বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

ফের দুর্ঘটনা বাংলার পর্বতারোহণে, সরকারি অভিযানে গিয়ে তুষারক্ষত চার আরোহীর

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

কয়েক মাস আগেই কারাকোরামের সাসের কাংরি অভিযানে গিয়ে ক্রিভাসে পড়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন দার্জিলিঙের পেমবা শেরপা। সেই ক্ষত মেলানোর আগেই ফের দুর্ঘটনার শিকার হল বাঙালি পর্বতারোহী দল। আর এবার কোনও ব্যক্তিগত ক্লাবের অভিযান নয়, খোদ রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত পর্বতারোহণ অভিযানে ঘটে গেল এমন দুর্ঘটনা। হাতে-পায়ে তুষারক্ষতে আক্রান্ত হলেন দলনেতা-সহ চার সদস্য।

গত কয়েক বছরের মতো এই বছরও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুবকল্যাণ দফতরের পর্বতারোহণ শাখা (ওয়েস্ট বেঙ্গল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস ফাউন্ডেশন) আয়োজিত অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন বাংলার আরোহীরা। মহিলাদের এবং পুরুষদের দু’টি পৃথক দল যথাক্রমে যোগিন ১, ৩ এবং শ্রী কৈলাস শৃঙ্গ আরোহণে গিয়েছিলেন। সুপ্রিয়ার নেতৃত্বে অংশগ্রহণকারী ওই মহিলা দলটির সঙ্গে ছিলেন পর্বতারোহণ শাখার মুখ্য উপদেষ্টা দেবদাস নন্দীও। অন্য দিকে পুরুষ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন পার্থ দত্ত।

অভিযানের আগে, পতাকা তুলে দেন যুব কল্যাণ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস।

পুরুষ দলের চার আরোহীর সঙ্গেই ঘটেছে এই দুর্ঘটনা। তাঁরা জানিয়েছেন, ২১ অক্টোবর ৬,৯৩২ মিটার উচ্চতার শ্রীকৈলাস শৃঙ্গ ছোঁয়ার উদ্দেশ্যে সামিট ক্যাম্প থেকে বেরোন তাঁরা। শৃঙ্গ থেকে আনুমানিক ৩০০ মিটার মতো দূরে থাকাকালীন শেষ হয়ে যায় দড়ি। সে সময়ে ফের নীচে নেমে দড়ি খুলে এনে উপরে এসে নতুন করে লাগান শেরপারা। এই গোটা সময়টা শৃঙ্গের নীচেই অপেক্ষা করেন পাঁচ অভিযাত্রী, দলনেতা পার্থ দত্ত, সুমিত দাস, নীরজ জয়সওয়াল, শঙ্কর বিশ্বাস, শুভঙ্কর দত্ত এবং আর এক শেরপা। অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা জানাচ্ছেন, অতটা উচ্চতায় অত ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যথেষ্ট বিপজ্জনক এবং কঠিন। প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়ায় নাকে, আঙুলে তুষারক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা শুরু হয়। তার উপরে আরোহণ বা অবরোহণ করলে শরীর সচল থাকে, উষ্ণও থাকে। এক জায়গায় থেমে থাকলে তা হয় না। ফলে তুষার ক্ষতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়ে।

এমনই অবস্থা হয়েছে এক সদস্যের পায়ের।

কয়েক ঘণ্টা পরে দড়ি লাগানো হলে আরোহণ করেন সকলে। তত ক্ষণে প্রচণ্ড হাওয়া এবং তুষারের দাপটে আঙুলের ডগা, নাকের ডগা অবশ হয়ে যেতে থাকে। শুরু হয় তুষার ক্ষতের সূচনাও।

তুষার ক্ষত বা ফ্রস্ট বাইট আসলে কী, কেন হয়?
অতিরিক্ত ঠান্ডায় শরীরের কোনও অংশে রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা কমে গিয়ে স্নায়ু ও পেশি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। হাতের বা পায়ের আঙুল, নাক– এ সব উন্মুখ অংশগুলিতে ঠান্ডা হাওয়া বা তুষারের স্পর্শ বেশি লাগে বলে, পর্বতারোহণের সময়ে ওই অঙ্গগুলিই বেশি আক্রান্ত হয়। প্রথমে ঠান্ডায় অবশ হয়ে আসে, পরে চিনচিন ভাব শুরু হয়। এই অবস্থাই ক্রমে গ্যাংগ্রিনে পরিণত হয়। আক্রান্তের তীব্রতা অনুযায়ী ফার্স্ট ডিগ্রি বা সেকেন্ড ডিগ্রি বা থার্ড ডিগ্রির তুষার ক্ষত হয়ে থাকে। প্রথম অবস্থাতেই চিকিৎসা শুরু করতে পারলে ক্ষত সারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সংক্রমণ শুরু হয়ে গেলে, তা গোটা আঙুলকেই পচিয়ে ফেলে। তখন আঙুল বাদ দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

সুমিত দাসের হাতে তুষার ক্ষত।

শৃঙ্গ সামিট করার পরে অসুস্থ অবস্থায় দ্রুত গঙ্গোত্রী নেমে আসেন পার্থ, সুমিত ও নীরজ। ২৪ তারিখ সেখান থেকেই ফোনে যোগাযোগ করা হয় দফতরের উপদেষ্টা দেবদাস নন্দীর সঙ্গে। তিনি ২৩ তারিখেই কলকাতা ফিরেছেন মহিলা অভিযাত্রী দলটির সঙ্গে। দেবদাসবাবুর পরামর্শে উত্তরকাশীর পর্বতারোহণ ইনস্টিটিউট নিম (নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং)-এ যান তাঁরা। সেখান থেকে তাঁদের পাঠানো হয় হৃষীকেশের এইমস হাসপাতালে। সেখানেও তেমন কোনও চিকিৎসা না মেলায় তাঁরা দিল্লি চলে আসেন। সেখান থেকে ২৬ তারিখ ফ্লাইটে সোজা কলকাতা।

সুমিত দাস।

জানা গিয়েছে, তত ক্ষণে বেশ খারাপ অবস্থা অভিযাত্রীদের হাত-পায়ের। কিন্তু ওই অবস্থাতেও বিমানবন্দরে সরকারি তরফে কেউ ছিলেন না তাঁদের সাহায্য করার জন্য। ওই অবস্থাতেই নিজেরা নিজেদের ভারী রুকস্যাক বয়ে, ট্যাক্সি জোগাড় করেছেন তাঁরা। দেবদাস নন্দীর নির্দেশে পৌঁছেছেন বিটি রোডের সাগর দত্ত হাসপাতালে।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেবদাস বাবু। ডাক্তার দেখিয়ে, ওষুধ কিনে দিয়ে রাত দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ ছেড়ে দেওয়া হয় তিন জনকেই। চতুর্থ অভিযাত্রী শুভঙ্কর দত্ত আজ, ২৯ তারিখে দলের বাকি সদস্যদের সঙ্গে ফিরছেন। তাঁর ক্ষত অতটা মারাত্মক নয়। আক্রান্ত শেরপার কোনও খবর মেলেনি এখনও।

দলনেতা পার্থ দত্ত জানালেন, গোটা পর্বেই তিনি যোগাযোগ রেখেছেন দেবদাস নন্দীর সঙ্গে। “হৃষীকেশের এইমসে চিকিৎসকেরা প্রথমে দেখেই আঙুল অ্যাম্প্যুট করার কথা বলেন। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই, কলকাতায় ফিরে চিকিৎসা করানোর। অ্যাম্প্যুট যদি করাতেই হয়, তবে তা কলকাতায় করানোই ভাল বলে মনে হয় আমার।”– বলেন পার্থ। তিনি জানান, সদস্যদের হাতের গ্লাভস সকলেরই পার্সোনাল ছিল, সরকারের নয়। সেই সঙ্গে তিনি এ-ও বলেন, চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনও ত্রুটির অবকাশ রাখেনি রাজ্য সরকার। আর এক আক্রান্ত সদস্য সুমিত দাসের অবশ্য অভিযোগ, ফেরার পরে অন্তত কোনও সরকারি প্রতিনিধি বিমানবন্দরে থাকবেন বলে আশা করেছিলেন তিনি।

পর্বতারোহী মহলের প্রশ্ন, প্রায় সাত হাজার মিটার উচ্চতার শৃঙ্গে আরোহণের মতো দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা কি সকল সদস্যের ছিল? পার্থ জানান, দলের সদস্যদের প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা ভাল ছিল অভিযানে। আবহাওয়াও বেশ ঝকঝকে ছিল সামিটের দিন পর্যন্ত। তাই ফিরে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি এক বারও। কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডায় আর কনকনে হাওয়ায় যে এই অবস্থা হবে, তা বুঝতে পারেননি কেউই।

যুব কল্যাণ দফতরের পর্বতারোহণ শাখার মুখ্য উপদেষ্টা দেবদাস নন্দীকে অনেক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও ফোন ধরেননি তিনি। তাঁর প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে আপডেট করব আমরা।

Comments are closed.