জাগ্রত হিন্দুদেবী ‘বিবি’ নানির ভয়ে আজও কাঁপে পাকিস্তান

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন  গোস্বামী

করাচি থেকে ২৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। আরব সাগর থেকে ১৯ কিমি দূরে এবং সিন্ধু নদ থেকে ৮০ কিমি দূরে  অঘোর বা হিংগুল নদীর তীর। বালুচিস্তান প্রদেশের লাসবেলা জেলার হিংগুল ন্যাশনাল পার্কের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে হিংগুল নদী।

এই নদীর তীরে একটি দুর্গম পর্বতগুহায় বিরাজ করছেন বালুচিস্তানের জগতবিখ্যাত নানি। হিন্দুদের একান্নটি শক্তিপিঠের শ্রেষ্ঠ পিঠের অধিশ্বরী মাতা হিংলাজদেবী।

যে পীঠস্থানকে হিন্দুরা চিনি মরুতীর্থ  হিংলাজ নামে।  সারা পাকিস্তানের মুসলিমরা চেনেন ‘নানি কি হজ’ নামে। ‘হজ’ শব্দের অর্থ কোনো দৈব বা ধর্মীয় স্থান দর্শনের সংকল্প করা।


সারা বিশ্বে এই দেবীর জুড়ি মেলা ভার। পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের পুরো প্রতিরক্ষার দায়িত্ব একা সামলান। হিন্দু দেবীকে পুজো করেন বালুচ মুসলিমরাও। নিজেদের সাংসারিক সুরক্ষা ও মঙ্গল কামনায় এই দেবীর দরবারে আসেন মুসলিমরা।

ইসলামী দেশ ও মৌলবাদী অধ্যুষিত পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে প্রচুর হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন মন্দির ধূলিসাৎ করা হয়েছে, কিন্তু এই হিন্দু দেবীকে স্থানচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। বালুচ মুসলিমদের বাধায় ও জাগ্রতা দেবীর কোপের ভয়ে। দেবীর শরণাপন্ন হন পাকিস্তানের মন্ত্রী আমলারাও।

হিন্দু পুরাণ মতে, এই স্থানে সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র পড়েছিল। তাই দেবী এখানে কোট্টারী ও তাঁর  ভৈরবকে  ভীমলোচন রূপে পূজা করা হয়। হিংলাজ পিঠটি শিবসরিতায় একান্ন পিঠের প্রথম পিঠ। কুলার্ণব তন্ত্রে আঠারোটি পিঠের তৃতীয় পিঠ। কুব্জিকা তন্ত্রের বিয়াল্লিশটি সিদ্ধপিঠের পঞ্চম পিঠ। তন্ত্রচুড়ামণির  পিঠনির্ণয় বা মহাপিঠনির্ণয় বিভাগে প্রাথমিক ভাবে  তেতাল্লিশটি পিঠের কথা বলা হলেও পরবর্তীকালে একান্নটি দেবীপিঠের কথা সংযোজিত হয়েছে।

কিন্তু হিংলাজ মাতার পিঠটি সব শাস্ত্রের সব পুস্তকেই  জাগ্রত শক্তিপিঠ হিসেবে বর্ণিত। হিংলাজ মাই ও বিবি নানী ছাড়াও প্রচুর নাম এই  দেবীর। কোট্টরি, কোট্টভি, কোট্টরিশা এবং দেবীর ভৈরবের নাম ভীমলোচন। যিনি কচ্ছর কোটেশ্বর মন্দিরে বিরাজমান।


এপ্রিল মাসে  করাচি থেকে নানীর হজ যাত্রা  শুরু  হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে সিন্ধুপ্রদেশ বাংলা ও আসামেই মূলত শক্তির পূজারী শাক্তদের বসবাস৷ তবে হিংলাজের তীর্থযাত্রীরা আসেন ভারত, পাকিস্তান ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। প্রাচীন কালে তীর্থযাত্রীরা হিংলাজ যেতেন উটের পিঠে চড়ে৷ যাত্রা শুরু হত করাচি শহরের কাছে হাব নদীর ধার থেকে।

যাত্রীদের সঙ্গে থাকত এক মাসের রসদ, যেমন তাঁবু, জ্বালানি, চাল, ডাল, আটা, ঘি, তেল, মশলা, শুকনো খাবার, পানীয় জল ইত্যাদি৷ মরুদস্যুদের প্রতিরোধ করার জন্য থাকতো অস্ত্রশস্ত্রও। এ ছাড়া, সঙ্গে থাকত হিংলাজ মাতার প্রসাদের জন্য শুকনো নারকেল, মিছরি, বাতাসা ইত্যাদি৷ এক মাসের অত্যন্ত কঠোর যাত্রার পর শ্রান্ত তীর্থযাত্রীরা পৌঁছতেন হিংলাজে৷

অঘোর নদীতে স্নান সেরে তাঁরা দর্শন করতে যেতেন হিংলাজ মাতাকে৷ এখন করাচি থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা গাড়িতে করে মরুভুমির ভেতরে দুর্গম স্থানে অবস্থিত নানী কি হজে আসেন হিন্দু ও মুসলিম শ্রদ্ধালুরা ।

মহাভারতের সময়কাল বা  দ্বাপর  যুগেরও আগে  ত্রেতা যুগে এই  হিংলাজ  শক্তিপীঠের অস্তিত্ব   পাওয়া যায়। হিংলাজ মাতাকে নিয়ে বেশ কিছু কিংবদন্তী রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো  ব্রহ্মক্ষত্রিয়ের কাহিনী। পরশুরাম তখন  ক্ষত্রিয় নিধনের উদ্দেশ্যে  সারা পৃথিবী ভ্রমণ করছেন। সেই সময় তিনি ক্ষত্রিয়র খোঁজে আসেন এই বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে, তখন স্থানীয় ক্ষত্রিয়রা হিংলাজ মাতার শরণাপন্ন হন।

হিংলাজ মাতা  তখন ক্ষত্রিয়দের ব্রাহ্মণ রূপ দান করে পরশুরামের হাত থেকে বাঁচান। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন জয়সেনা। ‌যিনি সিন্ধু প্রদেশে রাজত্বও  করেন। কথিত আছে ক্ষত্রিয়দের শুধু বাঁচানোই নয়, পরশুরামকে এই হত্যালীলা থেকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন স্বয়ং হিংলাজ মাতা। দেবী পরশুরামকে বলেছিলেন, প্রত্যেক মানব ব্রহ্মার সন্তান। আর ব্রহ্মত্ব আসে সুকর্মের মধ্যে দিয়ে। ক্ষত্রিয় নিধন করে পৃথিবী ক্ষত্রিয়শূন্য  করলেও ব্রহ্মত্ব প্রমাণ হয় না।

পরশুরাম বুঝেছিলেন তিনি ব্রাহ্মণ সন্তান তাই তিনি ক্ষত্রিয় নিধন সংকল্পে নেমে  ব্রহ্মহত্যাই করছেন। অগত্যা ক্ষত্রিয়হত্যা থেকে সরে আসেন পরশুরাম।


মানুষের তৈরি  কোনো  মূর্তি নয়, সিঁদুর লেপা এক খণ্ড পাথরই  হলো বালুচ আদিবাসীদের আদরের নানী ও হিন্দুদের হিংলাজ মাতা। পাহাড়ের একটি গুহার মধ্যে অবস্থিত। গুহাটাই হিংলাজ মায়ির মন্দির বা নানী কি হজ। মন্দিরের ভেতরে একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের অগ্নিকুণ্ড। এই অগ্নিজ্যোতিকেও হিংলাজদেবীর রূপ বলে মান্য করা হয়।

মন্দিরের কাছে আছে একটি কুণ্ড। এটিও বেশ রহস্যময়। কুণ্ডের মধ্যে অবিরাম কাদা মাটি ফুটতে থাকে। কিংবদন্তী রয়েছে, এই ফুটন্ত কুণ্ডের কাছে এসে অন্তর থেকে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করলে পাপ স্খালন হয়। হিন্দুরা ফুল ও নারকেল আর মুসলিমরা সির্নি খেজুর দেন দেবীকে।

হিংলাজ মাতা

হিন্দুদের হিংলাজ মাঈ ও মুসলিমদের বিবি নানীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ সব তীর্থযাত্রী। সকল মনস্কামনা পূরণ করেন নানী। তাই নানীর হজ বুক দিয়ে আগলান বালুচ মুসলিমরা। নানী মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে হজ যাত্রার তদারকি পুরোটাই করেন তাঁরা।

কারণ তাঁদের চিরাচরিত বিশ্বাস হিংলাজ মাঈ বা বিবি নানী  তাঁদের পরিবারের একজন,  আত্মার আত্মীয় ও বালুচিস্তানের জনজীবনে তাঁর পূর্ণ অস্তিত্ব  ও কর্তৃত্ব আছে। তাই তো তাঁরা ডাকেন নানী নামে।

আরও পড়ুন ঃ বালুচ-বুকে কালাটেশ্বরী কালী, মাথা ঝোঁকায় পাকিস্তানও

আরও পড়ুন ঃমিঠি পাকিস্তানের একমাত্র হিন্দুপ্রধান শহর, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেরা নিদর্শন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More