রবিবার, অক্টোবর ২০

দেখে নয়, শুধু গন্ধ আর শব্দেই তৈরি নানা পদ! দৃষ্টিহীনদের রান্না প্রতিযোগিতা, দেখুন ভিডিও

মধুরিমা রায়

রান্না আজকাল ঘরে ঘরে শিল্প। কাগজ বলুন, ইউটিউব বলুন বা টি.ভি চ্যনেল সব জায়গাতেই রান্না নিয়ে নানা রকম হৈ-হুল্লোড় চলছে। এই প্রতিযোগিতার বাজারে কে কার চেয়ে এগিয়ে তা নিয়ে ঠেলাঠেলি, গুঁতোগুঁতিরও অন্ত নেই। অনেত নেই নানা রকমের প্রতিযোগিতারও। এ শহরে সম্প্রতি হয়ে গেল তেমনই এক অভিনব রন্ধন-প্রতিযোগিতা।

অভিনব, কারণ এই প্রতিযোগিতায় যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা আমাদের থেকে একটু আলাদা। আমরা যারা পাঁচটা ইন্দ্রিয়ে সাবলীল, তাঁরাও যে সমস্ত রান্না খুব সহজে করতে পারি না, ওই ১২ জন প্রতিযোগী একটি ইন্দ্রিয় ছাড়াই তা করলেন নিখুঁত ভাবে। ১৩ জানুয়ারি শ্যামবাজারের রামধন মিত্র লেনে আয়োজিত ওই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সকলেই ছিলেন দৃষ্টিহীন!

বিস্ময় নিয়ে গিয়েছিলাম এ প্রতিযোগিতা দেখতে, ফিরলাম মুগ্ধতা নিয়ে। তবে কাটা-বাটা-কষা-বাড়ায় রাঁধুনিদের পারদর্শিতা দেখে মুগ্ধতা ছাড়া আর কোনও কিছুরই অবকাশ ছিল না। এই অভিনব প্রতিযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছিল “সংবেদন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার” সংস্থা এবং “পেটুক” ফুড ম্যাগাজিন।

উদ্যোক্তাদেরই এক জন, দেবাঞ্জন কর বলছিলেন, এ দেশে এই প্রথম এ ভাবে দৃষ্টিহীনরা রন্ধন প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন। এর আগে চিনে শুধুমাত্র কাটিং অর্থাৎ আনাজ কাটার কম্পিটিশনে অংশ নিতে দেখা গেছে দৃষ্টিহীনদের।

দেখে নিন প্রতিযোগিতার কয়েক ঝলক।

প্রতিযোগিতায় যাঁরা এসেছেন রানিগঞ্জ বা লক্ষ্মীকান্তপুর বা বসিরহাট থেকে, তাঁরা বলছেন এ তো তাঁদের রোজকার রান্না, নতুন কিছুই নয়। তাঁরা দেখতে পান না ঠিকই, তবে রান্নার শব্দ শুনে আর গন্ধে বুঝতে পারেন, কপি কতটা সেদ্ধ হল বা রান্নাটা তৈরি হল কি না। সে দিনও সে ভাবেই বানিয়ে ফেললেন কপি কষা, মুলো ঘণ্ট, মিক্সড ভেজ, ঝাল চাটনি, আলু কপির তরকারি। এমনকী রোজ গ্যাস আভেনে রান্না করে ইন্ডাকশনে অনভ্যস্ত তাঁরা, তবু লড়ে চলেছেন। পুরস্কার নয়, যোগদানের আনন্দেই বিভোর।

প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন শেফ রঙ্গন নিয়োগী এবং শেফ অমিত কর্মকার। এই বিচার যে অন্য প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা, বিচারকরাও তা মানলেন। তবে এ ক্ষেত্রেও এই যোগদানের উৎসাহই তাঁদের কাছে সব চেয়ে বেশি।

শ্যামবাজারের রামধন মিত্র লেনে রবিবারের সকালে রান্নার গন্ধে মিশেছিল এক অন্য আনন্দ। সকাল ১০টা থেকে দুপুর তিনটে হৈ হৈ করে রান্নাপর্ব চলল। বিচার শেষে মাম্পি দে-র মূলো চিংড়ি, মণিকা মণ্ডলের নতুন আলুর কষা দম, টিনা শ-র সিম-আলুর সবজি যখন পরপর ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড হল, বাকিরাও তখন দিব্যি হাসছেন।

কারণ তাঁরাও জানেন, দৃষ্টি যাঁদের আছে, তাঁরাও রান্না করতে গেলে তাঁদের হাত কাটে, মশলার বাটি হাত থেকে পড়ে যায়, কখনও বা নুনে পোড়া হয়, কখনও আবার ঝাল বেশিও হয়। তাই তাঁদের দৃষ্টি না থাকলেও, রান্নার এই সাহস ভিতর থেকেই এসেছে। যা প্রথম বার ভারতে ইতিহাস তৈরি করল।

Comments are closed.