মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

জীবনের ছবি জটিল করছে সিরিয়াল

দীপেন্দু হালদার

শ্রী রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন, “যাত্রায় লোকশিক্ষা হয়”।

এক সময়ে অভিনয় মাধ্যম হিসেবে সমাজে একমাত্র যাত্রারই প্রচলন ছিল। তার পরে এল মঞ্চ নাটক। প্রথম দিকে পৌরাণিক নানা ঘটনা সমাজ সংস্কারক নানা বিষয়, জনসচেতনতা, বৈপ্লবিক ভাবধারা (যেহেতু তখন ব্রিটিশ অধিকৃত ছিল দেশ) এবং নানা শিক্ষামূলক বিষয়ের উপরেই বানানো হত এই নাটকগুলো। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের কথা তো সবাই জানি। যুগের বিবর্তনে এরপরে আসে বড় পর্দার ছবি। সেখানেও একই বিষয়। ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ (ভারতের প্রথম সিনেমা) হোক বা ‘শকুন্তলা’, বইয়ের পাতায় পড়া ঘটনারই দৃশ্যরূপ ঘটানো হত পর্দায়। ক্রমশ হাস্যরসের প্রবেশ ঘটলো বড়পর্দায়। তখন মানুষ দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে যেত সিনেমা থিয়েটারে। তার পরে চলচ্চিত্রে এল প্রেম। নিষ্পাপ প্রেম। কিন্তু কখনওই সেই প্রেমের মধ্যে কলুষতাকে স্থান দেওয়া হতনা। সাল ১৯৫৯, ভারতে প্রবেশ করলো প্রথম টেলিভিশন। কিন্তু বাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে সময় লেগে গেল প্রায় আটের দশক অবধি।

তার পরে যুগের বিবর্তনে এল সিরিয়ালের যুগ। মনে আছে আমরাও ছোটবেলায় দেখেছি জন্মভূমি, যুগ, রামায়ণ, কৃষ্ণ, মালগুড়ি ডেজ এইসব সিরিয়াল। সেখানেও কোনও সমাজ দূষক উপাদান থাকতোনা স্ক্রিপ্টে। সিরিয়াল দেখার পর কখনও মনে হতো না ‘ইসস!! মেয়েটা এমন করল!!’… তার পরে চ্যানেল বেড়েছে, গল্প কমেছে। এখন তথাকথিত পারিবারিক সিরিয়াল বলে প্রচারিত যেগুলো সেখানে পারিবারিক কুটকচালিই যেন মুখ্য উপাদান। পরকীয়া, প্রাক্তন প্রেমিকা/প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ের পর আবার সম্পর্ক স্থাপন এই সবই সিরিয়ালের মুখ্য উপাদান।

একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে একটা সিরিয়াল হয়। এই সিরিয়ালটা এর আগেও এক বার বিতর্কের চূড়ায় পৌঁছেছিল। একজন বর্ষীয়ান অভিনেতা স্ত্রীর চরিত্রে তাঁর সহ-অভিনেত্রীকে অনস্ক্রিন জুতো মেরেছিলেন স্ক্রিপ্টের খাতিরেই। সেই নিয়ে লেখালেখিও কম হয়নি। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তার পরেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখন আবার ওই সিরিয়ালেই দেখাচ্ছে একটি ক্লাস নাইনের মেয়ে সে নাকি বিয়ে করে সংসার পাতার জন্য পালিয়ে গেল তার প্রেমিকের হাত ধরে!

এ সব কী? সিরিয়াল তো সবাই দেখে। এগুলো দেখে কি ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না? তারা কি এগুলো শিখবে না? ক্লাস নাইনে আমরা স্কুলে পেন ফাইটিং খেলে পেন ভেঙে বাড়ি ফিরতাম তার জন্য বকুনিও খেতাম, আর এরা নাকি সংসার করার স্বপ্ন দেখছে। এরা কি দেখছে? দেখাচ্ছে তো এদের পরিচালক প্রযোজকরা। শুধু কি তাই? আরও একটি সিরিয়ালে বেশ কিছু শিশু অভিনেতা অভিনেত্রীর মুখে যে সব ডায়লগ দেওয়া হচ্ছে সেগুলো কি ওই বয়সের বাচ্চাদের মুখে শোভা পায়? পরিচালকদের বাড়ির ৫-৬বছরের কোনও বাচ্চা যদি বলে ওঠে, ‘আমাকে পোষা চাট্টিখানি কথা নয়। দেখবে হাড়ে দুব্বোঘাস গজিয়ে যাবে’ বা প্রযোজকের বাড়ির ক্লাস নাইনের মেয়ে যদি পালিয়ে সংসার পাতে, তাঁরা কি মেনে নেবেন?

মানুন বা না মানুন মানুষ কিন্তু যা দেখে সেটা তার মনে দাগ কাটেই। বিশেষ করে শিশুরা তো দেখা থেকে শিক্ষা পায়। তাহলে এখনকার বাচ্চারা তো সিরিয়াল থেকে এই শিক্ষাই পাবে। এটাই কি তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা? আমাদের কি তাহলে প্রস্তুতি নিতে হবে ক্লাস নাইনে পাঠরতা আমাদের পরের প্রজন্ম বাড়ি থেকে পালানোর জন্য ব্যাগ বাঁধছে?

(লেখক পেশায় গায়ক, নেশায় লেখক। সঞ্চালনাও করেন সংবাদমাধ্যমে।)

Leave A Reply