নিবিড় অমা-তিমির হতে বাহির হল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অংশুমান কর

এ লেখা যখন লিখছি তখন লক্ষ্মী পুজোর মাত্র আর দু’দিন বাকি। এসেছি গ্রামের বাড়ি বেলিয়াতোড়ে।  উঠোন থেকে তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। চাঁদ দেখছি। মনে হচ্ছে টুক করে কেউ যেন তার একটু খানি অংশ ভেঙে চায়ে ডুবিয়ে খেয়ে ফেলেছে। আকাশে ভাঙা চাঁদ। মাটিতে তার আলো। তাতে কিন্তু বিস্কুটের রঙ নেই। বরং চরাচর ভাসিয়ে দিচ্ছে নীলকন্ঠ পাখির পালকের মতো জোৎস্না। জোৎস্নার ঠিক এই রকম রঙ বছরের আর কোনও সময় আমি দেখি না। আসলে এই সময়ের জোৎস্না তো শুধু জোৎস্না নয়, তার সঙ্গে নিক্তিতে মেপে মিশিয়ে দেওয়া থাকে হিম আর শিশির। খিচুড়ি বা লাবড়া বা নারকেল নাড়ু বা লাল-নীল-সবুজ রঙের কদমার পিরামিডের জন্য নয়, ছোটবেলা থেকেই ওই নীলকন্ঠ পাখির পালকের মতো জোৎস্নার জন্যই লক্ষ্মীপুজো আমার বড্ড প্রিয়।

আরও পড়ুন ব্লগ : প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম 

#

ভাবলে অবাক লাগে যে, যে জোৎস্না বা চাঁদের প্রতি ছেলেবেলায় আমার ছিল প্রগাঢ় প্রেম, সেই জোৎস্না আর চাঁদের প্রতিও এক বিবমিষা তৈরি হয়েছিল এক সময়। তখন আমরা কয়েকজন বন্ধু ‘জরুরি অবস্থা’ নামে একটি ছোট পত্রিকা প্রকাশ করে বাংলা কবিতায় একটা হেস্তনেস্ত করব মনস্থ করেছি। তিরিশ পেরোইনি কেউই। সেই বন্ধুদের অনেকের মতোই আমিও ক্রমশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছি চাঁদ-তারা-ফুল-পাখি ঘেরা জীবনের ভেতরে প্রকৃত কবিতা নেই; তা বরং লুকিয়ে আছে ওই ঘেরাটোপের বাইরেই। সেই সময়েই শ্রীজাত একটা কবিতা লিখেছিল যার নাম ছিল ‘রেসিপি নং-১’। তাতে ও লিখেছিল: “চাঁদ তাক ক’রে গুলি মারুন—ঢিচক্যাঁও! / চাঁদ লুড়কিয়ে যাবে’। পড়ে আমি ভেবেছিলাম, আরে এ তো আমারই লেখার কথা ছিল! আসলে বাংলা কবিতায় চাঁদকে নিয়ে যে মায়া ও মিঠে রহস্য তৈরি হয়েছিল আমরা কেউ কেউ তাকেই আক্রমণ করতে চাইছিলাম অন্ধের মতো। ওই সময়কালেই চাঁদকে নিয়ে আমিও ‘নোংরা চাঁদ’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলাম, যে কবিতায় লিখেছিলাম ‘জঞ্জাল ফেলার বাস্কেটকে চাঁদের মতো দেখাচ্ছে’। বেশ মনে আছে যে, ওই কবিতাটি লিখে রূপময় চাঁদের  থেকে আমি কেড়ে নিতে চেয়েছিলাম তার শ্রী। তাই লিখেছিলাম যে, জঞ্জাল ফেলার বাস্কেটে পাওয়া গেছে পুরনো মোজা, ছেঁড়া রিবন আর গায়ের ময়লা। তবে শুধু এটুকুই না। আরও লিখেছিলাম যে, জঞ্জাল ফেলার বাস্কেটে পাওয়া গেছে সাদা পাতা, পুরো পৃথিবী, একটি জীবন। এসবও লিখেছিলাম ওটুকু বোঝাতেই যে, পৃথিবী মানে শুধু চাঁদ-ফুল-তারা-পাখি নয়। কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে  প্রশ্নকর্তা আমায় জিজ্ঞেস করলেন এই কবিতাটিতে কেন আমি চাঁদকে জঞ্জাল ফেলার বাস্কেটের সঙ্গে তুলনা করেছি। তখনও আমি একই কথা বললাম। বললাম যে, চাঁদকে নোংরা করে দেওয়াই ছিল আমার লক্ষ্য। সত্যি বলতে কি, প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার সময় আমার পুরো কবিতাটি মনে ছিল না। সাক্ষাৎকার শেষ হলে আমি আবারও পড়েছিলাম নিজেরই লেখা ওই পুরনো কবিতাটি। পড়ে মনে হয়েছিল, আরে! চাঁদকে শ্রীহীন করতে গিয়ে আমি তো আসলে জঞ্জাল ফেলার বাস্কেটেই একটা আলগা শ্রী জুড়ে দিয়েছি। ওই যে লিখেছি, ‘পুরো পৃথিবী’—ওর মধ্যে তো কেবল শ্রীহীন জগত-সংসার নেই, আছে শ্রীময়ী বসুধা। আসলে কবিতায় উদ্দেশ্যের উপরিতলের নিচ দিয়ে চিরকালই তো বয়ে চলে ফল্গুধারা বিধেয়—অন্তর্ঘাত তার অনিবার্য কর্ম।

আরও পড়ুন ব্লগ: শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?

#

বিবমিষা থেকে জন্মানো চাঁদ নিয়ে লেখা কবিতার ভেতরেও ছিল যে লুকোনো অনুরাগ, নিজের ভেতরেই কোনও এক গোপন কুঠুরীতে সঞ্চিত সেই অনুরাগ অবশ্য বেশ স্পষ্ট করে আমার কাছে ধরা পড়েছিল একটি অনুষ্ঠানে। সেটি ছিল বর্ধমানে বসন্তোৎসবের একটি অনুষ্ঠান। এখন আর সেই অনুষ্ঠানটি হয় না। তবে যখনকার কথা বলছি তখন সেই অনুষ্ঠান হত বর্ধমান শহরের সবচেয়ে বড় পুষ্করিণী কৃষ্ণসায়রের পাড়ে, জলের ওপর একটি ভাসমান মঞ্চে।  সেই বসন্তোৎসবের প্রথম দিন দোল পূর্ণিমার সন্ধ্যায় ওই ভাসমান মঞ্চে ‘নিবিড় অমা-তিমির হতে বাহির হল’ গাইছিল শুভদা, মানে সঙ্গীত শিল্পী শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার। গান যখন ও ধরেছিল তখন চাঁদের আলো ছিল ম্লান; কৃষ্ণবর্ণ মেঘের টুকরো ঢেকে রেখেছিল পূর্ণশশীকে। কিন্তু যেই শুভদার কন্ঠে উচ্চারিত হল ‘শুক্লরাতে চাঁদের তরণী’ অমনি আমি দেখলাম কোনও এক কল্যাণময় করস্পর্শে যেন সরে গেল মেঘ আর দেবদারু গাছের মাথার ওপর এক নবীন সন্ন্যাসীর মতো স্মিত হেসে উঠলেন পূর্ণচন্দ্র। কী যে হল এরপর সে কথা এই ল্যাপটপ তো কোন ছার, খাগের কলমও কোনওদিন সম্পূর্ণ লিখে উঠতে পারবে না। তাই সে পথে যাচ্ছি না, শুধু সেই সমাপতন আমাকে বেশ স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, চাঁদকে ঘিরে তৈরি হওয়া মায়া আর কুয়াশা ছিন্ন করে এমন বাস্তব ঘোর বস্তুবাদীরাও আজও নির্মাণ করতে পারেনি; বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, কবিতা লেখার দন্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত আমাদের মতো কয়েদীদের বাস্তবের জেলখানা থেকে মুক্তি দেন যে গেরিলা যোদ্ধা, তিনিই তো চাঁদ।

#

লক্ষ্মীপুজোর ঠিক দু’দিন আগে বেলিয়াতোড়ের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মনে হচ্ছে এইসব। মনে হচ্ছে যতই চেষ্টা হোক না কেন, বাংলা কবিতায় চাঁদের বিসর্জন অসম্ভব। তাই আমি আর শ্রীজাত দু’জনেই তো পরে চাঁদ নিয়ে লিখে ফেলেছি একাধিক কবিতা। সত্যি বলতে কি, হিসেব করে দেখলে, চাঁদকে নিয়ে যত কবিতা আমি লিখেছি তার সিকিভাগও তো সূর্যকে নিয়ে লিখিনি, অথচ বিজ্ঞান তো জানিয়ে দিয়েছে যে, চাঁদ হল পরজীবী, সূর্যের আলোই তার আলো। তবে শুধু আমার কবিতাতেই নয়, সারা পৃথিবীতেই যত কবিতায় চাঁদ এসেছে বোধহয় তার সিকিভাগ কবিতাতেও সূর্য আসেনি। আসলে ওই যে চাঁদের বাড়া-কমা, ওই যে ক্ষইতে ক্ষইতে একেবারে শেষ হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে আবার প্রাণ ফিরে পাওয়া, আবার ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে ওঠা—জীবনের  এই সার সত্যটুকু নভোমন্ডলীর আর কোনও দীপ্ত গোলকই কি এভাবে স্পর্শ করতে পারে? একটি মৃত্যুর ধাক্কায় বিষণ্ণ হয়ে, ঈষৎ ন্যূব্জ হৃদয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে এমনটাও।

#

এ লেখা যেদিন আপনারা পড়বেন সেদিন বাঙালির ঘরে ঘরে পূজিতা হবেন ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী। তাঁর কাছে বাঙালি যাঞ্চা করবে ধন-সম্পদ, সমৃদ্ধি।  আর না-চাইতেই আকাশে পূর্ণ গোলক হয়ে জেগে উঠে মাঠে-প্রান্তরে, তালগাছের মাথায় আর নবীন ধানের শীষে, ভীতু আমলকি বনে আর অন্যমনস্ক পুকুরের ওপরে নীলকন্ঠ পাখির পালকের মতো জোৎস্না ছড়িয়ে দিয়ে নবজীবিত চন্দ্র যেন এই বার্তা দেবে যে,  মণি-মানিক্য নয় অপরাজেয় প্রাণশক্তিই জীবনের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।  

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More