বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

ব্লগ: সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে…

অংশুমান কর

মেঘলা মনখারাপের দিনে আমি এখনও ভাস্কর চক্রবর্তী পড়ি। পুরোনো অভ্যেস। আজও একটা মেঘলা দিন। পড়তে পড়তে চোখ আটকে গেল এই পঙ্‌তিতে, “সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে”, আর সঙ্গে সঙ্গে আমার এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের কথা মনে পড়ল। রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন? ঠিকই পেয়েছেন। মধ্যচল্লিশে এসে একটা জিনিস আমি ঠিক বুঝেছি। পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় মানুষ হলেন ট্যাক্সি ড্রাইভাররা। ওঁদের বুঝে ওঠা খুবই কঠিন। এই মনে হবে যে, ধরে ফেলেছেন একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার ঠিক কী ধরনের মানুষ, তো পরমুহূর্তেই সে ভুল যাবে ভেঙে। এঁদের কেউ কেউ মৌনব্রত পালন করেন। গোটা সফরে আপনার সঙ্গে একটি বাক্য বিনিময়ও করেন না। কেউ কেউ আবার কথার তুবড়ি, থামতেই চান না। কাউকে কাউকে মনে হয় শয়তানের দূত, তো কাউকে কাউকে ফেরেশতা।

#

দেশে-বিদেশে ড্রাইভার-সঙ্গের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা আপনাদের অনেকের মতোই আমারও আছে। গোমড়ামুখো ড্রাইভার যেমন পেয়েছি, তেমনই গপ্পে ড্রাইভার যাত্রাপথের ক্লান্তি কাটিয়ে দিয়েছেন রসবাহারে। সবসময় অবশ্য সব গল্পে যে রস থেকেছে তা নয়। কখনও কখনও চোখও আর্দ্র হয়েছে। যেমন একবার ষাট-ছুঁইছুঁই এক পাঞ্জাবি ড্রাইভারের উবেরে সওয়ার হলাম দিল্লিতে।  সাহিত্য অকাদেমি থেকে যাচ্ছি এয়ারপোর্ট। দিল্লির জ্যামে বড় কোনও গাড়ির পেছনে পড়লেই, দেখছিলাম, তিনি অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন। মনে হচ্ছিল ছোট গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে থেকে যেন ঠিক তাঁর পোষাচ্ছে না।  ঠিকই মনে হয়েছিল আমার। কথায় কথায় সেই পাঞ্জাবি ভদ্রলোক  জানিয়েছিলেন যে, সারা জীবন তিনি বারো চাকার লরি চালিয়ে এসেছেন, এখন এই ট্যাক্সি চালাচ্ছেন, তাই তাঁর অসুবিধে হচ্ছে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, বয়সের কারণেই কি তিনি লরি চালানো বন্ধ করেছিলেন? প্রশ্ন শুনে এক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তারপরে যে কাহিনি শুনিয়েছিলেন, তার অভিঘাতে সারা রাস্তা আমিই মৌন হয়ে বসেছিলাম। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর দুই ভাইপোকে হারিয়েছিলেন সেই ভদ্রলোক। দু’টিই দুর্ঘটনায়। পাঞ্জাবে ওঁদের ছিল খেতিবাড়ি। সেই খেতে ট্রাক্টর নিয়ে যাওয়ার সময়, কী ভাবে কে জানে ট্রাক্টরের ওই লাঙলের ফলার মতো অংশটি উঠে গিয়ে সোজা আঘাত করে হাড্ডা-কাড্ডা তাঁর যুবা ভাইপোটির মাথায়। মুহূর্তেই মৃত্যু হয় তার।  সেই আতঙ্ক থেকে ছোট ভাইপোকে নিয়ে পথে বেরোন ওই প্রৌঢ়। ইচ্ছে ছিল তাকে খেতিবাড়ির কাজ আর করতে দেবেন না। শিখিয়ে দেবেন ট্রাক চালানো। একটি ধাবায় দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর নিজের ট্রাকই হঠাৎ গড়িয়ে গিয়ে দু’টি ট্রাকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর ওই ভাইপোটিকেও পিষে দেয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সে শেষ। এই ঘটনার পরেই ট্রাক চালানো ছেড়ে দেন ওই পাঞ্জাবি বৃদ্ধ। দু’দুটি মৃত্যুর এমন বর্ণনা শুনে সেদিন আমার কেন কে জানে, বারবার মনে হচ্ছিল আমার পরিবার-পরিজনদের কথা। মনে হচ্ছিল, সবাই ঠিকঠাক আছে তো? আছে তো নিরাপদে?  মনে হয় আমার ওই দুশ্চিন্তা কোথাও একটা স্পর্শ করেছিল ওই প্রৌঢ়কে। বলেছিলেন, উনি দুর্ভাগা, এসব নিয়ে বেশি ভাবতে নেই। সবার সঙ্গে এই রকম হয় না। আর বলেছিলেন হঠাৎ করে যে, বড় গাড়ির মতো বড় কোনও কিছুকেই উনি আর বিশ্বাস করেন না। বড় রোজগারকেও না।  অসুবিধে হলেও তাই তিনি ট্যাক্সিই চালাবেন বাকি জীবন।

আরও পড়ুন: ব্লগ: পরীর দেশে বন্ধ দুয়ার দিই হানা

#

সকলে অবশ্য ওই পাঞ্জাবি প্রৌঢ়ের মতো তো হন না। কেউ কেউ আলাপ জমান। আপনার মনে হয় তিনি বুঝি আপনার বন্ধু। তারপর বোঝেন যে, না, হিসেবে গরমিল ছিল।  যেমন রবীন্দ্রসদনের ঠিক সামনে আমার একবার মনে হয়েছিল।  তখনও টাচ ফোনের যুগে আমরা প্রবেশ করিনি। আমার ছিল নোকিয়ার সেই পুরোনো ফোন, যা আগুনে না পোড়ালে নষ্ট হত না। তো, সেদিন যাচ্ছিলাম সরকারি কবিতা উৎসবে। বক্তৃতা ছিল। আমরা যারা মফস্‌সল শহর থেকে কলকাতায় যাই, তাদের সকলেরই লক্ষ্য থাকে কত তাড়াতাড়ি শহরটার কেন্দ্রে পৌঁছনো যায়। তো, আমার এক বন্ধু বলেছিল যে, দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজে ওঠার ঠিক মুখে বাস থেকে নেমে যদি ট্যাক্সি ধরা যায়, তাহলে সবচেয়ে কম সময়ে পৌঁছনো যায় রবীন্দ্রসদন চত্বরে। কেন না, বর্ধমানের বাস সাধারণত আমাদের নামায় ধর্মতলায়, সেখান থেকে মেট্রোয় রবীন্দ্রসদনে আসাটাই আমাদের দস্তুর। এতে সময় লাগে বেশ খানিকটা। সেই সময়টুকু বাঁচানো সম্ভব যদি ওই দ্বিতীয় হুগলি সেতুর কাছে নেমে ট্যাক্সি ধরা যায়। বন্ধুর উপদেশ মতো সেদিন বাস থেকে নেমে উঠে বসলাম এক ট্যাক্সিতে। ট্যাক্সি চালক অবাঙালি।  জমিয়ে গল্প শুরু করলেন আমার সঙ্গে। কিন্তু ঠিক সেতুর মাঝখানে আসতেই সামনের একটি ট্রাক অচল হয়ে গেল। ব্যাস! ভয়ংকর জ্যাম। বসে আছি তো বসেই আছি। সময় অবশ্য কাটছে ভালোই ওই ট্যাক্সি চালকের সঙ্গে খোশগল্পে। কিন্তু বক্তৃতার সময় যতই এগিয়ে আসতে লাগল, ততই বাড়তে লাগল টেনশন। আসতে লাগল বাংলা আকাদেমি থেকে ফোন। সময়ে যে-কোনও অনুষ্ঠানে পৌঁছনোর বাতিক থাকা আমি ঘামতে শুরু করলাম। কিন্তু জ্যাম আর পরিষ্কার হয় না।  ফোনের পর ফোন আসছে তখন। অবশেষে অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক পাঁচ মিনিট পরে ট্যাক্সি আমাকে নামাল রবীন্দ্র সদনের সামনে।  মনে হল, যাক, পৌঁছলাম। হুড়মুড়-দুড়মুড় করে ট্যাক্সি থেকে নামলাম, কিন্তু ফেলে এলাম ফোন। বাংলা আকাদেমির শুভময়দার ফোন থেকে হাজারবার ফোন করেও আমার ফোনে আর সাড়া পাওয়া গেল না। বুঝলাম ওই সহৃদয় ট্যাক্সিচালক মুহূর্তে আমার ফোনের সিমটি খুলে নিয়েছেন। সেই ফোন আর ফেরত পাওয়া যায়নি। নম্বরটি অবশ্য পেয়েছিলাম।  এর ঠিক উলটো ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম অবশ্য গতবছর।  যাব আদ্রা। কলকাতার ফ্ল্যাট থেকে হাওড়া স্টেশনে এসে ধরব পুরুলিয়া এক্সপ্রেস। ডেকেছি উবের। এ বার আর আমি না। ট্যাক্সিতে ফোন ফেলে এল কন্যারত্ন। হাওড়ায় ট্রেনে বসে টনক নড়ল। করলাম ফোন। ধরলেন ড্রাইভার। বললেন, ফোন ফিরিয়ে দেবেন। প্রায় এক মাস নিজের কাছে ফোনটি রেখেছিলেন তিনি। তারপর ফিরিয়ে দিলেন ফোন, পার্ক স্ট্রিটে। আমি কিছুটা টাকা দিতে গেছিলাম ওঁর হাতে, নিলেন না কিছুতেই। উবেররই আর এক চালক অবশ্য আমার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা অতিরিক্ত নিয়েছিলেন একবার, আমার অ্যাকাউন্টে বাড়তি টাকাটুকু জমা করে দেবেন—এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সে প্রতিশ্রুতি অবশ্য তিনি সযত্নে ভেঙেছিলেন।  এইসব পরস্পরবিরোধী অভিজ্ঞতার কারণেই আমি স্থির বুঝেছি যে, ড্রাইভারদের সম্বন্ধে শেষ কথা বলা যায় না। বলা অসম্ভব।

আরও পড়ুন : ব্লগ ব্লগ : প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম

#

আমার সম্বন্ধে অবশ্য শেষ কথা বলে দিয়েছিলেন এক বাংলাদেশি ট্যাক্সি ড্রাইভার, অস্ট্রেলিয়ায়। সেবার সিডনি থেকে ছিল দেশে ফেরার ফ্লাইট। ট্যাক্সি বুক করার পর যখন গাড়ি এল, দেখলাম ড্রাইভার বাংলাদেশি। বেশ কয়েকমাস অস্ট্রেলিয়ায় কাটিয়ে দেশে ফিরে যাচ্ছি শুনে তিনি স্থির সিদ্ধান্ত করলেন যে, আমার মতো নির্বোধ আর হয় না।  আমার ছলেবলে কৌশলে নাকি ও দেশে থেকে যাওয়া উচিত।  এই বিধান দিয়ে ওই আধঘণ্টার ট্যাক্সি সফরেই তিনি শুনিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর জীবনকাহিনী।  একটি ব্যবসায়িক কনফারন্সে যোগ দিতে এসে ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও তিনি আর দেশে ফিরে যাননি। বিয়ে করে নিয়েছিলেন রেস্তোরাঁয় কাজ করা এক অস্ট্রেলীয় তরুণীকে। চুক্তির বিয়ে।  ওই বিয়ের সুবাদেই  মিলে গিয়েছিল নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব মিলে যাওয়ার পরে চুক্তি মাফিক ডিভোর্স। তারপরে বাংলাদেশ থেকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন, তাঁর ভাষায়, তাঁর ‘প্রকৃত স্ত্রী’ ও দুই শিশুপুত্রকে। আমাকে বারবার বলছিলেন যে, তাঁর দুই পুত্র ভালো স্কুলে পড়ে, চমৎকার অস্ট্রেলীয় অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বলে, কে বলবে যে তারা অস্ট্রেলীয় নয়!  বলছিলেন যে, এই সোনার দেশ থেকে কেউ ফিরে যায় না। ভারতীয়-অস্ট্রেলীয় মেয়ে না পাওয়া গেলে ফিজির মেয়েদের বিয়ে করতেই পারি। ওরা অনেকেই অস্ট্রেলীয় কিন্তু খাওয়া-দাওয়া, আদব-কায়দার সঙ্গে ভারতীয়দের মিল বিস্তর! খুঁজে পেতে একজনকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। বলেছিলেন যে, কয়েকটা তো বছরের মামলা। তারপরে আমি দেশ থেকে মেয়ে বউকে ঠিকই  নিয়ে যেতে পারব।

আরও পড়ুন : নিবিড় অমা-তিমির হতে বাহির হল 

#

না, আজ সকালে ভাস্কর চক্রবর্তীর পঙ্‌তিটি পড়ে এই ড্রাইভারটির কথা মনে পড়েনি। মনে পড়েছিল বরং এক কোরিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভারের কথা। তাঁরও দেখা পেয়েছিলাম ওই সিডনি শহরেই। হোটেল থেকে একদিন সিডনি ইউনিভার্সিটি যাওয়ার পথে। ট্যাক্সিতে ওঠার পরেই তাঁর সঙ্গে আমার ঠোকাঠুকি লেগে গেল আমি ‘এশিয়ান’ কি না তা নিয়ে।  তিনি বলতে থাকলেন, “তোমরা কিছুতেই ‘এশিয়ান’ নও। গোটা পৃথিবী তোমাদের ‘এশিয়ান’ বলে মানে না, তোমরা হলে ‘সাউথ এশিয়ান’”। ডায়াসপোরার মিথ্যে তত্ত্ব কপচানো, পন্ডিত পন্ডিত হাবভাব করা আমি যখন তাঁর ওই উক্তির মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি ডায়াসপোরার বিভাজনের ইতিহাস, কী ভাবে ‘এশিয়ান’ কেন, আর ‘ভারতীয়’ ডায়াসপোরাকেও একটি ছাতার তলায় রাখা অসম্ভব—সেই গূঢ় অভিজ্ঞানের ইশারা, তখন আমাকে আরও চমকিত করে দিয়ে ওই ট্যাক্সি ড্রাইভার ‘সাউথ এশিয়ান’দের ওপর ওঁর আসল রাগের কারণটি পরিষ্কার করলেন। বললেন, “বুদ্ধ জন্মালেন তোমাদের ভূখণ্ডে, আর তোমরাই কি না ওঁকে ব্রাত্য করে রাখলে, বুঝতেই পারলে না, এই লোকটিই পথ দেখাতে পারেন বিশ্বকে”। বললেন যে, এ ব্যাপারে, দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে ভারতীয়দের পাপ নাকি ক্ষমার অযোগ্য। আমরা পারতাম বুদ্ধকে গোটা পৃথিবীর সামনে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থাপন করতে, করিনি। জানি, একথা বললেই অনেকেই বৌদ্ধদের হিংসার অতীত আর বর্তমান নিয়ে এখনই গুরু গম্ভীর তত্ত্বালোচনা শুরু করে দেবেন। যার কণাখানিক এই অধমেরও জানা। কিন্তু, তবু সিডনি শহরের রাজপথে এক কোরিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভারের শকটে সওয়ার হয়ে সেদিন মনে হয়েছিল যে, সত্যিই তো গৌতমকে কি আমাদের জীবনচর্যায় সেভাবে স্থান দিতে পেরেছি আমরা? আদর করেছি তাঁর দর্শনের? করিনি তো। করিনি বলেই যখন বৃষ্টিতে গোলা-বারুদের মিইয়ে নেতিয়ে পড়ার কথা, তখনও জঙ্গিরা নিরীহ মানুষ মারার নতুন নতুন পরিকল্পনা করছে আর ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার স্বার্থে হাল্লা রাজার মুখে শোনা যাচ্ছে যুদ্ধের নব নব হুংকার। সত্যিই মনে হচ্ছে, সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।  

Comments are closed.