শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

ব্লগ: একটি মোটর কার গাড়লের মতো গেল কেশে

অংশুমান কর

এক মুহূর্তে আপনি রাজা থেকে ফকির হতে পারেন। হতে পারেন কোটিপতি থেকে ভিখিরি। কীভাবে? বলছি।

 

একটা সময় ছিল যখন বর্ধমান থেকে কলকাতা যাওয়ার কোনও বাস ছিলই না।  যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল ট্রেন। আমরা যারা মাঝেসাজে কলকাতা যেতাম, ডেলি প্যাসেঞ্জার ছিলাম না, তাঁদের জন্য তখন ট্রেনে চড়া ছিল এক বিষম আপদ। ট্রেনে উঠে বসার জায়গা পাব কিনা—সে দুশ্চিন্তায় মাথার চুল খাড়া হয়েই থাকত। তারপর হঠাৎ একদিন কলকাতা যাব বলে ট্রেন ধরতে স্টেশনে গিয়ে দেখলাম স্টেশনের বাইরে থেকে একেবারে সোজা এসপ্ল্যানেড যাবে বলে তৈরি হয়ে বসে আছে একটি লাল-সাদা এসবিএসটিসি বাস। যাত্রী প্রায় নেই। কন্ডাকটর দু’ঘণ্টার মধ্যে কলকাতা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় আমি আর আমার এক সহকর্মী  উঠে বসেছিলাম বাসে। কথার খেলাপ হয়নি। ঠিক দু’ঘণ্টায় গিয়ে নেমেছিলাম ধর্মতলায়। সেই শুরু। তারপর এখন কলকাতা যাওয়ার কথা ভাবলে বাস ছাড়া অন্য কিছুর কথা মাথায়ই আসে না। এখন সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু বাস যাত্রায় নিজেকে বেশ রাজা রাজা মনে হয়। কেননা, বাসে গেলে ওই ট্রেনে উঠে সিট পাব কি না সে দুশ্চিন্তা নেই। অনলাইনে নিজের পছন্দসই সিট বুক করে নিন, আর তারপর বসে পড়ুন গদি মোড়া সিটে; জানলা দিয়ে দিগন্তকে চুম্বন করে ছুটে আসা হাওয়ার কম্পিত অঙ্গুলিস্পর্শে এলোমেলো হয়ে যাক চুল,  এবার আপনিই তো  অর্ধেক পৃথিবীর অধীশ্বর। ছুটে চলেছেন বাকি অর্ধেক জয় করে নেবেন বলে। এই দিবাস্বপ্ন ভাঙতে কিন্তু এক সেকেন্ডও লাগবে না যদি মধ্যরাস্তায়, হাইওয়ের ওপর টুক করে খারাপ হয়ে যায় বাস। স্বপ্ন ভেঙে গেলে তখন আপনি শুনবেন বাস্তবে বোমা ফাটল। না, চাকা বার্স্ট করার শব্দ নয় ওটা। বিরক্ত ড্রাইভার গালাগাল করতে করতে দুম করে কেবিন-সংলগ্ন হাফ-দরজাটি খুলে, বন্ধ করে নীচে নামলেন আর শব্দ হল যেন বোমা ফাটার। ড্রাইভার সাহেব কিছুক্ষণ এই পাইপ, ওই বল্টু নেড়েচেড়ে রণে ভঙ্গ দেবেন। তারপর কন্ডাকটর জানিয়ে দেবেন এই বাস আর যাবে না। কলকাতা পৌঁছতে তখনও ঘণ্টা খানেক বাকি। অগত্যা বেজার মুখে অন্য প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে আপনিও নেমে আসবেন হাইওয়ের ওপরে। সাঁ সাঁ করে আপনার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাবে বেসরকারি ও অন্যান্য সরকারি কোম্পানির বাস। তারা আপনাকে নেবে না। কেননা, আপনি এসবিএসটিসির প্যাসেঞ্জার। তারপর অবশেষে আধঘণ্টা প্রতীক্ষার পরে আসবে একটি এসবিএসটিসি বাস। আপনি উঠতে অনুমতি পাবেন সে বাসে। কিন্তু উঠে দেখবেন একটিও সিট খালি নেই। অগত্যা বেজার মুখে রড ধরে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে আপনাকে। ভাগ্য ভাল থাকলে, রড দিয়েই বানানো বাসের কেরিয়ারে রাখতে পাবেন কাঁধের ব্যাগ, নইলে, সে ব্যাগও গন্ধমাদনের মতো ঝুলবে কাঁধের থেকেই। কোথায় তখন সম্রাটের মেজাজ? আপনার মনে হবে ওই বাসে বসে থাকা যাত্রীরা সকলেই আপনাকে করুণা করছে। মুচকি হাসছে আপনার দিকে তাকিয়ে। নিজেকে তখন মনে হবেই হবে ভিখিরিরও অধম!

 

কেন কে জানে, এ রকম আমার সঙ্গে বারবার হয়। যন্ত্রের সঙ্গে আমার একেবারেই সদ্‌ভাব নেই। বারবার আমি যন্ত্রের কাছে হেরে যাই। বাস খারাপ হয়, গাড়ি খারাপ হয়, নতুন কেনা টিভি, গিজার, মোবাইলও খারাপ হয়ে যায়। বিকল যন্ত্রের সামনে আমি তখন নীরবে বসে থাকি। এটা ঠুকি, ওটা ঠুকি। কোনও কাজ হয় না। বুঝি, যন্ত্রকে আজও পুরোপুরি কব্জা করতে পারেনি মানুষ।  কী যে অসহায় লাগে তখন। এই তো কয়েকদিন আগে আমরা আর সৈকত-অর্পিতারা একদিনের জন্য বেড়াতে গেলুম তাজপুর। আমাদের সঙ্গে তিন্নি নেই। কিন্তু ছিল অর্পিতা-সৈকতের রাজপুত্রসদৃশ তনয় নালক। সমুদ্রের পারে সারাদিন ধরে হুটোপুটি চলল। সন্ধের মুখে গোধূলি, সমুদ্র আর অস্ত সূর্যকে সাক্ষী রেখে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলাম যে, নিদ্রাসুরকে পরাজিত করে পরের দিন ভোরবেলা আমরা যাবই যাব শঙ্করপুরে মাছধরা দেখতে। যেমন কথা, তেমন কাজ। পরেরদিন ভোরবেলা উঠে পড়লাম আমরা। একটি তারা তখনও আকাশে রয়েছে। ঘুম ভাঙিয়ে তোলা হল ড্রাইভারকে।  কিন্তু তার ঘুম ভাঙলে হবে কি! গাড়ি বেচারার ঘুম ভাঙল না। সারারাত্রি হিমের সঙ্গে রতিবিলাসে শরীরে প্রেমের শীর্ষকে অনুভব করে, সে তখন ‘এলায়ে পড়েছে ছবি’। নড়েও না, চড়েও না। আর শক্তি নেই। যে হোটেলে আমরা ছিলাম সেই হোটেলের কর্মীদের দু’তিনজন, রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারীদের দু’একজন মিলে বিস্তর ঠেলাঠেলির পর সে আবার নতুন করে তন্বী দিবসের অঙ্গ মর্দনের জন্য প্রস্তুত হল। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

 

প্রায় একই কাণ্ড ঘটল মাত্র ক’দিন আগে বাঁকুড়া কবিতা উৎসব থেকে ফেরার পথে। খুব ভোরে উঠে জয়পুরের জঙ্গল থেকে রওনা দিয়েছি একটি অল্টোয়। গন্তব্য আরামবাগ। সেখান থেকে বাস ধরে দশটার মধ্যে ফিরব বর্ধমান। দুয়ারে প্রস্তুত থাকবে গাড়ি। সে গাড়িতে চড়ে অতঃপর চলে যাব বিশ্বভারতীতে কলেজের অধ্যাপক এক গবেষকের পিএইচডির ভাইভা নিতে। হিসেব কষে কাঁটায় কাঁটায় মেপে রাখা আছে সময়। কিন্তু গোল বাঁধল  জয়পুর ছেড়ে একটু এগোতেই। একটি গ্রামে তিনটি গরু চুরি গেছে। তাই গ্রামবাসীরা অবরুদ্ধ করে রেখেছেন পথ। আমি আমার সারথিকে বললাম, ভাই আমাকে যেভাবে হোক পৌঁছে দাও আরামবাগ। ওকে বলতে পারলাম না যে, বিশ্বভারতীতে এক তরুণ গবেষকের ভাগ্য জড়িয়ে আছে ঠিক সময়ে আমার আরামবাগ পৌঁছনোর সঙ্গে, কিন্তু  আমার উৎকন্ঠা দেখে সে কী বুঝল কে জানে,  মূল রাস্তা ছেড়ে ধরল গ্রামের মাটির রাস্তা। আর সেই আঁকাবাঁকা লাল মাটির পথে একটু এগোবার পরেই দেহ রাখল অল্টোটি। এবার উপায়? সারথির এক বন্ধুকে রাজি করিয়ে সে আর একটি অল্টো হাজির করল আমার সামনে। এতে গেল আধঘণ্টা। অবশ্য ওই আধঘণ্টাটুকু দিব্য কেটেছিল আমার। বাঁকুড়ার রুক্ষ জমিও যে কীভাবে শ্যামলে শ্যামল হয়ে থাকতে পারে দেখলাম তা। ধানের শীষের সোনালি বিভার জ্যোতির সামনে লজ্জা পেয়ে মুখ লুকোল উৎকন্ঠার আঁধার।

 

তবে এই গাড়ি খারাপ হওয়ার সবচেয়ে রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছিল একবার মাজিরডাঙা যাওয়ার পথে। বাঁকুড়া জেলারই ছোট্ট এক গ্রাম মাজিরডাঙা, সোনামুখির থেকে খুব বেশি দূরে নয় এই জনপদ। ওই গ্রামটিই আমার স্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি। ওই গ্রামেই কেটেছে তার ছোটবেলা। বিয়ের আগের থেকেই সে গ্রাম নিয়ে শুনে আসছি কতই না রূপকথা। অথচ বিয়ে হয়ে যাওয়ার বেশ কিছু বছর পরেও ওই গ্রামে পা রাখিনি আমি। কারণ সেই কোন ছেলেবেলাতেই ওই গ্রামকে বিদায় জানিয়ে আমার স্ত্রীও তো চলে এসেছিল বেলিয়াতোড়ে। আমার শ্বশুরমশাই তো বাড়ি বানিয়েছিলেন বেলিয়াতোড়েই। যাই হোক, একবার পুজোর সময়ে ঠিক হল যে, মাজিরডাঙা যাব আমরা। আমি, সোমা, তিন্নি, আমার দুই শ্যালিকা, শ্যালিকার পুত্র আর আমার শাশুড়ি মাতা। এদের মধ্যে আমি, তিন্নি আর শ্যালিকার পুত্রই যা একটু রোগাসোগা। তবু সকলে মিলে চেপে বসলাম ভাড়া করা একটা সাদা অ্যম্বাসাডারে। এতজন মিলে একটা গাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে আমার একটু কিন্তু কিন্তু ছিল। তবে পাত্তাই দিলেন না আমার ডাকাবুকো শাশুড়ি ঠাকরুন। অ্যাম্বাসাডারের নাকি বক রাক্ষসের বল। এগোতে লাগল গাড়ি। শুনলাম যে, একটা শর্টকার্ট রাস্তা আছে। সেটাই ধরব আমরা। তবে সে পথে যেতে গেলে গাড়ি নিয়েই পেরোতে হবে শালি নদী। শুনলাম যে, সেও খুবই সাদামাটা ব্যাপার, কারণ পুজোর পরে ও নদী তখন শুকিয়ে খটখটে। একসময় গাড়ি উঠে পড়ল শালি নদীর বুকে। কিন্তু  নদীর ঠিক মাঝখানে এসে বন্ধ হয়ে গেল  গাড়ির স্টার্ট। আমি ড্রাইভারকে বললাম, নামব কি? আত্মসম্মানে ঘা লাগল তার। সে বলল, না, বসুন, এখনই স্টার্ট নিল বলে। কিন্তু যতই সে চাবি ঘোরায় গাড়ি স্টার্ট আর নেয় না, উলটে কাশতে লাগে গাড়লের মতো। বেশ খানিকক্ষণের চেষ্টায় অবশেষে গাড়ি স্টার্ট নিতে হল আর এক বিপত্তি। ড্রাইভার যতই অ্যাক্সিলেটর দাবায়, ভাবে এগোবে গাড়ি, ততই আমাদের অতজনের ভারে গাড়ির চাকা বসে যেতে থাকে বালির গভীরে। বুঝলাম বিপদ, এইবার ড্রাইভারকে ধমক দিয়ে নামলাম আমি। নামলেন আমার আপদ সামলাতে সিদ্ধহস্ত ওস্তাদ শাশুড়ি ঠাকরুন। দূরে নদীর অন্য পারে দেখা যাচ্ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু মানুষজন। কাজ করছিলেন তাঁরা মাঠে। আমার শাশুড়ি মায়ের হাঁকডাক শুনে ছুটে এলেন তাঁরা। জানলেন যে, তাঁদের গ্রামের জামাই এই প্রথম পা রাখতে চলেছিলেন তাঁদের গ্রামে, তার আগেই এই বিপত্তি। মুহূর্তে তাঁরা হয়ে উঠলেন বিপদত্তারণ। আমাদের সকলকে প্রথমেই বললেন গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে নদী পেরিয়ে মাজিরডাঙায় যেতে। তারপর তাঁরা যা করলেন, তা নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। বেশ কয়েকজন মানুষ মিলে প্রায় চ্যাং দোলা করে বালিতে বসে যাওয়া গাড়িকে নদী পার করে এনে দাঁড় করালেন আমাদের সামনে।

 

ওই রকম একটা দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমি সত্যিই সেদিন বাক্‌রহিত হয়ে গিয়েছিলাম। তবে সত্যি বলতে কি, খুব আনন্দও হয়েছিল। না, জামাই হিসেবে ওই বিশেষ খাতির পাওয়ার জন্য না। আনন্দ পেয়েছিলাম বরং জীবনে ওই একবারই যন্ত্রকে পরাজিত করতে পেরে। এটা ভেবে যে,  এমনকী রাক্ষসও কখনও যূথবদ্ধ মানুষকে পরাজিত করতে পারে না।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।  

Shares

Comments are closed.