রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

‘বন্ড ০০৭’! বরগুনায় কুপিয়ে যুবক খুনের তদন্তে উঠে আসছে ভয়াবহ কিশোর গ্যাং-এর কথা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বরগুনায় সম্প্রতি খুন হয়েছেন বছর পঁচিশের যুবক রিফাত শরিফ। তাঁর স্ত্রী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁর সামনেই প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে। ভাইরাল হয়েছে খুনের ভিডিও। শুরু হয়েছে পুলিশি তদন্ত। আর এর পরেই সামনে এসেছে ‘বন্ড ০০৭’ নামের একটি গ্রুপের কথা।

বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের ওই নৃশংস ঘটনায় রবিবার আরও এক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার পরেই জানা গিয়েছে ফেসবুক গড়ে ওঠা ‘বন্ড ০০৭’ গ্রুপের কথা। এই নিয়ে যে চার জন গ্রেফতার হয়েছে, তারা সকলেই ওই গ্রুপের সদস্য বলে জানা গেছে।

এই গ্রুপটি কে তৈরি করেছে, কোন উদ্দেশে করেছে, কী তাদের কাজ, কি নিয়েই বা তারা আলোচনা করে, এ সব এখনও পুলিশি তদন্তে পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এই গ্রুপে যে অপরাধমূলক চিন্তাভাবনার চর্চা হতো, তা এক প্রকার নিশ্চিত পুলিশ। এবং ওই গ্রুপের তরফেই যে বিভিন্ন বয়সের কিশোর ও তরুণদের নানা রকম কাজে উস্কানো হতো, তারও প্রমাণ মিলেছে ইতিমধ্যেই।

এবং এই ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশের ঢাকা ও অন্যান্য শহরের অভিভাবকেরা ভয় পেতে শুরু করেছেন তাঁদের সন্তানকে নিয়ে। আশঙ্কা, নিজের অজান্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় চলাচল করতে করতে কেউ এ রকম কোনও চক্রে জড়িয়ে না পড়ে!

যে সমস্ত কিশোর গ্যাং নিয়ে অভিভাবকদের এত উদ্বেগ, তার খবর অবশ্য ঢাকায় প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল বছর দুয়েক আগেই সেই সময়ে দু’টি দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে আদনান কবীর নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। সে সময়ে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছিল, ‘উত্তরা ডিস্কো বয়েজ’ ও ‘বিগ বস কিশোর গ্যাং’ নামের দুটো গ্রুপ। এর পরে গত দু’বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বারবার নানা ঘটনার জন্ম দিয়েছে বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং-ই।

কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল-সহ কয়েকটি বড় শহরে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং নানা ঘটনায় আলোচনায় উঠে এলেও, মফস্বল শহরে এই ধরনের সংঘবদ্ধ কিশোর দলের অপরাধমূলক তত্‍পরতার খবর আগে খুব একটা আসেনি। বরগুনার সাম্প্রতিক খুন সেটাই করে ফেলল এ বার।

ঢাকায় পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এক অফিসার নাজমুল ইসলাম জানিয়েছেন ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে এই ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের ধারণা শহর থেকে মফস্বল শহরগুলোতে প্রকাশ পাচ্ছে ক্রমশ। তবে এ সবের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পুলিশও দিনে দিনে সক্ষম হয়ে উঠছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, “ঢাকার মধ্যে যে সব গ্রুপ কাজ করছিল, তাদের আইপি অ্যাড্রেস চিহ্নিত করে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তদন্তের জন্য সব রকম তথ্য সংগ্রহ করে মনিটর করে এই কাজ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মফস্বলের পুলিশের সাইবার-দক্ষতা ঢাকার পুলিশের তুলনায় কম। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চ মহল থেকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সাইবার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হচ্ছে। আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, বিভিন্ন ডিভাইস এনেও কাজ করছি।”

পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, ঢাকাতেই গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সন্ধান মিলেছে অন্তত ৫০টি। এখন নতুন করে মফস্বল জেলা শহরের কিশোররাও জড়িয়ে পড়ছে এ ধরনের অপরাধী চক্রের সাথে।

নাজমুল ইসলাম আরও বলেন, “অনেক গ্রুপ নিজেদের মধ্যে মাদক নিয়ে কথা বলে। আবার অনেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। অনেকে সেলেব্রিটিদের নানা ভাবে উত্ত্যক্ত করা নিয়ে কথা বলে, তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করে। তাঁদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার পরিকল্পনা করে। অনেকে আবার নানা ‘দুশ্চরিত্র’ মহিলাদের উল্লেখ করে শাস্তি দেওয়ার কথা বলে।”

শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের মতে, অভিভাবকদের উচিত সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং তাদের জগৎকে অনুধাবনের চেষ্টা করা, যাতে সন্তান খারাপ সংসর্গে যাওয়ার সুযোগ না পায়। ২৪ ঘণ্টা নজরদারি সম্ভব নয়, উচিতও নয়। তবে দিনের শেষে খোলামেলা মেলামেশা কিন্তু অনেক অসঙ্গতি দূর করে দিতে পারে। আবার পাড়ার মধ্যে কিশোরদের মধ্যে কখনও কোনও বিষয়ে বিরোধ হলে, তা যেন খুব বেশি দূর না গড়ায়, সে দিকেও অভিভাবক ও এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের খেয়াল রাখা উচিত বলে মনে করেন তাঁরা।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বালিন্দা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপিকা যেমন বলছেন, তাঁর কিশোর সন্তান ইন্টারনেট দুনিয়ায় কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে ভুল করে ফেলে কি না, কিংবা অপরাধীদের চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে কি না, এ নিয়ে রীতিমত উত্‍কণ্ঠায় থাকেন তিনি।

ঢাকার আর এক জন চাকরিরতা মা বলছেন, “প্রথমত আমি বুঝতেই পারি না যে আমার ছেলে স্কুলে আর স্কুলের বাইরে কাদের সাথে মিশছে। আর একটা বিষয় হলো, সে কী ভাবে চিন্তা করছে সেটা পুরোপুরি বোঝা যায় না। ইন্টারনেট সে কী ভাবে ব্যবহার করছে, নিজের বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাচ্ছে কি না, সেটা বোঝার মতো কোনও কন্ট্রোল আমার কাছে নেই। এটাই বড় উদ্বেগের।”

চট্টগ্রামের গৃহবধূ শগুফতা পারভিন বলছেন, “এমনিতেই এই বয়সি সন্তানদের নিয়ে আমরা বাবা-মায়েরা সব সময়ে চিন্তিত থাকি। তার মধ্যে নতুন উপসর্গ হিসেবে এসেছে কিশোর গ্যাং কালচার, যা অভিভাবকদের আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আমার এক ছেলে ক্লাস সিক্সে, আর এক ছেলে ক্লাস ইলেভেনে পড়ছে। আমি নিজে দেখেছি ওদের স্কুলের অনেকে গ্যাং বা গ্রুপে জড়িয়ে পড়েছে। ক্রাইম করে ফেলছে ছোটোখাটো। আমার ছেলেদের নিয়েও খুব চিন্তা। এই বয়সে কুসঙ্গে জড়ানো এক রকম। কিন্তু সেট দুনিয়া সেটাকে একটা অন্য মাত্রা দিচ্ছে।”

পুলিশ জানাচ্ছে, ইংরেজি সিনেমা দেখে নানা রকম অপরাধের প্লট মাথায় ছকছে তারা। কোনও কোনও জায়গায় তো রীতিমতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বরগুনার যুবক রিফাত শরিফ খুনের পরে এরকমই একটি গ্যাংয়ের কথা সামনে এল। খতিয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

Comments are closed.