স্যার সত্যেন বোসের ছাত্র ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, মাস্টারমশাইয়ের জন্মদিন পালন করেন তিনিই প্রথম

৯০

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

এ এক অন্য ছাত্র-মাস্টারের গল্প। এ তখনকার গল্প, যখন মাস্টারের সঙ্গে ছাত্রের সম্পর্ক ততটাও সহজ ছিল না। কিন্তু সে সময়েই মাস্টারমশাইয়ের জন্মদিন প্রথম উদযাপন করেন এক ছাত্র। শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যেকার শাসন, বারণ কখন যেন স্নেহ, ভালবাসা, শ্রদ্ধায় পরিণত হয়ে গেছিল। তারিখটা ১ জানুয়ারি, ১৯৪১। মাস্টারমশাইকে জন্মদিনে প্রণাম জানাতে ফুল নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি হাজির হয়েছিল ছাত্র। বাংলার বুকে তখন এমন রীতি আদৌ প্রচলিত ছিল না। কিন্তু যেখানে সম্পর্কটাই অনন্য, সেখানে উদযাপনও হবে অভিনব।

সেই ছাত্রটি ছিলেন কমেডি সম্রাট ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, আর তাঁর মাস্টারমশাই ছিলেন স্যার বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। স্যার সত্যেন বোস কলকাতার লোক হলেও ১৯২১ থেকে ১৯৪৫, তাঁর গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২৪ বছরের সময়কালটি তিনি বাংলাদেশে কাটিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসু তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান ও এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির ওপর কাজ শুরু করেন। আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তো ঢাকারই পোলা, তাঁর সব ফিল্মি ডায়লগে তিনি নিজেই সে ছাপ রেখে গেছেন। তাই কোথাও একটা আত্মিক টানও ছিল দুজনের।

ভানুর আসল নাম সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। সূর্যের প্রখর তেজ আবার বিপ্লবের সাহস, দুইই রয়েছে তাঁর নামেই। তিনি ছাত্র হিসেবেও ছিলেন খুব বুদ্ধিদীপ্ত। যার জন্য ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় শিক্ষকদের খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন। কমেডিয়ান ভানু পরবর্তী কালে দেশজোড়া নাম কুড়োলেও, ছাত্র ভানু অনেকটাই অপরিচিত রয়ে গেছেন সকলের কাছে।

ভানু ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক সত্যেন বসু, আচার্য ডঃ জ্ঞান ঘোষ, বিদগ্ধ মনীষী মোহিতলাল মজুমদারের প্রিয় ছাত্র। ভানুর কলেজ জীবন শুরু হয় জগন্নাথ কলেজ ও তার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সাম্যময় ভাল ছাত্র হওয়ায় তাঁকে নিয়ে শিক্ষকদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। তবে ভানু কি পদার্থবিদ্যা সরাসরি পড়েছেন স্যার সত্যেন বোসের কাছে? এই নিয়ে অনেক দ্বিমত আছে। কেউ বলেন ভানু ছিলেন কমার্সের ছাত্র, কেউ বলে খোদ সায়েন্সের।

সঠিক তথ্য জানালেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। “বাবা মূলত ছিলেন বিএ-র ছাত্র। কিন্তু বাবার বিষয় ছিল অর্থনীতি (ইকনমিক্স), ইতিহাস এবং পদার্থবিদ্যা। স্বভাবতই বাবা সরাসরি ক্লাস করেছিলেন ঢাকাতে সত্যেন বোসের কাছে। স্যার সত্যেন বোস বাবাকে পদার্থবিদ্যা পড়িয়েও ছিলেন। শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক অটুট ছিল শেষ দিন অবধি। তখন অর্থনীতি, ইতিহাস, পদার্থবিদ্যা একসঙ্গে নেওয়া যেত। বাবা পদার্থবিদ্যা অবশ্যই পড়েছিলেন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যার ক্লাসঘর থেকে কলেজ সোশ্যাল অনুষ্ঠান সবেতেই অধ্যাপক সত্যেন বসুর সঙ্গে হৃদতা গড়ে ওঠে ভানুর। সত্যেন বোস তখন রমনায় থাকেন বাংলাদেশে। ১ জানুয়ারি ১৯৪১, ছাত্র ভানু তাঁর প্রিয় স্যারের বাড়ি ফুল নিয়ে উপস্থিত স্যারের জন্মদিন পালন করতে। এই প্রথম স্যার সত্যেন বোসের জন্মদিন পালন হয়েছিল, তাঁরই প্রিয় ছাত্রের হাত ধরে।

ভানু তাঁর মাস্টারমশাইকে সত্যেনদা বলতেন। তা সত্যেন বোস ভানুর হাতে ফুল মিষ্টি দেখে বলেন, “এ কী! এসব কী হবে?” ভানু তখন বললেন, “সত্যেনদা, আজ আপনার জন্মদিন তাই আমি ফুল নিয়ে এসেছি।” সত্যেন বোস বললেন, “ধুর! আমাদের আবার জন্মদিন হয় নাকি! আমরা বাঙালিরা পায়েস খাই, আমাদের জন্মদিন হয়ে যায়। আর তুই এসব ফুল মিষ্টি এনেছিস!”

মুখে যাই বলুন, একজন ছাত্র, যাঁর সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক নেই, সে তাঁর জন্মদিন মনে রেখে ফুল নিয়ে এসেছে, এই ভালবাসা ও শ্রদ্ধা দেখে সত্যেন বোসের মন ভরে যায়। এই শুরু হল সত্যেন বসু আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের হৃদ্যতা। ভানুর দেখাদেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি ছাত্ররাও ফুল নিয়ে উপস্থিত সত্যেন বোসের বাড়ি। ভানু বললেন, “স্যার এবার থেকে প্রতি ১ জানুয়ারি আমরা ছাত্ররা আপনার জন্মদিন পালন করব।”

পরের বছরে আর কথা রাখা হয়নি ভানুর। দেশভাগের ভাগ্য বিপর্যয়ে নিজের দেশ ছাড়তে হল ভানুকে। ১৯৪১ সালেই ভানুরা চলে এলেন কলকাতা। তিনি ‘আয়রন অ্যান্ড স্টিল’ কোম্পানিতে চাকরিও পেয়ে যান ওই বছরই। ৪৮-৪৯ সালে পাকাপাকি কলকাতা চলে আসেন সত্যেন বোসও। তাই দেশভাগ হলেও শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কে ছেদ পড়ল না। আবার নতুন করে প্রতি বছর জানুয়ারির ১ তারিখে ভানু যেখানেই থাকুন, ঠিক পৌঁছে যেতেন হেঁদুয়ার ঈশ্বর মিল লেনে সত্যেন বোসের বাড়ি, স্যারের জন্মদিন পালন করতে।

ভানু যখন নামী অভিনেতা তখনও একবারও ছেদ পড়েনি স্যারের জন্মদিন পালন করতে যেতে। ভানু হয়তো অধ্যয়ন বিষয়ক কাজে যুক্ত হননি পরবর্তী জীবনে, কিন্তু তাঁর অভিনয়ের বিষয়েও লেখাপড়া ছিল। সত্যেন বোস প্রভাব ছিল। নিখাদ অভিনয় পড়াশোনো ছাড়া হয় না। তিনি কাউকে দেখে বা কোনও প্রচলিত জোক্স থেকে কৌতুকরস উপস্থাপন করতেন না। আবার ভানু যখন মঙ্গল গ্রহ অভিযান, স্পুটনিক– এসব তাঁর নাটকে এনেছেন, তা তো সত্যেন বোস প্রভাব বটেই। আর সত্যেন বোসও চারুকলা, অভিনয় ইত্যাদির সুরসিক ছিলেন। তাই তাঁর ছাত্র অভিনেতা হিসেবে ভানু নাম করায় মনটা ভরে উঠত স্যারেরও।

কোনও বার যদি সত্যেন বোসের জন্মদিন পালন করতে কেউ না আসত, ভানু ঠিক হাজির হবেই। সত্যেন বোস স্ত্রীকে বলতেন “দেখো ভানু কিন্তু আমার জন্মদিন ভোলেনি।” স্যার সত্যেন বোসই ছিলেন সেই মিথভাঙা লেজেন্ড শিক্ষক, যিনি প্রথম পদার্থবিদ্যা বাংলা ভাষায় ছাত্রদের পড়াতে শুরু করেন। ক্লাসে ছাত্রদের মাতৃভাষায় বোঝাতেন, ইংরাজিতে নয়। যাতে সহজপাঠে সহজবোধ্য হতো কঠিন বিষয়।

ছাত্ররা যদিও খাতায়-কলমে ইংরেজিতে লিখত, কারণ সিলেবাসে ইংরেজি মাধ্যমেই লিখতে হত। কিন্তু যেখানে একজন অধ্যাপকও বাংলায় বিজ্ঞান পড়াতেন না সেখানে সত্যেন বোস বাংলায় পড়িয়ে মিথ ভাঙেন। পড়ে তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি সবাই মেনে চলে। তাঁর নেতৃত্বে কলকাতায়  ১৯৪৮ সালে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদের মুখপাত্র হিসেবে বাংলা ভাষার বিজ্ঞান পত্রিকা জ্ঞান ও বিজ্ঞান প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালে জ্ঞান ও বিজ্ঞানে কেবলমাত্র মৌলিক গবেষণা নিবন্ধ নিয়ে “রাজশেখর বসু সংখ্যা” প্রকাশ করে তিনি দেখান, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের মৌলিক নিবন্ধ রচনা সম্ভব।

স্যার সত্যেন বসু বলতেন, “যাঁরা বলেন বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয় তাঁরা হয় বাংলা জানেন না অথবা বিজ্ঞান বোঝেন না।”

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যে স্যার বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর ছাত্র, তা জেনে টালিগঞ্জ পাড়াতেও ভানুর দর বেড়ে যায়। ভানুকে তরুণ কুমার, শুভেন্দু চ্যাটার্জী, রঞ্জিত গুপ্ত– এমন অনেকেই বলতেন, স্যার সত্যেন বোসের বাড়ি নিয়ে যেতে, ওঁকে একবার চাক্ষুষ দেখে জীবন সার্থক করবেন বলে। ভানু কথা রেখেছিলেন।

এছাড়াও ভানু ও ভানুর স্ত্রী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল সত্যেন বোসের বাড়িতে অবারিত দ্বার। পিতৃস্নেহে দুজনকে তুই করেই বলতেন সত্যেন বসু। নীলিমাও তখন গানের জগতে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ভানুর আগেই গানে নাম করেন নীলিমা দেবী। আর এমনিতেও ছাত্রের বউ গান গাইছে, সেটা তো মাস্টারমশাইয়ের কাছে ভাল লাগার মতোই ব্যাপার। নীলিমার গানও খুব পছন্দ করতেন সত্যেন বোস।

ভানু পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় এ নিয়ে শোনালেন একটা মধুর স্মৃতির গল্প। “একবার বাবা মাকে নিয়ে সত্যেন বোসের  বাড়ি গেছেন। ঘরে ঢুকে দেখেন সত্যেন বোস তখন এস্রাজ বাজাচ্ছেন। উনি এস্রাজ ও সেতার দুটোই বাজাতে পারতেন। তখন এস্রাজ বাঙালিরা প্রায় বাজাতেনই না। ওস্তাদ সারেঙ্গিওয়ালারাই কেবল বাজাতেন। সেদিন নিমগ্ন চিত্তে সত্যেন বোস এস্রাজ বাজিয়েই চলেছেন। কিছুক্ষণ পরে সত্যেন বোস চোখ খুলে দেখেন ভানু ও নীলিমা। বললেন “কী রে, তোরা কতক্ষণ? আমায় ডাকিসনি কেন?”

বাবার উত্তর “এই আট-দশ মিনিট। আমরা আপনার এস্রাজ বাজানো শুনছিলাম।” মাকে তখন সত্যেন স্যার বললেন, “এই নীলিমা তুই গান গা দেখি, তুই খুব ভালো কীর্তন গাইতে পারিস, একটা কীর্তন গেয়ে শোনা।” তো মা একটা কীর্তন গাইলেন। গান শেষ হতে সত্যেন বোস মুচকি মুচকি হাসছেন। একবার বাবার দিকে তাকাচ্ছেন একবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছেন। তখন বাবা বলছেন “কী হল সত্যেনদা, আপনি কিছু বলছেন না শুধু হাসছেন। কিছু হয়েছে?” মা বলল, “সত্যেনদা, গানে কিছু ভুলচুক হয়েছে?” সত্যেন বোস বললেন, “না, না। তোর কীর্তন অপূর্ব। আমি ভাবছি আসলে তুই ভানুকে পেয়ে লাভবান হয়েছিস, না ভানু তোকে পেয়ে লাভবান হয়েছে?”

এতটাই রসিক ছিলেন কিংবদন্তী বৈজ্ঞানিক মনীষী।”

আরও একটা গল্প জানালেন গৌতম বাবু। “বাবা বসুশ্রীতে আড্ডায় বসে আছেন‚ সুব্রত মুখোপাধ্যায় তখন বেঙ্গলের কালচারাল মিনিস্টার, উনি বাবাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৭৪ সালে খুব বড় করে যাত্রা সম্মেলন হবে‚ বাবাকে সুব্রতবাবু জিজ্ঞেস করলেন‚ “একজন খুব নামকরা গুণী ব্যক্তিকে দিয়ে উদ্বোধন করাতে হবে যাত্রা উৎসব‚ কাকে দিয়ে করানো যায় ভানুদা?” বাবা বললেন‚ “এই মুহূর্তে আমি যাঁকে যোগ্যতম বলে মনে করি, তার চেয়ে গুণী আর সারা ভারতবর্ষে নেই। তিনি হচ্ছেন বিজ্ঞানী সত্যেন বোস। কারণ একে তো তিনি সত্যেন বোস তার উপর উনি বেহালা ও এস্রাজ বাজান‚ গান বাজনা বোঝেন‚ আবার যাত্রা থিয়েটার দেখতেও ভালবাসেন। সুতরাং যেহেতু ভালো বোঝেন, তাই বক্তৃতাটা প্রাসঙ্গিক এবং ভালই দেবেন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ গুণী ব্যক্তি যাঁরা গান বাজনা বা যাত্রা থিয়েটার বিশেষ বোঝেন না, তাঁদের দিয়ে বক্তৃতা করানো হয়‚ তাঁরা বেশিরভাগই হাবিজাবি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেন। সত্যেনদার ক্ষেত্রে সেটা হবে না।”

সুব্রতবাবু ওর ডিপার্টমেন্টের একজন সেক্রেটারি পঙ্কজ দত্তকে পাঠালেম সত্যেন বোসের বাড়ি। সত্যেন বোস বললেন‚ “ভানুকে দিয়েই ওপেন করাও‚ ও খুব গুণী। আমার ছাত্র ছিল‚ আমি ওকে খুব ভাল জানি।” তখন ওই সেক্রেটারি বললেন‚ “কিন্তু ভানুবাবু তো নিজেই এই যাত্রা সম্মেলনের সভ্য‚ ওঁকে দিয়ে কী করে করানো যাবে?” তখন ভানুর সত্যেনদা তাঁকে রসগোল্লা খেতে দিয়ে বলেন‚ “উপযুক্ত, গুণী, সভ্য মানুষকে দিয়ে না করিয়ে আমার মতো একজন ‘অ-সভ্য’ লোক দিয়ে এরকম একটা মহৎ কাজ করাতে চাও? আমি যেতে পারব না। তুমি আমার কাছে যা খেলে শুধু গোল্লা‚ ভানুর কাছে রসটা পাবে।”

মাস্টারমশাইয়ের এই ভালবাসা, আশীর্বাদ আজীবন মনে রেখে সব দুঃখ ও বিপদ জয় করতে পেরেছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। স্যার সত্যেন বোস আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প প্রতিটি শিক্ষক দিবসে সকলের কাছে আদর্শ হয়ে থাকবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More