বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

যুদ্ধ থামানোর ইতিহাস গড়েছিল তার ছবি! নাপাম বোমায় ঝলসে যাওয়া সেই শিশু আজ শান্তির মুখ

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

সালটা ১৯৭২। জুন মাসের ৮ তারিখ। নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদমাধ্যমের সদর দফতরে প্রবীন ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা এক জায়গায় হয়েছেন। গুরুতর এক বৈঠক চলছে। বৈঠকের কেন্দ্রবস্তু, একটি ছবি।অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের চিত্রসাংবাদিক নিক উটের তোলা, ভিয়েতনাম যুদ্ধের ছবি। সারা বিশ্বের সংবাদজগৎ তখন তোলপাড় করছে এই যুদ্ধ। প্রতিদিন যুদ্ধের হাজারো প্রতিবেদন, ছবি ছাপা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু এই ছবিটি যেন নাড়িয়ে দিয়েছে পোড় খাওয়া দক্ষ সংবাদকর্মীদের। এ ছবি কি ছাপা যায়?

ছবির বিষয়বস্তু, যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে পালিয়ে আসছে ন’বছরের এক বালিকা। পরনে পোশাক নেই। নগ্ন। চোখেমুখে চূড়ান্ত আতঙ্ক। তার সঙ্গেই দৌড়চ্ছে আরও কয়েকটি বাচ্চা। গোটা ছবিতে যেন যুদ্ধের ভয়াবহ আতঙ্ক উপচে পড়ছে। এই ছবি হাতে পাওয়ার পরে, কী করবেন, বুঝতে পারছিলেন না নিউইয়র্ক টাইমসের এডিটররা। বালিকার নগ্নতার জন্যই হয়তো একটু ধন্দে পড়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সাহস করে শেষ পর্যন্ত ছবিটা তাঁরা ছেপেই দিয়েছিলেন পরের দিনের সংবাদপত্রে। আনএডিটেড।

ইতিহাস বদলে দেওয়া সেই ছবি।

বাকিটা ইতিহাস। এই একটা ছবিই বদলে দিয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি।

এই ছবি এতটাই প্রভাব ফেলেছিল জনমানসে, যে শুধু এই ছবি নিয়েই আলোচনায় বসেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। মার্কিন সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাঁর সেই আলোচনার অডিও টেপে নিক্সনকে বলতে শোনা যায়, ‘‘আমার মনে হচ্ছে এই ছবি সাজানো।’’ এ কথা শোনার পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ফোটোগ্রাফার নিক উট। বলেছিলেন, ‘‘আমার তোলা এই ছবি ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতোই সত্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা রেকর্ড করার জন্য কোনও কিছুই সাজানোর দরকার নেই।’’

ছবির মেয়েটির নাম, ফান থি কিম ফুক। দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাসিন্দা এই মেয়ের ছবিটি প্রকাশের পর থেকে কিম ফুক সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত ‘নাপাম কন্যা’ নামে। কারণ নাপাম বোমার শিকার হয়েই এই অবস্থা হয় তার। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল সে দিন কিমের সঙ্গে? কেনই বা অমন করে দৌড়চ্ছিল সে?

ফোটোগ্রাফার নিক উটের হাতে তাঁর তোলা সেই ছবি।

এর উত্তর পেতে, পিছিয়ে যেতে হবে আরও দশটা বছর। ১৯৬১ সাল। ভিয়েতনামের মাটি থেকে জঙ্গল, ফসল– সব ধরনের সবুজ চিরতরে মুছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডি। কারণ জঙ্গলের আড়ালেই লুকিয়ে থাকছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের গেরিলা বাহিনী। কেনেডির নির্দেশে বিপুল পরিমাণে রাসায়নিক তৈরির বরাত দেওয়া হয় বহুজাতিক রাসায়নিক সংস্থা মনস্যান্টো কেমিক্যালসকে।

দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলাদের জব্দ করতে এর পরই ভিয়েতনাম জুড়ে গ্যালন গ্যালন রাসায়নিক ঢালতে শুরু করে মার্কিন সেনা। সে রাসায়নিকের নাম, রেনবো কেমিক্যালস অর্থাৎ রামধনু রাসায়নিক! কুখ্যাত এই বিষকে এই নামেই ডাকত মার্কিন সেনারা। কারণ আমেরিকা থেকে এই রাসায়নিক ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়া হতো গোলাপি, সবুজ, লাল, নীল, হলুদ, কমলা– ইত্যাদি রংচঙে ড্রামে ভর্তি করে।

এই রাসায়নিক দিয়ে সবুজ ধ্বংসের পাশাপাশি, বড় গাছে ভর্তি অরণ্য ধ্বংস অভিযানেও নেমেছিল আমেরিকা। আর সেই কাজে তাঁদের হাতিয়ার ছিল নাপাম বোমা। প্লাস্টিক পলিয়েস্টিরিন, হাইড্রোকার্বন বেঞ্জিন আর গ্যাসোলিন দিয়ে তৈরি এই জেলির মতো রাসায়নিক মিশ্রণ আকাশপথে ভিয়েতনাম জুড়ে ফেলতে শুরু করেছিল মার্কিন সেনারা। কখনও স্প্রে করে, কখনও বা সরাসরি বোমা ফেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হত জঙ্গল, ঘরবাড়ি সব কিছুই।

এক মার্কিন সেনা পরবর্তী কালে একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এই নাপাম বোমা কোথাও ফেলার পরে, সেই দিকে আর তাকানো যেত না। চোখ ধাঁধিয়ে অন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতো। এই বোমার বিস্ফোরণে জন্মানো আগুন দশ মিনিট ধরে জ্বলত, তাপমাত্রা পৌঁছত ১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে।

এই নাপাম বোমাই পড়েছিল ৯ বছরের কিম ফুকের গ্রামে। বোমা পড়তে শুরু করল যখন, গ্রামের স্থানীয় কাওদাই মন্দির চত্বরে ছিল কিম ও তার বন্ধুরা। আচমকা বোমারু বিমান থেকে নাপাম বোমা ধেয়ে আসে গ্রামে। বোমার আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারায় যায় কিম ফুকের চার পড়শি। বোমায় জ্বলে যায় কিমের দেহের একটা অংশও। জ্বলন্ত পোশাক টেনে খুলে ফেলেছিল ছোট্ট কিম। তার পরেই তীব্র চিৎকার করতে করতে দৌড়তে থাকে সে। সঙ্গে তার বন্ধুরাও।

এই মুহূর্তটাকেই লেন্সবন্দি করে ফেলেছিলেন নিক। তবে এই ছবি তোলার পরেই কিম ও অন্য শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটেছিলেন নিক। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, কিমের ক্ষত সব চেয়ে বেশি। তার বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। ছোট্ট শরীরের ৩০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে থার্ড ডিগ্রিরও বেশি মাত্রার দহনে। কিন্তু হাল ছাড়েননি নিক উট। ১৪ মাস হাসপাতালে রেখে সারিয়ে তুলেছিলেন কিমকে। মোট ১৭টি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল কিমের।

নিক উট এবং কিম ফুক

এক বছর পরে, ১৯৭৩ সালে সারা পৃথিবীর চিত্রসাংবাদিকদের বিচারে সেরা ফোটো নির্বাচিত হয় এই ছবি। পুলিৎজার পুরস্কারও পান নিক। সকলের সামনে আসে নাপাম কন্যার কথা। মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে সারা বিশ্ব জুড়ে। সরকারের ভিয়েতনাম-নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন খোদ মার্কিন নাগরিকেরাও। দেশের ভাবমূর্তি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওযায় শেষমেশ ভিয়েতনাম আগ্রাসনের তীব্রতা কমাতে বাধ্য হয় আমেরিকা। থামে ২০ বছর ধরে চলতে থাকা কুখ্যাত ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এই কুড়ি বছরে মাইলের পর মাইল জঙ্গল ধ্বংস হয়ে গিয়েছে ভিয়েতনামে। অধিকাংশ চাষজমি অনুর্বর হয়ে গিয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩০ লক্ষ সাধারণ মানুষ। ভয়ঙ্করতম যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে ওঠা ভিয়েতনামকে সে দিন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে ওঠার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল ওই একটি ছবি।

ইউনেস্কোর শুভেচ্ছা দূত তিনি।

তবে প্রায় পাঁচ দশক আগে তুমুল যুদ্ধের মুহূর্তে দেখা হওয়া নিক আর কিমের যোগাযোগ কিন্তু এখনও রয়েছে। সে দিনের ছোট্ট কিমের বয়স আজ ৫৬ বছর। ১৯৭২ সালে নাপাম বোমায় গা ঝলসে যাবার পর ভিয়েতনাম থেকে কিউবায় চলে গিয়েছিলেন তিনি৷ সেখান থেকে চলে যান কানাডায়। সেখানেই এখন থাকেন তিনি। সারা দুনিয়া এখনও তাঁকে চেনে নাপাম গার্ল নামেই। আর যুদ্ধের মুখ হয়ে ওঠা সেই নাপাম গার্ল আজ পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য খুলে ফেলেছেন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তাঁর সেই কাজেই সহযোগিতা করছেন নিক।

আজও এ ভাবেই যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন শরীর জুড়ে।

তবে কিশোর বয়সে চরম হতাশায় ডুবে কিয়েছিলেন কিম। তাঁর সব সময় মনে হতো, “আমি এক জন নিষ্পাপ শিশু। আমার সঙ্গে কেন এমন হল। কোনও অপরাধ ছাড়া, আমার শরীরের এতটা চামড়া পুড়ে গেল কেন, কেন আমি কুৎসিৎ হয়ে গেলাম।” যুদ্ধ ও তার ভয়াবহতা বুঝতে আর একটু বড় হতে হয়েছিল কিমকে। এই সময়টাও পাশে ছিলেন নিক। কিমকে ক্রমাগত উদ্বুদ্ধ করে গেছেন, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য।

সম্প্রতি নাপাম কন্যাকে নিয়ে একটি ছোট তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে ব্রুট ইন্ডিয়া। দেখুন সেই তথ্যচিত্র।

The “Napalm Girl” is Helping Child Victims of War

The "Napalm Girl" photo changed the way the world looked at the Vietnam War. That girl, Kim Phúc, is now in her 50s and helping other child victims of war around the world.

Brut India এতে পোস্ট করেছেন মঙ্গলবার, 11 জুন, 2019

৫৬ বছরের কিম এখন ইউনেস্কোর এক জন শুভেচ্ছা দূত। স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে সুখেই আছেন ভাল আছেন তিনি। সারা শরীরে যুদ্ধের পুড়ে যাওয়া ক্ষত বহন করছেন আজও, তবু সারা বিশ্বে পৌঁছে দিচ্ছেন শান্তির বার্তা। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে সচেতন করছেন মানুষকে নানা ভাবে।

মা হয়েছেন কিম।

এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানিতে একটি যুদ্ধবিরোধী অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন কিম। শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। সেখানে তিনি বলেন, “ওই দিন, ওই মুহূর্তের ছবিটা নিশ্চিত ভাবেই আমার জীবন বদলে দিয়েছে। ছবিটা দেখলেই আজও আমার মনে পড়ে যায়, আগুনের পোড়া গন্ধ, অন্ধ ধোঁয়া, তীব্র তাপ, অসহায় চিৎকার। চার দিকে শুধু আগুন দেখতে পাচ্ছিলাম। অসহনীয় তাপে পুড়ে গিয়েছিল আমার জামাও। তখন আমার ভেতর কী হচ্ছিল, তা আমার এখনও মনে আছে। আমার ন’বছর বয়স ছিল তখন। আমার মনে হচ্ছিল, হে ঈশ্বর! আমি পুড়ে গেছি। ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। ভয় পেয়ে ছিঁড়ে ফেলি জামা। নইলে সবসুদ্ধ জ্বলে যেতাম। ভয়, লজ্জা– সব মিলিয়ে আমি প্রাণপণে দৌড়চ্ছিলাম। সেই সময়ই ছবিটা তোলা হয়।”

কিম আরও জানান, তিনি এই পৃথিবীতে যুদ্ধের শিকার হওয়া লাখ লাখ শিশুদের মধ্যে এক জন। তাঁর কথায়, “একটু ভালোবাসা, আশা আর ক্ষমা—এই তিনটি বিষয় দিয়েই সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জীবন সাজানো যেতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। আমাদের পৃথিবীতে যুদ্ধের কোনও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সহানুভূতির, শিক্ষার, চেতনার। একটা ছবির একটি বাচ্চা মেয়ে যদি যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারে, তা হলে সবার পক্ষেই যুদ্ধহীন জীবন পাওয়া সম্ভব।”

কিন্তু কিম নিজে যুদ্ধ-জর্জর জীবন থেকে যে শিক্ষা নিয়েছেন, যেভাবে প্রতিহিংসার বদলে শান্তির পথে হেঁটেছেন, তা কি আজকের পৃথিবীতে আদৌ গ্রহণযোগ্য? ক্ষমা, ভালবাসা আর আশার কথা শোনার জায়গায় কি আছে আজকের পৃথিবী? এই মুহূর্তের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কিন্তু সেই কথা বলছে না। এখন সারা পৃথিবী জুড়েই বাজছে যুদ্ধের দামামা। যুদ্ধ চলছে আফ্রিকা, এশিয়ার এক বিরাট অংশে। কয়েক দিন আগেও যুদ্ধের ঘনঘটা ঘনাচ্ছিল আমাদের উপমহাদেশেও। প্রতিদিন জঙ্গিহানায় প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের, প্রাণ হারাচ্ছেন সেনারাও।

কিমের কিন্তু আজও আশা— মানুষ এক দিন যুদ্ধের ক্ষতি বুঝবেই। ইতিহাস তা-ই বলছে। পরিস্থিতি বদলাবে, মানুষ এক দিন প্রতিহিংসা ভুলে হাঁটবে শান্তির পথেই।

Comments are closed.