সোমবার, নভেম্বর ১৮

ব্লগ: থাকতে দে-না আপন-মনে

আবীর মুখোপাধ্যায়

বিশ্বভারতীর বাসা থেকে নিজের ঠিকানায় চলে আসার পরে, শেষ বয়সে একা একা আপনমনে ছবি আঁকতেন নন্দলাল। চারপাশে পড়ে থাকত ছোট ছোট কাগজ। পরনে হাঁটু পর্যন্ত ঝুলের পাজামা, হাতকাটা কুর্তা। এমন একলা হয়েই থাকতেন আরেকজন শিল্পীও। শ্রীপল্লির কোয়ার্টারে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। বাগানে বসে ছবি আঁকতেন, কাগজ জুড়তেন সারা দুপুরজুড়ে। চোখে দেখতে পেতেন না তবু, অন্তরের গহনে ছিল তাঁর দৃষ্টি। বড় একলা ছিলেন আর এক শিল্পী— প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। কিঙ্কর রবিঠাকুর গাইতেন তাঁর নিঃসঙ্গ সময়ে। কেউ দেখা করতে গেলে একাকী অভিমানে বলতেন, ‘আমি বুড়ো লোক। বেশিক্ষণ আমার সঙ্গ পছন্দ না হলে চলে তো যাবেই!’

একা একা এমন করে দিন যাপনের অপর নাম কি শান্তিনিকেতন! নন্দলাল কিংবা কিঙ্করকে একলা সময় দেখিনি। পড়েছি অনেকের লেখায়। তবে পড়তে পড়তে সেই জানার সঙ্গে মিলেছে পরের দিকে দেখা ও শোনা মানুষদের শান্তিনিকেতন-যাপন। কয়েকজনের কথা বললেই, তাঁদের রোজনামচা কতো সহজ ছিল, কেন তাঁরা শান্তিনিকেতনি ছিলেন মালুম হয়। অনুভব করা যায়, এখানকার নিভৃতিকে।

‘পলাশ’—পূর্বপল্লিতে আমাদের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের ঠিক সামনে, ছোট্ট একটা মাঠের পাশেই শ্যামলীদির এই বাড়ি। শ্যামলীদি মানে শ্যামলী খাস্তগীর। গেট সরিয়ে দু’পাশে কেয়ারি বাগান। লাল কাঁকর। গেটের ডানদিকে মাধবীলতা। বাঁদিকে বাঁশবন, উঠোনজুড়ে গাছগাছালি। গ্রিলে ঝুলত ডোকরার ঘণ্টা। বাজাতেই উনি এসে খুলে দিতেন। এমন সহজ মানুষ আমি আর দুটি দেখিনি। যেন কতো কালের পরিচয়।

ভিতরে ডেকে নিতে নিতে শুরু হত কথা। পুরনো আশ্রম, পরিবেশের বিপণ্ণতা, ছবি আর লেখার কথা। কথার মাঝে চোখ যেত ঘরের চারধারে। ছবি আর ছবি। সমবায়ের হলুদ পর্দা, ফুলদানিতে কাগজফুল। ডাঁই করে রাখা বইয়ের মাঝে ওঁর ঘর-গেরস্থালি। খাদির শাড়ির মতো মিঠে-নরম ঘরের চারধারের রোজনামচা।

কোনওদিন কথার ফাঁকে হাতে দিতেন আমপোড়ার শরবৎ, কোনওদিন বাগানের লেমনগ্রাসের চা, তিলের নাড়ু। মুসৌরি, লক্ষ্মৌ থেকে জীবনের শেষ বেলায় একেবারের জন্য এই পূর্বপল্লির বাড়িতেই ‘একটু নির্জনতা’-র সন্ধানে ফিরেছিলেন কিঙ্কর-বিনোদবিহারীর সহপাঠী, নন্দলালের ছাত্র সুধীর খাস্তগীর। শান্তিনিকেতনের পরিবেশ আন্দোলনের সময় দেখেছি, শ্যামলীদি কেমন করে প্রতিবাদ করতেন। খোয়াই আন্দোলনের সময় সোমনাথবাবুর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। আর একবার বিশ্বভারতীর এক উপাচার্যকে মন্দিরে উপাসনার পরে দেখা করে ‘সভ্যতার সংকট’ উপহার দিলেন। বলেছিলেন, ‘একটু-আধটু পড়বেন এগুলো।’

পূর্বপল্লির সেলিব্রিটিদের বাড়ি নিয়ে একবার একটি নামি সংবাদপত্রে একটি লেখা লিখেছিলাম। তখনই কতো মানুষের কথা যে জেনেছিলাম। সবার বাড়ি হয়তো ছিল না। কেউ ভাড়া থাকতেন। কেউ কেউ ঘনিষ্ঠদের বাড়িতে এসে উঠতেন নিত্য এখানেই। সব মিলে যাকে বলে এইটেই ছিল শান্তিনিকেতনের নক্ষত্র সরণি।

এই সময়ের বিশিষ্ট শিল্পী শেখ শাহজাহানের কাছে অনেক গল্প শুনেছি মানিদার। তাঁর একলা সময়ের কথাও জেনেছি। এই পূর্বপল্লির বাড়ি থেকেই মাথায় টোকা রিকশায় করে কলাভবন যেতেন মানিদা। এখানেই, নিরিবিলি থাকতে চেয়ে, শখ করে ডেরা করেছিলেন কবি অশোকবিজয় রাহা।

শান্তিনিকেতনকে ঘিরে তাঁর যাপন ছিল কাব্যময়। সেখানে, খোয়াই পেরিয়ে দূর মাঠের দিগন্ত রেখা দেখা যায়। চারিদিকে ধূ ধূ মাঠ, এলোমেলো ঘূর্ণি হাওয়া। ঘাসে ঘাসে নেচে বেড়ানো শালিখ। বুদ্ধমূর্তির কাছে দাঁড়িয়ে অবাক একটি মেয়ে। খোঁপায় গোঁজা মালতী ফুল। আর হঠাৎ-ই  ‘দুটি ফুল হল প্রজাপতি’ নয়নতারার বনে

তাঁর লেখায়, দেখি কেমন করে ‘সদ্য-ফোটা রক্তজবা কানে, / বুকের কাঁচুলিখানি বিঁধে আচে মহুয়ার ডালে’ পারুলডাঙার গগনতলে ভোর নামে। ‘ছুটির সকাল’-এ ‘হাসির ঝরনা খুলে ওদিকে মেয়েরা সব আসে/ ঘণ্টাতলার পাশে’। দূরের আকাশে দুপুর ঘনায়। কখন যেন, ‘ছায়াগুলো বুকে হেঁটে নড়ে/ সরে যায় গাছতলা হতে/ শান-বাঁধা বেদীগুলো আধখানা রোদে’। শব্দের পিঠে শব্দ বসিয়ে অশোকবিজয় যে সময় শান্তিনিকেতনের এমন সব নিসর্গ আঁকছেন, সেটা তাঁর শান্তিনিকেতন কাল। ’৫১। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে ‘যেথা এই চৈত্রের শালবন’। তখন সদ্য এসেছেন সব পেয়েছির দেশে। শেষ জীবনে পূর্বপল্লিতেই বাড়ি করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন ‘সুরাহা।’

টুকরো টুকরো নানা ঘটনায় ছড়িয়ে থাকা এই নিঃসঙ্গ কবি-শিল্পীদের কথা লিখে রাখতে ইচ্ছে করে। সেই ধারারই এই লেখাটাও। একসঙ্গে অনেকের কথা মনে পড়ছে। তাই হয়তো অভিমুখ থেকে সরে যাচ্ছি বারে বার।

এই তো এখন যেমন অশোকবিজয়েরই একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ওঁর প্রথম দিকের কথা বলছিলাম। এটা শেষ পর্বের। তখনও রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির ঘোরে আচ্ছন্ন অশোকবিজয়। আশ্রমমাঠে বাসন্তিক রাতে, কোপাই ধারে হুহু হাওয়ায়, রবিঠাকুরের গানে তখনও নিভৃতি খুঁজে নেন তিনি। তেমন সময়কার একটি ঘটনা। এটা লিখেছেন সিলেটের লোক অমিতাভ চৌধুরী। তিনি সেই ছোট থেকেই পড়ছেন অশোকবিজয়ের কবিতা। অনেক লাইন মুখস্থও। বসন্তকালের রাত্তিরে পলাশ গাছ দেখে তাঁর মনে পড়ে যায়, ‘দূরে এককোণে পলাশের ডালে আগুন লেগেছে চাঁদে’। একবার চাদের রাতে শালবীথিতে হাঁটছেন অমিতাভ।

মনে পড়ছে অশোকবিজয়। ‘শোন, জ্যোৎস্নারাতে কোন, নিজের ছায়ার সঙ্গে ঘুরেছো কখনও-’।

হঠাৎ শিক্ষক অশোকবিজয়ের সঙ্গেই দেখা। ছায়াময় একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে অমিতাভকে বললেন, ‘সুইনবার্ন কী লিখেছিলেন জানো? লিফ প্রিন্টেড স্কাই’। কথাটা কত সত্যি, এখন এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে উপরে আকাশের দিকে তাকাও, দেখবে সেই লিফ প্রিন্টেড স্কাই।’

এখনও শান্তিনিকেতনে শিক্ষক আর ছাত্রের মধ্যে এমন করে দেখা হয়…? দেখা হলে একে অপরে এমন করেই আকাশচারিতায় মেতে ওঠেন! জানি না, সে উত্তর জানা হয়ও না। বরং শান্তিনিকেতনি মানুষদের সহজ, নির্বিবাদ জীবন দেখি। আরেকজন শিল্পীর কথা পড়ব এ বার। সুবর্ণরেখার সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যেতেন লম্বা রোগা, বিচিত্র রঙের জামায় মানুষটি। তিনি সোমনাথ হোড়। লালবাঁধের বাড়িতে গ্রামের ভিতর অপেক্ষা করে থাকত ওঁর শিল্পের সংসার। ওঁর মেয়ে চন্দনাদির সঙ্গে কথা হয় মাঝে মাঝে ফেসবুকে-টেলিফোনে। অবনপল্লিতে ওঁদের বাড়িতে আমি নিজেও গিয়েছে দু’এক বার। সোমনাথদা বেঁচে থাকতে আর শেষবার, যে দিন চলে গেলেন, সেদিন! তারপর চন্দনাদির কাছে একবার বোধহয়। পাশেই থাকেন সনৎদা। কথা বললে, মনের গহনে শান্তিনিকেতন কথাটার মানে জানা হয়! মোহর, নীলিমা, সুচিত্রা, শান্তিদেব প্রমুখদের রোজনামচা শুনলে যেমন মনে হয়। কিংবা বুদ্ধদেবের ‘সব পেয়েছির দেশ’ পড়লে যেমন। ঠিক তেমন। মনের মধ্যে অপার শান্তি অনুভব।

লেখালিখির সূত্রে আরেকজন প্রখ্যাত মানুষের কাছে যেতে হয়েছিল কয়েকবার। এ লেখার শেষে তাঁর কথা বলব এখন।

বিশ্বভারতীর উপাচার্য তখন সুরজিৎ সিংহ। ফেলোশিপ দিয়ে গুণীজনদের নিয়ে আসা হচ্ছে শান্তিনিকেতনে। কবি অমিয় চক্রবর্তীর প্ররোচনায় আহ্বান জানানো হল অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায়কে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতবিদ্যা বিভাগ থেকে অবসর নিয়ে স্ত্রী গীতাকে নিয়ে তিনি দেশে ফিরলেন। ’ ৮১-তে প্রথমে উঠলেন আবাগড় রাজবাড়িতে। এরপরে তাঁর ঠিকানা হল, রবীন্দ্রভবনের সহকর্মী মানসী দাসগুপ্তের পূর্বপল্লির বাগান-ঘেরা বাড়িটিতে। রবীন্দ্রভবনে দায়িত্বে থাকাকালীন একবার রবীন্দ্রভবনে ২২ শ্রাবণ রবীন্দ্র-পাণ্ডুলিপির প্রদর্শনী করলেন। আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘দেশ’ সম্পাদক সাগরময় ঘোষকে। যেতে পারেননি সাগরময়। চিঠিতে শিবনারায়ণকে লিখছেন, ‘‘…অনুশোচনা হচ্ছে কেন ২২ শ্রাবণে শান্তিনিকেতনে গেলাম না। তাছাড়া গৌর ও সুনীলের মুখে বর্ষাদিনের আড্ডার লোভনীয় বর্ণনাও শুনেছি।’’

এমন আড্ডা নিত্য বসাতেন শিববাবু।

নাস্তিক মানুষটি আমৃত্যু বর্ষা দিনে সদ্য ফোটা কেয়া ফুল, যামিনী রায়ের ছবি, রবীন্দ্রনাথের কাব্যলোক ছেয়ে ছিল তাঁর মন। কবি নরেশ গুহ-র তাতার ঘেরা সমুদ্র (১৯৭৬) কাব্যগ্রন্থের ‘ফাল্গুন ১৩৫৯’ নামের কবিতাটিতে এই জন্যই বুঝি লিখেছেন :

‘‘কেমন, বলিনি? দ্যাখো, বসন্ত ফোটায় গাছে ফুল। (ধন্যবাদ গৌরী দত্ত, শ্রীনিমাই চট্টোপাধ্যায়।)

তিপ্পান্ন সালেও আজো ফাল্গুন কী রঙ্গ দেখায়

বিশ্বাস হ’তো না যদি না-দেখতুম জ্বলন্ত শিমুল

বীরভূমে অজয়তীরে (সাক্ষী থাকে অম্লানকুসুম; —

সাক্ষী থাকে আরো এক অধ্যাপক, মাথাজোড়া টাক,

সারা রাস্তা ভদ্রলোক, বাপরে বাপ, কী বকবকুম!

কিন্তু এবে পরচর্চা থাক।)

তাহলে ফাল্গুনে দেখছি – আরে, তাই তো,

সত্যি যে পলাশ!

এতো লাল?

ওই কি রঙ্গন?

পৌঁছলাম শান্তিনিকেতন।

(আবীর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৮১ সালে। ছেলেবেলা কেটেছে অজয়ের স্রোত ছোঁয়ানো বীরভূমের বেজড়া গ্রামে। স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতে। সাংবাদিক হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। কাজ করেছেন অন্য সংবাদপত্রেও। পদ্য-গদ্য প্রকাশিত হয়েছে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘প্রতিদিন’, ‘উনিশ কুড়ি’, ‘সুখী গৃহকোণ’, ‘নতুন কৃত্তিবাস’-সহ নানা পত্র-পত্রিকায়। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মুখ ঢাকো করতলে’, ২০১৬-তে গদ্যগ্রন্থ ’১৫ মেমারি লেন’। এ ২০১৬ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’ । ১০১৮-তে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘পৌষমেলা : স্মৃতির সফর’। এখন ‘মাসিক কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য তিনি। শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজস্ব নিখিল বইওয়ালা বুক ক্যাফে।)

Leave A Reply