বর্ষসেরা বাংলা ছবি ২০১৯: বক্সঅফিস কাঁপাল কারা, কারাই বা মন কাড়ল সমালোচকদের

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    ২০১৯ সালকে বাংলা ছায়াছবির এক অন্যতম সফল বছর হিসেবে আখ্যা দেওয়াই যায়। কারন এ বছর বাংলা ছবির বক্সঅফিস কালেকশন যেমন ভাল, তেমনই ভাল একাধিক ছবির গুণগত মানও। ২০১৯ তো শুধু একটা বছর শেষ হওয়া নয়, এই বছরের সঙ্গে সঙ্গে একটা দশকও শেষ হতে চলেছে প্রায়। ফলে এই দশ বছরে বাংলা ছবির পট পরিবর্তনের অভিমুখও অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায় ২০১৯-এর উপান্তে এসে।

    শুধু দেওয়ালের পোস্টার বা খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন নয়। বাংলা ছবির বিপণন এখন ফেসবুক, অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউবকেন্দ্রিক। সিনেমাও পর্দা বা টেলিভিশন পার করে বন্দি হয়েছে হাতের মোবাইলে। সেই সব মিলিয়েই ২০১৯ সাল কেমন কাটল বাংলা ছবির জগতে? আসুন দেখে নিই, এ বছরে মুক্তি পাওয়া সেরা বাংলা ছবি কোনগুলি !

    *বক্স অফিস হিট ছবি*

    বিজয়া

    কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিসর্জন’-এর সিক্যোয়েল হিসেবে ২০১৯ সালের গোড়াতেই মুক্তি পায় ‘বিজয়া’। অভিনয়ে জয়া আহসান, আবীর চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এবং লামা হালদার। সমালোচক মহল থেকে বক্স অফিস—দু’জায়গাতেই সাফল্য পায় বিজয়া। প্রতিটি চরিত্রই যেন অভিনয়ে নিখুঁত। ‘বন্ধু তোর লাইগা রে’-র সুরে পদ্মা-নাসির-গণেশ মণ্ডলের টানাপোড়েন দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়।

    নগর কীর্তন

    এই দশকেই আমরা ঋতুপর্ণ ঘোষকে হারিয়েছি। কিন্তু মানুষটা হারিয়ে গেলেও তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো অনেকটাই বেঁচে রয়েছে এই ধরনের সিনেমার মধ্যে দিয়ে। শরীর, ভালবাসা, প্রেম, সমাজ, সমলিঙ্গ প্রেম কি তৃতীয় লিঙ্গের সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ কিছুটা হলেও এগিয়েছে। প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য তো এমনটাই চেয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের তেমনই এক প্রেমের ছবি ‘নগরকীর্তন’। যে ছবির জন্য ঋদ্ধি সেন পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। কনিষ্ঠতম পুরুষ অভিনেতা হিসেবে এই সম্মান জয় করেছেন তিনি।

    ঋদ্ধি-ঋত্বিকের জুটি সকলের মনে নাড়া দিয়ে গেছে। সমাজের ব্যর্থ বিদ্রুপে কুঠারাঘাত করেছে এই ছবি। বিদীপ্তা চক্রবর্তীর বৌদির রোলে অভিনয় এ ছবিতে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ চরিত্রে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় যেন ঋতুপর্ণের ইচ্ছের পতাকা ধরে রেখেছেন।

    আহা রে

    রঞ্জন ঘোষের পরিচালনায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও আরিফিন শুভ অভিনীত ছবিটি প্রেম-ভালবাসা-স্নেহের মিশেলে এক অভিনব ছবি। ছবিতে দুই বাংলার নায়ক নায়িকা যেমন আছেন তেমন দুই বাংলার খাবার এবং সেইসব খাবারের উৎসস্থল, রেসিপি নিয়ে চিত্রনাট্যও আছে। শুধু তাই নয়, এখানে দেখা গেছে, শ্বশুরমশাই বাবা হয়ে বিয়ে দিচ্ছেন বিধবা হিন্দু বউমার। তাও আবার বয়সে ছোট, মুসলিম ধর্মের ভালবাসার মানুষের সঙ্গে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন ছবি যে কত প্রাসঙ্গিক, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

    মাল্টিপ্লেক্স-সহ নন্দন প্রেক্ষাগৃহে দশ সপ্তাহেরও বেশি চলেছিল এই সিনেমা। সমাদৃত হয়েছিল বিভিন্ন ফেস্টিভালেও। ঋতুপর্ণার অন্যতম সেরা অভিনয়ের চরিত্র বসুন্ধরা। শুভরও কলকাতায় প্রথম ছবি। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনন্য অভিনয় ছবির সুর ধরে রেখেছে। প্রযোজিকা হিসেবেও ঋতুপর্ণা সফল ।

    মহালয়া

    মহালয়ার সকালে আকাশবাণী রেডিওয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর স্তোত্রপাঠ না শুনলে আজও বাঙালির মনে হয় না পুজো এল। কিন্তু ১৯৭৬ সালের পুজোয় মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কন্ঠর পরিবর্তে আকাশবাণী থেকে বেজেছিল মহানায়ক উত্তমকুমারের কণ্ঠ। কার মাথা থেকে এই ভাবনার উদয় হল, উত্তমকুমার কেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর জুতোয় পা গলালেন, তার ফলাফলই বা কী হল– তাই নিয়েই সৌমিক সেনের ছবি ‘মহালয়া’।

    বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর ভূমিকায় শুভাশিস মুখোপাধ্যায় এ ছবির সম্পদ। উত্তমকুমার রূপে যিশু সেনগুপ্ত মানানসই। শুভময় চ্যাটার্জ্জী, সপ্তর্ষি রায়, কাঞ্চন মল্লিক, ভাস্বর চ্যাটার্জীদের ভাল চরিত্রে নতুন ভাবে ব্যবহার করেছেন সৌমিক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে এই ছবিটি বিতর্কিত হলেও সৌমিক সেন এবং প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় ‘মহালয়া’ ছবিটি মার্চে মাসেই পুজোর আমেজ তৈরি করে। নবীন প্রজন্মের যে সব সদস্যরা জানত না এই বিষয়টি, তাদের কাছে এ ছবি বেশ কৌতূহল তৈরি করে।

    মহালয়া’ বাণিজ্যিক ভাবে সফল ছবি। এবং এমন এক ছবি, যেখানে উত্তমকুমারকে ফ্লপ হতে দেখেও হলভর্তি লোক করতালি দিয়ে এ ছবিকে আপন করে নেয়। কারণ পুজো ও মহালয়া নিয়ে বাঙালির আবেগই শেষ কথা।

    মুখার্জীদার বউ

    মার্চ মাসের ৮ তারিখে, নারী দিবসের দিন শিবপ্রসাদ-নন্দিতার উইনডোজ প্রোডাকশান হাউস উপহার দিল ‘মুখার্জীদার বউ’। মেয়েদের নিজস্ব নামটা বিয়ে হয়ে আসা স্বামীর নাম-পদবীর আড়ালে কীভাবে চাপা পড়ে যায়, সেখান থেকেই নিজেকে খোঁজার গল্প বলে এ ছবি। প্রথম ফিচার ফিল্ম পরিচালনায় ছক্কা হাঁকালেন পৃথা চক্রবর্তী। কাহিনী চিত্রনাট্যতে সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়।

    শাশুড়ি-বৌমার ভূমিকায় অনসূয়া মজুমদার ও কণীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় অসাধারণ। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে সুন্দর ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে মনোবিদের চরিত্রে। সব বয়সের দর্শকের মন ভাল করেছে এমন সহজ কথায় প্রতি ঘরের গল্প বলা ও নতুন দিশা দেখানো ছবিটি।

    সোয়েটার

    ২০১৯ মার্চের শেষে শহরে শীতের পরিবেশ আনল শিলাদিত্য মৌলিকের ‘সোয়েটার’। জয়িতা সেনগুপ্তর লেখা গল্প অবলম্বনে উল বোনার অদ্ভুত এক কাহিনি নিয়ে নির্মিত এই ছবি। ঈশা সাহা, জুন মালিয়া, শ্রীলেখা মিত্র, অনুরাধা মুখার্জী, সৌরভ দাস, খরাজ মুখার্জী, ফারহান ইমরোজ প্রমুখ অভিনীত ‘সোয়েটার’ এমন একটি ছবি, যার সব ক’টি গান হিট। অনেক দিন পরে বাংলা ছবিতে যেন এক মুঠো বসন্ত এল। সংগীত পরিচালনায় অনিন্দ্য চ্যাটার্জী-সহ রণজয় ভট্টাচার্য নবাগত রূপে আশাব্যঞ্জক। হাউসফুল হল বুঝিয়ে দিয়েছিল, ‘প্রেমে পড়া বারণ’ নয় মোটেই।

    ভিঞ্চিদা

    এক জন মেক আপ আর্টিস্ট, ভিঞ্চিদা (রুদ্রনীল ঘোষ) তাঁকে ঘিরেই গল্প। অনেক দিন পর সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি নিয়ে সৃজিত-ফ্যান বাদেও সকলে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হল। রুদ্রনীল, ঋত্বিক ও সোহিনী তিন জনেই অনবদ্য। রুদ্রনীল আর ঋত্বিক দু’জন দু’জনকে টেক্কা দিয়েছেন যেন অভিনয়ে। মেকআপ দুর্দান্ত।

    জ্যেষ্ঠপুত্র

    এ ছবিও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও ঋত্বিক চক্রবর্তী—দুই তুখোড় অভিনেতাকে এক করা গেছে ছবিতে। ছবির মূল ভাবনা প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষের। সুপারস্টার জ্যেষ্ঠপুত্র যখন পিতৃবিয়োগের খবর পেয়ে গ্রামের বাড়ি আসেন, তখন পরিবার ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা কীরকম হতে পারে—তাই নিয়েই অনবদ্য এ গল্প। গার্গী রায়চৌধুরী, দামিনীরা যথাযথ। তবে পর্দায় চোখ সরানো যায়নি সুদীপ্তা চক্রবর্তীর থেকে।

    কণ্ঠ

    ‘কন্ঠ’ রিলিজ করেছিল মে মাসে, লোকসভা নির্বাচনের সময়। যে বিতর্কিত সময় অনেক পরিচালকই তাঁদের ছবি রিলিজ পিছিয়ে দেন। ‘কন্ঠ’র মতো একটি অনুভূতিপ্রবণ ছবি ঠিক সেই সময়েই রিলিজ করে। দর্শককুল ফিরিয়েও দেয়নি সে ছবি। নির্বাচনের উত্তপ্ত সময়েও এমন একটি ছবি দেখে হল ভরিয়ে আসেন বাঙালি দর্শকেরা।

    এটাই বোধহয় উইনডোজ, নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভাবনার জোর। শিবপ্রসাদ যে কত বড় অভিনেতা তার প্রমাণ পাওয়া যায় কণ্ঠর অর্জুনকে দেখলে। এক জন ল্যারিংজেক্টমির রোগী তাঁর বাচিকশিল্পের পেশা কীভাবে ফিরে পাচ্ছেন, সে অভিনয় সহজ নয়। স্পিচ থেরাপিস্টের ভূমিকায় জয়া আহসান দুরন্ত। জয়ার সঙ্গে উইনডোজের প্রথম ছবি ছিল এটি। জয়ার অভিনয় ‘দীপ জ্বেলে যাই’ র রাধা সুচিত্রা সেনকে মনে করায়। কনীনিকাও বান্ধবী রূপে বেশ। পাওলিও অসাধারণ।

    ছবির শেষ দৃশ্যে কাঁটা দেয় শিবপ্রসাদের কণ্ঠে কাজী নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ আবৃত্তি।

    দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন

    বাংলা অ্যাকশন, অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্যধর্মী চলচ্চিত্র। শুভেন্দু দাশমুন্সির কাহিনি অবলম্বনে ছবিটি পরিচালনা করেন ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্রীকান্ত মোহতা ও মহেন্দ্র সোনি শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের ব্যানারে ছবিটি প্রযোজনা করেন। সোনাদা আবীর, অর্জুন, ঈশার অভিনয়ে এ ছবি হাউজফুলের রেকর্ডও করে।

    মিতিন মাসি

    বহু প্রতীক্ষিত সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মিতিন মাসিকে বড় পর্দায় আনলেন অরিন্দম শীল। মিতিন মাসি রূপে কোয়েল মল্লিক পারফেক্ট। পুজো রিলিজ  ডিটেকটিভ ছবি সবার মন জয় করেছে। মিতিন মাসি সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ‘মেয়েছেলে’ বলে কোনও শব্দ হয় না। মিতিনের সকাল শুরু হয় যোগাভ্যাসে সেখানে সঙ্গীত আবহ দুর্দান্ত বিক্রম ঘোষের। পার্থ মেসোর চরিত্রে শুভ্রজিৎ দত্তকে বেশ লাগে। শবরের মতো মিতিন মাসি নিয়ে পরবর্তী ছবি হবে অরিন্দম শীলের কাছে আশা রাখা যায়।

    গোত্র

    মানুষের আসল গোত্র হল মনুষ্যত্ব আর ধর্ম মানবতা। ধর্ম, জাতপাতের চেয়েও ভালবাসার সম্পর্ক বড়—এই বার্তা দেয় এ ছবি। এ বছর উইনডোজ প্রোডাকশনের দ্বিতীয় ছবি ‘গোত্র’তে সহজ কথায় প্রকৃত সত্য বলা হয়েছে। কমেডি, প্রেম, স্নেহ, বিনোদনে ভরপুর ছবি বানায় শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটি। অনসূয়া মজুমদার ও নাইজেল আকারা—মা ও ছেলের ভূমিকায় অপূর্ব। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও হিন্দু মা ও মুসলিম ছেলের গল্প শোনায় এ ছবি। এরই মাঝে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে অভিনয় করে মানালি। অম্বরীশ ভট্টাচার্যের কমেডি দারুণ। ‘নীল দিগন্তে’ মনমুগ্ধকর আর ‘রঙ্গবতী’ মিলিয়ন ভিউ ছাড়িয়ে সবার মনের মণিকোঠায়। হাউসফুল হিসেবে রের্কড করে ‘গোত্র’। এই টালমাটাল ও অসহিষ্ণু সময়ে এই ছবি খুবই প্রাসঙ্গিক।

    পরিণীতা

    শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের কেরিয়ারে সেরা অভিনয় মেহুল চরিত্রটি। আর ঋত্বিক অভিনীত বাবাইদা চরিত্রটি আজকাল নবীন প্রজন্মের প্রেম ফ্যান্টাসিতে প্রায় আইকনিক। রাজ চক্রবর্তী শুভশ্রীকে দিয়ে তাঁর সেরাটা করিয়ে নিয়েছেন। লে ছক্কা, প্রলয়ের  পরে পরিণীতা রাজের কেরিয়ারে উল্লেখযোগ্য। ছবির গান মন ছুঁয়েছে শ্রোতাদের।

    ঘরে বাইরে আজ

    অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘ঘরে বাইরে আজ’ পলিটিক্যাল ড্রামা বেসড গল্প। অনেক দিন পরে আগের অপর্ণাকে ফিরে পেয়ে দর্শকেরা খুশি। মাঝে কয়েক বছর অপর্ণা সেনের ছবি সেভাবে চলছিল না ব্যবসায়িক ভাবে। কিন্তু এ ছবি আবার অপর্ণাকে বক্সঅফিস থেকে সমালোচক মহলে উচ্চ প্রশংসা এনে দিল। বিমলা রূপে তুহিনা দাস যথাযথ। যীশু ও অনির্বাণ দুরন্ত।

    প্রফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো

    সন্দীপ রায় এবার বড়দিনে বড় পর্দায় আনলেন শঙ্কুকে। প্রফেসর শঙ্কু সাহিত্য না রুপোলি পর্দায় বেশি ভাল– এ বিতর্ক চললেও বক্স অফিসে এ ছবির রেসপন্স ভাল। প্রফেসর শঙ্কুর ভূমিকায় ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় মানিয়েছেন কি মানাননি সেই নিয়ে মতের মিল-অমিল থাকলেও সবাই হল ভরিয়ে দেখছেন শঙ্কুকে। শুভাশিস মুখোপাধ্যায় ‘মহালয়া’র পর ফের চমক দিলেন এ ছবিতে।

    সাঁঝবাতি

    দেব কে এবার আট থেকে আশি সবাই ভালবাসলো ‘সাঁঝবাতি’ দেখে। বয়স্ক মানুষরা, যাঁরা ভাবতেন দেব শুধু ভাল নাচতে পারেন, অভিনয় পারেন না, তাঁরাও এবার অভিনেতা দেবকে ভালবাসলেন। এ ছবিতে দেব নিজের স্টারডম ঢেকে চাঁদুকে সামনে আনতে চেয়েছেন এবং পেরেছেন। পাওলি দামকে এত দিন আমরা সব সিরিয়াস রোলে কি দুঃখের দৃশ্যে ভাল অভিনয় করতে দেখে এসছি। এই প্রথম  ‘সাঁঝবাতি’ ছবিতে হাসিখুশি, মিষ্টি, প্রাণখোলা পাওলিকে দর্শক দেখল। লিলি চক্রবর্তীও মিষ্টি দিদার রোলে সবার মন জয় করেছে। সোহিনী সেনগুপ্ত যথাযথ।

    আরও চমক, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও দেবকে এক ছবিতে আনতে পারলেন লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালক জুটি এবং প্রযোজক অতনু রায়চৌধুরীর ‘বেঙ্গল টকিজ’।

    রবিবার

    প্রাক্তনের সঙ্গে ১৫ বছর দেখা হলে কি আর আদৌ প্রেম থাকে? নাকি ঘৃণা, প্রতিশোধ, প্রতারণার মিশেল সম্পর্কে নতুন মোড় আনে? ধরা যাক যদি দেখা হয় কোনও এক রবিবারে? অসীমাভ ও সায়নীর ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হয় এই রবিবারেই। অতনু ঘোষের ছবি ‘রবিবার’-এ জুটি বাঁধলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও জয়া আহসান। অতনুর ছবি সমালোচক মহলে তো প্রশংসা পাচ্ছেই কিন্তু বক্সঅফিস হিট জুটি হিসেবেও প্রসেনজিৎ-জয়া বছরের শেষে দারুন উপহার দিলেন দর্শকদের।

    রূপঙ্কর বাগচীর কণ্ঠে ‘কাল রাতে ঠিক, মাঝ রাতে ঠিক, তোমায় মনে পড়ছিল’ গানটি এ ছবির অতিরিক্ত প্রাপ্তি। সেই সময়েই দূরে গ্রামাফোনে বাজছিল আত্মমগ্ন আলি আকবর। বছর শেষে যেন নাড়া দিয়ে গেল এ ছবির এই অংশ।

    *সমালোচকদের পছন্দ*

    কেদারা

    কেদারা ছবি দিয়েই ছবি পরিচালনায় হাতেখড়ি সঙ্গীত পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর। যে ছবি উচ্চ প্রশংসিত সমস্ত ফেস্টিভালে। অন্যদিকে পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় অভিনেতা রূপেও উচ্চ প্রশংসিত এ ছবিতে।

    ভবিষ্যতের ভূত

    ছবি যখন আন্দোলনের পর্যায়ে চলে যায়, সেটা তো তখন আলোচনার শিখরে উঠে আসেই। অনীক দত্তর এই ছবি প্রদর্শন না করার অর্ডার জারি হলে বুদ্ধিজীবি মহল-সহ সর্ব স্তরের মানুষ প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। ‘ভবিষ্যতের ভূত’ রাজনৈতিক স্যাটায়ার হিসেবে রয়ে যাবে বাংলা ছবির ইতিহাসে।

    তারিখ

    চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি ‘নির্বাসিত’ বহুআলোচিত ছবি। মাঝে কিছুটা বিরতি নিয়ে ফিরলেন চূর্ণী দ্বিতীয় ছবি নিয়ে। চূর্ণী পরিচালিত ‘তারিখ’ মন ছুঁয়েছে ফিল্ম সমালোচকদের।

    চূর্ণীর এ ছবি বক্সঅফিসে ঝড় তোলেনি। হয়তো সে লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিকা বানানওনি এই ছবি। কিন্তু ‘তারিখ’ প্রকৃত সিনেপ্রেমীদের কাছে প্রশংসার দাবী রাখে। শাশ্বত, রাইমা,ঋত্বিক,অনসূয়া এরা কেউ মনে হয়নি অভিনয় করছেন যেন সেই রক্ত-মাংসের চরিত্র গুলোই হয়ে উঠেছেন। চূর্ণী পেরেছেন এমন ভাবে প্রতিটি অভিনেতা অভিনেত্রীকে সফল ব্যবহার করতে। ছবির চিত্রনাট্যে সোশ্যাল মিডিয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দিয়েছেন চূর্ণী।

    রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত

    প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর এ ছবি কলকাতার হলগুলির আনুকল্য সেভাবে পায়নি। তাই এ ছবিটিও দেখানোর জন্য দর্শকরাই একরকম আন্দোলন গড়ে তোলেন। ছবিটি যে ক’জন কয়েকটি প্রদর্শনে দেখেছেন সকলের ভালো লেগেছে। আধুনিক রূপে পর্দায় এসেছে শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত। ঋত্বিক চক্রবর্তী, অপরাজিতা ঘোষদাস অনবদ্য। বাংলাদেশের অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতির কলকাতার প্রথম ছবি হিসেবে রাজলক্ষ্মীর চরিত্রে অভিনয় বেশ সুন্দর।

    সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে

    তিনটি পুরুষ চরিত্র অভিনয়ে মেঘনাদ ভট্টাচার্য, চিরঞ্জিত ও অঞ্জন দত্ত। তিনটি চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েনের সঙ্গে কাহিনিকার অরিজিৎ বিশ্বাস ও পারমিতা মুন্সি সুন্দর ভাবে বুনে দিয়েছেন সমসাময়িক বিষয়গুলি। পরিচালক অরিজিৎ বিশ্বাস প্রথম ছবিতেই তাঁর নিজস্বতার পরিচয় রেখেছেন।

    উড়ো জাহাজ

    অনেকদিন পরে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ছবি এল। অনেক অসুস্থতা পেরিয়ে পরিচালক তৈরি করেছেন ‘উড়োজাহাজ’। মুখ্য চরিত্রে চন্দন রায় স্যানাল ও পার্নো মিত্র। আন্তর্জাতিক মহলেও খ্যাতি পেয়েছে উড়ো জাহাজ।

    কিয়া অ্যান্ড কসমস

    কিয়া একজন স্পেশ্যাল চাইল্ড। তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকে। পাশের বাড়ির বেড়াল কসমস ছিল কিয়ার প্রাণপাখি। সে ছিল সন্তানসম্ভবা। হঠাৎ এক দিন কসমসকে কেউ খুন করে। সেই খুনের কিনারা করতে নামে কিয়া ও তাঁর বন্ধুরা। সুদীপ্ত রায়ের প্রথম ছবি হিসেবে এটি বেশ প্রশংসা পেয়েছে। কিয়ার ভূমিকায় ঋত্বিকা পাল। মায়ের ভূমিকায় স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। তেমন কোনও প্রচার ছাড়াই এই ছবি অনেকের ভাল লেগেছে, ফেস্টিভালেও সমাদৃত হয়েছে।

    শঙ্কর মুদি 

    অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। শপিং মলের দৌরাত্মে হারিয়ে যাচ্ছে মুদিখানার গল্প, পাড়ার সেলুন, টেলারিংয়ের দোকান। কেমন ছিল তাঁদের জীবন, আধুনিকতার ধাক্কায় সে জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াল! এইসব নিয়েই এই ছবি। কবীর সুমনের সঙ্গীত পরিচালনা নতুন মাত্রা যোগ করে ছবিতে।

    মুখোমুখি

    কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের এ ছবি দেখলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি ভিস্যুয়াল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হবে দর্শক। ছবিটি কোনও প্রচার পায়নি। কিন্তু বেশ অন্যরকম প্রচেষ্টা। ছবির উদ্দেশ্য তো শুধু বিনোদন কিংবা ব্যবসা নয়, এটা ‘ওয়ার্ক অফ আর্ট’-ও বটে।  যিশু, গার্গীর অভিনয় উল্লেখযোগ্য।

    ফাইনালি ভালোবাসা

    অঞ্জন দত্তের ছবি ‘ফাইনালি ভালোবাসা’ সামাজিক ভাবে নিষিদ্ধ তিন সম্পর্কের কথা বলে। বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, সমকামিতা এবং অসম বয়সের প্রেম। অঞ্জন দত্ত, সৌরসেনী, সুপ্রভাত, অনির্বাণ, রাইমা, অর্জুন—সকলেই সাহসি অভিনয়ে যথাযথ।

    ২০১০ থেকে ২০১৯ এই দশটা বছরে বাংলা ছবির পটপরিবর্তন বেশ উল্লেখযোগ্য। মৃণাল সেনের মতো পরিচালককে আমরা হারিয়েছি। হারিয়েছি ঋতুপর্ণ ঘোষকে। মৃণাল সেন যদিও অনেক কাল আগেই ছবি করা থেকে সরে গেছিলেন, কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষের আকস্মিক প্রয়াণ কেউ মানতে পারেননি। দিও শিবপ্রসাদ, সৃজিত, কৌশিক, রঞ্জনদের মতো এক ঝাঁক পরিচালক বড় নাম হয়ে উঠে এসেছেন ভাল ভাল ছবি নিয়ে। এসেছেন বহু নতুন পরিচালক, নতুন নায়ক-নায়িকা। যেমন এই দশকেই কলকাতার ছবি পেল বাংলাদেশের জয়া আহসানের মতো অভিনেত্রী-নায়িকাকে যিনি এখন পশ্চিমবাংলার ছবিতেও প্রথমা নায়িকা। বাংলা ছবির বিপণন এখন অনেকটাই ইন্টারনেট বা পাবলিক রিলেশন বেসড। এই আমূল পরিবর্তন বেশ ইতিবাচক। আশা করা যায়, আগামী বছর তথা আগামী দশকও বাংলা ছবিকে নতুন আরও অনেক কিছু দেবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More