ছাতিমতলা/৩

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মোদিতে মতি নেই, ব্রেকআপে মনখারাপ

    আবীর মুখোপাধ্যায়

    মোদি আসছেন, সঙ্গে হাসিনা-মমতা। কিন্তু সে আমোদে মন নেই আশ্রমের। কেন না, শান্তিনিকেতন জুড়ে এখন সেমিস্টার শেষের ঘরে ফেরার গান।

    সন্ধ্যে রাতের রতনপল্লি, অরশ্রী, চৈত্য একটু একটু করে ফাঁকা হচ্ছে। প্রায় শুনশান দুপুরবেলার কাসাহারা, ছায়াঘর, নবদ্বীপ। মনখারাপিয়া হাওয়া মনোজদার হোটেলের টেবিলে। দিনভর বইওয়ালাতে বসে থাকতে থাকতেই প্রিয় বন্ধু-বন্ধুনিদের ঘরে ফেরার খবর মিলছে। কেউ ফিরবে সমাবর্তন সেরে। কেউ ফিরতে চায় মোদিকে না দেখেই, ভিড়ের সমুদ্রে না ভেসেই!

    এখন শান্তিনিকেতন এমন।

    ফাঁকা ফাঁকা, নিবু নিবু, প্রেম প্রেম, ব্রেকআপ, ব্রেকআপ!

    দু’জনে ফিরছি। কোথা থেকে যেন… হ্যাঁ, মনে পড়েছে। রতনকুঠির কাছে যে লিট্টির দোকান, সেখান থেকে। সন্ধ্যেবেলা ঘুগনি, সঙ্গে খান দুয়েক মিঠে লিট্টি খেয়ে দু’জনেরই ঠোঁট লাল। হুসহাস ঝালে একে অপরের নিষ্ঠ আশ্রয় হতে চায়। তারইমধ্যে কানে এল অবাঙালি যুগলের কথা। ওরা পাশাপাশি হেঁটে চলেছে। ছেলেটি পঞ্জাবিতে, মেয়েটি শাড়ি।

    ‘যেতে হবে, যেতেই হবে!’

    ‘বাবাকে কোনওভাবেই রাজি করাতে পারলাম না। মা-ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনের সপ্তাহে আসছে এখানে।’

    ‘একটা বছর থেকে যেতে পারতিস। প্লিজ।’

    ‘তা আর হয় না রে। ওরা এখানে দু’দিন থেকে আমাকে নিয়েই ফিরবে। তাছাড়া এখানে আমার কেরিয়ার নেই। তুই তো জানিস, খুব ছোট থেকে আমার বাইরে যাওয়ার স্বপ্ন!’

    দেখতে পাই, স্বপ্নগুলো ফিকে হতে হতে মিশে যাচ্ছে দূরের সেবা দোকানের ঝিম ধরা আলোক বিন্দুতে। আমরা রয়ে সয়ে হাঁটি। নইলে যে পথ ফুরিয়ে যাবে। কথা বলি না কেউ। আমি জানি, ও কি ভাবছে। হিজিবিজি থেকে কাল কেনা লিনেনের শাড়িটার আঁচল হাতে জড়াতে জড়াতে ভাবছে শিরিন আর দেবলের কথা। রিখিয়া আর অনন্তর কথা। ভাবছে, সেমিস্টার শেষ হতেই হঠাৎ এমন দূরে যাওয়াগুলো নিয়ে।

    সেমিস্টার শেষের শান্তিনিকেতন এখন এমন। এমনতরো।

    যারা পরস্পরকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে বা যাবে, সব সম্পর্কই যে ব্রেকআপ— তেমন নয়। কেউ কেউ হয়তো ছিল ভয় ধরানো ভীষণ কাছাকাছি। এখন থেকে তারা চলে যাবে সাইবার শাসিত দূর সম্পর্কে। অবশ্য দূরের নাকি কাছের সে সব বলার দিন এখনও আসেনি। কেউ চলে যেতে চায়, কাজ নিয়ে। হয়তো অনতি পরে একে-অপরের কাছাকাছি আসবে।

    সে সব বলতে বলতেই দু’জনে গিয়ে বসি বইওয়ালায়।

    দীয়া এরপর সুধীরকে বলবে, এলাচি চায়ের কথা। সমীরণদা, বিশ্বজিৎদা ফিরবেন সান্ধ্যভ্রমণ সেরে, মানবদা বাজারের থলি নিচে দিয়ে উপরে উঠে আসবেন গল্পের সিঁড়ি বেয়ে… একে একে তমোঘ্ন, ফাল্গুনি পান, কেশবনাগ।

    নাহ, তমোঘ্নোরও তো চলে যাবার কথা। আর কে কে যেন ঘর খুঁজছে যাদবপুরে…?

    একটু আগেই ফেসবুকে পোস্ট দেখলাম।

    শান্তিনিকেতন ছেড়ে যেতে যেতে নির্নিগড়ের বাসিন্দা মেয়েটি ফেসবুকে লিখেছে, ‘কলকাতায় একটা ঘর চাই। রেস্ট্রিকশন ছাড়া। যাদবপুরের আশেপাশে। সন্ধান থাকলে…!’

    চাঁদটা আজ কাস্তের মতো ধারালো হচ্ছে সন্ধ্যে থেকে। মাঝ রাতে ঠিক খুনে লাল হবে! এমন ধারালো চাঁদ আস্তিনের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। সে সব বলি, ও পঞ্জাবি ফোকের মুখড়া ধরে। কিন্তু কোনও কিছুতেই যেন মন নেই আমাদেরও। এত পরিচিত মানুষের একসঙ্গে শান্তিনিকেতন থেকে চলে যাওয়ার ঢল দেখে মনকেমন!

    দু’জনে কোহিনূর আর সুমন্তর কথা বলি।

    ক’দিন ধরেই এ ওকে গুছিয়ে দিচ্ছে। কেন না, পাঁচবছরের পাঠ চুকিয়ে কোহিনূর শ্রীসদন ছেড়ে চলে আসবে রতনপল্লির ভাড়া ঘরে। সুমন্ত চলে যাবে বেগুসরাই। স্কুলের চাকরি নিয়ে।

    ‘জিমকরবেট নিয়েছ?’

    ‘সিগনেট নয়, ওটা ইংরাজীতেই পড়ব। মনে করে তোমার সানগ্লাসটা নিও।’

    ‘এক্সটেনশন কড।’

    ‘হ্যাঁ বাবা, সব নিয়েছি। ও আরেকটা কথা, মেমোরি কার্ডগুলো নিতে ভুলো না।’

    মোদি, মমতা, হাসিনা— সিকিউরিটি, হেলিপ্যাড, হ্যালোজেন, হইহই-রইরই! কোনও কিছু নিয়েই যেন ভাবিত নয় ওরা। এই যুগল। ওই যুগল।

    এখনও রতনপল্লির মাঠে হাঁটতে হাঁটতে, ব্রেকআপ সামলাতে একে অপরকে বলছে, ‘প্লিজ, দেখ না। আরেকটা বছর সময় পেলে আমিও চলে যাব।’ কিংবা বলছে, ‘তাহলে চলেই যাবি।’ কেউ আবার পরম যত্নে ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছে। রাগারাগি করছে এই অল্প সময়ের বিরতির জন্য। যে কয়েকজন থাকছে, অপার আলসেমি তাদের রোজনামচায়!

    সকাল হচ্ছে। হোক।

    দুপুর গড়াচ্ছে। গড়িয়ে যাক।

    এই বার বিকেল। তো?

    মোদি। মমতা। হাসিনা। সিকিউরিটি পাস তুলবি না?

    উফ…! কি ঘুম পাচ্ছে। শান্তিতে ঘুমাব সারাদিন!

    নাহ, শান্তিনিকেতন আছে শান্তিনিকেতনেই!

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More