পড়ে না!

আরও পড়ুন: কোন্ অচেনার ধারে

রেমন্ডের কথা শোনার পর থেকেই আমি ভাবছি, মানছি যে, পরিবার না থাকলে মোবাইল ফোনের দরকারই পড়ে না, কিন্তু কমলিনীর মতো যাঁদের পরিবার থেকেও নেই, কী হয় তাঁদের বেলা? কমলিনীর কথায় আসছি পরে। তার আগে একটু নিজের কথা বলে নেওয়া যাক। কেননা, রেমন্ডের কথা শোনার পর থেকে আমি এও তো ভাবছি যে, সত্যিই কি পরিবার না থাকলে আমারও মোবাইল ফোনের দরকারই হত না? উঁহু, এই যন্ত্রটি এমনভাবেই জড়িয়ে গেছে আমার জীবনের সঙ্গে যে, এখন আর সহজেই তাকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। সোজা কথাটা সোজাভাবে বলাই ভালো। মেয়ে-বউ-মা-ভাই-বোনদের খবর নিতেই যে কেবল মোবাইল আজ আমার প্রয়োজন তা নয়। সে কারণেই মাঝেমাঝেই যখন মোবাইল ফোনটি দেহ রাখেন, তাকে হাসপাতালে পাঠাতে হয় পুনর্জীবিত করার জন্য, প্রায় আত্মীয়-বিয়োগের ব্যথা পাই। যতক্ষণ না তিনি আবারও স্বমহিমায় আমার প্যান্টের ডান পকেটে অধিষ্ঠিত হয়ে আমার সসাগরা পৃথিবীটির ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন ততক্ষণ আমি এক গভীর ডিপ্রেশনে চলে যাই। অথচ এই মোবাইল নিয়েই একটি কবিতা আছে আমার “সে একটা দিন” যে কবিতায় মোবাইল ফোন আসার ফলেই মিথ্যে-বলা বেড়ে গেছে মানুষের এরকম একটা অভিযোগ করে মোবাইল ফোনকে প্রায় ভিলেন বানিয়ে দিয়েছি আমি। কবিতায় তো অতিকথন থাকেই। তো, এই অতিকথন পছন্দ হয়নি গতবার আমেরিকার বঙ্গসম্মেলনে আমাদের কবিতাপাঠ শুনতে আসা এক বিদূষী রমণীর। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মোবাইল ফোনকে যে এত গালাগালি করলেন, কোনও উপকারেই কি লাগে না এই ফোন?” আমি জিভ কেটে তাঁকে বলেছিলাম, কবিতাকে আক্ষরিক অর্থে ধরবেন না প্লিজ, যা লেখা আছে এই কবিতায় তা অর্ধসত্য। সত্যিই তো, গত দশ বছরে কত কত কবিতাই না আমি মোবাইল ফোনে লিখেছি! বর্ধমান থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে, এমনকি কলকাতা থেকে ঢাকা যাওয়ার পথেও  কত কত বার  বাসে বসে বসে, এমনকি কখনও কখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও, লিখে ফেলেছি পুরো কবিতা বা বিদ্যুত চমকের মতো মাথায় চলে আসা কবিতার একটি দু’টি পঙ্‌তি। একই ঘটনা ঘটেছে রেল স্টেশনে, এয়ারপোর্টে, এমনকি বাজারের মধ্যে বা ক্লাস শেষ হওয়ার ঠিক পরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগেও। আগে কত কতবারই না হারিয়ে গিয়েছে এভাবে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে পাওয়া অলৌকিক সব পঙ্‌তি, এখন তো আর যায় না; সে তো এই মোবাইলের কারণেই। তাই যদি বলি যে, মোবাইল ফোন শুধু ক্ষতিই করেছে আমার বা আমাদের তবে তা হবে অনৃতকথন। মোবাইল ফোন নিয়ে তো আমি এই যন্ত্রটি কেনার প্রথম দিনটি থেকেই উত্তেজিত থেকেছি!

আরও পড়ুন: পরীর দেশে বন্ধ দুয়ার দিই হানা

মনে আছে, দুর্গাপুর থেকে আমি কিনেছিলাম আমার প্রথম মোবাইলটি। টাটা ইন্ডিকমের পুঁচকে মতো একটা সেট। কালো রঙ। মাথায় ছিল একটা ছোট্ট অ্যান্টেনা। দাম নিয়েছিল পাক্কা দু’টি হাজার টাকা। মোবাইলটি কিনে দিয়েছিল আমার দিদির দেওর অজয়দার এক ছাত্র। অজয়দার তখনই ছিল নানা কোম্পানির মোবাইল ফোন। যার একটি ছিল টাটার। আমার ওই ফোনটি কেনার পেছনে একটা কারণ ছিল যে, সম্ভবত টাটা টু টাটা কলে, বেশ অনেকটা ফ্রি টক-টাইম দিত তখন টাটা কোম্পানি। আর শুধু অজয়দার নয়, আমাদের আত্মীয়স্বজনদের অনেকেরই ছিল তখন টাটা ইন্ডিকমের ফোন। জিও জমানার অনেক আগের সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে ওই ফ্রি টক-টাইমটুকু ছিল এক অভাবনীয় ব্যাপার। মনে আছে, ওই ফ্রি টক-টাইমের ফায়দা তুলতে ফোন কেনার পরে  দুর্গাপুরে দিদির বাসা থেকে বেরিয়ে অটোয় চড়া, বাসে চড়া, ট্রেনে চড়া, প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াবার আপডেট অজয়দাকে দিয়েছিলাম ফোন করে করে। “অটোয় চড়লাম”, “বাসে চড়লাম”, “ট্রেনে উঠলাম”, “এই রাজবাঁধ এল”, “এবার এল পানাগড়”, “এবার মানকর”—ফোনের পর ফোন করেই চলেছিলাম ওকে।

আরও পড়ুন: দেখিস নে কি শুক্‌নো-পাতা ঝরা-ফুলের খেলা রে…

মোবাইলের হাজারো সুবিধে/অসুবিধে আছে। সেসব নিয়ে ইতিমধ্যেই পণ্ডিতেরা জ্ঞানগর্ভ সব বক্তৃতাও দিয়ে ফেলেছেন, রচনা করেছেন মানুষের জীবনে গ্যাজেটের প্রভাব নিয়ে ভারী ভারী সন্দর্ভ।  পণ্ডিতদের আমি বিষম ভয় পাই। তাই মোবাইল বা গ্যাজেট নিয়ে পণ্ডিতি করার বিন্দুমাত্র বাসনা আমার নেই। আমি শুধু মোবাইল ফোনের দু’টি বিশেষ সুবিধের কথা বলব। রাগ দেখাতে এই ফোনটির জুড়ি মেলা ভার। না, মেসেজ বা ফোন করে রাগ দেখানোর কথা বলছি না। রাগ দেখাতে গিয়ে আমি দেখেছি অনেকেই মোবাইল ফোনটি ছুড়ে ফেলেন। ভাবটা এমন যে, বিশ্ব সংসার  বুঝি তিনি মোবাইল ছুড়েই ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু, মোবাইল ছুড়ে রাগ দেখান যাঁরা তাঁরা এ বিষয়ে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করেই রাগটি দেখান। রাগ দেখিয়ে প্রায়ই, দেখেছি, এঁরা মোবাইলটি ছুড়ে ফেলেন বিছানার নরম গদির ওপরে। এতেই বিশ্বসংসারে কাঁপনটি সবচেয়ে বেশি হয় কিনা! মোবাইলের আর একটি সুবিধে হল ইমোজি। ভেবে দেখেছেন কত কত শব্দ খরচের হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দেয় এই ইমোজি? যা বলতে খরচ হত দশটি শব্দ, তা ওই এক ইমোজিতেই পুরো ছবি! আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়, শব্দের দুই পাহাড়ের মধ্যিখানের উপত্যকায় ফুটে থাকা লাল-নীল-সবুজ বুনোফুলগুলোই পরজন্মে হয়ে ওঠে ইমোজি। রূপে, রসে, গন্ধে, বর্ণে ওদের হারাতে পারে কেবল দু’টি কাজলকালো আঁখি। তবে এই ইমোজির বিপত্তিও আছে বই কি! অনেকেই দেখেছি, ইমোজি পাঠালে বেশ আহতই হন, রেগেও যান কখনও কখনও। এই তো কিছুদিন আগেই আমার একটি লেখা সম্বন্ধে এক মেধাবী পাঠিকার একটি মন্তব্য ইনবক্সে পেয়ে তাঁকে থাম্বস আপের ইমোজিটি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ক’দিন পরে আর একটি লেখার ওপরে আর একটি মন্তব্য ইনবক্সে পাঠিয়ে তিনি জানালেন, “ওই নীল বুড়ো আঙুলটি আবার যেন পাঠাবেন না প্লিজ…”

আরও পড়ুন:  সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে…

তবে মোবাইল নিয়ে গপ্পো করতে বসলেই আমার গপ্পোটি মুড়িয়ে যায় একটি সত্যিকারের গল্পের কাছে এসে। সেই গল্পটি কমলিনীর। গল্পটি একটি বৃদ্ধাবাসেরও। সেখানেই থাকেন স্বামীহারা কমলিনী। তাঁর রুমমেট ইস্কুলের প্রাক্তন বড়দিদিমণি নমিতা। স্বামীহারা কমলিনী নিজেই এসেছেন এই বৃদ্ধাবাসে। বাধা দেয়নি তাঁর ভারী ব্যস্ত পুত্র বাবলু। বাবলু মাঝে-সাজে, সময় সুযোগ মতো দেখা করে যায় কমলিনীর সঙ্গে। বৃদ্ধাবাসের ঘরের কুলুঙ্গিতে নাড়ুগোপাল আছে কমলিনীর। তাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন কমলিনী। নমিতার অবশ্য সেসব বালাই নেই। এক রোববার অফিসের ট্যুরে যাওয়ার পথে বাবলু এসে মায়ের হাতে দিয়ে যায় সদ্য কেনা মোবাইল ফোন। শিখিয়ে দেয় কীভাবে ফোন এলে ধরতে হবে ফোন। ফিরে যাওয়ার সময় প্রথম ফোন করে বাবলু ট্রেনে চেপে। হোটেলে ঢুকে আবার। কী যে ভালো লাগে কমলিনীর! মনে হয়, “আজ কতবার বাবলু এল। এখন বাবলু পাশে। বালিশের পাশে। বাবলুটা। বাবলুসোনা। ঘুমু কর। ঘুমু ঘুমু কর। মোবাইল ফোনটার গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে থাকেন কমলিনী।” একটু পরে তাঁর মনে হয় যে,  বাবলু সোনার শীত করছে। তাই নমিতাকে লুকিয়ে, নাড়ুগোপালের সাটিনের চাদর এনে ঢাকা দিয়ে দেন “ছোট্ট মুবু মুবু মুবলু ফোনুটাকে”। ভাবেন বুঝি, কিছুই টের পাননি নমিতা। কিন্তু পরের দিন তাঁর ভুল ভাঙে। বুঝতে পারেন যে, রাত্রে সবই বুঝে ফেলেছেন নমিতা। দেখেন, কম কথা-বলা এই বড়দিদিমণি তাঁর মোবাইল ফোনের জন্য বুনে দিয়েছেন উলের চাদর!

গল্পটির নাম “মোবাইল সোনা”। লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। ভেবেছি, অনুবাদ করে রেমন্ডকে এই গল্পটি পড়াব। পড়িয়ে বলব, মানলাম, যাঁদের পরিবার নেই, তাঁদের মোবাইল ফোন দরকার নেই; কিন্তু যাঁদের পরিবার থেকেও নেই, গোপাল যাঁরা হারিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের কিন্তু একটা মুবলু সোনার দরকার আছে।  মোবাইল ফোনই তো তাঁদের নাড়ুগোপাল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More