দেখিস নে কি শুক্‌নো-পাতা ঝরা-ফুলের খেলা রে…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    “আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে”— বসন্তের গান নয়, তবু কোনও একবার, দোলের সময়ে শুনেছিলাম এই গানটি। আর মনে হয়েছিল, ঠিকই তো আজ তো সবার রঙে রঙ মেশানোর দিন, ওই যে একদল তরুণ অশান্ত আকাশে আবির উড়িয়ে দিচ্ছে, ওই যে দখিনা বাতাসে বেণুবনের মতো মর্মরিয়া উঠছে আরেক দল কিশোরী— ওদের সবার রঙে রঙ মেশানোর দিন আজ। রাঙিয়ে দিতে হবে বন-প্রান্তর-মানবজমিনকে।  তখন সত্যিই বুঝিনি যে, সবার রঙে রঙ মেশানো মানে সবাইকে আবিরে রাঙিয়ে দেওয়া নয়, বরং রঙের ছিটে কারও কারও গায়ে না লাগালেই তার রঙে সত্যিকারের রঙ মেশানো হয়। তখন বুঝিনি, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝেছি বই কি!

    #

    দোলের যে ক’টি উজ্জ্বল স্মৃতি আছে তার মধ্যে খুব ওপরের দিকে থাকবে শান্তিনিকেতনে দোল খেলার স্মৃতি। আমাদের বর্ধমানের বাসা থেকে শান্তিনিকেতন প্রায় ঢিল ছোড়া দূরত্বে। গাড়িতে সময় লাগে সাকুল্যে এক ঘণ্টা। তবুও এই অর্ধেক জীবন অতিক্রান্ত হলেও শান্তিনিকেতনে দোল খেলতে গিয়েছি মাত্র একবার। সে যাওয়াও আমাদের কবিবন্ধু আর সপ্তর্ষি প্রকাশনের দুই কর্ণধার সৌরভ আর স্বাতীর উৎসাহে। সেবার আমরা ছিলাম শান্তিনিকেতন থেকে একটু দূরে গল্পকার ও ঔপন্যাসিক অসীম চট্টরাজের ব্যবস্থাপনায়। দিব্যি কেটেছিল দু’দিন আমাদের, মানে আমি, সোমা, তিন্নি, সৌরভ, স্বাতী আর ওদের পরীর মতো ফুটফুটে কন্যা মামাইয়ের। তবে সেই দোলের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের  সঙ্গে দোল খেলার অভিজ্ঞতা। শান্তিনিকেতনে একটা গাছের নীচে বসে ছিলেন সুনীলদা আর যার ইচ্ছে এসে ওঁর মাথায় ঢেলে দিচ্ছিল আবির, রাঙিয়ে দিচ্ছিল গাল। সেই প্রথম এবং শেষবার আমাদের সুনীলদার সঙ্গে দোল খেলা। তো, এইবার সোমা হঠাৎ বলল, “স্বাতীদিকে বলো না, আর একবার আমরা সবাই মিলে শান্তিনিকেতনে যাই”। স্বাতীদিও বেশ কিছুদিন ধরে আমাকে বলছিলেন যে, “একবার শান্তিনিকেতনে তোমরা এসো”। ক’দিন আগে তাই স্বাতীদিকে বললাম যে, “চলুন এবার দোলের সময়ে শান্তিনিকেতনে যাই”। স্বাতীদি রাজি হলেন না। আমি একটু অবাকই হলাম। যে স্বাতীদি ক’দিন আগেই বলছিলেন তোমরা শান্তিনিকেতনে এসো, তিনিই এখন রাজি হচ্ছেন না! স্বাতীদি বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন আমার বিস্ময়। তাই থেমেথেমে বললেন, “আসলে সুনীল তো থাকে না, তাই এখন আর দোলের সময় শান্তিনিকেতন যেতে ভালো লাগে না। দোলের পরে একদিন যাই চলো”। মাটি থেকে অনেক উঁচুতে, দশতলায়, পারিজাতে একটি দেবীমূর্তির আননে বিষাদের ছায়া দেখে সেদিন আমার মনে হয়েছিল যে, দোলের সময় স্বাতীদির মনে আজ আর কোনও রঙ থাকে না— মনে হয়েছিল যে, ওই বর্ণহীনতাই একটা রঙ। ওঁর রঙের সঙ্গে রঙ মেশাতে হলে নিজের অন্তরকেও একটু বেরঙিন করে নিতে হবে।

    #

    আরও পড়ুন:  কোন্ অচেনার ধারে

    কিন্তু, এ কথা কি আমরা সব সময় মনে রাখি? রঙ মাখতে নিতান্ত অনিচ্ছুক একজনকেও আমরা দোলের দিনে দলের মধ্যে টেনে এনে রঙ মাখিয়ে দিই। মনেই রাখি না যে, বাইরে থেকে তাকে ফোটা ফুলের মতোই দেখাচ্ছে ঠিক, কিন্তু ভেতরে হয়তো তার ডালপালা থেকেই শুকনো পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে। যে জওয়ানরা প্রাণ দিলেন পুলওয়ামায় তাঁদের আত্মজন, যে মেয়েটি ধর্ষিতা হয়েছে দিন কয়েক আগে, সারা বছর জঙ্গলে শুকনো ঝরাপাতা কুড়িয়ে যে বৃদ্ধা দিনান্তে কোনওমতে শাকান্ন জোটান, যে বৃদ্ধকে গত দু’বছর বৃদ্ধাশ্রমে দেখতেই আসেনি তাঁর সন্তান— তাঁদের বর্ণহীন জীবনে যেদিন বিশ্বাস, শুশ্রূষা আর শান্তির সাদা রঙের একটি ছোট্ট ফোঁটা ফেলে দেওয়া যাবে, সেইদিনটিই তো তাঁদের দোল।  রঙের উৎসবের আবহে শুনতে খারাপ লাগবে ঠিক, কিন্তু গোটা দেশকে যেভাবে একটিই রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে আজ, তাতে তো সবার রঙে রঙ মেশানোর ন্যূনতম সদিচ্ছা বা প্রচেষ্টাটুকুও চোখে পড়ছে না।

    #

    আরও পড়ুন:  সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে…

    ছোটবেলার দোলের সময়ের একটি ঘটনার কথা মনে পড়লে এখন খুব লজ্জা লাগে ওই সবার রঙে রঙ না-মেশাতে পারার জন্যে। রোগা পাতলা ছিলাম বলে দোলের দিনে বন্ধুদের রঙ মাখানোর লড়াইয়ে খুব একটা সুবিধে করে উঠতে পারতাম না। অন্যকে রঙ মাখাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে গোলা রঙে নিজেই ভিজে একশা হতাম। আমার বিত্তাপ দেখানোর একমাত্র জায়গা ছিল পাড়ার সারমেয় দল। বন্দুকের মতো পিচকিরিকে বাগিয়ে ধরে জলে গোলা বাঁদুরে রঙের বুলেটে বিদ্ধ করতাম ওই অবলা জীবগুলোকে। ভয়ে ওরা পালাতে চাইত, আমি ধাওয়া করতাম পিছু পিছু এই ভেবে যে, আমার মতো দুবলা-পাতলা শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলেকেও কেউ ভয় পেতে পারে। সে এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ! আজ ওই অবলা জীবগুলোর কাছে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করে। রঙ মাখতে চাইছে না আমাদের যে বন্ধুরা তাদের জোর করে রঙ মাখিয়ে দেওয়ার চেয়েও এ আসলে আরও বড় অপরাধ। কেননা, মানুষ তো মনের না হলেও শরীরের রঙ ধুয়ে নিতে পারে। পশুরা তো সেটুকুও পারে না। ওদের গায়ে লেগে থাকা রঙ ওরা জিভ দিয়ে চেটে পরিষ্কার করে, বিষ ঢোকে ওদের শরীরে। এবার দোল খেলবেন যারা, তারা কি একটু খেয়াল রাখবেন পশুরা যেন আমাদের এই পেশিপ্রদর্শন থেকে রক্ষা পায়?

    #

    আরও পড়ুন: পরীর দেশে বন্ধ দুয়ার দিই হানা

    আরও একটি কথা বলতে ইচ্ছে করছে। বিশেষ করে এবারের দোলে যাঁরা শান্তিনিকেতন আর পুরুলিয়া যাবেন, এই কথাক’টি তাঁদের জন্য। যদি প্রকৃতির রঙের সঙ্গে রঙ মেশাতে চান, পলাশ ছিঁড়বেন না দয়া করে। বর্ধমানে, তারাবাগে আমার বাসার ঠিক নাকের ডগায় আছে একটি পলাশ গাছ। একশ গজের মধ্যে এদিকে ওদিকে আরও দু’তিনটি। আমি দেখেছি, টুপটুপ করে গাছ থেকে মাটিতে ঝরে পড়ে পলাশ। পাড়তে হয় না, ডাল ছিঁড়তে হয় না পলাশে অলক রঞ্জিত করার জন্য বা বাজু অলংকৃত করার জন্য। একটু নিচু হয়ে অনায়াসেই পলাশ কুড়িয়ে নেওয়া যায়। মানি যে, নানা কারণে সব জায়গায় নিচু হওয়ার অনেক অসুবিধে আছে। সব জায়গায় নিচু হওয়া উচিতও নয়। কিন্তু, প্রকৃতির সামনে নিচু হতে লজ্জা কি?

     

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More