বয়স সবে কুড়ির কোঠায়, অরণ্য রক্ষার এক অসম লড়াইয়ে রাষ্ট্রের মুখোমুখি তিন মূর্তি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতিদিন বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। বাড়ছে ঘরবাড়ি, বাড়ছে যানবাহন। বনভূমি সাফ করে বাড়ছে শিল্প, জল বুজিয়ে মাথা তুলছে বহুতল। পাহাড় ভেঙে তৈরি হচ্ছে রাস্তা। প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে ক্ষতবিক্ষত করে আধিপত্য বিস্তার করছে মানুষ, উষ্ণ থেকে উষ্ণতর করে তুলছে এই বসুন্ধরাকে। বিপন্ন থেকে বিপন্নতর অবস্থায় পৌঁছচ্ছে জীবজন্তু, পশুপাখি, গাছগাছালি।

এই অবস্থায় এক চরম অসম যুদ্ধে নেনেছেন ওঁরা। ওঁদের নাম– মোনা, ওমো এবং জিম৷ ওঁদের তিন মূর্তি বলেই চেনেন সকলে। ওঁরা তিন জনই জার্মানির পরিবেশ কর্মী৷

বাকি সারা বিশ্বের মতোই জার্মানির নাগরিক সমাজেও বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই। তার জন্য কয়লা জোগান দিতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে৷ তাই ক্রমেই বাড়ছে কয়লাখনির বহর, সে জন্য নির্বিচারে বধ হচ্ছে অরণ্য৷ এই অবস্থাতেই পশ্চিম জার্মানির সুবিস্তৃত এমবেখার জঙ্গলকে বাঁচাতে যুদ্ধে নেমেছেন ওঁরা।

পশ্চিম জার্মানির নেদারল্যান্ডস সীমান্তের কাছে অবস্থিত কোলোন শহর। সেখান থেকে খানিকটা দূরেই শুরু হয়েছে এই এমবেখার জঙ্গল৷ ঘন, সবুজ, গভীর। সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছয় না, এতই তার ঘনত্ব। অসংখ্য পশুপাখির আশ্রয় এই অরণ্য। কিন্তু শেষ কয়েক বছরে, অনেকটাই পাতলা হয়ে গিয়েছে এই সবুজ। অনেকটাই ঢেকে গিয়েছে ধূসর, কালো ধুলোয়৷

কারণ সেই জঙ্গল কেটেই কয়লা তোলার জন্য খাদান তৈরি হচ্ছে দ্রুত গতিতে৷ যত দিন যাচ্ছে, ততই জঙ্গলের ভাগ কমছে, বাড়ছে খনি অঞ্চলের আয়তন৷ কারণ, জার্মানির এক তৃতীয়াংশ বিদ্যুতেরই জোগান দেয় এই এলাকার কয়লাখনি৷ এত দিন জঙ্গল বাদ দিয়ে বাকি এলাকার খনি থেকে কয়লা তোলা হতো, কিন্তু এখন চাহিদা যত বাড়ছে, ততই খননও বেড়েছে৷

আর তা আটকাতেই নিজেদের জীবন পণ করে লড়াই করে চলেছেন মোনা, ওমো, জিম৷

রোজ সকাল সকাল ভারী বুট, জংলাছাপ পোশাক, কালো জ্যাকেট, মুখ-মাথা টুপিতে ঢেকে জঙ্গলের প্রবেশপথে বসে রীতিমতো পাহারা দেন এই তিন মূর্তি৷ তাঁরা তিন জনেই জঙ্গলের মধ্যে ‘হাম্বি’ তৈরি করে থাকেন। জার্মান ভাষায় হাম্বি শব্দের অর্থ, ট্রি হাউস৷

লড়াকু তিন মূর্তি বলছেন, “আমরা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছি৷ আমাদের প্রতিরোধ তাদের বিরুদ্ধে, যারা কেবল নিজেদের ব্যবসা বাড়াতে পরিবেশের, প্রকৃতির, পৃথিবীর চরম ক্ষতি করছে৷”

জার্মানিতে মূলত লিগনাইট বা ব্রাউন কয়লার চাহিদা সর্বোচ্চ৷ যা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ তৈরির পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড-ও নির্গত হয়৷ পরিবেশবিদদের মতে, এই বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদাই জার্মানিকে একই সঙ্গে সবুজশূন্য করছে এবং দূষণের পথেও এগিয়ে দিচ্ছে৷

বনরক্ষীরা জানাচ্ছেন, এমবেখার জঙ্গলে আগে প্রচুর প্রাকৃতিক ট্রি-হাউস ছিল৷ এখন কয়লাখনির দাপটে তা কমতে কমতে মাত্র ১০ শতাংশে এসে ঠেকেছে৷ প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি ট্রি-হাউসগুলি এই এমবেখার জঙ্গলের এক বিশেষ বৈচিত্র্য৷ ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে তা হারিয়ে যাচ্ছে খননের গ্রাসে৷

এই অবস্থায় জিম, মোনা, ওমোদের চ্যালেঞ্জ, সেই জঙ্গলের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখা৷ তাই ঠা ঠা রোদ হোক কিংবা তুমুল শীতের কামড়– সব কিছু সহ্য করে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজেদের অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কুড়ির কোঠার তিন অদম্য যুবক৷

তিন মূর্তির এই দুর্দমনীয় লড়াই দেশের সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রাণিত করেছে আরও অনেককেই৷ কেউ নেদারল্যান্ডস থেকে, কেউ বা সুদূর কেনিয়া থেকে চলে এসেছেন এমবেখার জঙ্গলে, জিমদের পাশে দাঁড়াতে৷ তাঁদের গলায় পরিবেশ বাঁচানোর স্লোগান, হাতে সবুজ সংগ্রামের ব্যানার৷ পুলিশি বাধা অবশ্য রয়েছেই। আন্দোলনকারীদের গায়েও হাত তুলছে পুলিশ, তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অনেককে।

তবু, তিনমূর্তির হাত ধরেই জার্মানির মাটিতে একযোগে এখন সুর চড়ছে, দূষণ কমাও, জঙ্গল বাঁড়াও, পৃথিবী বাঁচাও!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More