বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫

তাদের ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালেই মৃত্যু, তারা বিষকন্যা

নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

রাজ্যের বাছাই করা সদ্যোজাত শিশুকন্যাদের নিয়মিত বিষ খাওয়ানোর আদেশ দিলেন  এক রাজা। এক জন ছাড়া মারা গেল তাদের সকলেই। আর প্রতিদিন বিষপানে বেঁচে থাকা সেই একটি মেয়ে এক সময়ে হয়ে উঠল চোখ-ধাঁধানো সুন্দরী এক বিষকন্যা।

এক দিন দলবল-সহ যুদ্ধে বন্দি হয়ে, বিষকন্যাকে শত্রু শিবিরে বীণা বাজাতে পাঠালেন আক্রান্ত রাজা। সেই মেয়ের রূপ যেন এক আগল ভাঙা প্লাবন! মুগ্ধ শত্রু-রাজা তাকে ডাকলেন নিজস্ব আড়ালে। তার পরে যেই তাকে কাছে টেনে তার ঠোঁটে রাখলেন অধৈর্য চুম্বন, মারা গেলেন নিজে।

ষোড়শ শতকের এক ফরাসি আখ্যানে পাওয়া যায় এই গল্প। গবেষকেরা মনে করেন, খ্রিস্টের জন্মের আগেই বিষকন্যা ধারণার উৎপত্তি ভারতে, পরে তা ছড়িয়ে যায় বিশ্বের অন্যত্র। সম্ভোগের প্রখরতায় বিষকন্যারা সরাসরি রক্তে ঢেলে দিত বিষ। কখনও তাদের ঘাম অথবা দৃষ্টি, কখনও শুধু নিশ্বাসেই মৃত্যু ছিল অনিবার্য। ‘অৰ্থশাস্ত্র’ প্রণেতা চাণক্যও রাজাকে সাবধান করে বলেছিলেন, অচেনা রমণীদের ব্যবহারের আগে ধুয়ে নিতে হবে তাদের উরু। কারণ হতেই পারে, তারা বিষকন্যা!

পুরানের পুতনা বিষকন্যাই

মথুরার রাজা কংস বাসুদেবের সঙ্গে বিয়ে দিলেন বোন দেবকীর। বিয়ের সময় দৈববাণী হলো: দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান হবে কংসের হত্যাকারী। সন্ত্রস্ত কংস কারাগারে আটক করলেন বোন আর ভগ্নীপতিকে। সেখানেই জন্ম কৃষ্ণের। জন্মরাত্রে ভগবান এসে বাসুদেবকে বললেন, গোপালক নন্দের স্ত্রী যশোদার কাছে তাঁদের নবজাতককে রেখে, যশোদার সদ্যোজাত কন্যাকে এনে দিতে হবে দেবকীর কোলে। সন্তর্পণে সেই কাজই করলেন বাসুদেব। আর তাই, কংসের আক্রমণ থেকে বেঁচে গেলেন কৃষ্ণ। নন্দগৃহে তিনি বেড়ে উঠছেন দাদা বলরামের সঙ্গে।

ও দিকে দেবকীর কোলের মেয়েকে পাথরে আছড়ে যেই মারতে গেলেন কংস, হাওয়ায় মিলিয়ে সে বলে গেল, কংসকে এক দিন বধ করবে যে, সে বেঁচে অন্য কোনও খানে। আতঙ্কে মথুরার সমস্ত শিশুকে মারলেন কংস। এই হত্যালীলায় তাঁর সহায় পুতনা রাক্ষসী। বিষস্তন্য পান করিয়ে একে একে শিশুদের শেষ করল এই ছদ্মরূপী রূপসী রাক্ষসী। এক সময়ে তার কোলে এলেন কৃষ্ণও। এত কঠোর ভাবে কৃষ্ণ পান করলেন রাক্ষসীর স্তন, যন্ত্রণায় পুতনার মৃত্যু হল সেখানেই। পুরাণের এই পুতনা ছিলেন আদতে বিষকন্যাই।

বিষপানেই বিষধর

এলোমেলো ভাবে প্রাচীন ভারতের কিছু আখ্যানে ছড়িয়ে আছে বিষকন্যাদের কথা। তার অন্যতম হল, সোমদেব ভট্টের ‘কথাসরিৎসাগর’। শৈশব থেকে প্রতিদিন অল্প অল্প বিষপানে পালিতা বিষকন্যাদের ব্যবহার করা হতো মূলত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আর গুপ্তহত্যার প্রয়োজনে। লালসার বশে বিষকন্যাদের দুর্নিবার আবেদনে সাড়া দিলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন ক্ষমতাবান রাজপুরুষেরা। কখনও নাচের দলে, কখনও বা উপহার হিসেবে, এই সব বিষকন্যাদের শত্রু শিবিরে ঢুকিয়ে দিত চতুর প্রতিপক্ষ. তার পরেই শুরু হয়ে যেত তাদের বিষের ছোবলে কাঙ্ক্ষিত হত্যার খবর আসার অধীর প্রতীক্ষা।

চন্দ্রগুপ্তকে বিষ খাওয়াতেন চাণক্য

জঙ্গলে বন্ধুদের সঙ্গে এক বালককে রাজা-রাজা খেলতে দেখে নিজের লক্ষ্য স্থির করে ফেললেন চাণক্য। দাম্ভিক, প্রজা-বিদ্বেষী রাজা ধননন্দের মুখে নিজের অপমানের বদলা নিতে সেই বালককেই ভবিষ্যতের মগধ অধিপতি হিসেবে তৈরি করলেন তিনি। তার পরে এক দিন ধননন্দকে যুদ্ধে হারিয়ে পাটলিপুত্রের সিংহাসনে চাণক্য এগিয়ে দিলেন প্রিয় শিষ্য চন্দ্রগুপ্তকে। চার পাশে চন্দ্রগুপ্তকে হত্যার  চক্রান্তের আভাস পাচ্ছিলেন চাণক্য, যার মধ্যে বিষের আক্রমণের সম্ভাবনাই ছিল প্রবল। প্রজ্ঞা আর চতুর কৌশলে চন্দ্রগুপ্তকে আগলে রেখেছিলেন চাণক্য, আর তাঁর খাবারে প্রতিদিন গোপনে সামান্য বিষ মিশিয়ে দিতেন তিনি। তিনি জানতেন, বিষের আক্রমণ থেকে বাঁচতে এ ভাবেই এক দিন তৈরি হয়ে উঠবে চন্দ্রগুপ্তের শরীর।

কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী-র সঙ্গে যে দিন না জেনে নিজের বিষ-মেশানো খাবার ভাগ করে খেলেন চন্দ্রগুপ্ত, এলিয়ে পড়লেন তাঁর স্ত্রী দুর্ভারা। ছুটে এলেন আচার্য চাণক্য। তত ক্ষণে সব শেষ. শুধু দুর্ভারার পেট চিরে আচার্য বাঁচাতে পারলেন শিষ্যের পুত্রকে। মায়ের গর্ভেই এক বিন্দু বিষ তখন নীল এক টিকা এঁকে দিয়েছে সেই শিশুর কপালে। তাই তার নাম হলো বিন্দুসার।

আর এক বার ধননন্দের ক্ষমতালোভী, কুচক্রী মন্ত্রী রাক্ষস, চন্দ্রগুপ্তের কাছে পাঠাল এক বিষকন্যাকে। ধরে ফেলে, চন্দ্রগুপ্তের চৌহদ্দি থেকে বিষকন্যাকে চাণক্য পাঠিয়ে দিলেন যুদ্ধে, মিত্র অথচ আকাঙ্ক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বী পর্বতকের দরজায়। মারা গেলেন পর্বতক। বিষকন্যাই সরিয়ে দিল চন্দ্রগুপ্তের পথের কাঁটা! এই নিয়েই বিশাখদত্তের রাজনৈতিক নাটক ‘মুদ্রারাক্ষস’। সেখানে দেখা যায় এক বার বিষ ঢেলেই ফুরিয়ে যেত বিষকন্যাদের বিষ।

তিন বদ্যি ও বিষকন্যা

অনেকের বিশ্বাস, বিষকন্যা বলে বাস্তবে ছিল না কেউ। তারা শুধুই গল্পের মনগড়া সব চরিত্র! অথবা বিষকন্যারা ছিল গ্রহ-লগ্নের নির্দিষ্ট সমীকরণে জাত, যাদের বিয়ে করলে স্বামীর মৃত্যু ছিল অনিবার্য। অথচ চরক, সুশ্রুত আর ভাগবত– প্রাচীন ভারতের শ্রুতকীর্তি এই তিন চিকিৎসক উল্লেখ করেছিলেন বিষধর মহিলাদের কথা। শিখিয়ে গিয়েছিলেন, বিষের সঙ্গে লড়াই করার কৌশল। বিশদে খোঁজ দিয়েছিলেন সমুদ্রমন্থন থেকে অমৃতর আগে উঠে আসা স্থাবর ও জঙ্গম বিষের উৎস আর তার তেজ বিনাশকারী পথ্যের। বিষপ্রয়োগের প্রচলিত মাধ্যম হিসেবে এঁরা চিহ্নিত করেছিলেন মহিলাদের। রাজার বিপদের কথা বলতে গিয়ে শত্রুর চর, অতৃপ্ত আত্মীয়দের পাশাপাশি এঁরা বলেছিলেন ছলকারী মেয়েদের কথা। সাবধান করেছিলেন খাবার, দাঁত মাজার সরঞ্জাম, চুলের তেল, জামাকাপড়, স্নানের জল, চোখের পথ্য, অলঙ্কার আর প্রসাধনের উপকরণের বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা থেকে।

রাস্তা, পশুর খাবার, জল, ছায়াঘেরা জায়গা, জ্বালানি কাঠে মিশিয়ে দেওয়া শত্রুর বিষ থেকে বাঁচতে দুর্গম যুদ্ধপথেও রাজার কাছাকাছি সর্ব ক্ষণ চিকিৎসকদের রাখার কথা বলেছিলেন সুশ্রুত। আর সরাসরি সাবধান করেছিলেন ক্ষমতার লোভে রাজার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ঢুকে পড়া ভয়ঙ্করী বিষকন্যাদের সংস্রব থেকে, যাদের স্পর্শেই মৃত্যু ছিল নিশ্চিত।  বিষের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সুশ্রুত দিয়েছিলেন সদা-সন্দীহান হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ। চিকিৎসাবিজ্ঞানাচার্য ভাগবত বলেছিলেন, সাধারণত মানুষের তৈরি বিষ প্রয়োগ করে থাকে স্বামীর ভালোবাসা পেতে মরিয়া, ঈর্ষাকাতর স্ত্রী, রাজার কাছাকাছি চলে আসা শত্রুর পাঠানো বিষকন্যারা।

বিষ চেনার উপায়

বিষ তৈরিতে সহায়ক হতো পশুর দেহ নির্গত বর্জ্য, আফিম, প্রতিকূল ওষুধ এবং অল্প তেজের বিষ। বিষ মেশানো খাবার চেনার উপায় ছিল অনেক। পাখিদের খাইয়ে অথবা আগুনে ছুড়ে অগ্নিশিখার রং-পরিবর্তন দেখে বুঝে নেওয়া হতো, খাবারে বিষ মেশানো কি না। খোদ বিষকন্যা চিনে ফেলার উপায় বলে না গেলেও, লক্ষণ দেখে সম্ভাব্য চক্রান্তকারী চিনতে শিখিয়েছিলেন সুশ্রুত। কুচক্রীদের চেনার জন্য নিয়োগ করতে বলেছিলেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আধিকারিকদের। সন্দেহভাজনদের মুখ-চোখের অবস্থা, উদ্দেশ্যবিহীনভাবে চুলে হাত দেওয়া, অতিরিক্ত কথা বলা, হাসা, মাটি আঁচড়ানো, ঘনঘন পিছন ফিরে দরজা দেখা, প্রশ্নের উত্তরে নীরবতা– এমন সব আচরণ দেখেই বিষকন্যাদের ধরে ফেলতেন বিচক্ষণ আধিকারিকেরা। যেমন পেরেছিলেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল।

ভিনদেশি গুরুও চিনেছিলেন বিষকন্যাদের

ভুবনজয়ী শাসক আলেকজান্দার দ্য গ্রেটের পরামর্শদাতা-গুরু ছিলেন দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল। বয়সের ভারে তিনি যখন কাহিল, তখন শুধু চিঠি লিখেই উপদেশ দিতেন শিষ্য আলেকজান্দারকে। গোপনীয় তাঁর সেই সব উপদেশ নিয়ে সংকলিত হয়েছিল ‘সিক্রেটা সিক্রেটোরাম’। সেখানেই দেখা যায়, প্রাচ্যের, বিশেষত ভারতের বিষকন্যাদের থেকে আলেকজান্দারকে শত হস্ত দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন অ্যারিস্টট্ল। লিখছেন, “মনে নেই, কী হয়েছিল সে বার! যে বার ভারতের সম্রাট তোমাকে পাঠিয়েছিল দুর্মূল্য সব উপঢৌকন, যার মধ্যে ছিল এক অপরূপা সুন্দরী! তাকে তত দিন ধরে খাওয়ানো হয়েছিল বিষ, যত ক্ষণ না সে হয়ে ওঠে বিষধর এক সাপের মতো।” অ্যারিস্টট্ল আরও লিখছেন, তিনি সন্দেহ না করলে বিষকন্যার আলিঙ্গন আর ঘামে সেদিন আলেকজান্দারের মৃত্যু ছিল অবধারিত। শিষ্যকে তিনি এ-ও মনে করিয়ে দেন, অতীতে বহু রাজা শেষ হয়েছেন এই বিষকন্যাদের সংসর্গেই।

লোভ আর ভোগের পরিণামের ছবি

শুধু মানুষই নয়, বিষকন্যাদের ছুঁলেই ঝিমিয়ে যেত পাতা, ফুল, কীট, পতঙ্গ, পাখি। তবে ধরা পড়লে বিষকন্যাদের পরিণতি কী ছিল, তা সঠিক জানা যায় না। প্রাচীন ভারতীয় অপরাধ আর শাস্তির ধরন দেখে অনুমান, হয় তাদের কেটে ফেলা হতো টুকরো টুকরো করে, না হয় পুড়িয়ে মারা হত জ্যান্ত!  মূলত রাজপুরুষদের শরীরি আকাঙ্ক্ষার সুযোগ নিয়েই গুপ্তহত্যার সফল কৌশল হিসেবে উঠে আসে বিষকন্যারা –এমনও মনে করার কারণ রয়েছে। অষ্টম শতকের পরে ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে বিষকন্যাদের কাহিনী। লোভ আর ভোগের চিরকালীন পরিণামের ছবি হয়েই তার পরে যেন ঘুমিয়ে পড়ে তারা।

ঋণ: Secret Services in Ancient India: Techniques and Operation (S.D. Trivedi), Poison Damsels and Other Essays in Folklore and Anthropology ( N.M. Penzer) , Crime and Punishment in Ancient Hindu Society (Damayanti Doongaji)

ফিচারড ইমেজ সৌজন্য: The Mysterious India
লেখক কবি এবং বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনের প্রাধিকারিক।
Shares

Comments are closed.